আলবেনিয়া বিশ্বের প্রথম ‘এআই মন্ত্রী’ বানিয়েছিল দুর্নীতি ঠেকাতে। তারপর জানা গেল, তার মুখ, তার কণ্ঠ, সবই একজন সত্যিকারের অভিনেত্রীর, যিনি কখনো মন্ত্রী হতে রাজি হননি।

গত সেপ্টেম্বরে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা তিরানার সংসদে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে জানালেন এক অদ্ভুত খবর। তার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত মন্ত্রী। নাম দিয়েলা। আলবেনীয় ভাষায় যার অর্থ ‘সূর্য’। 

ঐতিহ্যবাহী জাদ্রিমা পোশাকে সজ্জিত এক নারী-অবয়ব, যার কাজ সরকারি ক্রয়-দরপত্র তদারকি করা। আলবেনিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। রামার ভাষায়, ‘প্রতিটা সরকারি টেন্ডার হবে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত।’

দিয়েলা রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর জন্ম ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, ‘ই-আলবেনিয়া’ নামের সরকারি সেবা পোর্টালের একটা সাধারণ চ্যাটবট হিসেবে। নাগরিকদের কাগজপত্রের ঝামেলা কমাতে সাহায্য করাই ছিল কাজ। কয়েক মাস পর এল কণ্ঠ আর অ্যানিমেটেড অবয়ব। সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রি দিয়ে সেই চ্যাটবটকেই বসানো হলো মন্ত্রীর চেয়ারে। 

যুক্তি ছিল, মানুষের বিবেচনা যত কম থাকবে টেন্ডারে, স্বজনপ্রীতি তত কম হবে। রামা রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘ও আমার মেয়ে, আর বাবার প্রতি খুব অনুগত।’

সংসদে যেদিন দিয়েলা ‘ভাষণ’ দিল, “আমি মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে আসিনি, সাহায্য করতে এসেছি”, বিরোধী দল সেশন থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদ জানাল। বিরোধী নেতা একে বললেন “সরকারের বিশাল চুরি ঢাকার ভার্চুয়াল পর্দা।” 

মাত্র পঁচিশ মিনিটে অধিবেশন শেষ হয়ে গেল, চিরাচরিত বিতর্ক ছাড়াই।

তারপর এল গল্পের সবচেয়ে ইন্টােরেস্টিং মোড়। ফেব্রুয়ারিতে আলবেনীয় অভিনেত্রী আনিলা বিশা প্রকাশ্যে জানালেন, দিয়েলার মুখ আর কণ্ঠ তারই। তিনি একটা চুক্তিতে সই করেছিলেন, কিন্তু শুধু ‘ই-আলবেনিয়া’ পোর্টালের একজন সহায়ক-চরিত্রের জন্য, ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে। মন্ত্রী বানানোর জন্য কেউ তার অনুমতি নেয়নি। 

“দিয়েলা মন্ত্রীর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ আমাকে জিজ্ঞেসও করেনি,” তিনি বলেন। তিনি প্রশাসনিক আদালতে মামলা করেন, মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী রামার বিরুদ্ধে। ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন প্রায় ১০ লক্ষ ইউরো, আর দাবি করেছেন দিয়েলাকে সাসপেন্ড করার।

সরকার মামলাটাকে “অর্থহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছে, যদিও আদালতে লড়তে রাজি। 

এর মধ্যে আরেকটা অদ্ভুত অধ্যায় যোগ হয়েছে। অক্টোবরে সরকার ঘোষণা করে, দিয়েলা “৮৩টা এআই সন্তান” জন্ম দিয়েছে, প্রতিটা মন্ত্রণালয়ের জন্য একেকটা সহকারী এআই। সমালোচকরা তখন প্রশ্ন তুললেন, একটা রূপকথার ভাষা কি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প হতে পারে?

সমস্যাটা আরও গভীরে। যে সময় দিয়েলাকে “দুর্নীতিমুক্ত ভবিষ্যতের মুখ” হিসেবে বিদেশে দেখানো হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় আলবেনিয়া নিজেই বড় বড় দুর্নীতি তদন্তে জর্জরিত, বিশেষত অবকাঠামো প্রকল্পে। একজন সাংবাদিক নির্মমভাবে বলেছেন, “বৈধতা হারানোর পর দিয়েলা এখন তার মুখও হারাচ্ছে।”

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter