ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ প্রতি বছরের মতো এবারও প্রকাশ করেছে তাদের “গ্লোবাল লাইভএবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬”। বিশ্বের ১৭৩টা শহরের ওপর পরিচালিত এই জরিপে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর একটা হিসেবে জায়গা পেয়েছে ঢাকা, অবস্থান সেই ১৭১তমই।

স্কোরও প্রায় অপরিবর্তিত, গতবারের ৪১ দশমিক ৭ থেকে সামান্য বেড়ে হয়েছে ৪২। ঢাকার ঠিক নিচে আছে শুধু লিবিয়ার ত্রিপোলি (১৭২তম) আর সিরিয়ার দামেস্ক (১৭৩তম, সবচেয়ে নিচে)। অর্থাৎ পৃথিবীর মোট ১৭৩টা বড় শহরের মধ্যে মাত্র দুটো শহরই ঢাকার চেয়ে কম বাসযোগ্য, আর সে দুটো শহরই বছরের পর বছর ধরে গৃহযুদ্ধ আর সংঘাতে বিধ্বস্ত।

পাশের দেশ পাকিস্তানের করাচিও প্রায় একই অবস্থানে আটকে আছে, ১৭০তম স্থানে, স্কোর ৪২ দশমিক ৭ থেকে সামান্য বেড়ে ৪৩। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই বড় শহরই বছরের পর বছর ধরে তালিকার তলানির দশটা শহরের মধ্যে আটকে আছে, উন্নতি বলতে যা হচ্ছে তা প্রায় চোখেই পড়ে না।

মূলত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগকে সহায়তা আর প্রবাসী কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা ঠিক করতে এই সূচক তৈরি করে ইআইইউ। পাঁচটা মাপকাঠির ভিত্তিতে শহরগুলোর স্কোর দেওয়া হয়, স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা, আর অবকাঠামো।

মোট তিরিশটারও বেশি সূচক এই পাঁচ ভাগে বিভক্ত, আর তথ্য নেওয়া হয় ইআইইউর নিজস্ব বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক আর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার থেকে।

এবারের তালিকার শীর্ষে টানা দ্বিতীয়বারের মতো আছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন, স্কোর ৯৮। শহরটা স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, আর অবকাঠামো, এই তিন খাতেই পুরো একশোতে একশো পেয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, তৃতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন।

শীর্ষ পাঁচের বাকি দুই শহর সিডনি আর জুরিখ, অর্থাৎ ইউরোপ আর অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যই এখানে স্পষ্ট। উত্তর আমেরিকার একমাত্র শহর হিসেবে শীর্ষ দশে জায়গা পেয়েছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, নবম স্থানে। বড় মহানগরগুলোর মধ্যে শুধু জাপানের টোকিওই শীর্ষ দশে ঢুকতে পেরেছে, কারণ ইআইইউর মতে যানজট, জনঘনত্ব, আর অপরাধপ্রবণতার কারণে বড় শহরের স্কোর সাধারণত কমে যায়।

এবারের প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় খবর অবশ্য এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-হামলা, তারপর ইরানের প্রতিআক্রমণ আর হরমুজ প্রণালি অবরোধ, এই পুরো যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে গোটা অঞ্চলের শহরগুলোর ওপর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের আঠারোটা শহরের গড় অবস্থান তিন ধাপেরও বেশি নিচে নেমেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে ওমানের মাস্কাটের, চৌদ্দ ধাপ নিচে নেমে গেছে, ইরানি ড্রোন হামলার প্রভাবে। কুয়েত সিটিও বারো ধাপ নিচে নেমেছে।

ইরানের রাজধানী তেহরান এই প্রথমবারের মতো তালিকার সবচেয়ে নিচের দশটা শহরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কাতারের দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আর আবুধাবিও কয়েক ধাপ করে নিচে নেমেছে।

তালিকার তলানির দশটা শহর এবার হলো তেহরান, হারারে, কিয়েভ, পোর্ট মোর্সবি, লাগোস, আলজিয়ার্স, করাচি, ঢাকা, ত্রিপলি, আর দামেস্ক। এখানে একটা তথ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভও বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার চেয়ে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে।

অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ চলছে এমন একটা রাজধানীর চেয়েও ঢাকার অবস্থান খারাপ। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এবার তলানির দশ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, মূলত জানুয়ারিতে সেখানে সরকার পরিবর্তনের সুবাদে। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরের অবস্থান ধরে রেখেছে দামেস্ক, স্কোর মাত্র ৩১ দশমিক ৬।

এশিয়ার সামগ্রিক চিত্র অবশ্য এবার বেশ ভালো। মূলত চীন আর জাপানের বিভিন্ন শহরের অগ্রগতির কারণে এশিয়ার গড় স্কোর শূন্য দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়েছে। এই মহাদেশের আটান্নটা শহরের গড় স্কোর এখন ৭৩ দশমিক ৯, যা পূর্ব ইউরোপের গড়ের চেয়েও বেশি। ওপরের দিকে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করা শহরের তালিকায় আছে চীনের ফুচৌ, লিসবন, উশি, নানজিং, আর চুহাইয়ের মতো শহর।

চীনের এই অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারি স্বাস্থ্য-বিনিয়োগ। দেশটা এমন একটা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যাতে প্রতিটা নাগরিক মাত্র পনেরো মিনিট হাঁটার দূরত্বের মধ্যেই চিকিৎসাসেবা পান। তবে কড়া নজরদারি, পরিবেশগত সমস্যা, আর গণতান্ত্রিক ঘাটতির কারণে চীনা শহরগুলোর সামগ্রিক র‍্যাংকিং যতটা বাড়ার কথা ছিল, ততটা বাড়েনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এশিয়ার এই সামগ্রিক উন্নতির পরও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ঢাকার মতো তালিকার তলানিতে থাকা শহরগুলোর ধারাবাহিক কম স্কোর পুরো মহাদেশের গড়কেই নিচের দিকে টেনে ধরছে। অর্থাৎ এশিয়ার বাকি অংশ এগোলেও ঢাকা কার্যত সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, বছরের পর বছর।

(এই প্রতিবেদনটি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের “গ্লোবাল লাইভএবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬” নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন, মূল প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত সূত্র থেকে সংগৃহীত বিস্তারিত তথ্য যোগ করে তৈরি।)

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter