রিউমর স্ক্যানারের ডেটা অনুসারে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যেখানে ১ হাজার ৭৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর একটি বড় কারণ হতে পারে এ বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

তবে প্রথম প্রান্তিকের ১ হাজার ৯৭৪টি থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ১ হাজার ২৩৬-এ নেমে আসা ইঙ্গিত দেয় যে নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের প্রবাহও কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

প্ল্যাটফর্মভিত্তিক হিসাবে ফেসবুক এখনো অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম। ৬ মাসে সেখানে প্রায় ২ হাজার ৮২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

এরপর টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, থ্রেডস ও এক্স রয়েছে তালিকায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফেসবুক ও টিকটকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে অপতথ্য কমলেও ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, এক্স এবং দেশের গণমাধ্যমে তা বরং বেড়েছে।

যা বোঝায় অপতথ্য ছড়ানোর মূল স্রোত একেবারে থেমে না গিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও এর নেতাকর্মীদের ঘিরে সবচেয়ে বেশি, ৯৮০টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল নেতিবাচক প্রকৃতির।

জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও নেতিবাচকতার হার প্রায় কাছাকাছি। তুলনামূলক কম অপতথ্যের শিকার হলেও নেতিবাচকতার হারে এনসিপি এগিয়ে। দলটিকে ঘিরে প্রচারিত অপতথ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই নেতিবাচক।

আর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ক্ষেত্রে তা ৯২ শতাংশের কাছাকাছি।

এর বিপরীতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রচারিত অপতথ্যের সিংহভাগই (প্রায় ৮৪-৮৭ শতাংশ) ছিল ইতিবাচক প্রকৃতির।

এই বৈপরীত্য থেকে স্পষ্ট, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী, উভয় ধারার রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরেই সংগঠিত প্রচারণা চলছে, তবে উদ্দেশ্য ভিন্ন, একদিকে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, অন্যদিকে সহানুভূতি বা জনপ্রিয়তা তৈরির চেষ্টা।


দ্বিতীয় প্রান্তিকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে তারেক রহমানকে ঘিরে।

‘দলীয় প্রধান’ হিসেবে তার নামে অপতথ্য প্রথম প্রান্তিকের ২২২টি থেকে নেমে দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র ১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা তার সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার প্রতিফলন।

কিন্তু ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তাকে ঘিরে ছয় মাসে ১২৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৭৩ শতাংশই নেতিবাচক।

আইনশৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোকেও ব্যাপকভাবে জড়ানো হয়েছে অপতথ্যে। ছয় মাসে এ-সংক্রান্ত ১৯৫টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশকে ঘিরে অপতথ্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮৭ শতাংশ। যেখানে সেনাবাহিনীকে ঘিরে বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

সেনাপ্রধান ও আইজিপির মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও এই প্রবণতা থেকে বাদ যাননি।

জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতথ্যই ছিল সবচেয়ে বড় উৎস। একাই ৭৭৪টি ঘটনা। যা মোট দেশীয় অপতথ্যের একটি বড় অংশ দখল করে আছে।

এর বাইরে গণভোট, জ্বালানি সংকট, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক ঘটনা নিয়েও উল্লেখযোগ্য অপতথ্য ছড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত একাই সবচেয়ে বেশি, ১৮০টি অপতথ্যের জন্ম দিয়েছে, যা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক ইস্যুর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

প্রান্তিকভিত্তিক তুলনায় দেখা যায়, রাজনৈতিক ইস্যুতে অপতথ্য দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৪৯ শতাংশ কমলেও শিক্ষাবিষয়ক অপতথ্য বেড়েছে চমকপ্রদভাবে। প্রায় ২৭৫ শতাংশ, আর খেলাধুলা-সংক্রান্ত অপতথ্য বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ।

এটি বোঝায়, রাজনৈতিক উত্তাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে গুজব ও অপতথ্যের কেন্দ্র অন্য ক্ষেত্রে সরে যাচ্ছে।

এবারের প্রতিবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রযুক্তিনির্ভর অপতথ্যের উত্থান। ছয় মাসে এআই দিয়ে তৈরি অন্তত ৫০৪টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে, যা ছবি, ভিডিও ও লেখা, সব মাধ্যমেই ছড়িয়েছে।

এর পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটায়ার পেজের কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা মনে করে প্রচারের প্রবণতাও বেড়েছে, যেখানে ৩৭৪টি এমন ঘটনা পাওয়া গেছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরাও এসব ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে সত্য ভেবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

সংখ্যায় কম হলেও প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ডিপফেক কনটেন্ট, এ ধরনের ৩৮টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যেখানে বাস্তব ব্যক্তির চেহারা বা কণ্ঠস্বর কৃত্রিমভাবে নকল করা হয়েছে। এসব কনটেন্ট সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে ফেলে।

দেশের গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য প্রচারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত বছরের ৯০টি ঘটনার তুলনায় এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪১টিতে, প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি।

এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ইনকিলাব, এরপর ইত্তেফাক এবং যুগান্তর ও বিডি২৪রিপোর্ট।

আরও উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের নাম ও লোগো নকল করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো।

ছয় মাসে এমন ৭২০টি ঘটনায় মোট ৭৩৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে দৈনিক আমার দেশ, যমুনা টিভি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের নামে।

এটি শুধু পাঠকের বিভ্রান্তিই বাড়ায় না, বরং প্রকৃত গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষুণ্ন করে।

বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় উৎস থেকে অপতথ্য প্রচারের ধারা এবারও অব্যাহত রয়েছে। ছয় মাসে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত ১৭টি ঘটনায় ভারতের ৫৬টি সংবাদমাধ্যমে অপতথ্য প্রচারিত হয়েছে, যেখানে শীর্ষে আছে আজতক বাংলা ও রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভারতীয় অ্যাকাউন্ট-পেজ থেকে অন্তত ৫১টি ঘটনায় বাংলাদেশ-বিরোধী অপতথ্যের প্রমাণ মিলেছে।

সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের ক্ষেত্রে অবশ্য চিত্রটা প্রায় সমান, ১০৫টি ঘটনার মধ্যে ৫৩টি বাংলাদেশি ও ৫২টি ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছে, যা দেখায় এই সমস্যা একতরফা নয়, বরং সীমান্তের দুই পাশেই সমান তালে চলছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের চিত্র বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো বড় ঘটনাগুলোই অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

তারেক রহমান ও বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় আসার পর তাদের ঘিরে যেমন ব্যাপক অপপ্রচার হয়েছে, তেমনি প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এআই ও ডিপফেকের মতো নতুন মাধ্যমও অপতথ্যের বিস্তারকে আরও জটিল করে তুলছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে সামগ্রিক অপতথ্য কমে আসা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও শিক্ষা ও খেলাধুলার মতো নতুন ক্ষেত্রে অপতথ্যের বিস্তার এবং গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা প্রমাণ করে, তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা কমেনি বরং বেড়েছে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter