দৃশ্যটা আপনার চেনা। ফেসবুক খুললেই পাবেন।

একটা পেজ, নাম ধরা যাক “খাঁটি ফুডস”। লাইভে একজন মধুর চাক হাতে দাঁড়িয়ে, পেছনে সুন্দরবনের ছবি। ক্যাপশনে লেখা, শতভাগ অর্গানিক, কেমিক্যালমুক্ত, নিজস্ব খামার থেকে সরাসরি। কমেন্টে শত শত অর্ডার।

কারা অর্ডার করছেন? যার বাবার ক্যানসার, ডাক্তার বলেছেন ভেজাল খাবার এড়াতে। যার বাচ্চা প্রথম ভাত খাবে, মা চান প্রথম চালটা যেন বিষমুক্ত হয়। যার নিজের ডায়াবেটিস, তাই দ্বিগুণ দামে লাল চাল।

ঢাকার দোকানগুলোতে এই ‘অর্গানিক’ লেবেলের দাম কেমন? অর্গানিক ঘি, পাঁচশো গ্রাম সাড়ে সাতশো টাকা। অর্গানিক দুধ, লিটার নব্বই। অন্যান্য কিছু পণ্যে সাধারণ বাজারের প্রায় দ্বিগুণ। মানুষ দিচ্ছে। ভয়ে দিচ্ছে, ভালোবাসায় দিচ্ছে।

এখন প্রশ্নটা করি।

এই যে প্যাকেটের গায়ে “অর্গানিক” লেখা, এই দাবিটা বাংলাদেশে কে যাচাই করে? উত্তরটা এক শব্দের। কেউ না।

আক্ষরিক অর্থে কেউ না। কোনো সরকারি সংস্থা না, কোনো ল্যাব না, কোনো পরিদর্শক না। আপনি চাইলে কালকে সকালে কারওয়ান বাজার থেকে সাধারণ চাল কিনে, প্যাকেটে “অর্গানিক” ছাপিয়ে, তিনগুণ দামে বেচা শুরু করতে পারেন। কেউ আপনাকে একটা প্রশ্নও করবে না।

এই লেখা সেই প্রশ্ন-না-করা নিয়ে।


কথাটা অবিশ্বাস্য শোনায়, তাই কাগজপত্র ধরে দেখাই।

পৃথিবীতে “অর্গানিক” কোনো মুখের কথা না, একটা আইনি মর্যাদা। ভারতে কোনো কৃষক অর্গানিক লেবেল লাগাতে চাইলে স্বীকৃত সংস্থা তার ক্ষেতে যাবে, মাটি-পানি-বীজের রেকর্ড দেখবে, তিন বছর নজরে রাখবে, তারপর সনদ দেবে।

প্রতি বছর আবার আসবে। মিথ্যা বললে সনদ যাবে, মামলা হবে। চীনে তাই, থাইল্যান্ডে তাই, এমনকি ভুটানেও ব্যবস্থাটা দাঁড় করানোর কাজ চলছে।

বাংলাদেশে? ২০১৬ সালে সরকার একটা জাতীয় জৈব কৃষি নীতি করেছিল। সেই নীতিতে সনদ দেওয়ার সংস্থা বানানোর কথাও লেখা ছিল। দশ বছর হয়ে গেল। সংস্থাটা আজও বানানো হয়নি।

এটা আমাদের কথা না। আন্তর্জাতিক জৈব কৃষি ফেডারেশন আইফোমের এশিয়ার নীতি-পরিচালক নিজে বলছেন, নীতিটা বাস্তবায়িতই হয়নি। জৈব কৃষি আইনের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের ঘরে আজও লেখা, অসম্পূর্ণ।

দেশি গবেষকদের ভাষ্য আরও করুণ, দেশে অর্গানিক খাদ্যের কোনো আইনি সংজ্ঞাই নাই।

মানে দাঁড়াল, “অর্গানিক” এই দেশে একটা মালিকবিহীন শব্দ। “সুস্বাদু” লেখা আর “অর্গানিক” লেখার মধ্যে আইনের চোখে কোনো তফাত নাই। দুটোই বিজ্ঞাপনের বিশেষণ।

তফাত শুধু একটাই। “সুস্বাদু” লিখলে দাম দ্বিগুণ করা যায় না। “অর্গানিক” লিখলে যায়।


তারপরও কেউ বলতে পারেন, লেবেল যাচাইহীন হোক, জিনিসটা তো সত্যি হতে পারে। দেশে তো জৈব চাষ হয়ই।

