জন কিরিয়াকু একসময় সিআইএ-তে কাজ করতেন, পাকিস্তানে কাউন্টার-টেররিজম বিভাগের প্রধান পর্যন্ত হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে তিনিই প্রথম প্রকাশ্যে বলেন যে আমেরিকা বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। এর ফল হিসেবে তাকে মামলায় ফাঁসানো হয় এবং তিনি ২৩ মাস জেল খাটেন। এখন তিনি ইউটিউবে নিজের পডকাস্ট চালান আর হঠাৎ করেই টিকটকে বিশাল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। নিচের লেখাটা তার একটা সাক্ষাৎকারের সহজ ভাষায় সারসংক্ষেপ।
কিরিয়াকু বলেন, তিনি একটা গ্রিক অভিবাসী পরিবার থেকে এসেছেন। পরিবার তাকে শিখিয়েছিল দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই তিনি সরকারি চাকরির কথা ভাবতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার এক শিক্ষক আসলে গোপনে সিআইএ-র লোক ছিলেন। তিনি বলেন, এমন ঘটনা শুধু বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে না, সব জায়গাতেই ঘটে। এভাবেই তিনি সিআইএ-তে যোগ দেন।
তিনি সিআইএ ছাড়েন ২০০৪ সালে। কারণ হিসেবে বলেন, তখন তার সদ্য বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল, দুই ছোট ছেলে ছিল। তিনি চেয়েছিলেন ছেলেদের সাথে থাকতে, ইরাক-আফগানিস্তানে না গিয়ে।
২০০৭ সালে তিনি এবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে তিনি প্রথমবার স্বীকার করেন যে আমেরিকা সরকার বন্দিদের ওপর নির্যাতন-ধরনের কৌশল ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তিনি বলেন, তাকে চৌদ্দজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তারা এই নির্যাতন-কৌশল শিখতে চান কিনা। তিনিই একমাত্র না বলেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এটা স্পষ্টতই বেআইনি ও অনৈতিক, আরও কেউ না কেউ প্রকাশ্যে বলবে। কিন্তু কেউ বলেনি।
সাক্ষাৎকার দেওয়ার কয়েকদিন পরেই প্রেসিডেন্ট বুশ ক্যামেরার সামনে বলেন, আমেরিকা নির্যাতন করে না। যা কিরিয়াকুর কাছে সরাসরি মিথ্যা মনে হয়। এরপর বুশ বলেন, যদি নির্যাতন হয়েও থাকে তবে সেটা কোনো এক “উচ্ছৃঙ্খল” সিআইএ কর্মকর্তার কাজ। কিরিয়াকু বুঝে যান, এই দোষ তার ওপরই চাপানো হবে। তাই তিনি সব সত্যি বলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সাক্ষাৎকারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সিআইএ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে, বলে যে তিনি গোয়েন্দা তথ্য ফাঁস করেছেন। এফবিআই এক বছর তদন্ত করে কোনো অপরাধ পায়নি। কিন্তু ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার পুরনো প্রতিপক্ষ জন ব্রেনানের অনুরোধে মামলা আবার খোলা হয়। এরপর তিন বছর ধরে তার ফোন আড়ি পাতা হয়, ইমেইল পড়া হয়, এফবিআই এজেন্টরা তাকে অনুসরণ করে। শেষে ২০১২ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে পাঁচটা অভিযোগ আনা হয়, যার মধ্যে তিনটা ছিল গুপ্তচরবৃত্তির।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অভিযোগ ছিল কথিতভাবে গোপনীয় তথ্য সাংবাদিকদের দেওয়ার। নির্যাতনের তথ্য ফাঁস করার জন্য না, যদিও পুরো ঘটনার শুরু সেখান থেকেই। তিনি বলেন, যারা আসলে নির্যাতন চালিয়েছিল বা নির্দেশ দিয়েছিল, তারা কেউ একদিনও জেলে যায়নি, শুধু তিনিই গেছেন।
নির্যাতন কাজ করে কিনা এই প্রশ্নে তিনি এখন স্পষ্ট বলেন, না, কাজ করে না। কিন্তু ২০০৭ সালের সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন এক বন্দির ওপর এটা কাজ করেছিল। এই দ্বিমুখী কথার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, তখন যা তথ্য তার কাছে এসেছিল তা ভুল ছিল। আসলে এফবিআই-এর একজন তদন্তকারী ওই বন্দির সাথে ভালো ব্যবহার করে তথ্য বের করেছিলেন, কিন্তু সিআইএ পরে সেই তথ্যকে নিজেদের ভাষায় বদলে দাবি করে যে ওয়াটারবোর্ডিং করেই তথ্য পাওয়া গেছে। এই সত্যিটা তিনি জানতে পারেন অনেক পরে, ২০০৯ সালে।
এরপর কথা ঘোরে তার হঠাৎ অনলাইন জনপ্রিয়তার দিকে। তিনি বলেন, প্রায় এগারো সপ্তাহ আগে দুবাইয়ে থাকার সময় তার ভাগ্নি ফোন করে বলে যে সে টিকটকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তার এক পুরনো পডকাস্ট সাক্ষাৎকার কেটে ছোট ছোট ভিডিও বানিয়ে মজার এফেক্ট দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর একটা বড় এজেন্সি তাকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়। তিনি বলেন, তার দর্শক মূলত পনেরো থেকে ত্রিশ বছর বয়সী পুরুষ, যারা ডানপন্থী আর বামপন্থী গণমাধ্যমের পরস্পরবিরোধী বয়ান দেখে বিভ্রান্ত। কেউ একজন সহজ ভাষায় সত্যিটা বলুক এটাই চায়।
সিআইএ নিয়ে তার মূল্যায়ন কঠোর। তিনি বলেন, সিআইএ ১৯৪৯ সালে ইতালির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা থেকে শুরু করে বরাবরই নিয়ন্ত্রণহীন ছিল, শুধু ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের চার্চ কমিটির সময়টুকু বাদে, যখন সত্যিকারের তদারকি ছিল। কিন্তু ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি আর পরে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”-এর সময় সেই তদারকি পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তিনি বলেন, কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটিগুলো এখন তদারকি কমিটি না, বরং সিআইএ-র পক্ষে গলা ফাটানো কমিটি। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, তার মতে সিআইএ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
জেফরি এপস্টেইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি বহু আগে থেকেই বিশ্বাস করেন এপস্টেইন ছিলেন ইসরায়েলের মোসাদের একজন “অ্যাক্সেস এজেন্ট”। অর্থাৎ সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত গুপ্তচর না, বরং এমন একজন মধ্যস্থতাকারী যে প্রভাবশালী মানুষদের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক নথি থেকে জানা গেছে এপস্টেইন সিআইএ, এফবিআই, ব্রিটেনের এমআই৫-এমআই৬ আর জার্মান গোয়েন্দা সংস্থাকেও নিজে থেকে যোগাযোগ করেছিলেন, এমনকি রাশিয়ার সাথেও সরাসরি পুতিনের সাথে বৈঠক চেয়েছিলেন। গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েলও মোসাদের গুপ্তচর ছিলেন বলে মনে করেন তিনি।
ইসরায়েল নিয়ে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। সিআইএ-তে যোগ দেওয়ার ছয় সপ্তাহের মাথায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সাথে প্রথম বৈঠকে শিন বেতের একজন কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে ইহুদি কিনা, যা তিনি নিয়োগের চেষ্টা হিসেবে দেখেন, সরাসরি বলে দেন তাকে নিয়োগ করা যাবে না। এরপর থেকে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরায়েলের বদলে আরব দেশগুলোতে কাজ করা বেছে নেন।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল বহু বছর ধরেই আমেরিকাকে ইরানে হামলা চালাতে উৎসাহিত করেছে। প্রতিটা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে ইরানে বোমা ফেলার অনুরোধ করতেন। তার মতে, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছিল না, শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল। এটা তার নিজের কথা না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিজস্ব মূল্যায়ন। তবু শেষ পর্যন্ত ইরানে হামলা হয়েছে, যেটা তিনি সরাসরি ইসরায়েলের চাপের ফল বলে মনে করেন।
এআইপ্যাক নিয়েও তিনি খোলাখুলি কথা বলেন। তার মতে, এই ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠীর উচিত যুক্তরাষ্ট্রে “বিদেশি এজেন্ট” হিসেবে নিবন্ধন করা, ঠিক যেমন অন্য যেকোনো দেশের হয়ে কাজ করা লবিস্টদের করতে হয়। তিনি নিজের একটা উদাহরণ দেন — একবার আবুধাবির বাণিজ্য চেম্বারের হয়ে কিছু লেখার জন্য তাকে বিদেশি লবিস্ট হিসেবে নিবন্ধন করতে হয়েছিল, অথচ এআইপ্যাক নির্বাচনে কোটি কোটি ডলার খরচ করেও নিবন্ধন করে না। তিনি এমনকি একটা ঘটনার কথা বলেন, যেখানে টেক্সাসের এক আইনপ্রণেতা তাকে সম্মাননা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এআইপ্যাকের আপত্তিতে সেটা বাতিল হয়ে যায়।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে তিনি আবার জোর দিয়ে বলেন, ইরানে হামলার পেছনে ইসরায়েলের চাপ ছিল মূল কারণ, ইরান আমেরিকার জন্য সরাসরি হুমকি ছিল না। এই আলোচনায় তিনি নিজের ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও মনে করিয়ে দেন। তিনি আগেই বলেছিলেন, ইরানের সাথে যদি শান্তি হয়, সেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত দিয়েই হবে।
