কাবুল ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার আগে হাশমত প্রতিদিন সকালে আয়নায় নিজের মুখ দেখেন। মূলত দেখেন, দাড়ি ঠিকমতো বাড়ছে কি না। কারণ দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক।
ছেলে শিক্ষার্থীদের মুখে দাড়ি থাকতে হবে, গায়ে থাকতে হবে আফগান ঐতিহ্যবাহী পোশাক। যে এই মাপে পড়ে না, তার জন্য শাস্তি আছে।
হাশমত বলেন, কিছুদিন আগে তার এক সহপাঠীকে ট্রাউজার পরে আসার “অপরাধে” পেটানো হয়েছে।
“তারা আপনার কথা শোনার আগে আপনার চেহারা দেখে। চেহারায় গণ্ডগোল থাকলে ক্লাস শুরুর আগেই আপনি সমস্যায় পড়ে যাবেন।”
তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা ফের দখল করেছে পাঁচ বছর হলো। এই পাঁচ বছরে শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। গার্ডিয়ানকে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সেটা বলেছেন।
নারীদের পড়াশোনা পুরোপুরি বন্ধ। শিক্ষকরা একে একে দেশ ছাড়ছেন। আর পড়ানো বলতে যা বাকি আছে, তার বড় অংশ এখন ধর্মীয় বিষয় আর শৃঙ্খলার নামে শাসন।
হাশমত বলেন, প্রতিদিন ধর্মীয় বক্তৃতায় বসতে হয়, প্রকাশ্যে নামাজ পড়তে হয়, কখনো কখনো সেটা একটানা দুই ঘণ্টা। বক্তৃতার বিষয়? ইসলাম, আচার-আচরণ, আর আনুগত্য।
এগুলো ঐচ্ছিক না। আর অনেক সময় এই বক্তৃতা চলে ঠিক সেই স্লটে, যেখানে মৌলিক একাডেমিক ক্লাস হওয়ার কথা ছিল।
“আসল ক্লাস বাদ দিয়ে আমাকে বসে থাকতে হচ্ছে ‘বাধ্যতা’ বিষয়ক লেকচারে। তালেবানের কাছে শিক্ষা মানে এটাই। সবাই বলে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক। কিন্তু যে ছেলেদের থাকতে দেওয়া হলো, তাদের সাথে কী হচ্ছে সেটা কেউ বলে না।”
মধ্য আফগানিস্তানে পড়াশোনা করেন আরেক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, সমস্যা শুধু পড়ানোর মান কমে যাওয়া না, আসল সমস্যা হলো ক্লাসরুম থেকে তর্ক আর প্রশ্ন করার অভ্যাসটাই উধাও হয়ে গেছে।
কাদের বলেন, “আমাদের কাজ শোনা, প্রশ্ন করা না। কাবুলের পতনের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অর্থ নেই। এখন এটাকে মাদ্রাসা বললেই ঠিক হয়, যেখানে কৌতূহল নিষিদ্ধ, এবং চুপ থাকাটা ফরজ।”
হাশমত পড়েন সাংবাদিকতা, এমন একটা বিষয় যার পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে ডিজিটাল টুল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা আর প্রযুক্তির ওপর। কিন্তু ক্লাসে বসে তিনি ভাবেন, যিনি পড়াচ্ছেন তিনি নিজেও বিষয়টা আদৌ বোঝেন কি না।
“উনি আমাদের আধুনিক দুনিয়ার কথা বলছেন, অথচ ক্লাসে পাওয়ারপয়েন্ট চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। প্রযুক্তি কী জিনিস সেটাই যিনি বোঝেন না, তিনি সাংবাদিকতার প্রযুক্তি শেখাবেন কীভাবে?”
