এডওয়ার্ড সাইদ, ইকবাল আহমেদ, এবং যে চিন্তা একাত্তর থেকে গাজা পর্যন্ত হেঁটে আসলো

উনিশশো একাত্তরের সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকস একটা খোলা চিঠি ছাপে।

চিঠির লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি মামলার আসামি। অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে তিনি অপহরণের ষড়যন্ত্র করেছেন।

এরকম ভয়ংকর মামলায় বিচারাধীন একজন আসামির পক্ষে সেই মুহূর্তে সবচেয়ে অবিবেচকের কাজ ছিল, নতুন করে কোনো রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়া।

কিন্তু তিনি সেটাই হলেন।

চিঠিটা তিনি লিখলেন নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের নাম পাকিস্তান, চিঠির বিষয় পূর্ব বাংলা।

লেখকের নাম ইকবাল আহমেদ।

তিনি বিহারের মুহাজির। সাতচল্লিশে কিশোর বয়সে বড় ভাইয়ের সঙ্গে পায়ে হেঁটে দেশভাগের রক্তাক্ত পথ পার হয়ে লাহোরে পৌঁছেছিলেন।

স্বজনদের অনেকে গিয়ে উঠেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে, এবং একাত্তরের মার্চের আগের অস্থির সপ্তাহগুলোতে, চিঠিতে তিনি নিজেই লিখছেন, বাঙালি জনতার হাতে তাদের কয়েকজন নিহত হন।

শেখ মুজিবের প্রতিও তার কোনো টান ছিল না। তার মূল্যায়নে মুজিব সীমিত, হঠকারী, কল্পনাশক্তিহীন।

রক্ত, স্মৃতি ও রাজনীতি, তিন দিক থেকেই তার দাঁড়ানোর কথা ছিল ইয়াহিয়ার পাশে। তিনি উল্টো দিকে দাঁড়ালেন।

বিহারি নিধনের কথা চিঠিতে অকপটে স্বীকার করলেন, আওয়ামী লীগের দায়িত্বহীনতাও ছাড় পেলো না। তারপর লিখলেন সেই বাক্যগুলো, যার ভার আজও আমরা বহন করি।

উত্তেজিত জনতার সহিংসতা আর একটা সংগঠিত পেশাদার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ এক পাল্লায় ওঠে না।

অপরাধ কোনো বেচাকেনার জিনিস না, একজনের অপরাধ আরেকজনের নামে জমা দেওয়া যায় না।

সাতই অক্টোবরের পরের পৃথিবীতে যত তর্ক উঠেছে, “কিন্তু তারাই তো শুরু করেছিল” প্রশ্নের যত সংস্করণ ঘুরেছে, তার মীমাংসা এই এক অনুচ্ছেদে বাহান্ন বছর আগে লেখা হয়ে আছে।

লেখা হয়েছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। লিখেছিলেন একজন পশ্চিম পাকিস্তানি।

চিঠি শেষ হয়েছিল একটা স্বীকারোক্তিতে।

আমাদের প্রতিবাদে হয়তো কিছুই বদলাবে না, তিনি লিখেছিলেন, কিন্তু সাফল্যের অভাব নীরবতার অপরাধকে জায়েজ করে না।

➖

ইকবাল আহমেদের জীবন বিশ শতকের উপনিবেশবিরোধী ইতিহাসের একটা চলমান মানচিত্র।

বিহারের ইরকি গ্রামে জন্ম, ভূমি-বিরোধে বাবা খুন হয়েছিলেন তার শিশুচোখের সামনে। দেশভাগ, লাহোর, তারপর বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা, প্রিন্সটনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডক্টরেট।

গবেষণার সূত্রে উত্তর আফ্রিকায় গিয়ে তিনি যুক্ত হলেন আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধে, ফ্রানৎস ফানোঁর সহযোদ্ধা হিসেবে।

স্বাধীন আলজেরিয়ার প্রথম সরকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, ক্ষমতার আসন আর স্বাধীন চিন্তার আসনের মধ্যে বাছতে বললে তিনি আজীবন দ্বিতীয়টি বেছেছেন।

আমেরিকায় ফিরে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রথম সারির বিরোধীদের একজন, সেই সূত্রেই হ্যারিসবার্গের মামলা, যেখান থেকে বাহাত্তরে তিনি অব্যাহতি পান।

আর সাতষট্টির যুদ্ধের পরের বছর শিকাগোতে বন্ধু ইব্রাহিম আবু-লুগদ তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ সাহিত্য-অধ্যাপকের, জেরুজালেমে যার জন্ম।

এডওয়ার্ড সাঈদ।

তিরিশ বছরের বন্ধুত্ব। সাঈদ পরে লিখেছেন, তার বৌদ্ধিক গঠনে গভীরতম দুই প্রভাবের একজন ইকবাল, ‘কালচার অ্যান্ড ইম্পিরিয়ালিজম’ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন এই বন্ধুকেই।

দুজনের জীবনের গোড়ায় একই ক্ষত, উপনিবেশের হাতে ঘরহারা হওয়া, সাঈদের বেলায় আটচল্লিশের ফিলিস্তিন, ইকবালের বেলায় সাতচল্লিশের ভারত।

এবং দুজনের প্রকল্প ছিল একটাই, দুই প্রান্ত থেকে।

ইকবাল দেখাতেন সাম্রাজ্য কী করে। সাঈদ দেখাতেন সাম্রাজ্য কীভাবে নিজের কৃতকর্মকে বলার অযোগ্য করে রাখে।

➖

ওরিয়েন্টালিজম নিয়ে বাংলায় যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। সাঈদের যে প্রবন্ধটি আজকের প্রশ্নের জন্য অনেক বেশি ধারালো, সেটি ওই তুলনায় অপঠিত।

প্রবন্ধটির নাম ‘পারমিশন টু ন্যারেট’, বর্ণনার অনুমতি।

প্রেক্ষাপট বিরাশির লেবানন আক্রমণ ও সাবরা-শাতিলার গণহত্যা। যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর ছোড়া আলোকবাতির নিচে ফালাঞ্জিস্ট মিলিশিয়া দুই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে হত্যা করেছিল।

সাঈদ শুরু করেছেন একটা ধাঁধা দিয়ে।

ধাঁধাটা হলো, প্রমাণের কোনো অভাব ছিল না। আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের কমিশন প্রতিবেদন দিয়েছে, সাংবাদিকেরা ধ্বংসস্তূপ নিজের চোখে দেখেছেন। তবু কিছুই দাঁড়ালো না।

তার ব্যাখ্যা, পশ্চিমে একটা ব্যবস্থা চালু আছে, যার কাজ দুটো।

ইসরায়েলকে অস্বস্তিতে ফেলে এমন তথ্য এড়িয়ে যাওয়া, আর যারা তবু বলার চেষ্টা করে তাদের শাস্তি দেওয়া।

এখান থেকে তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, তা হলো, তথ্য নিজে নিজে গল্প হয় না। গল্প হতে হলে কারও না কারও অনুমতি লাগে, এবং সেই অনুমতি সবাই পায় না।

ফিলিস্তিনিদের সমস্যা কোনোদিন প্রমাণের অভাব ছিল না। সমস্যা ছিল, তাদের প্রমাণ শোনার মতো কান পৃথিবীতে তৈরি হয় নাই।

সাঈদের ওজন এখানেই যে তিনি কেবল প্রতিপক্ষের সমালোচক ছিলেন না।

তিরানব্বইয়ে হোয়াইট হাউসের লনে আরাফাত-রাবিনের করমর্দনে যখন পৃথিবী উদ্বেল, সাঈদ প্রায় একা লিখলেন, ওসলো চুক্তি ফিলিস্তিনি আত্মসমর্পণের দলিল, এক ফিলিস্তিনি ভার্সাই।

চুক্তিতে রাষ্ট্র নাই, সার্বভৌমত্ব নাই, ফেরার অধিকার নাই, আছে দখলদারির প্রশাসনিক ভার দখলকৃতের কাঁধে চাপানোর বন্দোবস্ত।

এই অবস্থানের মূল্য দিতে হয়েছিল আরাফাতের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে। তিন দশক পরে পশ্চিম তীরের মানচিত্রে তার ভবিষ্যদ্বাণীর নির্ভুলতা মাপা যায়।

➖

উনিশশো আটানব্বইয়ের ১২ অক্টোবর কলোরাডোর বোল্ডারে ইকবাল আহমেদ একটা বক্তৃতা দেন, যার শিরোনাম পরে তার সবচেয়ে পরিচিত বইয়ের নাম হয়ে দাঁড়ায়।

‘টেররিজম: দেয়ার্স অ্যান্ড আওয়ার্স’। ওদের সন্ত্রাস, আমাদের সন্ত্রাস।

বক্তৃতার ভিত্তি একটা শ্রমসাধ্য পাঠ। সন্ত্রাসবাদ-বিষয়ক অন্তত বিশটি মার্কিন সরকারি দলিল তিনি খুঁটিয়ে পড়েছেন, একটিতেও শব্দটির সংজ্ঞা নাই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ শুলজের সাত পৃষ্ঠার ভাষণে সংজ্ঞার জায়গায় কেবল আবেগ। সন্ত্রাস আধুনিক বর্বরতা, সন্ত্রাস পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি হুমকি, ইত্যাদি।

ইকবালের সিদ্ধান্ত, এই সংজ্ঞাহীনতা অক্ষমতা় না, নকশা। সংজ্ঞা দিলে সামঞ্জস্য রাখতে হয়, আর সামঞ্জস্য রাখলে মিত্রের কৃতকর্মকেও একই নামে ডাকতে হয়।

এরপর তিনি হিসাবের খাতা খোলেন।

সন্ত্রাসের পাঁচ প্রকার। রাষ্ট্রের, ধর্মের, অপরাধীর, বিকারগ্রস্তের, রাজনৈতিক গোষ্ঠীর।

প্রাণহানির হিসাবে শীর্ষে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, বিপুল ব্যবধানে, জিয়াউল হক বা পিনোশে ঘরানার শাসকের হাতে নিহতের সংখ্যার পাশে পিএলও-ঘরানার সংগঠনের হিসাব রাখলে অনুপাত দাঁড়ায় লাখে একের কাছাকাছি।

অথচ পৃথিবীর সমস্ত আলো, সমস্ত আইন, সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র বরাদ্দ থাকে তালিকার সবচেয়ে ছোট অংশের জন্য।

বক্তৃতার শেষে তিনি একটা ব্যক্তিগত গল্প বলেন। ছিয়াশি সালে পেশোয়ারে তিনি এক সৌদি ধনকুবেরের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

লোকটা তখন সিআইএ-র টাকায় আফগান জিহাদের জন্য আরব তরুণ জোগাড় করছে, এবং রেগান সেই মুজাহিদদের বলছেন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের নৈতিক সমতুল্য।

সাক্ষাৎকারদাতার নাম ওসামা বিন লাদেন।

বক্তৃতার মাত্র দুই মাস আগে সেই লোককে মারতে ক্লিনটন আফগানিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছেন। ইকবালের কথা, গতকালের সন্ত্রাসী আজকের বীর, আজকের বীর আগামীকালের সন্ত্রাসী।

বক্তৃতার শেষে আমেরিকার জন্য কয়েকটা পরামর্শ ছিলো।

দ্বৈত মানদণ্ড ছাড়ুন। গোপন অভিযান বন্ধ করুন, ওই কারখানাতেই সন্ত্রাস আর মাদক তৈরি হয়। সামরিক সমাধান খুঁজবেন না, সন্ত্রাস রাজনৈতিক সমস্যা, সমাধানও রাজনৈতিক।

আন্তর্জাতিক আইনকে শক্ত করুন, বিন লাদেনের বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকলে আন্তর্জাতিক আদালতে যান, পরোয়ানা নিন, তারপর ধরুন।

লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, এর একটাও নৈতিক আবেদন না। প্রতিটাই কার্যকারণের দাবি।

তিনি বলছেন না, এটা অন্যায়। বলছেন, এটা কাজ করবে না, এবং কেন করবে না।

সাত মাস পরে, নিরানব্বইয়ের মে মাসে, ইসলামাবাদে ক্যানসারে ইকবাল আহমেদের মৃত্যু হয়।

তার তিন বছর পরে টুইন টাওয়ার ধসে পড়ে, আর আমেরিকা তার বলা তালিকা ধরে ধরে ঠিক উল্টো রাস্তায় আগায়।

সংজ্ঞাহীন শত্রুর বিরুদ্ধে সীমানাহীন যুদ্ধ, আদালতের বদলে ড্রোন, আইনের বদলে গুয়ান্তানামো, আর আফগানিস্তানে আবার সেই গোপন অভিযান, যেটা আগেরবার বিন লাদেনকে তৈরি করেছিলো।

হিসাবনিকাশের শেষ অংশ লেখা হয়েছে ট্রিলিয়ন ডলারে আর লক্ষাধিক মৃত্যুতে।

ফলে ইকবাল আহমেদের যুক্তিটা ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না, ছিল একটা রোগনির্ণয়। ভুলটা কৌশলের না, রোগ চেনার।

সাঈদ ওইসময় লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত।

তবু নাইন-ইলেভেনের ছয় সপ্তাহের মাথায় দ্য নেশন পত্রিকায় তিনি লেখেন জীবনের শেষ বড় পলেমিক, ‘দ্য ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’, হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের জবাব।

সভ্যতা কোনো সিলমোহর করা পাত্র না, ইতিহাস কেবল যুদ্ধের না, বিনিময় ও সংকরায়ণেরও। দুই বছর পরে, ইরাক আক্রমণের ছয় মাসের মাথায়, তারও প্রয়াণ হলো।

যে দুজন এই চিন্তার স্থপতি, তারা বিদায় নিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তাদের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে তীব্র।

➖

কিন্তু চিন্তা ব্যক্তির সঙ্গে মরে না। ওয়ার অন টেররের দুই দশকে ওই শূন্য আসনে বসা দুইটা বইয়ের কথা আমরা বলতে পারি।

দুই হাজার চারে কলাম্বিয়ারই অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি লিখলেন ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’।

বইয়ের কেন্দ্রে একটা ধারণা, তিনি যার নাম দিয়েছেন কালচার টক। রাজনৈতিক সংঘাতকে সংস্কৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করার অভ্যাস, যেন সমস্যাটা ওদের ধর্মে, ওদের মজ্জায়।

মাহমুদ মামদানি দেখালেন, ভালো আর খারাপ মুসলিমের ভাগটা ধর্মের না, আনুগত্যের।

ভালো মুসলিম মানে আমাদের পক্ষের মুসলিম। যে মুসলিম গতকাল সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়েছে সে ভালো, সে-ই আজকে আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়লে খারাপ।

আর সন্ত্রাসকে সংস্কৃতির দোষ বলার একটা সুবিধা আছে। তাহলে আর জিজ্ঞেস করতে হয় না, এতদিন আমরা কী করেছি।

আফগান জিহাদে সিআইএ-র টাকা তখন আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

এটাই মাহমুদ মামদানির মূল কথা। ওদের ধর্মটাই এমন, এই এক কথা বললে আর কোনো প্রশ্ন করতে হয় না। কে অস্ত্র দিয়েছিল, কে টাকা দিয়েছিল, কে এদের বানিয়েছিল, কিছুই না।

একই বছর দার্শনিক জুডিথ বাটলার লিখলেন ‘প্রিকেরিয়াস লাইফ’, পরে ‘ফ্রেমস অব ওয়ার’। তার প্রশ্ন আরও মৌলিক, কার মৃত্যু শোকের যোগ্য?

যুদ্ধ জনসংখ্যাকে দুই ভাগে ভাগ করে। যাদের জন্য শোক করা যায়, আর যাদের জন্য শোকের প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তাদের জীবনকে কখনো পূর্ণ জীবন বলে গণনাই করা হয় নাই।

পশ্চিমা সংবাদপত্রে নিহত ইসরায়েলির নাম থাকে, মুখ থাকে, শৈশব থাকে। নিহত ফিলিস্তিনি থাকে সংখ্যায়।

বাটলার এই ব্যবধানের নাম দিলেন ‘শোকযোগ্যতা’। সাঈদ দেখিয়েছিলেন বর্ণনার অনুমতি লাগে, বাটলার দেখালেন, শোকেরও।

এবং এই দশকেই, প্রায় নিঃশব্দে, পুরা আলোচনার ভিত্তিভূমি সরে গেল।

দুই হাজার ছয়ে অস্ট্রেলীয় ইতিহাসবিদ প্যাট্রিক উলফ এক প্রবন্ধে লিখলেন, দখল কোনো ঘটনা না, দখল একটা কাঠামো।

বসতি-স্থাপনকারী উপনিবেশ লুণ্ঠন করে বিদায় নেয় না, সে থাকতে আসে, এবং থাকতে হলে যে আগে থেকে আছে তাকে অপসারণ করতে হয়, নিরবচ্ছিন্নভাবে, প্রজন্মান্তরে।

আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল, তিনটাই তার দৃষ্টান্ত। এই কাঠামোয় আটচল্লিশের নাকবা সমাপ্ত অতীত না, চলমান বর্তমান।

এই কাঠামোতেই আলোচনা প্রথমবার সন্ত্রাসের অভিধান ত্যাগ করে ঢুকলো নির্মূলের অভিধানে, যার আইনি নাম গণহত্যা।

➖

সাতই অক্টোবর দুই হাজার তেইশে হামাসের হামলায় প্রায় বারোশো ইসরায়েলি নিহত হলেন, আড়াইশো জিম্মি।

পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের ভাষা হুবহু দুই হাজার একের ব্যাকরণ অনুসরণ করলো। নেতানিয়াহু ঘোষণা করলেন, হামাসই আইসিস, এটা আমাদের পার্ল হারবার, আমাদের নাইন-ইলেভেন।

সৈন্যদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বাইবেল থেকে উদ্ধৃত হলো আমালেকের নাম, যে জাতিকে নিঃশেষ করার ঐশী নির্দেশের কথা শাস্ত্রে লেখা আছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিলেন সম্পূর্ণ অবরোধের। বিদ্যুৎ নাই, খাদ্য নাই, জ্বালানি নাই।

বাইশ বছর আগে এই ভাষা কাজ করেছিল। সমস্ত পশ্চিম বিনা প্রশ্নে যুদ্ধের পেছনে সারিবদ্ধ হয়েছিল, আর প্রশ্নকারীরা ছিলেন প্রান্তের কণ্ঠ।

এবার ঘটলো ভিন্নরকম।

হামলার ছয় দিনের মাথায়, তেরোই অক্টোবর, ইসরায়েলি-আমেরিকান হলোকস্ট-গবেষক রাজ সেগাল লিখলেন, আমাদের চোখের সামনে যা উন্মোচিত হচ্ছে তা গণহত্যার পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত।

বছরের শেষ দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা চুরাশি পৃষ্ঠার আবেদন নিয়ে দাঁড়ালো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে। চব্বিশের এপ্রিলে হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের হলোকস্ট-ইতিহাসবিদ আমোস গোল্ডবার্গ লিখলেন, হ্যাঁ, এটা গণহত্যা।

পঁচিশের জুলাইয়ে ইসরায়েলের নিজস্ব মানবাধিকার সংগঠন বেৎসেলেম একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো।

নিউ ইয়র্ক টাইমসে ওমের বার্তভ, সাবেক আইডিএফ সৈনিক ও গণহত্যা-গবেষক, স্বীকার করলেন, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক ছিল, যতদিন সম্ভব তিনি প্রতিরোধ করেছেন, আর পারছেন না।

আগস্টে গণহত্যা-গবেষকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রস্তাব পাশ করলো।

আর পঁচিশের ষোলোই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন, নেতৃত্বে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের সাবেক সভাপতি নাভি পিল্লাই, জানালেন তাদের সিদ্ধান্ত। গণহত্যা কনভেনশনে যে পাঁচটা কাজের কথা আছে, তার চারটাই ইসরায়েল করেছে।

উসকানিদাতার তালিকায় নাম উঠলো রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর।

এই পুরো তালিকার মেরুদণ্ড ইসরায়েলি আর ইহুদি গবেষকরা। সাঈদ যে ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, সেই ব্যবস্থার যাদের গায়ে ইহুদিবিদ্বেষের তকমা লাগাতে সবচেয়ে অভ্যস্ত, এবার তারাই সবচেয়ে অনড় সাক্ষী।

আর ইকবাল আহমেদের আটানব্বইয়ের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক আইনের কাছে যান, শেষ পর্যন্ত সেটাও মানা হলো। কিন্তু আমেরিকা মানলো না, মানলো দক্ষিণ আফ্রিকা।

দক্ষিণ আফ্রিকা নিজের চামড়ায় জানে বর্ণবাদী রাষ্ট্র কাকে বলে। এটাও জানে, সেই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বিশ্বস্তভাবে অস্ত্র জুগিয়েছিল কে। ইসরায়েল।

আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে তাদের আইনজীবীরা আসলে ম্যান্ডেলার একটা পুরনো কথার ঋণ শোধ করছিলেন। ফিলিস্তিন মুক্ত না হলে আমাদের মুক্তি অসম্পূর্ণ।

বর্ণনার অনুমতি এবার কেউ পশ্চিমের কাছে চায় নাই। গ্লোবাল সাউথ নিজের অনুমতি নিজেই লিখে নিয়েছে।

➖

তবে এটা জয়ের গল্প না। হিসাবের বাকি অর্ধেকটা বলার বাকি।

গাজায় নিহতের সরকারি সংখ্যা এই আগস্টে তিয়াত্তর হাজার ছাড়িয়েছে, তার মধ্যে সাড়ে একুশ হাজার শিশু। ল্যানসেটের গবেষণা বলছে, আসল সংখ্যা এর অনেক ওপরে। পঁচিশের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি ভাঙছে প্রায় প্রতিদিন।

রায় এসেছে, শাস্তি হয় নাই।

আর যারা কথাটা বলেছিল, তাদের একে একে দাম দিতে হচ্ছে।

পঁচিশের আটই মার্চ নিউ ইয়র্কে নিজের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হলো কলাম্বিয়ার ছাত্র-আন্দোলনের মুখপাত্র মাহমুদ খলিলকে, আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও।

তাকে উড়িয়ে নেওয়া হলো লুইজিয়ানার বন্দিশালায়। সতেরো দিন পরে বস্টনের রাস্তা থেকে মুখোশধারী এজেন্টরা ভ্যানে তুললো টাফটসের গবেষক রুমেইসা ওজতুর্ককে।

পরে আদালতের নির্দেশে সরকারি নথি খুললে দেখা গেল, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হাতে একটাই জিনিস ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-পত্রিকায় একটা মতামত-লেখায় তার নাম।

ছাব্বিশের গোড়ায় প্রায় সব ছাত্রই মামলায় জিতেছে, আদালত বলেছে ধরপাকড় বেআইনি ছিল। কিন্তু শাস্তিটা রায়ের অপেক্ষা করে না। শাস্তিটা হলো হাতকড়া, ভ্যান, লুইজিয়ানা, আর ক্যাম্পাসে নেমে আসা ভয়।

জার্মানি আরও এক ধাপ বেশি গেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সে বানিয়েছে নিজের রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি, জার্মান ভাষায় স্টাটসরেজোন।

সেই ভিত্তি রক্ষায় বাতিল হয়েছে ফিলিস্তিনি ঔপন্যাসিক আদানিয়া শিবলির পুরস্কার-অনুষ্ঠান, কেড়ে নেওয়া হয়েছে ইহুদি সাংবাদিক মাশা গেসেনের হানা আরেন্ট পুরস্কার, কারণ গেসেন গাজাকে নাৎসি আমলের ইহুদি ঘেটোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

হানা আরেন্টের নামের পুরস্কার কেড়ে নেওয়া হলো ঠিক সেই কাজের জন্য, আরেন্ট বেঁচে থাকলে যেটা তিনি নিজেই করতেন।

এই তালিকায় বাংলাদেশও আছে, আমরা খেয়াল করিনি।

তেইশের নভেম্বরে তিনটা জার্মান শহর তাদের পরের বছরের আলোকচিত্র বিয়েনালে পুরোটাই বাতিল করে দেয়। কারণ প্রধান কিউরেটরের ফেসবুক পোস্ট, যেখানে তিনি গাজার ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যা বলছিলেন।

তিনি শহিদুল আলম। সহ-কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব আর মুনেম ওয়াসিফ জানিয়ে দেন, তাকে ছাড়া তারা কাজ করবেন না।

তিন বাঙালিকে বাদ দেওয়ার চেয়ে সমস্ত প্রদর্শনী বাতিল করাই জার্মান কর্তৃপক্ষের কাছে সহজ মনে হয়েছিল।

আর রাজ সেগাল, যিনি সবার আগে গণহত্যা শব্দটা লিখেছিলেন?

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডেকেছিল তাদের হলোকস্ট ও গণহত্যা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হতে। তারপর প্রচারণা শুরু হলো, চাপ আসলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলো। সেগাল মামলা করেন, গত সপ্তাহে মীমাংসায় আড়াই লাখ ডলার পেয়েছেন।

ঘটনাটা একবার সাজিয়ে দেখুন। যে ব্যক্তির কাজ গণহত্যা চেনা, সে গণহত্যা চিনেছে বলে গণহত্যা গবেষণার চাকরিটা হারালেন।

তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, এতগুলো রায়, এতগুলো প্রতিবেদন, তারপরও গাজায় বোমা পড়ছে কেন?

কারণ যা জিতেছে, তা তর্ক। যা জেতেনি, তা রাজনীতি।

ইকবাল আহমেদ আটানব্বইয়ে আদালতের কথা বলেছিলেন যুদ্ধ ঠেকানোর উপায় হিসেবে। যুদ্ধের বদলে আদালত।

আদালত এসেছে, কিন্তু যুদ্ধের পরে, ধ্বংসস্তূপের হিসাব লিখতে।

সাঈদ চেয়েছিলেন ফিলিস্তিনিরা নিজেদের গল্প বলার অনুমতি পাক, একটা রাজনৈতিক জাতি হিসেবে হাজির থাকুক। অনুমতি মিলেছে, কিন্তু একটাই ভূমিকায়। ভুক্তভোগীর ভূমিকায়।

সংখ্যা হিসেবে তাদের এখন গোনা হয়, দাবিদার হিসেবে এখনো না।

ফলে সাঈদের সেই দেখানো ব্যবস্থা ভাঙে নাই, নতুন হিসাব শিখেছে। সে এখন গণহত্যা শব্দটা ছাপতে দেয়, কিন্তু যে ছাপল তার চাকরি খায়। স্বীকৃতি ঠিক ততটুকুই মেলে, যতটুকুতে ক্ষমতার কিছু আসে যায় না।

এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা একটাই, এবং সেটা কোনো প্রতিবেদন না।

আমেরিকার ক্যাম্পাসে যারা তাঁবু খাটিয়েছিল, তাদের পড়ার তালিকায় ছিল সাঈদ আর মাহমুদ মামদানি।

ছাব্বিশের পয়লা জানুয়ারি নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন চৌত্রিশ বছরের এক তরুণ, যিনি প্রচারের সব চাপ সত্ত্বেও গাজা প্রশ্নে অবস্থান বদলাননি, এবং তার পরেও আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরটা জিতেছেন।

জোহরান মামদানি, তিনি ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’-এর লেখকের ছেলে।

তর্কটা এতদিন কিতাবে ছিল, প্রতিবেদনে ছিল, আদালতে ছিল। এই প্রথম সেটা ভোটের বাক্সে গেল, এবং জিতল।

ইকবাল আহমেদ তার একাত্তরের চিঠি শেষ করেছিলেন এই বলে, সাফল্যের অভাব নীরবতার অপরাধকে জায়েজ করে না। বাক্যটা তিনি লিখেছিলেন হেরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই।

আজ যারা এই প্রশ্নে চাকরি হারাচ্ছেন, পুরস্কার হারাচ্ছেন, ভ্যানে উঠছেন, তারা প্রত্যেকে ওই এক বাক্যের ঋণ পরিশোধ করছেন।

কিন্তু নীরব না থাকাটাও শুরু, শেষ না। কথা বলা আর কথা শোনানোর মধ্যে যে দূরত্ব, গত ষাট বছরে এই চিন্তা সেই পথ অতিক্রম করতে পারে নাই। ফলে পার হওয়ার জায়গাটা লাইব্রেরি না, ক্ষমতা।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন