অ্যামাজন যখন প্রতিটা জিনিস ঘরে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিগত কারিকুরিতে ব্যস্ত, কস্টকো তখন উলটো পথে হেঁটে কম জিনিস, কম ঝামেলা, আর সহজ ব্যবস্থাপনা দিয়ে বছরের পর বছর মুনাফা বাড়িয়ে যাচ্ছে।

আমরা এখন এমন এক যুগে আছি, যেখানে অ্যামাজন প্রতিদিন প্রমাণ করছে, কতটা জটিল একটা ডেলিভারি ব্যবস্থা চালানো সম্ভব। সামনে আসছে আরও নতুন কিছু। চ্যাটজিপিটির মতো এআই এজেন্ট পুরো ইন্টারনেট ঘেঁটে আপনার কুকুরের নির্দিষ্ট খাবারটা সবচেয়ে সস্তায় খুঁজে দেবে। ক্রেতা যা চায়, ঠিক তা-ই, ঠিক এখনই, দরজায়।

কিন্তু এই স্বপ্নের ভেতরে কিছু সমস্যা লুকিয়ে আছে। প্রথম সমস্যাটা হলো, এটা আসলে ততটা কাম্যও না। ভেবে দেখুন, একটা জিনিস আলাদাভাবে প্যাকেট করে সরাসরি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, আর বড় ট্রাকে করে গুদামে মাল পাঠানো, তারপর ক্রেতা নিজে গাড়িতে করে সেটা বাড়ি নিয়ে যাওয়া, এই দুইয়ের খরচ-কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুই ভিন্ন অর্থনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করছে দুটো কোম্পানি, অ্যামাজন আর কস্টকো। কস্টকো ই-কমার্সে নেমেছে দেরিতে। নিজস্ব ডেলিভারি নেটওয়ার্কেও তাদের বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। আর পণ্যের বৈচিত্র্যও তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত রাখে। এক কথায়, অ্যামাজন যা করে, কস্টকো তার উলটোটাই করে। অথচ, গত পাঁচ বছর ধরে কস্টকোর আয় গড়ে প্রতিবছর দশ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে।

মজার ব্যাপার হল, সীমাবদ্ধতা নিজেই একটা সেবা হতে পারে। ওয়ালমার্টের একেকটা সুপারসেন্টারে গড়ে প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার ধরনের আলাদা পণ্য থাকে। অ্যামাজনের তো সীমাই নেই। কস্টকোতে থাকে মাত্র চার হাজার ধরনের পণ্য। অথচ মানুষ প্রতিটা পণ্যের জন্য দশটা বিকল্প দেখে রিভিউ পড়ে মাথা ঘামাতে চায় না সবসময়, বরং এই দেখাশোনার ধকল থেকে মুক্তি চায়। কস্টকো তাই আগে থেকেই বেছে দেয়, কোনটা ভালো, কোনটা নেবেন। কম পণ্য মানেই কম দাম না, বরং প্রতিটা পণ্যের জন্য বেশি সময় দিয়ে ভালো সরবরাহকারী বাছাই করার সুযোগ। কস্টকোর সবচেয়ে সস্তা জিনিস থাকে না দোকানে, কিন্তু যে জিনিস থাকে, তার দামটা সবচেয়ে ভালো থাকে, কারণ তাদের ক্রয়-দল সরবরাহকারীদের সঙ্গে সম্পর্কটাই সবচেয়ে গভীর।

কম পণ্য রাখার আরেকটা সুবিধা আছে টাকার প্রবাহে। ব্যবসায় একটা হিসাব আছে, কত দিনে গুদামের মাল বিক্রি হয়ে নগদ টাকায় ফেরত আসে। অ্যামাজন এই হিসাব নিজের পক্ষে আনে সরবরাহকারীদের চাপ দিয়ে, তিরিশ দিনের বদলে আরও পরে টাকা দেওয়ার শর্তে। এতে ক্রেতার টাকা অ্যামাজনের হাতে চলে আসে সরবরাহকারীকে টাকা দেওয়ার অনেক আগেই, প্রায় সুদমুক্ত নগদ টাকার মতো। কস্টকোও এই একই সুবিধা পায়, কিন্তু সরবরাহকারীকে চাপ না দিয়েই, কারণ কম ধরনের পণ্য মানেই সেই পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়া। একটা চালান দোকানে এলে সেটা এক মাসের ভেতরেই শেষ হয়ে যায়, কারণ ওই একই জিনিসের আর কোনো বিকল্প থাকে না তাকে।

দোকানে গিয়ে কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও কস্টকোর একটা বড় আকর্ষণ, যদিও এখানেও প্রচলিত ধারণার উলটো ঘটনা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে ই-কমার্সের ভাগ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু এখনো তা মোট খুচরা বেচাকেনার সতেরো শতাংশের কম। কস্টকোতে কেনাকাটা মানেই লাইনে দাঁড়ানো, করিডোরে ভিড়, একরকম হুড়োহুড়ি। অ্যামাজনের সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের ঠিক উলটো। তারপরও ক্রেতারা এই ঝামেলা নিয়ে অভিযোগ করে না, বরং একরকম মজা করেই গ্রহণ করে। কস্টকো বিজ্ঞাপনেও প্রায় খরচ করে না, দরকারও পড়ে না, কারণ মুখে মুখে আর সামাজিক মাধ্যমে ক্রেতারাই বিনামূল্যে প্রচার চালিয়ে দেয়। বছর বছর সদস্যপদ নবায়নের হার নব্বই শতাংশের বেশি, একেবারে বিরল এক আনুগত্য।

তবে ক্রেতার পছন্দ ছাড়াও আরেকটা মাপকাঠি আছে, সামাজিকভাবে কোন মডেলটা বেশি মূল্যবান। “লজিস্টিক্স” শব্দটার শিকড় আসলে সামরিক শব্দভান্ডারে, সৈন্য সরবরাহের কৌশল বোঝাতে ফরাসি একটা শব্দ থেকে। ব্যবসায় এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, যার প্রয়োজন তার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা, শুধু একজন ব্যক্তির জন্য না, পুরো সমাজের জন্য। সামাজিক পর্যায়ে খরচের হিসাবে এটা বোঝা যায়, গুদাম, গাড়িবহর, জ্বালানি, ফর্কলিফট, এই সব খরচ যত বেশি পণ্যের ওপর ভাগ করা যায়, ব্যবস্থাটা তত দক্ষ। আর যত সহজ ব্যবস্থা, তত কম সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি।

সহজ কথায়, সদ্য কেনা একটা টুথব্রাশ কাউকে দিয়ে ভ্যানে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াটা কোনো সর্বজনীনভাবে চালানোর মতো ব্যবস্থা না। অ্যামাজন এটা করে দেখাতে পারে, এটা একটা কারিগরি কীর্তি বটে, কিন্তু এটা করা উচিত কি না, বা সবার জন্য এভাবে করা সম্ভব কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন। বেশিরভাগ কেনাকাটার ক্ষেত্রে মানুষ নিজেই দোকানে গিয়ে একসঙ্গে অনেক কিছু কিনে আনাটাই বেশি দক্ষ পথ। এতে রাস্তায় ডেলিভারি ভ্যান কমে, অপ্রয়োজনীয় গাড়ি চলাচল কমে, আর দোকানের খরচও কমে যায়।

কস্টকোর হিসাবপত্রে বিক্রি-প্রশাসনিক খরচ মোট বিক্রির মাত্র দশ শতাংশ, যেখানে অ্যামাজনের ডেলিভারি খরচই তাদের মূল বিক্রির চল্লিশ শতাংশ। এর একটা বড় কারণ কস্টকোর সরল বিতরণ ব্যবস্থা। তাদের ডিপোতে পুরো প্যালেট একদিক দিয়ে ঢোকে, ইলেকট্রিক প্যালেট-জ্যাক দিয়ে অন্যদিকে যায়, তারপর সরাসরি ট্রাকে উঠে দোকানে চলে যায়। প্যালেট ভাঙা হয় না, কনভেয়ার বেল্ট নেই, কোনো বাড়তি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি নেই।

এই কম খরচের সুফল শুধু দামে না, শ্রমিকের বেতনেও পড়ে। ওয়ালমার্টের বিক্রয়কর্মী ঘণ্টায় গড়ে পান প্রায় ষোল ডলার, অ্যামাজনের গুদামকর্মী প্রায় উনিশ ডলার, আর কস্টকোর কর্মী পান একুশ ডলারের বেশি। এর ফল, কস্টকোর কর্মী-পরিবর্তনের হার মাত্র ছয় শতাংশ, যেখানে খুচরা ব্যবসায় সাধারণত ষাট শতাংশ, আর অ্যামাজনের গুদামে দেড়শো শতাংশ পর্যন্ত। এটাকে অনেক সময় ব্যবসায়িক সাংবাদিকতায় “সংস্কৃতি” বলে চালানো হয়, কিন্তু আসলে এর পেছনে সোজাসাপ্টা অর্থনীতিই কাজ করে। খরচ কম রাখলে মুনাফা না কমিয়েও কর্মীকে বেশি বেতন দেওয়া যায়।

একটা মজার তথ্য হলো, অ্যামাজনের সদস্যপদ মডেল “প্রাইম”-এর ধারণাটাই এসেছিল কস্টকোর সাবেক প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে। কিন্তু দুই মডেল আসলে দুই দিকে যায়। কস্টকোর সদস্যপদ খরচ কমায়, অ্যামাজনের সদস্যপদ খরচ বাড়ায়, কারণ দুই দিনে ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিতে গেলে বিশাল বিনিয়োগ লাগে বিতরণ নেটওয়ার্কে। কম খরচ মানে শ্রমিকের জন্য বেশি সুবিধা তো বটেই, কম চাপও, কস্টকোর কর্মীদের অ্যামাজনের মতো কোটা আর নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় না।

আমরা সাধারণত অ্যামাজনের লজিস্টিক্স নিয়ে যতটা মুগ্ধতা প্রকাশ করি, কস্টকোকে নিয়ে ততটা করি না। অথচ সামাজিক বিচারে কস্টকোর মডেলটাই বেশি কার্যকর আর ভারসাম্যপূর্ণ। জটিল কাজ করাটাই যে সবসময় বাহবা পাওয়ার যোগ্য, এমন কোনো কারণ নেই। বরং প্রশ্নটা হতে পারে, একটা কঠিন সমস্যা সমাধান করাটাই বেশি কৃতিত্বের, নাকি সেই সমস্যাটাই তৈরি না হতে দেওয়া?

এর মানে এই না যে অ্যামাজনের সব কিছুই বাতিল করার মতো। বয়স্ক মানুষের কাছে একই দিনে জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা সত্যিকারের একটা সামাজিক অবদান। কিন্তু সাধারণ দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য একটা সর্বজনীন মডেল খুঁজতে গেলে কস্টকোই বেশি ভালো একটা নকশা দেখায়, অ্যামাজন না।


এই লেখাটি একটি অর্থনীতি-বিষয়ক নিবন্ধের ভিত্তিতে তৈরি, কস্টকো ও অ্যামাজনের ব্যবসায়িক মডেল তুলনা করে সরকারি মুদি দোকানের সম্ভাবনা নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter