ফ্রয়েড অবচেতনের কথা বলার বহু আগে, সার্ত্র স্বাধীনতাকে অভিশাপ বলার বহু আগে, আর বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থাগুলো জন্ম নেওয়ার বহু আগে, উনিশ শতকের এক রুশ ঔপন্যাসিক এই সবকটা প্রশ্নের উত্তর লিখে রেখে গিয়েছিলেন তার উপন্যাসের পাতায়, যেই উত্তরগুলো আজও পুরোনো হয়নি।

সেন্ট পিটার্সবার্গের ঠান্ডা রাস্তায় যে মানুষটা হাঁটতেন, তিনি স্রেফ একজন গল্পকার ছিলেন না। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, আর এক অর্থে ভবিষ্যদ্বক্তা, যিনি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর ছায়া আগেভাগেই দেখে ফেলেছিলেন। ফ্রয়েড যখন অবচেতন মনের মানচিত্র আঁকবেন, তার দশক দশক আগেই তিনি সেই মানচিত্রের সবচেয়ে অন্ধকার অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে ফেলেছিলেন। অস্তিত্ববাদীরা যখন ঘোষণা দেবেন যে অস্তিত্ব সারবস্তুর আগে আসে, তারও অনেক আগে তিনি তার চরিত্রদের হাত দিয়ে এই সত্যকে নাটকীয়ভাবে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। আর যে সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাগুলো একদিন পৃথিবীকে ভয় দেখাতে উঠে দাঁড়াবে, তারও বহু আগে তিনি প্রায় নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিলেন সেগুলো কী রূপে আসবে, আর কেন কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় তাদের কাছে নতি স্বীকার করবে।

এই লেখাটা নিছক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা না। তার উপন্যাস আর গল্পের ভেতরে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এমন কিছু অন্তর্দৃষ্টি লুকিয়ে আছে, যা মানব ইতিহাসের শুরু থেকে তাড়া করে ফেরা প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ায়। আমরা কেন কষ্ট পাই? স্বাধীন হওয়ার অর্থ কী? অর্থহীন এক মহাবিশ্বে অর্থ খোঁজা যায় কীভাবে? ভালো আর মন্দের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কী? মানুষ কি একটা নিখুঁত সমাজ গড়ে তুলতে পারে? ঈশ্বর কি আছেন, আর থাকলে নিরপরাধের কষ্টের ব্যাখ্যা কী?

এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি তিনি হননি কোনো আরামকেদারায় বসে থাকা বিদ্বান হিসেবে। তরুণ বয়সে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চোখ বেঁধে বন্দুকের সামনে দাঁড় করানোর ঠিক শেষ মুহূর্তে খবর আসে, সাজা বদলে সাইবেরিয়ায় কঠোর শ্রমে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে চার বছর তিনি কাটান এমন এক শ্রমশিবিরে, যেখানে মানুষের নিষ্ঠুরতা আর অধঃপতনের একেবারে তলদেশ তিনি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেন। সারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবন তিনি ভুগেছেন মৃগীরোগে, জড়িয়ে পড়েছেন জুয়ার নেশায়, হারিয়েছেন প্রিয় সন্তানদের, দারিদ্র্যে কাটিয়েছেন জীবনের বড় অংশ। যন্ত্রণা তার কাছে বিমূর্ত কোনো ধারণা ছিল না, তিনি সেটা ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন। আর এই চেনাজানাই তার অন্তর্দৃষ্টিকে এমন একটা শক্তি আর সত্যতা দিয়েছিল, যা কেবল বইয়ের পাতায় দর্শন চর্চা করা মানুষের পক্ষে অর্জন করা কখনোই সম্ভব হতো না।

তার দর্শন নিয়ে কথা বলার আগে একটা সতর্কতা জরুরি। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যতাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন যুক্তি দিয়েছিলেন, দস্তয়েভস্কিকে একজন “দার্শনিক” হিসেবে পড়াটাই আসলে এক ধরনের ভুল পথে হাঁটা, যদি তার মানে দাঁড়ায় তার কোনো একটা উপন্যাস থেকে একটামাত্র সুসংহত মতবাদ বের করে আনা। বাখতিনের মতে দস্তয়েভস্কির আসল আবিষ্কার সাহিত্যিক রূপেই লুকিয়ে, তিনি প্রথম ঔপন্যাসিক যিনি সত্যিকারের “পলিফনিক” উপন্যাস লিখেছেন, যেখানে রাসকলনিকভ, ইভান, জসিমা, আন্ডারগ্রাউন্ড মানুষ, প্রত্যেকেই লেখকের হয়ে কথা বলা পুতুল না, বরং নিজের মতো স্বাধীন এক চেতনা, যার যুক্তি নিজের পূর্ণ ওজন নিয়ে দাঁড়ায়, আর উপন্যাসের কোনো এক জায়গায় “সঠিক” কণ্ঠস্বর দিয়ে খারিজ হয়ে যায় না। এই কারণে দস্তয়েভস্কি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, তার উপন্যাস থেকে একটা পরিষ্কার, একরৈখিক দার্শনিক উপসংহার টেনে বের করাটা নিজেই তার শিল্পের বিরুদ্ধে যাওয়া।

আরেকটা ভুল সাধারণত হয়, তাকে ইতিহাসের বাইরে বসে থাকা একা এক ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে কল্পনা করা। দস্তয়েভস্কির সবচেয়ে সম্মানিত জীবনীকার জোসেফ ফ্রাঙ্ক তার পাঁচ খণ্ডের বিশাল জীবনীগ্রন্থে দেখান, উলটোটাই বেশি সত্যি। দস্তয়েভস্কির প্রতিটা বড় উপন্যাস আসলে তার সময়ের নির্দিষ্ট আদর্শিক লড়াইয়ের সরাসরি জবাব, বিশেষত রুশ নিহিলিজম আর নিকোলাই চের্নিশেভস্কির যুক্তিবাদী সমাজতান্ত্রিক দর্শনের বিরুদ্ধে। ফ্রাঙ্কের ভাষায় তিনি ছিলেন “তার সময়ের একজন লেখক, যাঁকে বোঝার জন্য উনিশ শতকের রাশিয়ার প্রকৃত রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।” তার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতাকেই ফ্রাঙ্ক তার পরিণত চিন্তার সবচেয়ে বড় জন্মমুহূর্ত বলে মনে করেন। এটাও মনে রাখা দরকার, ফ্রাঙ্ক তাকে বর্ণনা করেন একজন “দেশপ্রেমিক স্লাভপন্থী” হিসেবে, যার রুশ-জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি।

তার কাছে স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক ধারণা না, ভোটাধিকার বা সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন না। স্বাধীনতা হলো মানব-অস্তিত্বের আধিবিদ্যক ভিত্তি নিজেই, যা মানুষকে পশু থেকে, যন্ত্র থেকে, এমনকি দেবদূত থেকেও আলাদা করে। এটাই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান আর সবচেয়ে ভয়ংকর উপহার, আর এখান থেকেই আসে তার সবচেয়ে বড় গৌরব, আবার সবচেয়ে গভীর দুর্দশাও।

বেশিরভাগ মানুষ যখন স্বাধীনতার কথা ভাবে, তারা ভাবে বাধাহীনভাবে যা খুশি করার ক্ষমতা। কিন্তু তিনি বলতে চাইছিলেন আরও মৌলিক আর আরও অস্বস্তিকর কিছু, ভালো আর মন্দের মধ্যে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ার স্বাধীনতা, এমনকি কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই নিজেকে আর অন্যকে ধ্বংস করার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা ঐচ্ছিক না। মানুষ চাইলেও একে ত্যাগ করতে পারে না। যখন কেউ কোনো কর্তৃপক্ষের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়, তখনো আসলে সে একটা স্বাধীন সিদ্ধান্তই নিচ্ছে, নিজের বশ্যতা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। যখন কেউ বলে তার আচরণ জিন বা লালনপালন বা অবচেতন তাড়না দিয়ে নির্ধারিত, তখনো সে স্বাধীনভাবেই সেই নির্ধারণবাদী ব্যাখ্যাটাকে মেনে নিতে বেছে নিচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা সিদ্ধান্তের আড়ালে এই স্বাধীনতা লুকিয়ে থাকে, আর এই বোঝাই মানুষের মধ্যে জন্ম দেয় উদ্বেগ, অপরাধবোধ, আর এক ধরনের অস্তিত্বজনিত ভয়ের।

কেন এমন ভয়ংকর একটা বোঝা মানুষের কাঁধে চাপানো হলো? কারণ স্বাধীনতা ছাড়া ভালোত্বের কোনো অর্থ থাকে না। মানুষকে সাহায্য করার জন্য প্রোগ্রাম করা একটা যন্ত্র নৈতিকভাবে প্রশংসার যোগ্য না। শাবককে রক্ষা করা কোনো পশুও গুণের পরিচয় দিচ্ছে না। কেবল সেই সত্তাই নৈতিক কৃতিত্ব অর্জন করে, যে মন্দ বেছে নিতে পারত কিন্তু স্বেচ্ছায় ভালো বেছে নিয়েছে। এখানেই তার দর্শনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। বেশিরভাগ মানুষ, তিনি বলেন, এই মাত্রার স্বাধীনতা সামলাতে পারে না। এটা এত ভয়ংকর, এত ভারী, যে সত্যিকারের স্বাধীনতার মুখোমুখি হলে বেশিরভাগ মানুষ সেটা থেকে পালানোর জন্য যা কিছু করতে রাজি। তারা রাজনৈতিক নেতার কাছে নিজের স্বায়ত্তশাসন তুলে দেয়, এমন কঠোর মতাদর্শ গ্রহণ করে যা তাদের ঠিক কী ভাবতে হবে বলে দেয়, নেশা আর বিনোদনে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, যাতে নিজে কে হতে চায় সেই ভয়ংকর দায়িত্বটা এড়ানো যায়।

উনিশ শতকের বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বাস করতেন, মানুষ মূলত এক যুক্তিবাদী প্রাণী, যাকে সঠিক শিক্ষা আর অনুকূল সামাজিক পরিবেশ দিলে সে স্বাভাবিকভাবেই নিজের ভালো বেছে নেবে। কিন্তু তিনি এই বিশ্বাসের মধ্যে দেখেছিলেন এক বিপজ্জনক ভ্রান্তি। মানুষ প্রধানত যুক্তিবাদী প্রাণী না। মানুষ আবেগপ্রবণ, আধ্যাত্মিক, আর প্রায়ই গভীরভাবে অযৌক্তিক এক সত্তা, যে বারবার নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন মনস্তাত্ত্বিক কারণে, যার সঙ্গে যুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। “অপরাধ ও শাস্তি”-র রাসকলনিকভ খুন করে এই ভেবে না যে সেটা তার যুক্তিসংগত স্বার্থ রক্ষা করবে, বরং প্রমাণ করতে যে সে সাধারণ মানুষের নৈতিক আইন অতিক্রম করার মতো অসাধারণ। এই ধরনের চরিত্র দেখায়, বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি কীভাবে গভীর মানসিক তাড়নাকে প্রকাশের বদলে আড়াল করার একটা কৌশল হয়ে উঠতে পারে।

এই অন্তর্দৃষ্টির রাজনৈতিক তাৎপর্য ভয়াবহ। মানুষ যদি যুক্তিসংগতভাবে আচরণ না করে, তাহলে যুক্তিনির্ভর সামাজিক পরিকল্পনা দিয়ে নিখুঁত সমাজ গড়া যায় না। মানুষের আচরণ যদি অবচেতন মনস্তাত্ত্বিক শক্তি দিয়ে চালিত হয়, তাহলে শুধু সচেতন শিক্ষা আর সংস্কার দিয়ে সামাজিক অসদাচরণ দূর করা যায় না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা দিয়ে মন্দকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা হয় সরল বিশ্বাসী, নয়তো অসৎ।

সেই সময়ের বেশিরভাগ চিন্তক মনে করতেন, মানুষ মূলত ভালো, খারাপ আচরণ আসে দুর্নীতিগ্রস্ত সামাজিক পরিস্থিতি থেকে। কিন্তু সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে চার বছর কাটানোর সময় তিনি দেখেছিলেন, সেখানকার অনেক অপরাধী দারিদ্র্য বা মরিয়া পরিস্থিতির চাপে না, নিছক পছন্দ করেই অপরাধ করেছে। কেউ কেউ হিংসা উপভোগ করত নিজের জন্যই। যা তাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করেছিল, তা হলো এই মানুষগুলো দানব ছিল না, তারা ছিল একেবারে চেনা মানুষের মতোই, একই মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক গঠন নিয়ে তৈরি, যারা যুক্তি বুঝতে পারে, আবেগ অনুভব করতে পারে, এমনকি মাঝে মাঝে সহৃদয়ও হতে পারে। যদি এই ধরনের মানুষও হিংস্র অপরাধী হয়ে উঠতে পারে, তাহলে প্রতিটা মানুষের ভেতরেই সেই সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।