হাশমতের অভিজ্ঞতা একলা তার না। আফগানিস্তানের সাত প্রদেশ, কাবুল, কান্দাহার, হেলমান্দ, নাঙ্গারহার, বামিয়ান, বালখ ও ওয়ার্দাক জুড়ে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কুড়িরও বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে গার্ডিয়ান।
তারা সবাই মোটামুটি একই ছবি এঁকেছেন।
ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০১৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাত ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়েছে।
২০২৪-এ মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা শূন্য। আর ছেলেদের ২০১৯-এ যেখানে তিন লক্ষ দশ হাজারের বেশি ছেলে ভর্তি ছিল, ২০২৪-এ সেটা নেমে এসেছে এক লক্ষ ঊননব্বই হাজারের কাছাকাছি।
কাবুল ইউনিভার্সিটি বাইরে থেকে দেখলে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মনে হয়। ভবনগুলো খোলা, ছেলেরা ক্লাসে যাচ্ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, ডিগ্রিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছেন, যা একে বিশ্ববিদ্যালয় বানাত, সেই ভেতরটা ফাঁপা হয়ে গেছে।
অভিজ্ঞ অধ্যাপকরা হয় দেশ ছেড়েছেন, না হয় পড়ানো বন্ধ করেছেন, না হয় তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জায়গায় বসানো হয়েছে তালেবানের মতাদর্শে চলা নতুন শিক্ষক। কোনো কোনো বিভাগে সদ্য পাশ করা ছাত্র, এমনকি আন্ডারগ্র্যাজুয়েটরাও পড়াচ্ছে।
হাশমত একজন প্রভাষকের কথা বলেন, যিনি নিজে মাত্র দুই বছর আগে ডিগ্রি শেষ করেছেন। “এখন উনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়াচ্ছেন। পরিষ্কার বোঝা যায়, আমাদের চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না।”
হেলমান্দ প্রদেশের শিক্ষার্থী জলমাই-ও পড়ানোর মানে একই রকম পতনের কথা বলেন।
“কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে এসে পুরনো নোট থেকে পড়ে শোনান, এতটুকুই। আমরা প্রশ্ন করলে যা লেখা আছে তার বাইরে কিছু বলতে পারেন না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অথচ মাঝে মাঝে মনে হয় হাই স্কুলে ফিরে গেছি।”
কাবুল ইউনিভার্সিটির এক সাবেক অধ্যাপক, যিনি প্রতিশোধের ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি, শিক্ষার্থীদের কথা সত্য বলে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, যোগ্য শিক্ষকদের চলে যাওয়া এমন সব বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল করেছে, যাদের কাছ থেকে এখনো গ্র্যাজুয়েট তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন যারা, তাদের প্রায় সবাই একই সংকটের কোনো না কোনো রূপ বর্ণনা করেন।
দুর্বল পড়ানো, অযোগ্য প্রভাষক, বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বক্তৃতা, চেহারা নিয়ে চাপ, আর দিনে দিনে গাঢ় হয়ে ওঠা একটা বিশ্বাস যে পড়াশোনা করে আর কাজ মিলবে না।
কাবুলের পতনের পর হাশমতের দুই ছোট ভাই স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। তাদের আর বিশ্বাস নেই যে পড়াশোনা করলে চাকরি হবে, ভবিষ্যৎ গড়া যাবে।
বছরের পর বছর তাদের বলা হয়েছিল পড়াশোনাই সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা, পড়ো, পাশ করো, কাজ পাও, পরিবার চালাও। তালেবান আসার পর সেই প্রতিশ্রুতিটা আর সত্যি মনে হয় না।
“ওরা আর বিশ্বাস করে না পড়াশোনায় কিছু হবে। আমিও ধীরে ধীরে একই জায়গায় পৌঁছাচ্ছি। ক্লাসে যেতে মন চায় না।”
ক্যাম্পাসের ভেতরেও সাংবাদিকতার ছাত্ররা শত্রুতা টের পান, বলেন হাশমত। তারা এমন একটা পেশা পড়ছেন যেটাকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে পেশাদাররা হারিয়ে গেছেন, আর যেটাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অসংখ্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে।
হাশমত বলেন, তাকে আর তার সহপাঠীদের শিক্ষকরাই “শয়তান” বলে ডেকেছেন।
“আমরা এমন একটা দেশে সাংবাদিকতা পড়ছি যেখানে সাংবাদিকতা বলতে কিছু প্রায় নেই-ই। তাহলে আমাদের তৈরি করা হচ্ছে ঠিক কীসের জন্য?”
এই প্রশ্ন তার অনেক সহপাঠীকে ক্লান্ত করে দিয়েছে। কেউ কেউ এখনো আসেন কারণ পরিবার আশা করে। কেউ আসেন কারণ একটা ডিগ্রি, যতই দুর্বল হোক, সমাজে এখনো কিছুটা মর্যাদা বহন করে।
কিন্তু হাশমত বলেন, বেশিরভাগ সহপাঠী তারা যা করছেন তাতে আর বিশ্বাস রাখেন না। “ওরা আসে পরিবারের জন্য। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওরা হাল ছেড়ে দিয়েছে।”
“আমি যাই কারণ আর কী করব বুঝি না। কিন্তু প্রতিদিন বিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে যায় যে এর কোনো মানে আছে,” তিনি বলেন। “তালেবানের যুদ্ধক্ষেত্রের যুদ্ধ থেমেছে। কিন্তু শিক্ষার বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ চলছে, নীরবে।”
— ফাতেমা ফাইজি, দ্য গার্ডিয়ান
(পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।)
