জাতিসংঘের বাগানে স্যুট-টাই খুলে বল নিয়ে দৌড়ানো কূটনীতিকদের সেই ছবিটা যতটা আশাবাদী গল্প বলে, ২০২৬ বিশ্বকাপের বাস্তবতা ততটাই বলে দেয়, ভিসা নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধের রাজনীতির সামনে ফুটবলের নরম শক্তি কতটা অসহায়।
এ বছর বসন্তের এক ঝলমলে দিনে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাগানে একদল কূটনীতিক স্যুট-টাই খুলে জার্সি পরে বল নিয়ে নেমে পড়েছিলেন। ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ আর জাতিসংঘের বিশ্ব ফুটবল দিবস উপলক্ষে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে একটা প্রীতি ম্যাচ খেলেন। জার্মানির জাতিসংঘ প্রতিনিধি সে দিন বিয়ার আর সসেজ দিয়ে পার্টিও দিয়েছিলেন, আর অনেকেই সেদিন বলেছিলেন, খেলা নিজে যুদ্ধ থামাতে পারে না ঠিকই, কিন্তু মানুষে মানুষে সেতু গড়ার একটা অন্যরকম শক্তি তার আছে।
এই ধরনের “স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি” বা ক্রীড়া-কূটনীতি নতুন কিছু না। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে বরফ গলিয়েছিল যে “পিং-পং ডিপ্লোমেসি”, এটাকে তারই আধুনিক সংস্করণ বলা যায়, যদিও ধারণাটার বয়স আসলে প্রাচীন অলিম্পিকের সমান পুরনো। বিশেষজ্ঞরা একে বলেন “সফট পাওয়ার” বা নরম শক্তির একটা রূপ, যুক্তি বা জোর না খাটিয়ে প্রভাব বিস্তারের সেই পুরনো কৌশল। বিশ্বকাপ চলাকালীন জাতিসংঘের ডেলিগেটদের বসার ঘরেও তাই এখন খেলা দেখার আসর বসছে নিয়মিত।

কিন্তু এই নরম শক্তির চকচকে উপরিভাগের নিচে এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার সীমাবদ্ধতা। কানাডা, মেক্সিকো, আর যুক্তরাষ্ট্র মিলে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাই বেশি আলোচিত হচ্ছে, খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য ভিসা জটিলতা থেকে শুরু করে ফিফার নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল পর্যন্ত। বিশ্বজুড়ে সংঘাতের মাত্রা এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে, আর তার প্রভাব পড়েছে খেলার মাঠেও, একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, বয়কট, আর ভাষণের ওপর বাধানিষেধ। খেলাধুলাকে “রাজনীতিমুক্ত” রাখার যে পুরনো ভান, সেটার আবরণ এখন ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে।
অথচ এই বিশ্বকাপ ঘিরে বিনিয়োগের পেছনে যুক্তিটাই ছিল সুনাম বাড়ানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের আচরণেই আছে এক ধরনের স্ববিরোধিতা। নিউ জার্সিতে ফাইনালে ট্রফি তুলে দেওয়ার কথা তাঁর, অথচ টুর্নামেন্টের কোনো ম্যাচেই এখনো তাঁকে গ্যালারিতে দেখা যায়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচটাই হয়ে গেছে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা ফুটবল সম্প্রচার, গড়ে আড়াই কোটির বেশি দর্শক। এক সময়ের মার্কিন কংগ্রেসম্যান জ্যাক কেম্পের সেই পুরনো রসিকতা, যে আমেরিকান ফুটবল গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ আর সকার ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক খেলা, আজকের আমেরিকানদের কাছে হয়তো আর তেমন গ্রহণযোগ্য না।
একদিকে এই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক আসর, দল বেড়ে বত্রিশ থেকে আটচল্লিশ হয়েছে, প্রবাসী খেলোয়াড়ে ঠাসা অনেক দল। অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, এই আসরকেই করে তুলেছে সবচেয়ে বেশি বর্জনমূলক এক বিশ্বকাপ। মার্কিন স্বাধীনতার আড়াইশো বছর উদযাপনের সঙ্গে বিশ্বকাপ মিলিয়ে দেওয়াটা দেশটির জন্য নিজেকে জগতের সামনে মেলে ধরার এক অসাধারণ সুযোগ হতে পারত। কিন্তু বহু ভক্তের কাছে এই আসরের স্মৃতি হয়ে থাকবে ভিন্ন কিছু, ভিসা আর সীমান্ত-নীতির কঠোরতাই যাদের মূল অভিজ্ঞতা।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বারবার বলেন, ফুটবল পুরো পৃথিবীকে এক করে দেয়। ট্রাম্পকে বিতর্কিতভাবে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়াটা সম্ভবত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করানোর একটা কৌশল, যার ফল হয়েছে মিশ্র, নির্দিষ্ট কিছু দেশের খেলোয়াড় ও কাছের মানুষদের জন্য জামানত মাফ হলেও অনেক দর্শকই শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছেন খালি হাতে। এপ্রিলে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফার সম্মেলনে ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের ফুটবল কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতার একটা দৃশ্য তৈরির চেষ্টাও উলটো ফল দিয়েছিল, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা ইসরায়েলি প্রতিনিধির সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করায় দৃশ্যটাই হয়ে ওঠে সেই পুরনো সংঘাতের আরেক প্রতিচ্ছবি। ২০১৮ সালের পিয়ংচ্যাং শীতকালীন অলিম্পিকের আগে একীভূত কোরীয় দল গড়ার যে চেষ্টা হয়েছিল, তার পরিণতিও একই রকম হতাশাজনক ছিল, শেষ মুহূর্তে দলে যোগ করা উত্তর কোরীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নারী আইস হকি দল হেরেছিল সবকটা ম্যাচ, আর তরুণ দক্ষিণ কোরীয়রা একে দেখেছিল রাজনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবে।
রাষ্ট্র আর ক্রীড়া সংস্থাগুলো বারবার বলে, খেলা রাজনীতিমুক্ত থাকা উচিত। অথচ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিজেই তীব্র রাজনৈতিক এক ময়দান। রাশিয়া এই যুক্তি সবচেয়ে বেশি তোলে ইউক্রেন যুদ্ধ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে, আর কিছুটা সফলও হয়েছে সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাতে। অলিম্পিক আর টেনিসের গ্র্যান্ড স্লামে রুশ খেলোয়াড়রা এখনো নিরপেক্ষ পতাকার নিচে খেলতে পারেন। দাবা অলিম্পিয়াডে রাশিয়া ও বেলারুশের জাতীয় দল নিষিদ্ধ হলেও খেলোয়াড়রা এখনো ব্যক্তিগতভাবে দাবা ফেডারেশনের পতাকার নিচে খেলছেন। ইউরোভিশন থেকেও রাশিয়া নিষিদ্ধ। অথচ ইউক্রেন আক্রমণের পরও বিশ্বকাপ থেকে রাশিয়াকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয় কেবল তখনই, যখন বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ কাতার বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয়। যারা রাশিয়ার এই “রাজনীতিমুক্ত খেলা” দাবির সমালোচনা করেন, তাঁরা মনে করিয়ে দেন, সোচি শীতকালীন অলিম্পিকের সেনা সমাবেশকেই কাজে লাগিয়ে ক্রিমিয়া দখল করেছিলেন পুতিন, বেইজিং গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলাকালীন জর্জিয়ায় হামলা হয়েছিল, আর বেইজিং শীতকালীন অলিম্পিকের ঠিক পরপরই শুরু হয় ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন।
ক্রীড়া সংস্থাগুলো নিজেদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে দেখাতে পছন্দ করে, কারণ আয়োজনস্বত্ব, স্পনসরশিপ, আর বিস্তৃত দর্শকগোষ্ঠী ধরে রাখতে তাদের প্রয়োজন এই ভাবমূর্তি। কিন্তু কোনটা “রাজনৈতিক প্রতীক” আর কোনটা না, সেই সীমারেখা টানাটাই আসলে একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ইউক্রেনের স্কেলেটন রেসার ভ্লাদিস্লাভ হেরাসকেভিচকে এবারের শীতকালীন অলিম্পিক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি যুদ্ধে নিহত ইউক্রেনীয় ক্রীড়াবিদ ও কোচদের ছবি আঁকা হেলমেট খুলতে রাজি হননি। ২০২২ বিশ্বকাপে সাত ইউরোপীয় অধিনায়ক এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানাতে “ওয়ান লাভ” আর্মব্যান্ড পরার পরিকল্পনা করলে ফিফা জানিয়ে দেয়, সেটা পরলেই তাৎক্ষণিক হলুদ কার্ড।
এই বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর ঘটনাটাও অভূতপূর্ব, ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ শুরুর পর কোনো আয়োজক দেশ কখনো এভাবে অংশগ্রহণকারী কোনো দেশে সরাসরি সামরিক হামলা চালায়নি এত কাছাকাছি সময়ে। শীতল যুদ্ধের সময় পশ্চিম জার্মানির মাটিতে পূর্ব জার্মানির জয়ের মতো ঐতিহাসিক টানাপোড়েনের নজির আগেও ছিল ঠিকই, কিন্তু এবারের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গটা একেবারে অন্য মাত্রার। ইরানের বিপ্লব-পূর্ব পতাকা প্রদর্শনে ফিফা নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা কার্যকর হয়েছে ঢিলেঢালাভাবে। আবার তিজুয়ানায় নামার সময় ইরানি খেলোয়াড়রা যখন লাপেলে “১৬৮” সংখ্যা লেখা পিন পরেন, ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন হামলায় নিহত ইরানি স্কুলছাত্রীদের স্মরণে, ফিফা সেটাকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে গণ্যই করেনি। একই টুর্নামেন্টে কোনটা “রাজনীতি” আর কোনটা না, তার এই দ্বিচারিতাই বলে দেয় পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত কোনো আন্তর্জাতিক আসরের ধারণাটাই আসলে কতটা ঠুনকো।
ইরান দলের এবারের বিশ্বকাপ-যাত্রা তাই দীর্ঘদিন মনে থাকবে ভিন্ন কারণে। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার আগেই মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাদের দেশে অবস্থানের সময় সীমিত করে দেয়, কিছু কর্মীর ভিসাও আটকে দেয়, ফলে দলকে ঘাঁটি সরিয়ে নিতে হয় মেক্সিকোয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোরতার একটা বুমেরাং প্রভাবও দেখা গেছে অবশ্য, প্রতি ম্যাচের পর বিশ্রাম ছাড়াই উড়ে যাওয়ার প্রতিকূলতা তুলে ধরে ইরানি দল মেক্সিকোয় পেয়েছে বীরোচিত সংবর্ধনা, যা কিছুটা হলেও সমালোচনার মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে নিজেদের সরকারের দিক থেকে।
খেলোয়াড়রা তো রাজনীতিবিদ না, স্বভাবতই। স্পোর্টস ডিপ্লোমেসিকে এত অননুমেয় আর দেখার মতো আকর্ষণীয় করে তোলে ঠিক এই অনিশ্চয়তাটাই, একে আগে থেকে চিত্রনাট্যে বাঁধা যায় না। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটাও তো এসেছিল ঠিক এভাবেই, জেসি ওয়েন্স যখন চতুর্থ সোনার পদক নিতে মঞ্চে ওঠেন, একটা শব্দও না বলে নাৎসি মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
কোনো অসৎ উদ্দেশ্যের হাতে পড়লে স্পোর্টস ডিপ্লোমেসি অকার্যকর, এমনকি ক্ষতিকরও হয়ে উঠতে পারে ঠিকই। কিন্তু একই সঙ্গে এটা সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মুগ্ধতাও ছড়াতে পারে, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের দলের চিতাবাঘ-ছাপ স্যুট পরে আসার সেই উচ্ছ্বাস, কিংবা নরওয়ের ভক্তদের “ভাইকিং রো” যেভাবে স্টেডিয়াম ছাপিয়ে উত্তর আমেরিকার রাস্তায় নেমে এসেছে, তাতেই তা স্পষ্ট। তাই কঠোর শক্তির সামনে সাম্প্রতিক কোনো বড় জয় না পেলেও, স্পোর্টস ডিপ্লোমেসিকে এখনই অকেজো ঘোষণা করে দেওয়ার সময় বোধহয় এখনো আসেনি।
এই লেখাটি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ।