এই উপলব্ধি থেকেই আসে তার সবচেয়ে ভারী সিদ্ধান্ত, মন্দ কোনো দুর্ঘটনা না, বরং মানুষের স্বাধীনতারই এক অনিবার্য পরিণতি। মানুষ যদি সত্যিকার অর্থেই ভালো আর মন্দের মধ্যে বেছে নিতে স্বাধীন হয়, তাহলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ মন্দকেই বেছে নেবে। এই মন্দ কখনোই ভালো সমাজব্যবস্থা দিয়ে সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায় না, আর যে ব্যবস্থা মন্দ পুরোপুরি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা প্রায়ই নিজেরাই আরও ভয়ংকর মন্দে পরিণত হয়, কারণ তাদের পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে চরম পন্থা ব্যবহার করতে তারা দ্বিধা করে না।

তাকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিয়েছিল একটা প্রশ্ন, নিরপরাধ শিশুর কষ্টের প্রশ্ন। একজন প্রেমময় সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কীভাবে শিশুদের নির্যাতন আর হত্যার অনুমতি দিতে পারেন? “ব্রাদার্স কারামাজভ”-এর ইভান কারামাজভের মুখ দিয়ে তিনি এই প্রশ্নটা তোলেন তার সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে হৃদয়বিদারক রূপে। ইভান বলেন, নিরপরাধ শিশুর যন্ত্রণার কোনো ব্যাখ্যা তিনি মেনে নিতে রাজি না, তা যত মহৎ চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের কথাই বলা হোক না কেন। ভবিষ্যতের কোনো সুখ, কোনো মহাজাগতিক ন্যায়বিচার একটা নির্যাতিত শিশুর চোখের জল মুছে দিতে পারে না। তাই ইভান ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন না, তিনি প্রত্যাখ্যান করেন ঈশ্বরের তৈরি এই পৃথিবীটাকেই।

এই বিদ্রোহের চূড়ান্ত রূপ ফুটে ওঠে “গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর” নামের সেই বিখ্যাত উপকথায়, যা ইভান শোনান তার ভাই আলিওশাকে। গল্পে যিশু আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন, আর চার্চের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করে। কারাগারের অন্ধকারে বসে বৃদ্ধ ইনকুইজিটর যিশুকে বোঝান কেন তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যুক্তিটা এই রকম, যিশু মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতা এমন এক বোঝা, যা বেশিরভাগ মানুষ বইতে পারে না। চার্চ তাই যিশুর সেই “ভুল” সংশোধন করেছে, মানুষকে রুটি, অলৌকিকতা, আর কর্তৃত্ব দিয়ে, ঠিক যা শয়তান মরুভূমিতে প্রস্তাব করেছিল আর যিশু প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই যুক্তির ভয়ংকর দিক হলো, এতে যথেষ্ট সত্যতা আছে যে একে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা যায় না। কতজন মানুষ সত্যিই নিজের নৈতিক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে চায়? কতজন সত্যের চেয়ে নিশ্চয়তা বেশি পছন্দ করে না?

গল্পের শেষে যিশু কোনো তর্ক করেন না। তিনি শুধু বৃদ্ধ ইনকুইজিটরের ঠোঁটে একটা চুমু দেন, যাতে কোনো যুক্তি নেই, শুধু আছে একজন পথ হারানো মানুষের প্রতি ভালোবাসার নীরব প্রকাশ। এই দৃশ্যটাকে অনেক সময় সহজ এক নৈতিক জবাব হিসেবে পড়া হয়, যেন ভালোবাসা তর্কে জিতে গেল। কিন্তু দস্তয়েভস্কি বিশেষজ্ঞরা এই সরলীকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। রুশ সাহিত্যতাত্ত্বিক মিখাইল বাখতিন তার “প্রবলেমস অব দস্তয়েভস্কিজ পোয়েটিক্স” গ্রন্থে দেখান, দস্তয়েভস্কির উপন্যাস আসলে “পলিফনিক”, অর্থাৎ প্রতিটা চরিত্র সেখানে লেখকের মুখপাত্র না, বরং নিজের মতো করে স্বাধীন এক চেতনা, যার যুক্তি নিজস্ব ওজন নিয়ে দাঁড়ায়। বাখতিনের মতে, ইভানের বিদ্রোহ কোনো ভুল অবস্থান হিসেবে উপস্থাপিত হয় না, যা পরে সঠিক উত্তর দিয়ে খণ্ডন করা হচ্ছে, বরং এটা এমন একটা কণ্ঠস্বর, যা উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত পুরো ওজন নিয়ে বেঁচে থাকে। ধর্মতাত্ত্বিক রোয়ান উইলিয়ামস তার দস্তয়েভস্কি বিষয়ক গ্রন্থে একই কথা আরেকভাবে বলেন, এই উপন্যাসে কোনো একক লেখক-কণ্ঠস্বর শেষ রায় দেয় না, যন্ত্রণার কোনো ভাষাগত সমাধান নেই, চুমুটা তর্কের জবাব না, বরং তর্ক থেকে সরে আসারই একটা ভঙ্গি। এই দৃশ্যটাই বলে দেয়, স্বাধীনতা আর নিরাপত্তার মধ্যেকার এই দ্বন্দ্ব যুক্তি দিয়ে চূড়ান্তভাবে মেটানো যায় না, আর দস্তয়েভস্কি নিজেও ইচ্ছাকৃতভাবে সেটা মিটিয়ে দেননি।

১৮৭০-এর দশকে লেখা “ডেমনস” উপন্যাসে তিনি বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের এমন এক চিত্র এঁকেছিলেন, যা বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক চরমপন্থার কৌশল আর মনস্তত্ত্বকে আশ্চর্যজনক নির্ভুলতায় আগাম আঁচ করে ফেলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থা জন্ম নেয় না ঐতিহ্যগত কর্তৃত্ব থেকে, বরং প্রচলিত বিশ্বাস আর প্রতিষ্ঠানের পতন থেকে। এই নতুন ধরনের অত্যাচারী নিজেকে বিজেতা হিসেবে না, মানবতার সেবক হিসেবে উপস্থাপন করে, যে কষ্ট দূর করতে আর নিখুঁত সমাজ গড়তে চায়। ঠিক এই কারণেই তাদের অত্যাচার ঐতিহ্যগত স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক, আর প্রতিরোধ করাও অনেক কঠিন।

তার উপন্যাসের বিপ্লবী চরিত্ররা সামাজিক অবিচারের প্রতি সত্যিকারের উদ্বেগ থেকে শুরু করে। কিন্তু মতাদর্শের প্রতি ক্রমবর্ধমান আনুগত্য ধীরে ধীরে তাদের মৌলিক মানবিক শালীনতাবোধকে গ্রাস করে ফেলে। তারা মিথ্যা বলতে, চুরি করতে, এমনকি খুন করতেও রাজি হয়ে যায়, কারণ তারা নিজেদের বুঝিয়ে ফেলেছে যে তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি আর নৈতিক দ্বিধা আসলে সেই “মহত্তর কল্যাণের” পথে সামান্য বাধামাত্র। এই ধরনের মন্দ সাধারণ অপরাধের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর, কারণ এটা কাজ করে পরিষ্কার বিবেক নিয়ে, নৈতিক বৈধতার দাবি নিয়ে।

তার দর্শনের একেবারে গভীরে আছে একটা সহজ অথচ বিপ্লবী দাবি। ভালোবাসা নিছক একটা মানবিক আবেগ না, এটা মহাবিশ্বকে একসূত্রে বেঁধে রাখা মূল শক্তি, সব দার্শনিক প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর। এটা জনপ্রিয় সংস্কৃতির সেন্টিমেন্টাল প্রেম না, বরং এমন এক নীতি, যা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় কষ্ট, ত্যাগ, আর অন্যের যন্ত্রণা ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছার মধ্য দিয়ে। সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে থাকাকালীন তিনি দেখেছিলেন, কঠোর অপরাধীরাও কখনো কখনো নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সহবন্দিকে সাহায্য করেছে, এমন সব সদয় কাজ করেছে যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। এই অভিজ্ঞতাই তাকে বিশ্বাস করিয়েছিল, মানুষের নিষ্ঠুরতার নিচে লুকিয়ে আছে এক সর্বজনীন ভালোবাসা, যা সবচেয়ে অধঃপতিত মানুষকেও রূপান্তরিত করতে পারে।

তবে তার কাছে সত্যিকারের ভালোবাসা সহজ কিছু ছিল না। যারা কেবল ভালো, আকর্ষণীয়, প্রাপ্য মানুষদেরই ভালোবাসতে পারে, তাদের সেই ভালোবাসায় কোনো বিশেষত্ব নেই। প্রকৃত পরীক্ষা হলো ক্ষমা, শত্রুকে ভালোবাসতে পারা, যারা কষ্ট দিয়েছে তাদের ক্ষমা করতে পারা, এমনকি সবচেয়ে খারাপ মানুষের মধ্যেও দৈব প্রতিচ্ছবি দেখতে পারা। এই ক্ষমতাকেই তিনি মানুষের মর্যাদার শেষ প্রমাণ হিসেবে দেখেছিলেন।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনোবিশ্লেষণ শুরু করার বহু আগেই তিনি মানুষের অবচেতন মনের গভীরতা নিখুঁতভাবে এঁকেছিলেন। ফ্রয়েড নিজে ১৯২৮ সালে লেখা তার “দস্তয়েভস্কি অ্যান্ড প্যারিসাইড” প্রবন্ধে স্বীকার করেছিলেন, সৃষ্টিশীল শিল্পী হিসেবে তার স্থান শেক্সপিয়রের ঠিক পরেই। তবে সেই একই প্রবন্ধে ফ্রয়েড দস্তয়েভস্কিকে নৈতিকতাবাদী হিসেবে খুব একটা মূল্য দিতে রাজি ছিলেন না, আর পুরো বিশ্লেষণটাই তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন দস্তয়েভস্কির নিজের মৃগীরোগ আর পিতৃহত্যা সংক্রান্ত এক অবচেতন অপরাধবোধের সঙ্গে, এই যুক্তি যে পরবর্তী পণ্ডিতদের কাছে বহুলাংশে বিতর্কিত এবং একপেশে বলে সমালোচিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই কথাটা মিথ্যা না যে, তার চরিত্ররা প্রায়ই এমন কারণে কাজ করে, যা তারা নিজেরাই বোঝে না। রাসকলনিকভ নিজেকে বলে সে গরিবদের সাহায্য করতে খুন করেছে, কিন্তু আসল কারণ তার নিজের শক্তি প্রমাণের তাড়না। আন্ডারগ্রাউন্ড মানুষ বলে অন্য মানুষ তার সঙ্গ পাওয়ার যোগ্য না, কিন্তু আসল কারণ প্রত্যাখ্যানের ভয়। এই অন্তর্দৃষ্টি দেখায়, মানুষ নিজের আচরণের প্রকৃত কারণ প্রায়ই নিজেই জানে না, তাই শুধু যুক্তি দিয়ে মানুষকে বদলানো যায় না।

তিনি বিশ্বাস করতেন, পশ্চিমা সভ্যতা যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পথ বেছে নিয়ে হারিয়ে ফেলেছে আধ্যাত্মিক গভীরতা আর সামাজিক সংহতি। এর বিপরীতে রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম আর রুশ কৃষক সমাজের মূল্যবোধকে তিনি দেখেছিলেন এক আধ্যাত্মিক বিকল্প হিসেবে, যেখানে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাস, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত সহমর্মিতা বেশি গুরুত্ব পায়। এই অবস্থানের মধ্যে খাঁটি ধর্মীয় অন্তর্দৃষ্টি আর বিপজ্জনক জাতীয়তাবাদী কল্পনা এমনভাবে মিশে গিয়েছিল, যা পরে ইতিহাসে ভালো-মন্দ দুই দিকেই ব্যবহৃত হয়েছে।

তার দর্শন সহজ কোনো সান্ত্বনা দেয় না। এটা বলে, স্বাধীনতা মেনে নেওয়া মানে তার পুরো ভার বহন করা। ভালোবাসা মানে শর্তহীন ক্ষমা। বিশ্বাস মানে সন্দেহের অনুপস্থিতি না, বরং সব প্রতিকূল প্রমাণ সত্ত্বেও অর্থের ওপর আস্থা রাখার একটা সিদ্ধান্ত। মানুষ ভয়ংকর মন্দ করতে সক্ষম, আবার একই মানুষ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গিয়ে অসাধারণ প্রজ্ঞা আর ক্ষমাশীলতাও অর্জন করতে পারে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বাঁচতে হয়, স্বস্তির বদলে সাহস, সততা, আর ভালোবাসা নিয়ে বাঁচার এক কঠিন শিক্ষা, যা তিনি রেখে গিয়েছেন।


এই লেখাটি একটি সাহিত্য-দার্শনিক প্রবন্ধ, দস্তয়েভস্কির প্রধান দার্শনিক ভাবনাগুলোর একটি পরিচিতিমূলক পাঠ হিসেবে তৈরি।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter