ভিডিওটার দৈর্ঘ্য পাঁচ মিনিট ষোলো সেকেন্ড।
ঠাকুরগাঁওয়ের এক হাসপাতালের ভিডিও। চেয়ারে বসা এক কিশোরী, হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা, সামনে অনেকগুলো ক্যামেরা। কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে একটা গোডাউন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।
ক্যামেরা চালু হওয়ার ঠিক আগে ঘটে ছোট একটা ঘটনা ঘটেছিলো। পরিচিত এক সাংবাদিক ঠাট্টার সুরে কিছু একটা বললে আশপাশের কয়েকজন হেসে ওঠেন, আর তাদের দেখে মেয়েটিও হেসে ফেলে। হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। সাক্ষাৎকার তখনো শুরু হয় নাই।
‘বাংলা টিভি’ সেই হাসিটা তাদের প্রতিবেদনে ব্যবহার করেছে তিনবার। প্রথমবার ভিডিওর শুরুতে, তারপর মাঝখানে, শেষবার ক্লোজআপে। মুখ ঝাপসা করা হয় নাই। পরিবারের দুই সদস্যের মুখও না।
পরদিন এশিয়ান টেলিভিশন একই ফুটেজ দিয়ে প্রতিবেদন করল। শিরোনামে আছে ধর্ষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে কিশোরীর হেসে ফেলার কথা। ভয়েসওভারে জানানো হলো, কেউ কেউ বলছেন এই ধর্ষণে মেয়েটির সম্মতিই ছিল।
তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। ভিডিও সরানোর আগেই ইউটিউবে পনেরো লাখ ভিউ।
ফেসবুক পোস্টে তিন লাখ প্রতিক্রিয়া, সাঁইত্রিশ হাজার মন্তব্য। হাসির দৃশ্য ঘুরতে থাকল দুইশোর বেশি পোস্টে, ফেসবুক থেকে টিকটক পর্যন্ত।
কেউ কেউ মেয়েটির মুখের আদলে এআই দিয়ে ছবি বানাল। যার একটাতে ওড়না ছাড়া পুরো মুখ, যে মুখ কোনো ভিডিওতেই কখনো দেখা যায় নাই।
মানে একটা কাল্পনিক মুখ তৈরি করে সেটাকেই তার মুখ বলে চালানো হলো।
গ্রামবাসীর চাপে পরিবারকে বাসা ছাড়তে হলো। শহরের ভাড়া বাসা থেকেও বের করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে সেটা থামে।
আর যে প্রতিবেদক এই খবর পাঠিয়েছিলেন তিনি হাসপাতালে উপস্থিতই ছিলেন না। ফুটেজ নিয়েছিলেন উপস্থিত এক সাংবাদিকের কাছ থেকে।
ডিসমিসল্যাব জবাব চাইলে তিনি দায় দিলেন অফিসের ডিজিটাল বিভাগকে, “কাটছাঁট তো ওরা করবে, কাটছাঁট তো আর আমরা করি না।”
ডিজিটাল বিভাগ বলল, ক্লিপটা নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যাখ্যামূলক বার্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল, দুই সপ্তাহ পরেও সে বার্তা আসে নাই।
এই গল্পে দায় এমন একটা জিনিস, যেটা প্রতিবেদক থেকে ডেস্কে, ডেস্ক থেকে অ্যালগরিদমে ঘুরতে থাকে, কারও হাতে গিয়ে আর থামে না।
অথচ যমুনা টিভি, একাত্তর টেলিভিশন আর চ্যানেল ২৪-ও একই ঘটনা কভার করেছিল। কোথাও হাসির দৃশ্য নাই। পরিচয় ফাঁস হয় এমন এক সেকেন্ড ফুটেজও নাই।
কেউ বলতে পারতেন, বাজারের চাপে করতে হয়েছে। কিন্তু চাপটা তো সবার ঘাড়েই সমান ছিল। একই ফুটেজ, একই দিন, একই ভিউয়ের অঙ্ক। তিনটা চ্যানেল ওই দৃশ্যটা বাদ দিয়েছে, দুইটা তিনবার করে দেখিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের বিচার করতে গেলেই বোঝা যায়, ক্যামেরা আসলে কী করে। ক্যামেরা সহিংসতা রেকর্ড করে না। ক্যামেরা ঠিক করে দেয়, কোন সহিংসতা দেখা যাবে, আর কোনটা যাবে না।
➖
দুই হাজার তিন সালের মার্চে আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করে। সৈন্যদলের সঙ্গে ঢোকেন প্রায় ছয়শো সাংবাদিক।
ব্যবস্থাটা তাদের নিজেদের চাওয়া না, পেন্টাগনের বানানো। নাম এমবেডিং। সামরিক ইউনিটের সঙ্গে সাংবাদিককে জুড়ে দেওয়া, যাতে তিনি ওই ইউনিটের সঙ্গেই থাকেন, খান, ঘুমান, চলাফেরা করেন।
নকশাটা বানিয়েছিলেন ভিক্টোরিয়া ক্লার্ক, প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র। পেশাগত জীবনে তিনি জনসংযোগ নির্বাহী ছিলেন।
চুক্তির শর্ত পরিষ্কার ছিল। সাংবাদিক পাবেন সৈন্য আর অভিযানে পূর্ণ প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে উনিশ শ্রেণির তথ্য প্রকাশ করবেন না।
তালিকার শুরুটা যেমন হওয়ার কথা তেমনই। ইউনিটে ঠিক কতজন সৈন্য, কত ট্যাংক, ঘাঁটির নাম আর অবস্থান, ভবিষ্যৎ অভিযান, গোয়েন্দা কৌশল, কখন গুলি করা যাবে সেইসব নিয়ম। সবই যুদ্ধক্ষেত্রের নিরাপত্তার ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়।
তারপর তালিকাটা ধীরে ধীরে অন্য জায়গায় চলে যায়।
তালিকার একদম শেষ দুইটা ধারা এই দেশ থেকে পড়লে অন্যরকম শোনায়। আটক ব্যক্তির চেনা যায় এমন মুখ বা নামফলক দেখা যায়, এমন ছবি তোলাই যাবে না। হেফাজতে নেওয়ার দৃশ্য বা হেফাজতে থাকা মানুষের সাক্ষাৎকার, নিষিদ্ধ।
তবে সবচেয়ে বেশি কথা বলে যেটা তালিকায় নাই।
নিজেদের হতাহতের বেলায় দলিলের নিয়ম বিস্তারিত। পরিবারকে জানানোর আগে পরিচয় প্রকাশ নিষেধ, বাহাত্তর ঘণ্টার সময়সীমা, হাসপাতালে ঢুকতে চিকিৎসকের অনুমতি লাগবে, ছবি তুলতে হলে রোগীর নিজের সম্মতি, সেই সম্মতির সাক্ষী থাকবেন সঙ্গের এসকর্ট।
কিন্তু উনিশটা ধারার একটাতেও ইরাকি বেসামরিক মানুষের কথা নাই। তাদের ছবি তোলা যাবে কি যাবে না, নিহতদের গোনা যাবে কি যাবে না, দলিল একটা শব্দও সেই বিষয়ে খরচ করেনি। নিষেধও না, অনুমতিও না।
এই নীরবতা পর্দায় কীভাবে অনুবাদ হলো, তা মাপা হয়েছিল যুদ্ধ চলাকালে। আমেরিকার প্রজেক্ট ফর এক্সেলেন্স ইন জার্নালিজম প্রথম সপ্তাহের এমবেডেড টেলিভিশন প্রতিবেদনগুলি একটা একটা করে বিশ্লেষণ করে।
প্রথম ছয় দিনের তিন দিন, সাড়ে চল্লিশ ঘণ্টার সম্প্রচার, পাঁচটা নেটওয়ার্ক, একশো আটটা প্রতিবেদন। তার ভিতর থেকে দুইটা সংখ্যা।
এক, চুরানব্বই শতাংশ প্রতিবেদন ছিল “প্রাথমিকভাবে তথ্যনির্ভর।” মতামত নাই, বিশ্লেষণ নাই, প্রেক্ষাপট নাই। যা ঘটছে, তাই দেখানো হচ্ছে।
দুই, ওই একশো আটটার একটাতেও গুলিতে কোনো মানুষকে আঘাত পেতে দেখা যায়নি। একটাতেও না।
একটা বিপুল আগ্রাসন, শত শত ক্যামেরা, কিন্তু পর্দায় রক্ত নাই। কারণ ক্যামেরাগুলি ছিল যেদিক থেকে গুলি ছোড়া হয় সেই দিকে। যেদিকে গুলি গিয়ে লাগে, সেদিকে ক্যামেরা যাওয়ার কথা ছিল না।
এই আনুগত্য কোনো মিথ্যা দিয়ে বানানো হয় নাই। ট্যাংক সত্যিই আগাচ্ছিলো, সৈনিকরা সত্যিই ক্লান্ত ছিল, বালুঝড়ও সত্যিই উঠেছিল। প্রতিটা প্রতিবেদন সত্য, কিন্তু মিথ্যাটা রয়ে গেছিল ফ্রেমের বাইরে।
এখানে একটু গভীরভাবে তাকালেই সাংবাদিকতার সবচেয়ে পুরানা দাবিটা ভেঙে পড়ে। “আমরা মত দিই না, আমরা তথ্য দিই।”
কিন্তু তথ্য জিনিসটা মাটি থেকে তুলে আনা পাথর না। প্রতিটা প্রতিবেদন কিছু সিদ্ধান্তের সমষ্টি। কার সঙ্গে কথা বলা হলো, কার সঙ্গে হলো না। কোনটা প্রথম বাক্যে গেল, কোনটা চোদ্দ নম্বর অনুচ্ছেদে। ক্যামেরা কোথায় দাঁড়াল, আর কোন দিকে ঘুরল না।
ফলে বস্তুনিষ্ঠতা এখানে সততার নাম না, দায়মুক্তির নাম। মত থাকল, দায় থাকল না।
আসল প্রশ্নটা তাই কোনোদিনও এমন ছিল না, সাংবাদিকের মত থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্নটা ছিল, মতটা লেখার ভিতরে দৃশ্যমান থাকবে, নাকি ফ্রেমের বাইরে লুকানো থাকবে।
এই লেখাটা তাই খবরের সত্য-মিথ্যা নিয়ে না।
এটা একটা সহজ প্রশ্ন নিয়ে। প্রতিদিন যে সহিংসতার ছবিগুলি আমাদের সামনে আসে, সেগুলি কে বেছে দেয়, আর যেগুলি আসে না, সেগুলি কে সরিয়ে রাখে।
কারণ পছন্দটা এলোমেলো না। বাংলাদেশের পর্দায় কোন সহিংসতা বড় করে আসে, কোনটা এক লাইনে সারা হয়, কোনটা কোনোদিন আসেই না, এর ভিতরে একটা নিয়ম আছে। নিয়মটা লেখা নাই কোথাও, কিন্তু কাজ করে।
➖
ধরা যাক ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর, দশ মাসে জেলার নয় উপজেলায় কমপক্ষে সাড়ে তিনশো সংঘর্ষ। আহত সাত হাজারের বেশি, নিহত আট, দুইজনের কবজি কাটা পড়েছে। ইউএনও-ওসিসহ পুলিশও বাদ যায় নাই।
কারণের তালিকাটা পড়লে মনে হবে কেউ ঠাট্টা করছে। শশা চুরি, টিস্যু দেওয়া, ফুল ছেঁড়া, রান্নার ধোঁয়া পাশের ঘরে যাওয়া, ভাংতি টাকা, মায়ের লাশ দেখতে না দেওয়া।
কিন্তু এই ঠাট্টার নিচের জায়গাটা আদতে ঠাট্টা না। সংঘর্ষে অংশগ্রহণকারীরা মাথায় হেলমেট গায়ে লাইফ জ্যাকেট পরে নামে। সংঘর্ষপ্রবণ এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতে টেঁটা-বল্লম মজুত থাকে। প্রবাসীরা এটাকে গোষ্ঠীর ইজ্জতের লড়াই ধরে নিয়ে বিদেশ থেকে টাকাও পাঠান।
মানে এটা তাৎক্ষণিক রাগ না। এটা প্রস্তুতি, সরঞ্জাম আর অর্থায়নসহ একটা চলমান প্রতিষ্ঠান।
সেই প্রতিষ্ঠানের প্রচার বিভাগ কে চালায়?
আংশিক উত্তর, গ্রামবাসী নিজেরাই। মোবাইলে ভিডিও তুলে ফেসবুকে ছাড়ে। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়, প্রবাসীরা দেখে হতবাক হন, আর পরের দফায় টাকা পাঠান। প্রচারই এখানে তহবিল সংগ্রহ।
বাকি উত্তরটা সংবাদমাধ্যমের। ঢাকার চ্যানেলগুলির এই সংঘর্ষ কাভার করতে নিজের ক্যামেরা পাঠাতে হয় না। গ্রামের তোলা ফুটেজই যথেষ্ট। ছাপার সময় শুধু একটা লাইন বসে, “ছবি, ভিডিও থেকে নেওয়া।”
ছবিটা কে তুলল, কেন তুলল, তোলার সময় সে কোন পক্ষের লোক ছিল, এই লাইন তার কিছুই জানায় না। জানানোর দরকারও পড়ে না। ভিডিও ছিল, নেওয়া হয়েছে।
না-নেওয়ার কোনো কারণও অঙ্কে নাই। ইউটিউবে বাংলাদেশের দর্শকের হাজার ভিউয়ের দাম মোটামুটি আধা ডলার, মানে ষাট-সত্তর টাকা। এই দামে টিকতে হলে একটা প্রতিবেদনের জায়গায় দশটা ক্লিপ লাগে, আর দশটা ক্লিপের সস্তা জোগান যে ফুটেজ নিজে থেকে আসে।
সংঘর্ষের ফুটেজ নিজে থেকে আসে।
ভিডিওটা অবশ্য চ্যানেলের পাতা থেকে একসময় নেমে যায়। গ্রাম থেকে নামে না। মামলা, গ্রেপ্তার, হাজিরা, পাল্টা হামলার ভয়। ঢাকার ডেস্কে যেটা ছিল এক দিনের কনটেন্ট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেটা পরের সংঘর্ষের উস্কানি, আদালতের খরচ, আর ঘরছাড়া পরিবারের তালিকা।
ভিউয়ের টাকাটা ঢাকায় জমা হয়, বাকি সবকিছু জমা হয় গ্রামের খাতায়।
আর একবার ফুটেজ তৈরি হয়ে গেলে সেটার মালিকানা কারও থাকে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক স্থানীয় সংঘর্ষের ভিডিও এই জুনেই ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরেছে “রামমন্দিরে বাধা দেওয়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হিন্দুদের শোডাউন” দাবিতে, ফ্যাক্টওয়াচকে আলাদা করে প্রমাণ করতে হয়েছে দাবিটা মিথ্যা।
একই মারামারি, কিন্তু তিনরকম বাজার। গ্রামে ইজ্জত, ঢাকায় ভিউ, সীমান্তের ওপারে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা।
➖
ঢাকা কলেজ আর সিটি কলেজের বেলায় ব্যাপারটা আরও দেখার মতো, কারণ এখানে ফুটেজের কারখানা রাজধানীর মাঝখানে, সব ক্যামেরার নাগালের ভিতরে।
তারিখগুলি পাশাপাশি রাখা যাক। চব্বিশের নভেম্বরে সায়েন্সল্যাবে বাস ভাঙচুরের অভিযোগে সংঘর্ষ, আহত অন্তত পনেরো।
পঁচিশের এপ্রিলে এক সহপাঠীকে মারধরের জেরে তিন ঘণ্টার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া আর ইটপাটকেল। অথচ সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেল, আগের দিন যারা মেরেছিল তাদের গায়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকই ছিল না।
পুরা যুদ্ধটা দাঁড়িয়ে ছিল একটা ভুল শনাক্তির উপর।
তারপর আগস্টে আবার। ডিএমপির উপকমিশনার সাংবাদিকদের বললেন, এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, ছোটখাটো বিষয় থেকেও উত্তেজনা তৈরি হয়, এবার তারা মূল কারণটা খুঁজে বের করতে চান।
কারণটা খুঁজতে অবশ্য একটা পুরানা বিদেশি বই কাজে লাগে।
উনিশশো বাহাত্তরে সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন দেখান, চৌষট্টি সালে ইংল্যান্ডের সমুদ্রতীরে মডস আর রকারস নামের দুই তরুণ দলের এক মামুলি হাতাহাতিকে পত্রিকাগুলি এমন মহাযুদ্ধ বানিয়ে ছেপেছিল যে পরের ছুটির দিনগুলিতে দুই দলই খবরে পড়া নিজেদের চরিত্রে অভিনয় করতে মাঠে নেমে যায়।
খবর ঘটনাকে অনুসরণ করেনি। ঘটনা খবরকে অনুসরণ করেছে।
ঢাকা কলেজ-সিটি কলেজ শব্দজোড়াও এখন একটা তৈরি চিত্রনাট্য। প্রতিটা নতুন ব্যাচ ভর্তি হয়েই উত্তরাধিকার হিসাবে পায় একটা শত্রু, একটা রণক্ষেত্রের নাম, আর ইউটিউবে আগের পর্বগুলির আর্কাইভ।
সংঘর্ষের দিন খবরে আলাদা করে লেখা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যেন ছড়িয়ে পড়াটাই ম্যাচের স্কোর।
➖
ক্যামেরা আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক সবচেয়ে খোলামেলা ধরা পড়ে অন্য এক জায়গায়।
এই মে মাসে সময় টিভির ইউটিউবে একটা ভিডিওর শিরোনাম ছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গান গেয়ে ছদ্মবেশে পুলিশের অভিযান, সাত মাদকসেবী গ্রেপ্তার।
দ্বিতীয়বার পড়লে অসংগতিটা চোখে পড়ে। ছদ্মবেশী অভিযানে টেলিভিশনের ক্যামেরা ঢুকল কীভাবে?
ছদ্মবেশ যদি সত্যি হয়, ক্যামেরা থাকার কথা না। আর ক্যামেরা যদি আগে থেকেই থাকে, তাহলে ছদ্মবেশটা অভিযানের প্রয়োজনে না, ফুটেজের প্রয়োজনে। পুলিশ তখন অভিনয় করছে পুলিশের চরিত্রে, আর সাংবাদিক সেখানে দর্শক না, প্রযোজনা সহকারী।
এই সহযোগিতার শর্তটা কী, সেটাও এখানে দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে সেখানে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হলেন দুই সাংবাদিক, বাংলানিউজের তোফায়েল আহমেদ আর আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদ রিপন, সঙ্গে কয়েকজন সাধারণ দর্শনার্থী।
ভিডিওতে দেখা গেল, একদল পুলিশ তোফায়েলকে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটাচ্ছে। চার পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার হলো।
একই বাহিনী, একই উদ্যান, একই অভিযান। ক্যামেরা যতক্ষণ কাঁধের পাশে, ততক্ষণ সহযোগী। ক্যামেরা মুখোমুখি দাঁড়ালেই লাঠি।
চব্বিশের জুলাইয়ের কথাও এখানে টানা দরকার। অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে তুলে নেওয়া হয়েছিলো ডিবি কার্যালয়ে। সেখান থেকে টেলিভিশনে প্রচারিত হলো তাদের আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা, খাবার টেবিলে বসা অবস্থায়।
মুক্তির পর ছয়জন যৌথ বিবৃতিতে জানালেন, জোর করে খাবার টেবিলে বসিয়ে ভিডিও করা হয়েছে, মিথ্যা বিবৃতি দেওয়ানো হয়েছে। সেই টেবিলে বসানোর আগে তারা ডিবি হেফাজতেই অনশন করছিলেন। আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক তখনই বলেছিলেন, এটা তো সামরিক শাসন স্টাইল।
দেশের প্রতিটা চ্যানেল সেই ভিডিও বার্তা প্রচার করেছিল। খবর হিসাবে, মতামত ছাড়া।
দুই বছর পর, ট্রাইব্যুনালে সেই দিনগুলির একটা ফোনালাপ বাজানো হয়। চব্বিশের একত্রিশে জুলাই ওবায়দুল কাদের ফোন করেছিলেন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদকে। তিনি বিরক্ত, হেফাজতে থাকা ছয়জনের খাবার টেবিলের ছবি প্রকাশ করা হলো কেন, “ছবিটা নিজের কাছে রেখে দিতা।”
হারুনের জবাব, ছবি তোলা আর প্রকাশ, দুইটাই হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর এসবিপ্রধানের নির্দেশে।
অর্থাৎ যে ছবিগুলি সেদিন সংবাদ হিসাবে প্রচারিত হয়েছিল, তার চিত্রগ্রাহক রাষ্ট্র, সম্পাদক মন্ত্রণালয়, আর বিতরণ বিভাগ দেশের গণমাধ্যম। এমবেডেড জার্নালিজম বোঝাতে ইরাক পর্যন্ত যাওয়ার দরকার হয় না, মিন্টো রোডই যথেষ্ট।
এই বন্দোবস্তের পুরানা নজিরও আছে, এবং সেটা আরও রক্তাক্ত। ক্রসফায়ার শব্দটা রাষ্ট্রের আবিষ্কার না।
অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, র্যাবের জন্মের পর শব্দটাকে জনপ্রিয় করেছিল গণমাধ্যমই, পরে সেটাই দাঁড়িয়ে যায় বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝানোর সর্বজনীন ভাষা হিসাবে। বাহিনীর প্রেস রিলিজ হুবহু ছাপা হতো, বছরের পর বছর, মতামত ছাড়া।
ওই কোরিওগ্রাফিটা তখনই ধরে ফেলেছিলেন এক ব্লগার। সন্দেহভাজনকে যখন সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়, তার গায়ে থাকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট। আর যখন তাকে সহযোগীদের ধরার নামে রাতের অভিযানে নেওয়া হয়, তখন সেই ভেস্ট থাকে না।
ক্যামেরার সামনের দৃশ্য আর ক্যামেরা নিভে যাওয়ার পরের দৃশ্য, দুইটাই একই নাটকের অঙ্ক। শুধু দর্শক আলাদা।
➖
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা চলছে গাজায়, যেখানে যুক্তিটা তার শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে।
ইরাকে পেন্টাগন সাংবাদিকদের ভিতরে ঢুকিয়েছিল, শর্তসাপেক্ষে। ইসরায়েল সে ঝামেলাতেও যায় নাই। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাইরের কোনো সাংবাদিককে স্বাধীনভাবে গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয় নাই।
ঢোকার একমাত্র পথ সেনাবাহিনীর এসকর্টে কয়েক ঘণ্টার সফর, সূচি সেনাবাহিনীর ঠিক করা, আর সেখানে সাংবাদিকরা কোনো ফিলিস্তিনির সঙ্গে কথা বলতে পারেন না।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এই সফরগুলির নাম দিয়েছে এক শব্দে, থিয়েটার। সংস্থাটির পর্যালোচনায় ইসরায়েলের পদ্ধতির তুলনা এসেছে মিয়ানমার, পশ্চিম পাপুয়া আর রাশিয়ার সঙ্গে, এবং তাদের ভাষ্য, এটা এমবেডিংয়ের আন্তর্জাতিক মানও পূরণ করে না।
ভিতরে যারা আছেন, তাদের হিসাব আলাদা খাতায়। সিপিজের যাচাইকৃত গণনায় এই জুন পর্যন্ত গাজায় ও ইসরায়েলি বন্দিশালায় নিহত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা দুইশো নয়, অন্যান্য গণনায় আরও বেশি।
সিপিজে বলছে, বিরানব্বই সালে তথ্য রাখা শুরুর পর থেকে আর কোনো বাহিনীর হাতে এত সাংবাদিক মারা যাননি, এবং একটা ঘটনাতেও ইসরায়েলি ফৌজদারি তদন্ত হয়নি।
কেন এই বন্দোবস্ত, তা বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য ব্যুরো প্রধান জো ফ্লোটো এক লাইনে বলেছেন। আমরা সবাই জানি কেন আমাদের ঢুকতে দেওয়া হয় না, ভিতরে ঢুকলে আমাদের রিপোর্টের ধাক্কাটা অনেক বড় হতো।
ইরাকে কৌশল ছিল ক্যামেরাকে নিজের কাঁধে বসানো। গাজায় কৌশল হলো নিজেরটা ছাড়া বাকি সব ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া, দরকারে চিরতরে। লক্ষ্য এক, ফ্রেমের একচেটিয়া মালিকানা।
➖
এতদূর এসে একটা অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করা দরকার, নইলে হিসাবটা মিলবে না।
গত বছরের নয়ই জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে জনসমক্ষে পিটিয়ে, পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়।
খুনিরা লাশের উপর লাফিয়েছে, আর সেই দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরেই দেশ জুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়, গ্রেপ্তার শুরু হয়। ভিডিওটা না থাকলে সোহাগ হত্যা থানার খাতার একটা লাইন হয়ে মিলিয়ে যেত।
মানে যে ক্যামেরা ঠাকুরগাঁওয়ের কিশোরীর হাসিকে পণ্য বানায়, সেই একই যন্ত্র মাঝে মাঝে একমাত্র সাক্ষীর কাজটাও করে।
এবং যারা এই ক্যামেরা চালান, তারা নিজেরাও নিরাপদ না। এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই এই দেশে তিনশো তিরাশি জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
ক্যামেরা তাই নিজে ভালো বা মন্দ কিছু না। প্রশ্ন হলো, তাকে কে কোন দিকে তাক করছে, আর না-তাক-করার সিদ্ধান্তগুলি কে নিচ্ছে।
সেই সিদ্ধান্তের হিসাব চাওয়ার একটা বন্দোবস্ত যদিও এই দেশের আইনে লেখা আছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের চৌদ্দ ধারা বলছে, নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ পায় এমন কোনো তথ্য বা ছবি কোনো মাধ্যমে ছাপা যাবে না। শাস্তি দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, বা এক লাখ টাকা জরিমানা, বা দুইটাই।
একুশ সালে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভুক্তভোগী জীবিত হোক বা মৃত, কোনো অবস্থাতেই না। পঁচিশের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশুটির ছবি সরাতে আদালতকে স্বপ্রণোদিত আদেশ দিতে হয়েছে।
আইন আছে, রায় আছে, আদেশ আছে। এবং তার পরেও, এই মে মাসে, পল্লবীতে নিহত শিশুটির ছবি ও পরিচয় ছেপেছে দেশের একাধিক শীর্ষ সংবাদমাধ্যম।
ওই ধারায় কোনো সম্পাদক কোনোদিন জেলে গেছেন, এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায় না।
➖
ঠাকুরগাঁওয়ে ফেরা যাক।
আঠারোই জুন বাংলা টিভি ভিডিওটা সরিয়ে ফেলে। ততদিনে পনেরো লাখ মানুষ দেখে ফেলেছে। ফেসবুকের মূল পোস্টটা থেকে যায়, তিন লাখ প্রতিক্রিয়াসহ। প্রথম একশো মন্তব্যের একান্নটাই ছিল মেয়েটার হাসি নিয়ে।
এশিয়ান টেলিভিশনের ডিজিটাল ইনচার্জের কাছে ডিসমিসল্যাব জানতে চেয়েছিল, হাসির দৃশ্যটাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হলো কেন। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, ধর্ষণের ভুক্তভোগীকে তো সাধারণত কষ্টে থাকতে দেখা যায়, এই ফুটেজ ছিল ব্যতিক্রম।
ব্যাখ্যাটা মন দিয়ে শোনার মতো, কারণ এখানে সিদ্ধান্তটা নিজেই কথা বলে। ভুক্তভোগীকে দেখতে কেমন হওয়া উচিত, নিউজরুমের মাথায় সেই ছবিটা আগে থেকেই আঁকা ছিল। মেয়েটা সেই ছবির সঙ্গে মেলেনি।
তখন নিউজরুম নিজের ছবিটা সংশোধন করেনি। মেয়েটাকে সংশোধন করেছে। তিনবার হাসি দেখিয়ে, একবার ক্লোজআপে, যতক্ষণ না দেশের মানুষ বিশ্বাস করেছে দোষটা তারই।
ইরাকের মরুভূমি থেকে মিন্টো রোডের খাবার টেবিল হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ওই হাসপাতাল পর্যন্ত কাজ একটাই। বাস্তবতা যখন আগে থেকে ঠিক করে রাখা চিত্রনাট্যের সঙ্গে মেলে না, ক্যামেরা বাস্তবতাকে কেটে চিত্রনাট্যের মাপে এনে ফেলে।
এই কাটাকাটিটাই এখন খবর নামে চলে, মতামতহীনতার সনদ হাতে নিয়ে। কোনো মিথ্যা বলতে হয় না, কারও উপর দোষ চাপাতে হয় না, ফলে দায়ও কারও ঘাড়ে বসে না। ছবি ছিল, দেখানো হয়েছে।
কাটাকাটিটা প্রতিবার একই দিকে হয়, এটাই আসল কথা। যার হাতে বাহিনী আছে, তহবিল আছে, লাইসেন্স আছে, সে ফ্রেমের বাইরে দাঁড়িয়ে ফ্রেমটা সাজায়। যার কিছুই নাই, তার মুখ ক্লোজআপে যায়।
খরচটাও তাই একই দিকে। সাড়ে তিনশো সংঘর্ষের ফুটেজ যত ভাইরালই হোক, বিলটা শোধ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আহত সাত হাজার মানুষ। ছয়শো এমবেডের রিপোর্ট যত সত্যই হোক, দামটা গুনেছে ফ্রেমের বাইরে থাকা ইরাকিরা, যাদের কথা ওই উনিশ ধারার একটাতেও ছিল না।
কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটা চ্যানেল দেখিয়ে গেছে, কাটাকাটিটা নিয়তি না, সিদ্ধান্ত। আর যা সিদ্ধান্ত, তার একজন সিদ্ধান্তদাতা আছে, তার নাম-ঠিকানা আছে, তার কাছে হিসাব চাওয়া যায়।
প্রতিটা ছবির সঙ্গে একটা অদৃশ্য ছবি থাকে, যেটা কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। দর্শক হিসাবে আমাদের কাজ ওই কাটা অংশটার খোঁজ করা।