হয়। কতটুকু হয়, সেই অঙ্কটাই এবার করি।

দেশে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেন মাত্র হাজার বারো কৃষক, এবং সেটা মাত্র সাত হাজার হেক্টর জমিতে। শুনতে ভারি লাগে। কিন্তু দেশের মোট কৃষিজমির হিসাবে এটা শূন্য দশমিক ঊনিশ শতাংশ। ভাগ করলে দাঁড়ায়, প্রতি পাঁচশো বিঘা জমিতে এক বিঘারও কম।

এবার সুপারশপে যান। অর্গানিক চাল আছে, ডাল আছে, তেল, মসলা, মধু, ঘি, চিনি, মুরগি, ডিম, সবজি, সব আছে। ফেসবুকে শত শত পেজ, কারও স্টক ফুরায় না। রেস্টুরেন্ট খুলেছে, বিয়ের গিফট বক্স হচ্ছে।

পাঁচশো ভাগের এক ভাগ জমি থেকে এত জিনিস আসে কীভাবে?

আসে না। আসা সম্ভব না। বাকিটা কোথা থেকে আসে, সেই উত্তরটা আপনি নিজেই জানেন। ওই কারওয়ান বাজার থেকেই আসে, মাঝপথে শুধু প্যাকেটটা বদলায়।

আর যে এক ভাগ সত্যিকারের চেষ্টা, তার পথও কতটা কঠিন, একটা তথ্যেই বুঝবেন। অর্গানিক হতে হলে শুধু নিজের খেতে বিষ না দিলে হয় না। পাশের খেতের স্প্রে বাতাসে ভেসে আসবে, সেটাও ঠেকাতে হয়। সেচের খালের পানি পরিষ্কার হতে হয়।

এবার ভাবেন, এই দেশের খেতের বাস্তবতা কী। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে দেশে যত কীটনাশক বিক্রি হয়, তার তিন বোতলের এক বোতলই ভেজাল। ভেজাল বিষে পোকা মরে না, তাই কৃষক ডোজ বাড়ায়।

জরিপ বলছে, প্রতি দুইজন কৃষকের প্রায় একজন মাত্রার চেয়ে বেশি বিষ দেন, আর প্রশিক্ষণ পাওয়া কৃষক প্রতি পঁচিশজনে একজন।

চারদিকে বিষের এই সমুদ্র, তার মাঝখানে এক টুকরা জমি, একই খালের পানি, একই বাতাস। ওই জমির ফসলকে দেশি বিশেষজ্ঞরা তাই সর্বোচ্চ যে নামটা দিতে রাজি, সেটা হলো “তুলনামূলক নিরাপদ।”

তুলনামূলক নিরাপদ। এই সৎ শব্দটা কোনো প্যাকেটে লেখা থাকে না। প্যাকেটে লেখা থাকে শতভাগ অর্গানিক।


আচ্ছা, এবার সবচেয়ে বড় ছাড়টা দিই। ধরে নিলাম আপনার কেনা প্যাকেটটা একশো ভাগ খাঁটি। ক্ষেত সত্যি বিষমুক্ত। তাহলে দ্বিগুণ দামে আপনি কী পেলেন?

উত্তরটা দিয়েছে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের গবেষকরা চার বছর ধরে কয়েক দশকের হাজার হাজার গবেষণা ঘেঁটে ২৩৭টা বাছাই করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তুলনাটা করেছিলেন। অর্গানিক বনাম সাধারণ। ফল, সবজি, শস্য, দুধ, ডিম, মাংস, সব।

ফলাফল, পুষ্টিতে কোনো ধারাবাহিক পার্থক্য তারা পান নাই। ভিটামিন সমান, মিনারেল সমান, প্রোটিন সমান।

একটা মাত্র জিনিস অর্গানিকে বেশি পাওয়া গেছিল। ফসফরাস। আর গবেষকরা নিজেরাই লিখে দিয়েছেন, ফসফরাসের ঘাটতি মানুষের এত কম হয় যে এই পার্থক্যের কোনো চিকিৎসাগত মূল্য নাই।

কয়েক দশকের বিজ্ঞান ঘেঁটে অর্গানিকের পক্ষে মিলল একটা জিনিস, যেটার অভাব কারও হয় না।


“পুষ্টির জন্য তো কিনি না, কিনি বিষ থেকে বাঁচতে।” আপত্তিটা ন্যায্য। কিন্তু এইখানে এসে বাজারের সবচেয়ে বড় গোপন কথাটা বলার দরকার পড়ে।

অর্গানিক চাষেও কীটনাশক দেওয়া হয়।

অবাক লাগছে? নিয়মটা শোনেন। অর্গানিক মানে বিষমুক্ত না। অর্গানিক মানে কারখানায় বানানো বিষ নিষিদ্ধ, কিন্তু “প্রাকৃতিক” বিষ অনুমোদিত। খোদ আমেরিকার অর্গানিক আইনের অনুমোদিত তালিকায় পঁচিশটার মতো সিন্থেটিক পদার্থও আছে।

আর সেই তালিকার সবচেয়ে ব্যবহৃত জিনিসটার নাম কপার সালফেট। বাংলায় তুঁতে। আঙুর, আলু, টমেটো, আপেলের ক্ষেত্রে অর্গানিক চাষিরা এটা দেদার ছিটায়। এই তুঁতে মাটির উপকারী অণুজীব মেরে ফেলে, মাছের জন্য বিষ, আর মাটিতে জমতে থাকে বছরের পর বছর।

গবেষণার ভাষায়, কৃষিতে ব্যবহৃত সবচেয়ে বিষাক্ত জিনিসগুলার একটা। ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে একরপ্রতি দেড়-দুই গুণ কীটনাশক ব্যবহার করে, এবং তার বড় কারণ এই তুঁতেই।

“প্রাকৃতিক” শব্দটা শুনতে নিরীহ। সাপের বিষও প্রাকৃতিক।

সততার খাতিরে উল্টো দিকের সংখ্যাটাও দিই। স্ট্যানফোর্ডের সেই গবেষণাতেই মিলেছে, সাধারণ ফল-সবজির প্রতি তিনটার মধ্যে একটায় কীটনাশকের অবশেষ থাকে, অর্গানিকে প্রতি চৌদ্দটায় একটায়। হ্যাঁ, অর্গানিকে কম। কিন্তু “মুক্ত” না।

যে বিষ থেকে বাঁচতে আপনি দ্বিগুণ দাম দিলেন, প্রতি চৌদ্দ প্যাকেটের একটায় সেটা আছেই। এবং মনে রাখবেন, ওই হিসাবটা সনদওয়ালা দেশগুলোর। বাংলাদেশের মত সনদহীন দেশের হিসাব কেউ জানে না।


তাহলে সনদওয়ালা দেশে সব ঠিক আছে? সেই গল্পটাও আনন্দদায়ক না।

আমেরিকার মিসৌরির কৃষক র‍্যান্ডি কনস্ট্যান্ট। সাধারণ ভুট্টা আর সয়াবিন চাষ করতেন, বেচতেন “অর্গানিক” লেবেলে। কত টাকার? পঁচিশ কোটি ডলারের।

বাংলাদেশি টাকায় হাজার কোটির উপরে, একজন কৃষকের একার জালিয়াতি। ধরা পড়ে দশ বছরের জেল হয়েছে।

ইতালিতে পুলিশ এমন চক্র ধরেছে, যারা পচা আপেল, যেটা মানুষের খাওয়ার অযোগ্য ঘোষিত, সেটা থেকে জুস আর জ্যাম বানিয়ে “ইউরোপীয় অর্গানিক” লেবেলে বেচত। জব্দ হয়েছে চৌদ্দশো টন।

ইতালি থেকে জার্মানির বাজারে ঢুকে গিয়েছিল সাড়ে পাঁচশো টন ভুয়া লেবেলের শস্য, যেটা দিয়ে টফু হয়েছে, বাচ্চার খাবার হয়েছে।

আর মার্কিন অর্গানিক শস্য-ব্যবসায়ীদের নিজেদের সংগঠনের শীর্ষ কর্তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি, এই খাতের এক নম্বর হুমকি জালিয়াতি, প্রতিদিন সাধারণ ফসল ভুয়া সনদে বিকোচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা এই পণ্যের একটা নাম দিয়েছেন। বিশ্বাসের পণ্য। আম চেখে বলা যায় মিষ্টি কি টক। কিন্তু চেখে, শুঁকে, এমনকি ল্যাবে দিয়েও বলা যায় না চালটা অর্গানিক ছিল কি না। ক্রেতার হাতে যাচাইয়ের কিছুই নাই, পুরোটাই সনদের উপর ভরসা।

এখন মিলিয়ে দেখেন। যেসব দেশে সনদ আছে, পরিদর্শক আছে, ল্যাব আছে, জেলে ভরার আইন আছে, সেখানেই হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি চলছে।

আর আমাদের দেশে ওই চারটার একটাও নাই। আছে শুধু ফেসবুক লাইভ, সুন্দরবনের ছবি, আর আপনার ভয়।


দুইটা কথা এখানে আলাদা করে লেখা থাকুক, নইলে ভুল মানুষের গায়ে লাগবে।

এক, এই দেশে সত্যিকারের বিষমুক্ত চাষের লড়াই আছে। হাজার বারো কৃষক, কিছু নিবেদিত সংগঠন, বছরের পর বছর প্রায় কোনো সরকারি সহায়তা ছাড়া লড়ছেন। এই লেখা তাদের বিরুদ্ধে না।

বরং সবচেয়ে বড় প্রতারণাটা হচ্ছে তাদের সঙ্গেই। তাদের তিন বছরের পরিশ্রমের ফসল আর কারওয়ান বাজারের বস্তা-বদলানো চাল, দুটোর প্যাকেটে একই শব্দ, একই দাম। যাচাই নাই বলে সৎ মানুষটার সততার কোনো বাজারমূল্যই তৈরি হলো না।

দুই, আপনার ভয়টাও অমূলক না। এই দেশের সাধারণ বাজারের সবজিতে সত্যিই মাত্রাছাড়া বিষ মেলে, ঢাকা-ময়মনসিংহ-বরিশালের বাজারে গবেষকরা বারবার হাতেনাতে পেয়েছেন। আপনি অর্গানিক খুঁজছেন, কারণ সাধারণ খাবারটাই আপনার ভরসাহীন।


ভেবে দেখেন, এই অর্গানিক বাজারটা দাঁড়িয়ে আছে কীসের উপর।

ফরমালিন-আতঙ্কের উপর। বিষাক্ত সবজির খবরের উপর। ভেজালের মহামারির উপর। অর্থাৎ রাষ্ট্র আপনার প্লেটে নিরাপদ খাবার দিতে পারে নাই, এই ব্যর্থতাটাই এই বাজারের একমাত্র মূলধন।

হিসাবটা দাঁড়াল এরকম। আপনি ট্যাক্স দিয়েছেন, বিনিময়ে নিরাপদ বাজার পান নাই। সেই ভয়ের সুযোগে একদল বিক্রেতা এসে বলল, দ্বিগুণ দাম দেন, ভয়টা আমরা নিয়ে নিচ্ছি। এবং তাদের সেই প্রতিশ্রুতি যাচাই করার ব্যবস্থাটাও ওই একই রাষ্ট্র দশ বছরে বানায়নি।

মানে আপনি ঠকছেন দুইবার। প্রথমবার সাধারণ বাজারে, বিষ কিনে। দ্বিতীয়বার অর্গানিক দোকানে, স্টিকার কিনে।

আপনার বাবার ক্যানসার তাদের মার্কেটিং। আপনার বাচ্চার প্রথম ভাত তাদের টার্গেট গ্রুপ। আপনার ভয় তাদের পুঁজি, আর সেই পুঁজিতে কোনো অডিট নাই।

এই ব্যবসার নাম অর্গানিক না। এই ব্যবসার নাম ভয়ের খাজনা। রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিয়ে যে নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল, সেটাই এখন ব্যক্তিখাতে, দ্বিগুণ দামে, রসিদ ছাড়া বিক্রি হচ্ছে।

সমাধান কী? আরও দামি লেবেল না। সমাধানটা পুরনো আর নীরস। বাজারের সব খাবারে বিষের মাত্রা পরীক্ষা। ভেজাল কীটনাশকের চক্র ভাঙা।

আর প্যাকেটে “অর্গানিক” শব্দটা লেখার আগে সনদ বাধ্যতামূলক করা, যে সনদের কথা ২০১৬ সালের নীতিতে লেখা আছে, শুধু কেউ বানায়নি।

যতদিন সেটা না হচ্ছে, ততদিন সাড়ে সাতশো টাকার ওই ঘিয়ের বয়ামে আপনি নিরাপত্তা কিনছেন না। কিনছেন একটা শব্দ। যে শব্দের জবাব দেওয়ার দায় এই দেশে কারও নাই।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter