চশমার লেন্সবিহীন ফ্রেম, ভিনটেজ জ্যাকেট আর একধরনের উদাসীন ভাব দিয়ে যাদের চেনা যেত, সেই “হিপস্টার” সংস্কৃতি কীভাবে জন্ম নিল, কীভাবে দুই ভাগে ভেঙে গেল, আর কীভাবেই বা তার শেষ হলো, তার গল্প।
“হিপস্টার” শব্দটা শুনলে একটা ছবি চোখে ভাসে। চশমার লেন্সবিহীন ফ্রেম, ভিনটেজ জ্যাকেট, আর একধরনের নিজের-প্রতি-সচেতন উদাসীনতা। কিন্তু আসল হিপস্টার কে ছিল, কোন শহরে, কোন সময়ে, এই প্রশ্নের উত্তর মোটেও সহজ না। ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল, এই সময়টাকেই সবাই এই সংস্কৃতির সবচেয়ে জমজমাট সময় বলে ধরে নেয়। আর এই সময়ের গান-বাজনাই ছিল এই সংস্কৃতির সবচেয়ে জোরালো প্রকাশ।
সহজ করে বললে, হিপস্টার হলো শহুরে তরুণদের একটা উপসংস্কৃতি, যেটা মূলত ২০১০-এর দশকে ছড়িয়ে পড়ে। এর তিনটা মূল দিক ছিল, পোশাক, জীবনযাপনের ধরন, আর গানের রুচি। এই সংস্কৃতির মানুষজন “খাঁটি” থাকতে চাইত, আলাদা থাকতে চাইত, কেনাকাটা কম করতে চাইত, পুরনো জিনিসের প্রতি টান থাকত, আর গ্রামের সরল জীবনের প্রতিও একধরনের ভালোলাগা থাকত। মজার বিষয় হলো, নিজেকে কেউ “হিপস্টার” বলে স্বীকার করত না। উল্টো, এই শব্দটা প্রায়ই ব্যবহার হতো একধরনের খোঁচা হিসেবে, মানে যে লোক দেখানো স্টাইলিশ হতে চায়।
শব্দটা কিন্তু নতুন না। এর শিকড় চল্লিশের দশকের জ্যাজ সংস্কৃতিতে। তবে বর্তমান অর্থে এই শব্দ ফিরে আসে নব্বইয়ের দশকের শেষে, আর ছড়িয়ে পড়ে ২০০০-এর দশকের শেষ আর ২০১০-এর শুরুতে। এর শুরুটা হয় মূলত নিউ ইয়র্কের উইলিয়ামসবার্গ এলাকা ঘিরে, যেখানকার তরুণ শিল্পী আর লেখকদের নিয়ে সংবাদমাধ্যম প্রথম লেখালেখি শুরু করে। ২০০৩ সালে একটা জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক বই বের হয়, যেটা এই ধারণাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পরিচিত করে দেয়। লন্ডনেও প্রায় একই সময়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটে, যেখানে মিডিয়া আর ডিজিটাল জগতে কাজ করা তুলনামূলক সচ্ছল তরুণরা শহরের গরিব পাড়াগুলোতে থাকতে শুরু করে, যা পরে সেসব এলাকার চেহারাই বদলে দেয়। এটা নিয়ে ব্যঙ্গ করে একটা টিভি সিটকমও তৈরি হয়।
পোশাকের দিক থেকে বললে, চেক শার্ট, ভিনটেজ পোশাক, স্কিনি জিন্স, বোনা টুপি, মোটা ফ্রেমের চশমা (কখনো লেন্স ছাড়াই), আর ইচ্ছা করে বাড়ানো দাড়ি-গোঁফ, এসবই ছিল হিপস্টার চেনার সবচেয়ে সহজ উপায়। এর পাশাপাশি বিশেষ ধরনের সাইকেল, রেট্রো ঘড়ি, হাতে বানানো বা পুরনো দোকান থেকে কেনা জিনিসপত্র, এসবও তাদের প্রিয় ছিল। বাগান করা, ছবি তোলা, নিজে হাতে বই বাঁধাই করা, ক্রাফট বিয়ার আর বিশেষ ধরনের কফির প্রতি আগ্রহ, এগুলাও এই সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
গানের দিক থেকে গল্পটা শুরু হয় শতাব্দীর শুরুতে, যখন ব্রিটপপের রাজত্ব কমে আসছিল। তখন নিউ ইয়র্ক, লন্ডন আর শিকাগোর মতো শহরে নতুন ধরনের গান তৈরি হচ্ছিল, ইলেক্ট্রোক্ল্যাশ, ড্যান্স-পাংক, পরে ব্লগহাউস, এই ধরনের ছোট ছোট ধারা আসত আর দ্রুত চলে যেত, প্রায় ঋতু বদলের মতো। এই সময় গান নিয়ে লেখালেখির ধরনও বদলে যায়। পিচফর্কের মতো ওয়েবসাইট বড় হয়ে ওঠে, যেখানে অচেনা কোনো ব্যান্ডও রাতারাতি সবার আলোচনায় চলে আসতে পারত।
প্রযুক্তিও এই গল্পের বড় একটা অংশ। ন্যাপস্টার আর লাইমওয়্যারের মতো ফাইল-শেয়ারিং সাইট তরুণদের গান শোনার ধরন বদলে দেয়। মাইস্পেস আসার পর ভক্ত আর শিল্পীর মধ্যে দূরত্ব কমে যায়, পরে টাম্বলার আর সাউন্ডক্লাউড এসে সেই সম্পর্ককে আরেকভাবে সাজায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বদল আসে ২০০৭-০৮ সালে, যখন আইফোন সবার হাতে হাতে পৌঁছে যায়। যে সংস্কৃতি এতদিন শুধু কিছু নির্দিষ্ট শহরের কিছু নির্দিষ্ট পাড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল, স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেটা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যত ছড়িয়ে পড়ল, তত তার আসল রূপটাও বদলে যেতে থাকল।
২০০৮-০৯ সালের দিকে এসে এই সংস্কৃতিটা নিজেই দুই ভাগ হয়ে যায়। একদিকে থাকল পরীক্ষামূলক, একটু বাঁকা চোখে দেখা, প্রযুক্তি-নির্ভর গানের ধারা, নয়েজ আর লো-ফাই ঘরানার শিল্পীরা। অন্যদিকে জন্ম নিল পুরাই আলাদা একটা ধারা, সৎ, আন্তরিক, ব্যানজো আর হাততালিভরা “লোক-পপ” গান, যা পরে বিজ্ঞাপন আর টিভি শোয়ের প্রিয় গান হয়ে ওঠে। এই দ্বিতীয় ধারাটাই ধীরে ধীরে মূলধারায় মিশে গিয়ে আজও কোনো না কোনোভাবে টিকে আছে, যদিও এর ভেতরের সেই বাঁকা হাসিটা আর নেই।
আসল কথা হলো, “হিপস্টার” শব্দটা যত জনপ্রিয় হলো, তত দ্রুত তার আসল অর্থ হারিয়ে গেল। যা একসময় ছিল প্রান্তিক আর নতুন কিছু করার চেষ্টা, সেটাই একসময় বিজ্ঞাপনের ভাষায় পরিণত হলো, আর তখনই আসল সংস্কৃতির সাথে তার দূরত্ব তৈরি হলো।
এই পুরো যুগের একরকম প্রতীকী শেষ হয় ২০১৪ সালে। একটা টিভি শোয়ে একটা ইন্ডি ব্যান্ডের পারফরম্যান্স ভাইরাল হয়ে যায়, যেখানে গায়কের তীব্র আবেগঘন উপস্থাপনা অনেকের কাছেই মনে হয় বাঁকা হাসির যুগের শেষ, আর আন্তরিকতার ফিরে আসা। এটা শুধু একটা পারফরম্যান্স ছিল না, বরং একটা মোড় ছিল, যেখানে গান আবার সরাসরি আবেগ প্রকাশের দিকে ফিরে যাচ্ছিল।
এই আলোচনা আজও চলে, কারণ “হিপস্টার” আসলে শুধু পোশাক বা গানের রুচির প্রশ্ন না। এটা একটা প্রজন্মের ভেতরে “কে খাঁটি, কে নকল” এই প্রশ্ন নিয়ে দ্বন্দ্ব। আর এই প্রশ্নটাই দেখিয়ে দেয়, যেকোনো প্রান্তিক সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে উঠলে কীভাবে নিজের ভেতরেই ভেঙে যায়। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও এই একই জিনিস ঘটছে, শুধু সময়টা আরও কমে এসেছে।
এই লেখাটি একটি সাংস্কৃতিক প্রবন্ধ, নির্দিষ্ট সময়কালের একটি সংস্কৃতি নিয়ে সহজ পরিচিতির জন্য তৈরি।
