প্রত্যাখ্যাত মানুষের চেয়ে বেশি রাগী কেউ হয় না, ইসরায়েলও এখন সেরকম রাগী।

এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনেক কিছু বদলে গেছে, যা এত বড় একটা সংঘাতের হিসেবে খুবই অল্প সময়। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলে এত জনপ্রিয় ছিলেন যে নিজেই মজা করে বলেছিলেন, চাইলে তিনি ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীও হতে পারতেন। অথচ এখন তিনি এতটাই অপ্রিয় হয়ে উঠেছেন যে ইসরায়েলিরা তার তুলনা করছেন “আমালেক”-এর সঙ্গে, ইহুদি ধর্মে যা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শত্রুর প্রতীক।

সরকারপন্থী মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা এই রায় দিতে কোনো রাখঢাক করেননি।

ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে কতটা গালিগালাজ শুনতে হয়েছে, তার একটা নমুনা দিই। চ্যানেল ১৪-এর জনপ্রিয় এক টিভি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ইয়িনন মাগাল সরাসরি ট্রাম্পকে ‘পরাজিত মানুষ’ বলে ডেকেছেন। এমনকি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আর তার মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফকেও তিনি ছোট করে ‘বাচ্চা ইহুদি’ বলে মন্তব্য করেছেন।

আরেকজন ইসরায়েলি ভাষ্যকার ইয়াকভ বারডুগো বলেছেন, ট্রাম্প আর তার উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভান্স এখন হয়ে উঠছেন আধুনিক যুগের চেম্বারলেইনের মতো। নেভিল চেম্বারলেইন ছিলেন ব্রিটেনের সেই প্রধানমন্ত্রী, যিনি ১৯৩৮ সালে হিটলারকে ঠেকানোর বদলে তাকে খুশি রাখার পথ বেছে নিয়েছিলেন, যা পরে ইতিহাসে একটা বড় ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ বারডুগো বোঝাতে চাইছেন, ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্প-ভান্স জুটির নরম নীতি আসলে সেই পুরনো ভুলেরই পুনরাবৃত্তি।

চ্যানেল ১২ আর ইসরায়েল হায়োমের প্রধান রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিত সেগাল, যে পত্রিকাটার মালিক আবার বিলিয়নেয়ার মিরিয়াম অ্যাডেলসন, তিনি বলেছেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়ে ট্রাম্প আসলে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন।

ইসরায়েলের ডানপন্থী চ্যানেল ১৪-এর উপস্থাপক শিমন রিকলিন এক্সে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল, কেউ আর তাদের মিত্র হতে চাইবে না।

এই ভাষ্যকারদের সবাই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ, কেউ কেউ তার মুখপাত্র হিসেবেই পরিচিত। অথচ এরা সবাই মিলে যেভাবে হুট করে সম্পূর্ণ উলটো দিকে ঘুরে গেছেন, সেটা রীতিমতো নজিরবিহীন এক ইউ-টার্ন।

যে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এখন এত ক্ষোভ, তিনিই কিন্তু নিজের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলের পক্ষে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা নিতে সাহস পাননি হোয়াইট হাউসের আগের কোনো প্রেসিডেন্ট। দখলকৃত গোলান হাইটসের ওপর ইসরায়েলের কর্তৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি, আর জেরুজালেমকে ঘোষণা করেছিলেন ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে।

এই একই প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বসিয়েছিলেন ডেভিড ফ্রিডম্যানকে, যিনি নিজেই ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের পক্ষে সোচ্চার একজন মানুষ। ফ্রিডম্যান এই সংঘাতে নিরপেক্ষ সাজার কোনো চেষ্টাই করেননি, উলটো দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি এলাকা সিলওয়ানে একটা সুড়ঙ্গের উদ্বোধন করেছিলেন হাতুড়ি হাতে নিজেই।

ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন, তখন তার ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচন প্রচারণার তৃতীয় বৃহত্তম অনুদানদাতা হিসেবে অ্যাডেলসনের অর্থ তিনি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

আর নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ফোনও তুলতে হতো না। কুশনারসহ আরও অনেকেই ছিলেন, যারা সবসময় প্রেসিডেন্টের কানে কানে কথা বলার জন্য প্রস্তুত থাকতেন।

ট্রাম্প: অনুগত থেকে বিশ্বাসঘাতক

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার পাশে ট্রাম্প সম্পূর্ণভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, আর আজ পর্যন্ত সেই অবস্থানেই আছেন।

কুশনারই ছিলেন “বোর্ড অব পিস”-এর মূল পরিকল্পনাকারী, গাজাকে তার ভূমধ্যসাগরীয় একাধিক বিলাসবহুল সৈকত-রিসোর্টের একটাতে রূপান্তরিত করার সেই অবাস্তব পরিকল্পনারও পেছনের মানুষ তিনিই।

এতে খুব একটা বিতর্ক নেই যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু আর তৎকালীন মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার এক ব্রিফিংয়ের পর।

একটা বিদেশি দেশের নেতাকে সিচুয়েশন রুমে ঢুকতে দেওয়ার এই ঘটনাকেই বলা হচ্ছে, এমনটা এই প্রথম ঘটল।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো এতটা প্রভাবিত হননি, আর ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রীও কখনো মার্কিন প্রশাসনের একেবারে কেন্দ্রস্থলের এতটা কাছে পৌঁছাননি।

অথচ এই মানুষটাকেই এখন তারা বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করছেন।

এখন প্রশ্নটা হলো, এই ফাটল আসলে কতটা গভীর? আর কতদিন টিকবে? ট্রাম্পই সেই প্রেসিডেন্ট, যিনি ইসরায়েলের চিরন্তন যুদ্ধগুলো লড়ার জন্য যা যা দরকার ছিল, তার সবই দিয়েছিলেন, বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি।

তাহলে কি তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের শেষ জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন?

এ ধরনের ফাটল জায়নবাদের ইতিহাসে নতুন কিছু না। নিজেদের নির্ভরশীলতার সেই সময়কার পরাশক্তির বিরুদ্ধেই জায়নবাদীদের ঘুরে দাঁড়ানোর নজির আছে বহু।

একটা ঐতিহাসিক ধরন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন আড়াই লাখ ইহুদি শরণার্থী ইউরোপের বাস্তুচ্যুত মানুষদের শিবিরে আটকে ছিলেন, আর ব্রিটেন ফিলিস্তিনে এক লাখ ইহুদির প্রবেশাধিকার দিতে অভিবাসন-নিষেধাজ্ঞা তুলতে অস্বীকার করেছিল, তখন ইহুদি ভূগর্ভস্থ সংগঠনগুলো একজোট হয়ে যায়।

১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ফিলিস্তিনে সাতশো আশিজনেরও বেশি ব্রিটিশ সেনা, পুলিশ কর্মকর্তা, আর সাধারণ নাগরিক নিহত হন, যাদের অনেকেই লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন ইরগুন আর স্টার্ন গ্যাং নামের সংগঠনের হাতে।

এসবই ঘটেছিল, অথচ ব্রিটেন নিজেই ১৯১৭ সালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদিদের জন্য একটা স্বদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিল, আরব নেতাদের কাছে দেওয়া একটা আরব রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেই।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটে ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই, জেরুজালেমে ব্রিটিশ প্রশাসনিক সদর দপ্তর কিং ডেভিড হোটেলে বোমা হামলায়, যেখানে মোট একানব্বই জন নিহতের মধ্যে আটাশ জনই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক।

আজও ইসরায়েল সেই নিহতদের কবর সম্মান জানাতে অস্বীকার করে, অথচ যারা এই হোটেলে বোমা হামলা চালিয়েছিল, তাদের ঠিকই সম্মান জানানো হয়।

২০০৬ সালে মেনাখেম বেগিন হেরিটেজ সেন্টার এই হামলার স্মরণে একটা অনুষ্ঠান করেছিল, ইরগুন নামের সেই সন্ত্রাসী সংগঠনের সাবেক নেতার নামেই যার নামকরণ, যিনি নিজেই এই বোমা হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন, এবং পরে হয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।

এই হামলায় নিহত সবচেয়ে সিনিয়র কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার পিটার স্মিথ-ডোরিয়েনের কবরে আজও কোনো নামফলক নেই।

হলোকাস্টের সময় অসাধারণ সাহসিকতা দেখানোও ইহুদি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কাউকে রেহাই দেয়নি। লেহি বা স্টার্ন গ্যাং হত্যা করেছিল সুইডিশ কূটনীতিক কাউন্ট ফক বার্নাডোটকেও, যুদ্ধের শেষ কয়েক মাসে যিনি নাৎসি বন্দিশিবির থেকে চার হাজারেরও বেশি ইহুদিকে মুক্ত করার আলোচনা করেছিলেন।

যুদ্ধের পর তিনিই হয়েছিলেন নতুন ইসরায়েলি রাষ্ট্র আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যেকার সংঘাতে জাতিসংঘের প্রথম আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী। স্টার্ন গ্যাংয়ের চোখে তার আসল “অপরাধ” ছিল, তিনি একটা যুদ্ধবিরতির আলোচনা করেছিলেন, আর প্রাথমিক ত্রাণ কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।

ইসরায়েলের ইতিহাসজুড়ে এই একই ধরনটাই বারবার ফিরে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিদায়বেলায় ইসরায়েলকে দিয়েছিলেন আটত্রিশ বিলিয়ন পাউন্ড, অর্থাৎ একান্ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটা সামরিক সহায়তা প্যাকেজ, দশ বছর মেয়াদে। এটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেওয়া সবচেয়ে বড় সহায়তা প্যাকেজ।

সেই সময় ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, নেতানিয়াহু ওবামার এই উদারতার প্রতিদান বরাবরই দিয়েছেন অকৃতজ্ঞতা আর অপমান দিয়ে। ওবামাকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগই তিনি হাতছাড়া করেননি, ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে অত্যন্ত অশোভনভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন, মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার বিশেষ সুযোগটাও ব্যবহার করেছিলেন তাদেরই প্রেসিডেন্টকে অপমান করতে, আর ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি ভণ্ডুল করার জন্য চালিয়েছিলেন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের জনসমক্ষ প্রচারণা।

শ্লাইমের ভাষায়, যে হাত খাওয়ায়, সেই হাতেই কামড় দেওয়ার এর চেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। নেতানিয়াহুর এই আচরণই তাকে পরিণত করেছে এমন এক মিত্রে, যাকে বলা যায় “নরকের সবচেয়ে বিশেষ মিত্র।”

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি সহজাতভাবেই একজন উদারপন্থী জায়নবাদী, তার কপালেও জুটেছিল একই পরিণতি। জেনারেল আমোস গিলাদ লিখেছিলেন, বাইডেনের প্রতি নেতানিয়াহুর “নজিরবিহীন তিরস্কার” ছিল অকৃতজ্ঞতার এক চরম প্রকাশ, আর একইসঙ্গে প্রথম শ্রেণির কৌশলগত ব্যর্থতা।

গিলাদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের একমাত্র প্রকৃত মিত্র, আর জো বাইডেন ইতিহাসে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট। তার ওপর আর সেনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমারের ওপর এভাবে চড়াও হওয়ার পেছনে কোনো কৌশলগত যুক্তিই নেই। বরং সন্দেহ হয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের জন্য যে কৌশল জরুরি, তার বদলে ঘরোয়া রাজনীতির তুচ্ছ হিসাব-নিকাশই এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে।

জায়নবাদের আসল চেহারা

কিছু ভাষ্যকারের চোখে, এখন যা ঘটছে তা আসলে জায়নবাদের নিজের আসল, আধিপত্যবাদী চেহারারই উন্মোচন। আর এই তালিকায় আছেন খোদ মোশে ইয়ালনও, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নেতানিয়াহুর অধীনে যিনি ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

ওয়াইনেটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ালন বলেন, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলনের ভেতরের কিছু অংশ আসলে ধারণ করে একধরনের “ইহুদি আধিপত্যবাদী মতাদর্শ”।

ইয়ালনের ভাষায়, ইহুদি আধিপত্যবাদ আসলে কী? হলোকাস্টের আশি বছর পর, এটা যেন হিটলারের “মাইন কাম্পফ”-এরই উলটো সংস্করণ, শুধু এবার “শ্রেষ্ঠ জাতি” হিসেবে বসানো হচ্ছে আমাদেরই।

ইহুদি আধিপত্যবাদ এখন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রেই চলে এসেছে। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট ইরান আর ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যেভাবে কথা বলেন, শুধু সেটাই একবার শুনে দেখুন। অথবা ইসরায়েলি ইহুদিরা সাধারণভাবে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যেভাবে কথা বলেন, সেটাও।

ইসরায়েলের সঙ্গে ট্রাম্পের এই বিরোধের পেছনে আসলে হয়তো একটাই কারণ, নতুনত্বের ধাক্কা। এই ধাক্কাটা আসছে এই কারণে যে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে বলছেন যুদ্ধ বন্ধ করতে। এটা ঠিক সেই ধরনের ধাক্কা, যা একটা বসতি-উপনিবেশ অনুভব করে যখন সে বুঝতে পারে তার নিজের জন্মদাতা রাষ্ট্রের ওপরই তার আর নিয়ন্ত্রণ নেই।

অনুরূপ একটা ধাক্কা আলজেরিয়ার “পিয়েদ নোয়ার” সম্প্রদায়ও অনুভব করেছিল। ১৯৫৮ সালে শার্ল দ্য গলকে ক্ষমতায় বসাতে তারাই সাহায্য করেছিল, অথচ পরে দেখেছিল সেই ফরাসি প্রেসিডেন্টই ঘুরে গিয়ে সমর্থন দিলেন আত্মনিয়ন্ত্রণ আর আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে।

অথবা ধরুন উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নবাদী সম্প্রদায়ের সেই ক্ষোভের কথা, যখন তাদেরই সবচেয়ে বড় ইউনিয়নবাদী নেত্রী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, স্বাক্ষর করেছিলেন অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি, যা ডাবলিনকে শান্তি প্রক্রিয়ায় মতামত দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

বিষাক্ত সুনামি

ইসরায়েলের ভেতরে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তার একটা সত্যিকারের বিষাক্ত প্রভাব পড়ছে আটলান্টিকের ওপারের জনমতের ওপর।

এটা বাড়িয়ে বলা হবে না যে, গাজায় গণহত্যা, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ যুদ্ধ, আর সিরিয়া, দক্ষিণ লেবানন, গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি, এই সব মিলিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি একটা পুরো প্রজন্মের সমর্থন কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

পিউ রিসার্চের তথ্য বলছে, রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাট, দুই দলের ক্ষেত্রেই পঞ্চাশ বছরের কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের বেশিরভাগই এখন ইসরায়েল আর নেতানিয়াহু সম্পর্কে নেতিবাচক মত পোষণ করেন। আঠারো থেকে ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীর হার সাতান্ন শতাংশ, গত বছর যা ছিল পঞ্চাশ শতাংশ।

সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ষাট শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আছে, গত বছরের তিপ্পান্ন শতাংশ থেকে যা বেড়েছে। আর ঊনষাট শতাংশ মানুষ মনে করেন, বিশ্ব-বিষয়ক সিদ্ধান্তে নেতানিয়াহুর সঠিক কাজ করার সামর্থ্যের ওপর তাদের সামান্যই আস্থা আছে, বা কোনো আস্থাই নেই, গত বছর যে হার ছিল বাহান্ন শতাংশ।

চলার গতিপথটা স্পষ্ট।

তবে জনমতের এই পরিবর্তন রাজনৈতিক অর্থে ঠিক কী বোঝায়, আর কখন এটা নীতিগত পরিবর্তনের মতো কিছুতে রূপ নেবে, তা নিয়ে ঐকমত্য কম।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর ঠিকানা নিউ ইয়র্কেই সম্প্রতি তিনজন সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান নিজেদের আসন হারিয়েছেন, আর মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থিত প্রার্থীরা জিতে নিয়েছেন পাঁচটা স্থানীয় আসন।

এর কিছুদিন পরই আইনজীবী ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মেলাত কিরোস প্রতিষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটদের জন্য এক বিস্ময়কর ধাক্কা দিয়ে কলোরাডোর প্রথম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে বিজয়ী ঘোষিত হন, যে জেলার মধ্যে পড়ে রাজ্যের রাজধানী ডেনভারও।

কিরোস হারিয়ে দেন ডায়ানা ডিগেটকে, যিনি ক্যাপিটল হিলে কাটিয়েছিলেন তিন দশক, আর আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা অ্যাইপ্যাক থেকে পেয়েছিলেন ষোল লাখ ডলারের বেশি।

জিউইশ ভয়েস ফর পিস-অ্যাকশন বলেছে, এই নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে দিয়েছে, ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরে অ্যাইপ্যাক এখন একটা “বিষাক্ত ব্র্যান্ড”-এ পরিণত হয়েছে, আর যেসব আইনপ্রণেতা গণহত্যাকে সমর্থন বা রক্ষা করেন, ডেমোক্র্যাট ভোটাররা তাদের ওপর ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

এটা নিঃসন্দেহে অ্যাইপ্যাকের জন্য একটা পরাজয়। ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের সমালোচক তিনজন প্রার্থীই হারিয়ে দিয়েছেন অ্যাইপ্যাক-সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই ফলাফল কি সত্যিকারের কোনো ফিলিস্তিনপন্থী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এটা নিছক ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরে উদারপন্থী জায়নবাদীদের নতুন করে জায়গা করে নেওয়া, শুধু অ্যাইপ্যাকের অনুমোদন ছাড়াই? দলটা কি আসলে নেতানিয়াহু-পরবর্তী এক যুগের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আবারও ব্যবস্থার ভেতরেই গেঁথে যাবে?

বিজয়ীদের একজন ছিলেন ব্র্যাড ল্যান্ডার, যিনি জিতেছেন নিউ ইয়র্কের দশম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রাইমারিতে।

ল্যান্ডার আগে মেয়র পদের জন্য লড়েছিলেন, পরে সরে গিয়ে মামদানিকে সমর্থন দেন। এক সময় তিনি বিডিএস আন্দোলনের (ইসরায়েল বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞার আন্দোলন) বিরোধিতা করতেন। নিউ ইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার থাকার সময় তিনি শহরের পেনশন তহবিলের টাকা আরও বেশি করে ঢেলেছিলেন ইসরায়েলি অস্ত্র কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসে। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন একজন উদারপন্থী জায়নবাদী হিসেবে।

স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজিয়া কাজি এমইইকে বলেন, একটা জিনিস দেখে তিনি সত্যিই ধাক্কা খেয়েছেন। যেসব কর্মী এলবিট সিস্টেমসের কার্যক্রম বন্ধ করতে আন্দোলন করেছেন, তারা এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর দমননীতির শিকার হচ্ছেন। অথচ সেই একই আন্দোলনের কিছু মানুষকেই দেখা যাচ্ছে ল্যান্ডারের জয় উদযাপন করতে, যিনি নিজেই একসময় এলবিটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই স্ববিরোধিতাটাই তার কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর লেগেছে।

কিরোসের জয়ের পর ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এক্সে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, স্রোত ঘুরে যাচ্ছে, আমেরিকানরা এখন স্থিতাবস্থার রাজনীতিতে ক্লান্ত।

মামদানি নিজে বলেছেন, এটা শ্রমজীবী মানুষের জয়, যা গত বছরের এক জরিপের ফলাফলকেই সমর্থন করে, যেখানে দেখা গিয়েছিল ভোটাররা মূলত প্রভাবিত হন দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক উদ্বেগ, সাশ্রয়ী আবাসন, আর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চিন্তা থেকে।

তবে বিজয়ী প্রার্থীরা নিজেদের বক্তব্যে দেশের ভেতরের সমস্যা আর গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবি, দুটোকেই উপস্থাপন করেছেন একসঙ্গে, একটা প্যাকেজ হিসেবে। স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে তাদের চ্যালেঞ্জ ছিল দুই ফ্রন্টেই।

দীর্ঘ এক যাত্রা

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল লেভির চোখে, ইসরায়েলের প্রতি নিজের সমর্থন নতুন করে ঠিক করার এই যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো শুরুর দিকেই আছে। লেভি নিজে ইউএস/মিডল ইস্ট প্রজেক্টের প্রধান।

তার ভাষায়, ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরের এই আন্দোলন আসলেই ক্ষমতার দিকে এগোতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট না। এই পরিবর্তন আনতে গিয়ে হয়তো তাদের নিজেদের ভেতরের অনেক অস্বস্তিও চেপে রাখতে হবে। আর এই পরিবর্তন যতটা দ্রুত হওয়া উচিত ছিল, তার চেয়ে অনেক ধীরেই হবে।

সামনে বিশাল সুযোগ অপেক্ষা করছে বলে তিনি মনে করেন, আর নিজেও চান এই পরিবর্তনটা সত্যিই ঘটুক। কিন্তু এখনো তা বাস্তবে দেখা যায়নি। এর পেছনে তিনটা কারণ আছে। এক, প্রতিষ্ঠিত লবির প্রতিরোধ এখনো অনেক শক্তিশালী। দুই, নিজেদের পক্ষেও ভুল করার আশঙ্কা থেকে যায়। তিন, এই পরিবর্তনের পেছনে চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার মতো কোনো সংগঠিত ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলন এখনো নেই। এই তিনটা মিলিয়েই বলা যায়, পরিবর্তনটা এখনো আসেনি।

তারপরও এটা সত্যি যে, যুক্তরাষ্ট্রের জনমতে একটা সত্যিকারের পরিবর্তন ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটা হলো, ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটা রাজনীতির প্রান্ত থেকে সরে এসে মূলধারার আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

একসময় যেটাকে বামপন্থীদের একান্ত নিজস্ব একটা উদ্বেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো, বা যা সীমাবদ্ধ থাকত ইসলামপন্থা বা সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে, সেটাই এখন এমন একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা রাজনৈতিক মতাদর্শের সব ধরনের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

এমনকি মার্কিন ডানপন্থার একটা অংশও এখন ইসরায়েলকে দেখতে শুরু করেছে ভিন্নভাবে, সম্পদ না ভেবে বরং বোঝা হিসেবে। এর একটা বড় কারণ ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আচরণ। শিশুসহ বেসামরিক মানুষের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা, এসব দেখেই কিছু রক্ষণশীলের কাছে একটা প্রশ্ন দাঁড়িয়ে গেছে। ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন করাটা কি আসলে আমেরিকার নিজের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর মেলানোটাই তাদের কাছে এখন ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

কারো কারো কাছে ইসরায়েল থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করাটাই হয়ে উঠেছে আমেরিকার নিজস্ব প্রকল্পটাকে পুনরুদ্ধারের একটা উপায়।

তবে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ মূলধারায় জায়গা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন কিছু সীমারেখাও। আলোচনার পরিসর বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু রক্ষণশীল আর প্রগতিশীল, দুই ধরনের মহলেই তা এখনো বেশ কড়াভাবে নিয়ন্ত্রিত।

অ্যাইপ্যাকের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করাটা ক্রমশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, কারণ এভাবে আলোচনা করলে আমেরিকানরা পুরো সমস্যাটাকেই একটা শক্তিশালী লবির অতিরিক্ত প্রভাবের প্রশ্ন হিসেবে সাজাতে পারেন।

তবে আপাতত অন্তত এই আলোচনার সীমারেখা স্পষ্ট, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, বা ফিলিস্তিনি সংগ্রামের পেছনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, এসব বিষয় এখনো “শোভন আলোচনা”-র সীমানার প্রায় বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

আমেরিকা হয়তো এমন এক পথে হাঁটছে, যা ধাপে ধাপে এগোবে, প্রথমে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের প্রতি সহানুভূতি বাড়বে, আর চিরস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত ইসরায়েলের প্রতি বৈরিতাও বাড়বে।

এর পরিণতিতে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের সেই “ব্যতিক্রমী মর্যাদা”র অবসান ঘটবে, আর শেষমেশ ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ অধিকারের স্বীকৃতিও আসবে। এটা অর্জন করতে হয়তো লাগবে বেশ কয়েকটা নির্বাচনী চক্র।

কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য, বা তার পরে যিনিই আসুন না কেন, আমেরিকার ডানপন্থার কাছে ইসরায়েলকে আবার প্রাসঙ্গিক করে তোলাটা মোটেও সহজ কাজ হবে না। ইরানের ব্যাপারে হাত-পা বাঁধা পড়লেও লেবানন আর সিরিয়ায় নিজেদের দখল করা ভূখণ্ড ধরে রাখার অনুমতি পাওয়া নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া হবে গাজার পুরোটা দখল করতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা।

তাকে এটা করতেই হবে, যদি তিনি নিজের মন্ত্রিসভায় আর নির্বাচনী প্রচারণায় চরম ডানপন্থীদের পাশে ধরে রাখতে চান। কিন্তু গাজায় নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বর্ণালির দুই প্রান্তেই এর প্রতি ঘৃণার অনুভূতি আরও বাড়বে।

এই যুদ্ধকে ইসরায়েলের নিজস্ব “নাইন-ইলেভেন” হিসেবে দেখানোর চেষ্টাটা ইতিমধ্যে করা হয়ে গেছে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না পুরোপুরি। এমনকি টাকার কার্লসনের মতো রিপাবলিকানরাও এখন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। গোটা ইসলামকে একটা অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা হয়েছিল, তারা এখন সেটাকেই একটা বড় ভুল বলে মনে করছেন।

আপাতত এই সংকট থেকে বেরোনোর কোনো সহজ পথ নেই। ইসরায়েলপন্থী লবি সহজে হার মানবে না, মার্কিন রাজনীতিতে তারা কঠিনভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।

কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট। ইসরায়েলকে সমর্থন করাটা যদি ক্রমশ জোর করে টিকিয়ে রাখা একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, বিশ্বাস থেকে না আসে, তাহলে জায়নবাদের সংকট আরও গভীর হতে থাকবে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter