মঙ্গলবার রাত সাড়ে এগারোটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসে ঢুকে শতাধিক মাদ্রাসাছাত্র পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভেঙে দেন।
পুলিশ লাঠিপেটা করে, ছাত্ররা ইটপাটকেল ছোড়েন, প্রথম আলোর হিসাবে সাত পুলিশ সদস্যসহ আহত হন ত্রিশজন।
বুধবার বিকালে জেলা পুলিশ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, তিনজন পুলিশ সদস্যকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ভাঙচুরের জন্য কারও বিরুদ্ধে মামলা হয় নাই। কেউ গ্রেপ্তার হয় নাই।
যে তিনজনের শাস্তি হলো, তাদের অপরাধ ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এক রকম লেখা। ঘটনার শুরুতে প্রধান ফটক ও কম্পাউন্ড পাহারায় গাফিলতি।
আক্রান্ত পক্ষ পুলিশ। শাস্তি পাওয়া তিনজনও পুলিশ। তাদের দোষ, হামলাকারীদের ঢুকতে দেওয়া।
➖
রাতের ঘটনাক্রমে কোনো পক্ষের ভাষ্যেই বড় অমিল নাই।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পুলিশ লাইনসের ড্রিল শেডে অনুষ্ঠান শুরু হয়। উপলক্ষ চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সফর আর দিনের মাদকবিরোধী সমাবেশ।
ডিআইজি ও পুলিশ সুপার রাত নয়টা-দশটার মধ্যে চলে যান। অনুষ্ঠান চলতে থাকে।
পুলিশ লাইনসের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠা ১৯৯৪ সালে। প্রতিষ্ঠাতা-প্রিন্সিপাল মাওলানা সাজিদুর রহমান, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব।
পরদিন সকালে ছাত্রদের পরীক্ষা ছিল।
কয়েকজন ছাত্র গিয়ে শব্দ কমাতে অনুরোধ করেন। শব্দ কমানো হয়। কিছুক্ষণ পর আবার বাড়ানো হয়।
রাত সাড়ে এগারোটায় ছাত্ররা দ্বিতীয়বার যান। কথা-কাটাকাটি, তারপর শতাধিক ছাত্র পকেট গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে চেয়ার ভাঙা শুরু করেন। লাঠিপেটা, ইটপাটকেল, এরপরে অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়।
এরপর ছাত্রদের এক দল প্রধান ফটক বন্ধ করে বসে পড়ে। ভেতরে শিল্পীরা আটকা পড়েন।
আরেক দল রাত দুইটায় পুরাতন জেলা রোড, কুমারশীল মোড় ও হাসপাতাল সড়কে বিক্ষোভ করে, আড়াইটায় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করে।
রাত দুইটার দিকে বৈঠক বসে। এক পাশে পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ ও দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। অন্য পাশে হেফাজত মহাসচিব সাজিদুর রহমান ও মাদ্রাসার শিক্ষকেরা।
মধ্যস্থতায় ছিলেন সিরাজুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। কয়েক ঘণ্টা আগে পুলিশের মাদকবিরোধী শোভাযাত্রায় তিনিই ছিলেন বিশেষ অতিথি।
আলোচনা চলে ভোর পর্যন্ত। সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, সভায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি আসে, উন্মুক্ত কোনো কনসার্ট করা যাবে না।
হেফাজত মহাসচিবের ভাষ্য আরও নির্দিষ্ট। ছাত্রদের দাবি ছিল, এখানে কনসার্ট করা যাবে না, দোষীদের বরখাস্তসহ ব্যবস্থা, আহত ছাত্রদের উন্নত চিকিৎসা। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, পুলিশ সব দাবি মেনে নিয়েছে।
পুলিশ সুপারের বক্তব্য ঢাকা ট্রিবিউনে ছাপা হয়েছে। ছোট একটা ভুল বোঝাবুঝিতে অনেক বাচ্চা আহত হয়েছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক, তার খারাপ লাগছে।
শতাধিক লোকের ঢুকে পড়া, চেয়ার ভাঙা, ত্রিশজন আহত, ভোর পর্যন্ত অবরুদ্ধ শহর। রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে এর নাম দাঁড়াল ‘ভুল বোঝাবুঝি’।
➖
ছাত্রদের প্রথম অভিযোগ আইনত সঠিক ছিল।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তার চারপাশের একশ মিটার নীরব এলাকা। রাত শুরু নয়টায়। নীরব এলাকায় রাতে শব্দের সীমা চল্লিশ ডেসিবেল।
গত নভেম্বরে জারি হওয়া নতুন বিধিমালা আরও কড়া। রাতে জনপরিসরে লাউডস্পিকার নিষিদ্ধ। লিখিত আবেদনে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টার অনুমতি মেলে, তবে রাত এগারোটার পর নয়।
গান বাজছিল সাড়ে এগারোটায়, পরীক্ষার আগের রাতে, একটা আবাসিক মাদ্রাসার দেয়ালের ওইপারে। অনুমতি ছিল কি না, কোনো প্রতিবেদনে সে প্রশ্নই ওঠে নাই।
বিধিমালায় অব্যাহতির তালিকাও আছে। সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহতিপ্রাপ্ত। মসজিদ-মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
পুলিশ লাইনসের কনসার্ট প্রথম তালিকায় পড়ে, রাতভর মাইকের ওয়াজ পড়ে দ্বিতীয় তালিকায়। কোনো তালিকায় পড়ে না শুধু সে, যে ঘুমাতে চায়, বা পরীক্ষা দিতে চায়।
আর নতুন বিধিমালা শব্দদূষণের জরিমানার ক্ষমতা দিয়েছে পুলিশকে। ঘটনাস্থলে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সেই রাতে আইন ভাঙছিল যে পক্ষ, আইনটা প্রয়োগের দায়িত্বও ছিল সেই পক্ষের হাতে।
➖
বাংলাদেশে কতজন কওমি মাদ্রাসাছাত্র আছে, রাষ্ট্রের কাছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য সংখ্যা নাই।
২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে দেশের প্রথম কওমি শুমারি হয়। ফলাফল, তেরো হাজার নয়শ দুইটা মাদ্রাসা, প্রায় চোদ্দ লাখ শিক্ষার্থী।
২০১১ সালের অন্য এক হিসাবে ছিল বাহান্ন লাখ। গত ১৪ জুলাই সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, পঁচিশ হাজার মাদ্রাসায় প্রায় সত্তর লাখ ছাত্র।
চোদ্দ লাখ থেকে সত্তর লাখ। পাঁচ গুণের ফারাক, এক দশকের ব্যবধানে, একই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের মুখে।
কত লাখ শিশু মাদ্রাসায় থাকে, সেই সংখ্যা কোনো শুমারিতে নাই।
টাকার উৎস আমাদের জানা। এক গবেষণার হিসাবে কওমি মাদ্রাসার আয়ের সাতান্ন শতাংশ জাকাত ও অনুদান, এগারো শতাংশ টিউশন ফি। ফলে খাওয়া, থাকা, পড়া তিনটাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনামূল্যে।
যে পরিবার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারে না, তার সন্তানের ভাত, বিছানা আর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে লিল্লাহ বোর্ডিং। রাষ্ট্র করে নাই।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের পরীক্ষার্থী তিন বছরে দুই লাখ পঁচিশ হাজার থেকে তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার। একই সময়ে সরকারি প্রাথমিক থেকে কমেছে দশ লাখের বেশি শিশু।
পাস করার পরের হিসাবও আলাদা। ২০১৮ সালে সংসদে আইন করে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়া হয়। গত বছরের এক গবেষণায় স্নাতকদের জরিপে দেখা যায়, মাত্র এক-চতুর্থাংশ মনে করেন ওই স্বীকৃতি চাকরির সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।
স্বীকৃতি যে পদগুলো খুলেছে সেগুলো ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিনের। অনলাইনে চাকরির ফরম জিপিএ ধরে বানানো, কওমির গ্রেড হয় মুমতাজ, জায়্যিদ, জিদ্দান এইসব ধরে। ফরমটাই পূরণ হয় না।
২০১০ সালে ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নুরুল মোমেন ভূঁইয়া একটা মফস্বল শহরের কওমি মাদ্রাসা নিয়ে নৃবিজ্ঞানের অভিসন্দর্ভ লেখেন। তার পর্যবেক্ষণ, ছাত্ররা বিশ্বাস করে আসল জ্ঞান তাদেরটাই, এবং একই সঙ্গে জানে, চাকরির বাজারে ঢোকে কেবল সাধারণ শিক্ষা।
তিনি লিখেছেন, এই দ্বিতীয় জানাটাই তাদের সবচেয়ে বেশি বিষিয়ে তোলে।
একই অভিসন্দর্ভে আছে, কওমি শৃঙ্খলার কেন্দ্রে আদব, এবং তার প্রয়োগ নৈতিক ও শারীরিক দুইভাবেই। যে ব্যবস্থায় এই ছাত্ররা বড় হয়, সেখানে অসম্মানের শাস্তি তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান, দেহের ওপর।
সেই ব্যাকরণে, মাইকের শব্দ কমানোর পর আবার বাড়ানো অসুবিধা না। এইটা তাদের প্রতি বেয়াদবি।
দাবির চেহারাও সেই মুহূর্তেই বদলে যায়। রাত সাড়ে এগারোটায় দাবি ছিল, আজ শব্দটা কমান। ভোরের সালিশে দাবি দাঁড়াল, পুলিশ লাইনসে আর কখনো গানের অনুষ্ঠান হবে না।
এক রাতের একটা নির্দিষ্ট অভিযোগ সাত ঘণ্টায় কালাতীত নীতি হয়ে গেল।
দক্ষিণ এশিয়ার দাঙ্গা নিয়ে কাজ করা নৃবিজ্ঞানী স্ট্যানলি তাম্বিয়া এই রূপান্তরটাই চিহ্নিত করেছিলেন, স্থানীয় বিরোধ তার স্থানীয়ত্ব হারিয়ে বিমূর্ত বড় বিরোধে ঢুকে যায়, আর সেই বদলের মুহূর্তেই ছাড়া-ছাড়া গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে বাঁধা পড়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেটা ঘটেছে শব্দের ডেসিবেল থেকে শরিয়তে।
➖
রাত দুইটার ওই বৈঠকের নাম সালিশ।
ব্র্যাকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে সালিশের কার্যপ্রণালি মাপা হয়েছিল। তার একটা লাইন, যেসব বিরোধে দুই পক্ষের সামাজিক বা অর্থনৈতিক জোর অসমান, রায় সেখানে অবধারিতভাবে শক্তিশালী পক্ষের দিকে যায়।
গবেষকদের হিসাবে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিরোধ আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। এইক্ষেত্রে সালিশ অন্যায় বিবেচনা করে না। সালিশ শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
লক্ষ্যটা শান্তি হলে সমঝোতার নিয়মও বদলে যায়। অশান্তি ঘটানোর ক্ষমতা যার যত বেশি, শান্তির বাজারে তার দাম তত চড়া। রাত দুইটায় রাষ্ট্র এই বাজারে ঢুকেছিল, এবং দাম মিটিয়েছে নিজের তিনজন কনস্টেবল দিয়ে।
সভায় হেফাজত মহাসচিব শুনেছিলেন বরখাস্ত, বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হলো প্রত্যাহার। এই দুই ভিন্ন শব্দে সাজার হিসাব আলাদা। দুই শব্দেই লোক তিনজন, এবং তারা তিনজনই পুলিশের।
➖
কোথাও গোলমালের আশঙ্কা হলে জেলা প্রশাসক ১৪৪ ধারা জারি করেন। জমায়েত বন্ধ, অনুষ্ঠান বন্ধ।
ধারাটা ব্রিটিশদের বানানো। প্রথম লেখা হয় ১৮৬১ সালে, আজকের চেহারা পায় ১৮৯৮ সালে, বাংলাদেশে সেটাই অপরিবর্তিত চলছে।
আইনে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলা আছে, তার যদি মনে হয় আদেশটা দিলে বাধা, উপদ্রব, ক্ষতি বা দাঙ্গা এড়ানো যাবে, তাহলে তিনি আদেশ দিতে পারবেন।
এখানে শর্ত হলো ‘গোলমালের আশঙ্কা’। অনুষ্ঠান বৈধ কি না, ধারাটায় সেই প্রশ্নই নাই।
ঔপনিবেশিক আমলে এই ধারা সবচেয়ে বেশি চালানো হয়েছে মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে। শোভাযাত্রা যাচ্ছে ঢাক বাজিয়ে, পথে মসজিদ, ভেতরে নামাজের ওয়াক্ত। শহরে শহরে একই বিরোধ, আর ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ বেশিরভাগ সময় একটাই, বাজনা বন্ধ।
১৯২৫ সালের ৮ অক্টোবর লাহোরের দ্য ট্রিবিউন লেখে, ম্যাজিস্ট্রেটদের নিষেধাজ্ঞার কারণে সে বছর রামলীলা আর দশেরা পরিত্যক্ত হয়েছে। হিন্দু মহাসভার প্রস্তাবে আদেশগুলোকে বলা হয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বেআইনি ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উসকানি।
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের তারাগঞ্জে জয়পুরহাট আর রাজশাহীর দুই নারী ফুটবল দলের খেলা ছিল। ইসলামী আন্দোলনের স্থানীয় সভাপতি আশরাফ আলী আপত্তি তোলেন।
প্রশাসন মাঠের চারপাশে ১৪৪ ধারা জারি করে খেলোয়াড়দের মাঠছাড়া করে।
আশরাফ আলী পরে ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের দাবি সহজ ছিল, খেলা বন্ধ করা। প্রশাসন খেলা বন্ধ করেছে, তাই আমরা কর্মসূচি তুলে নিয়েছি।
একশ বছর আগে নিষেধাজ্ঞা পড়েছিল ঢাকঢোলের ওপর, একশ বছর পরে সেটা পড়ল ফুটবলের ওপর। দুইবারই আদেশটা গেল সেই পক্ষের বিরুদ্ধে, যেই পক্ষ কাউকে কোনো হুমকি দেয় নাই।
ধর্মীয় অনুভূতির ধারাটাও একই সময়ের।
১৯২৪ সালে লাহোরে রঙ্গীলা রসূল নামে একটা পুস্তিকা বের হয়, যেটাকে মুসলমানরা ধর্মীয় অবমাননা হিসেবে দেখেন। মামলা হয় প্রকাশক রাজপালের বিরুদ্ধে।
১৯২৭ সালের ৪ মে লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি দলীপ সিং তাকে খালাস দেন।
খালাসের কারণ আইনের ফাঁক। ধর্ম নিয়ে অপরাধের যে ধারা তখন ছিল, সেটা লেখা হয়েছিল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানো ঠেকানোর জন্য। বিচারক বলেন, মৃত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে কুৎসা ওই ধারার ভেতরে পড়ে না।
রায়ের পর আন্দোলন শুরু হয়। ভারতীয় আইনসভা নতুন ধারা বানাতে বসে, বিল যাচাইয়ের কমিটির সভাপতি হন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার কমিটিই এই ধারায় শর্ত জুড়ে দেয়, অবমাননা ইচ্ছাকৃত আর বিদ্বেষমূলক হতে হবে।
ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ধারাটা আইনে ঢোকে। নাম ২৯৫ক। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বাংলাদেশে আজও এই ধারাতেই মামলা হয়।
দুই বছর পর রাজপাল খুন হন। খুনির পক্ষে আপিলে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন জিন্নাহ।
ফলে, ২৯৫ক ধারাটা ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া না। খালাস দিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক বিচারক, আইন বানিয়েছিল ভারতীয় আইনসভা।
তবে অনুষ্ঠান বন্ধ হয় না এই ধর্মীয় অনুভূতির আইন ২৯৫ক দিয়ে। ওই ধারায় শাস্তি হয় ঘটনার পরে, আদালতে, প্রমাণ দিয়ে। আগেভাগে বন্ধ করে ১৪৪ ধারা, যেখানে প্রমাণ লাগে না, ম্যাজিস্ট্রেটের মনে হলেই হয়।
এই বছরের ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে তানিম নূরের বনলতা এক্সপ্রেস দেখানোর কথা ছিল। ছবিটার সেন্সর ছাড়পত্র ছিল। জেলা কওমী ছাত্র ঐক্য পরিষদ আপত্তি জানায়, প্রশাসন সাত গাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়।
ততদিনে ব্রিটিশদের নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন উঠে গেছে চব্বিশ বছর আগে, আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধর্মীয় অনুভূতির ধারাটাও এক বছর আগে থেকে নাই।
কিন্তু ১৪৪ ধারায় কেউ হাত দেয় নাই।
২০১৯ সালে ভারতে পুলিশি চাপে প্রেক্ষাগৃহ থেকে একটা সিনেমা নামিয়ে দেওয়ার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বিশ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে বলেন।
বিচারপতি চন্দ্রচূড় লেখেন, স্বাধীন সমাজে পুলিশ জননৈতিকতার স্বনিযুক্ত অভিভাবক নয়। ছবিটা নিরাপদে দেখানোর ব্যবস্থা করাই রাষ্ট্রের কাজ।
বাংলাদেশের কোনো আদালতের এমন রায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
➖
আপত্তিকারীদের সম্মিলিত নাম গত কয়েক বছরে দাঁড়িয়ে গেছে, তৌহিদী জনতা।
শব্দটা পুরনোই, ওয়াজ মাহফিলের সম্বোধন। সংঘর্ষের পক্ষ হিসেবে মূলধারার খবরে এর প্রথম যাচাইযোগ্য ব্যবহার ২০১৯ সালের অক্টোবরে, ভোলায়।
বিপ্লব চন্দ্র শুভর হ্যাক হওয়া ফেসবুক আইডি থেকে কটূক্তি ছড়ানো হয়, সমাবেশ ডাকা হয় সর্বস্তরের মুসলিম তৌহিদী জনতা ব্যানারে, বোরহানউদ্দিনে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হন।
তখনই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে সাঈদ ইফতেখার আহমেদ প্রশ্নটা তুলেছিলেন। দেশের সব মুসলমানই তৌহিদে বিশ্বাসী, তাহলে ভোলার বিক্ষোভকারীদেরই আলাদা করে তৌহিদী জনতা বলা হচ্ছে কেন।
নামটার কাজ ওই প্রশ্নের ভেতরেই। কয়েকশ লোকের একটা ভিড় নামের জোরে হয়ে ওঠে পুরা উম্মাহ।
নামটার দ্বিতীয় সুবিধা, এর কোনো ঠিকানা নাই। নিবন্ধন নাই, কমিটি নাই, গঠনতন্ত্র নাই।
মানবজমিনে সাংবাদিক কদরুদ্দিন শিশিরের অনুসন্ধান অবশ্য দেখিয়েছে, আলাদা আলাদা ঘটনায় কয়েকটা মুখ ঘুরেফিরে আসে, এবং তাদের একজন, আবু সাঈদ শের মোহাম্মদ খান, ২০২২ সালে জঙ্গি সংগঠনে অর্থ সরবরাহের অভিযোগে র্যাবের হাতে আটক হয়েছিলেন।
➖
এই তৌহিদী জনতা নামক ভিড়ের রাজনৈতিক জায়গা তৈরি হয়েছে আওয়ামী আমলে।
২০১৩ সালের ৯ মার্চ হেফাজত তেরো দফা দেয়। মৃত্যুদণ্ডসহ ব্লাসফেমি আইন, বাধ্যতামূলক ইসলামি শিক্ষা, আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা, ভাস্কর্য বন্ধ।
এরপর দাবিগুলো একটা একটা করে মানা হয়। ২০১৭ সালে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বই থেকে বাদ যায় হুমায়ুন আজাদ, শরৎচন্দ্রের ‘লালু’, সত্যেন সেনের ‘লাল গরুটা’, উপেন্দ্রকিশোরের রামায়ণ কাহিনি।
একই বছরের ২৬ মে রাতে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে সরানো হয় ন্যায়বিচারের ভাস্কর্য। ২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিস পায় স্নাতকোত্তরের স্বীকৃতি, আর শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনা পান ‘কওমি জননী’ উপাধি।
ব্লাসফেমি আইনের দাবি অবশ্য একই সরকার ফিরিয়ে দিয়েছিল। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বিবিসিকে শেখ হাসিনা বলেন, দাবি ওরা করেছে, আমাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নাই, দরকারও নাই।
ওই বছরের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বর খালি করে এই সরকারই। নিহতের সংখ্যা আজও মীমাংসিত না। সরকারের হিসাবে বারোর নিচে, অধিকার আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তালিকায় তিপ্পান্ন থেকে একষট্টি, হেফাজতের নিজের তালিকায় তিরানব্বই।
২০২১ সালের এপ্রিলে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই গ্রেপ্তার হন দুইশ আটানব্বইজন। এক দশকে হেফাজতে ইসলামের নামে মামলা তিনশ বাইশটা।
রাষ্ট্র ইসলামপন্থার সাংস্কৃতিক দাবিগুলো মেনেছে, আবার তার সংগঠনগুলো ভেঙেছে। পাঠ্যবই দিয়েছে, ভাস্কর্য সরিয়েছে, সনদ দিয়েছে, উপাধি নিয়েছে, আবার নেতাদের জেলে ঢুকিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দমনের অংশটা আর নাই। ফলে ছাড়ের অংশটেই কেবল আছে।
➖
অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন এ এফ এম খালিদ হোসেন, হেফাজতে ইসলামের সহ-সভাপতি।
সেই সতেরো মাসের হিসাব সংস্থাভেদে আলাদা, তাই সংখ্যা নামসহ পড়তে হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের হিসাব, ক্ষমতার পালাবদলের পরের সাড়ে পাঁচ মাসে চল্লিশটা মাজারে চুয়াল্লিশটা হামলা। গ্রেপ্তার তেইশ। আদালতে চার্জশিট দুইটা।
বিশ্ব সুফি সংস্থার হিসাবে ছয় মাসে হামলা আশিটা। ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে শুধু ৫ আগস্ট এক দুপুরেই মাজারে হামলা চোদ্দটা, আর আয় হারানো পেশাদার বাউলশিল্পীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ।
মানবাধিকার সহায়তা সোসাইটির হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের সতেরো মাসে চারশ তেরোটা মব-ঘটনায় নিহত দুইশ উনষাট।
২০২৪ সালের নভেম্বরে নরসিংদীতে এক মাজারের ওরস বাতিল করিয়েছিল পুলিশ নিজে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মধুপুরের লালন স্মরণোৎসবে আয়োজকরা গান বাদ দিতে রাজি হয়েছিলেন, তাতেও হয় নাই, পুরো অনুষ্ঠানই বাতিল করতে হয়।
নভেম্বরে মানিকগঞ্জের ঘিওরে মেলায় বক্তব্যের অভিযোগে বাউলশিল্পী আবুল সরকার গেলেন কারাগারে, মামলার বাদী স্থানীয় মসজিদের ইমাম, বিক্ষোভের ব্যানার আলেম-ওলামা ও তৌহিদী জনতা।
তারপর তার ভক্তদের ওপর হামলা হলো, এবং মামলা হলো ভক্তদেরই দুইশজনের নামে।
ডিসেম্বরে শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পরের তিন দিনে পুড়ল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়, ছায়ানটের মিলনায়তন, উদীচীর কেন্দ্রীয় দপ্তর।
ওই তিন দিনেই ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামের সাতাশ বছরের এক পোশাকশ্রমিক নবী অবমাননার অভিযোগে পিটুনি খেয়ে, আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। র্যাব পরে জানায়, তদন্তে অবমাননার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে নাই।
এমন একজনও মেলে নাই, যে নিজে কিছু শুনেছে বা দেখেছে।
➖
নির্বাচিত সরকারের আমলেও ছকটা একই।
এই বছরের ২৪ মার্চ সিলেটের বিশ্বনাথে শতাধিক লোকের হামলায় শতবর্ষী এক বাউল উৎসব পণ্ড হয়, মঞ্চ আর বাদ্যযন্ত্র ভাঙা হয়। মামলা হয় নাই। পুলিশ জানায়, রাতে গানের শব্দ নিয়ে অভিযোগ ছিল, স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত।
পাঁচ মাস পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একই কথা, শুধু এবার আক্রান্ত পুলিশ নিজে।
১১ এপ্রিল দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরে তিনশ-চারশ লোক একটা দরবারে ঢুকে ভাঙচুর করে, আগুন দেয়, আর দরবারের প্রধান আবদুর রহমান ওরফে শামীম আল জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে মেরে ফেলে। তার বয়স বায়ান্ন।
অভিযোগ, তার পুরনো একটা ভিডিওতে ইসলাম নিয়ে আপত্তিকর কথা ছিল, সেটা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন পরে জানান, পুলিশ ভেতর থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিল, ওই সময়েই কোপগুলো পড়ে।
পরিবার প্রথমে মামলা করতে চায় নাই। নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মামলা করব না, আমি এখন বৃদ্ধ, এসব নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করার ক্ষমতা নাই।
তিন দিন পর তিনিই মামলা করেন। আসামি চারজনের নাম, আর অজ্ঞাতনামা দুইশ।
জুনে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে মন্দিরের একাশি ফুট মূর্তির কাজ বন্ধ হয় আশি শতাংশ হয়ে যাওয়ার পর, ইমাম ওলামা পরিষদের স্মারকলিপি আর জামায়াত-হেফাজত নেতাদের বিক্ষোভের মুখে। লিখিত কোনো নির্দেশ নাই, সরকারের প্রকাশ্য কোনো অবস্থানও নাই।
গত ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফটিকছড়িতে হেফাজত আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মাদ্রাসায় গিয়ে হাত ধরাধরি করে মঞ্চে ওঠেন।
হেফাজতের দাবির তালিকা অবিকল আগেরটাই, মৃত্যুদণ্ডসহ ব্লাসফেমি আইন, আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা, মামলা প্রত্যাহার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন, শুধু বলেন চাইলেই আইন করা যায় না।
ডেইলি স্টারের শিরোনাম ছিল, “বিএনপি হেফাজতকে কাছে টানছে, ছকটা কি চেনা ঠেকছে?”
সাত দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালিশ।
➖
এতদিন এই আলাপের ভরসার বাক্য ছিল একটা। ইসলামপন্থীরা রাস্তায় যত শক্তিশালী, ব্যালটে তত দুর্বল।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলে জামায়াতে ইসলামী একা পেয়েছে প্রায় বত্রিশ শতাংশ ভোট, আটষট্টিটা আসন। ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস মিলিয়ে ইসলামপন্থী ভোট প্রায় সাড়ে ছত্রিশ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ধারণাটা মারা গেছে।
যেটা বেঁচে আছে সেটা অন্য হিসাব। তৌহিদী জনতা ভোটে দাঁড়ায় না, তাই তাকে হারানোর কোনো নির্বাচন নাই। হেফাজতও দাঁড়ায় না। তার আমিরের মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী।
ভোটের রাজনীতিতে সাড়ে ছত্রিশ শতাংশের একটা সীমা আছে। ভেটোর রাজনীতিতে কোনো সীমা নাই।
➖
গানবাজনা হারাম কি না, এই তর্ক ফিকহে চৌদ্দশ বছরেও মিটমাট হয় নাই।
নিষেধের প্রধান দলিল বুখারির একটা হাদিস, ইবনে হাযম সেটার সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাতিল করেছেন। আল-গাযালি লিখেছেন, সংগীত নিজে হারাম না, হারাম হয় সঙ্গের জিনিসে। হানাফি মূলধারা নিষেধের পক্ষে। অর্থাৎ এটা মতভেদ, সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত না।
আসল প্রশ্নটা অন্য। অন্যায় দেখলে কেউ নিজের হাতে সেটা থামাতে পারে কি না।
সহিহ মুসলিমের একটা হাদিস সবাই জানে। যে মুনকার দেখে সে হাত দিয়ে বদলাক, না পারলে জিহ্বায়, না পারলে অন্তরে। হাদিসটা সহিহ। শর্তগুলো নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিরোধ নাই। শুধু উদ্ধৃতির সময় শর্তগুলো বাদ পড়ে যায়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আর ইবনে রজব দুজনেই লিখেছেন, হাত মানে তরবারি বা অস্ত্র না।
শাস্তি কে দেবে, এই প্রশ্নে সবচেয়ে বড় গবেষণা মাইকেল কুকের, কেমব্রিজ থেকে ছাপা। তার সিদ্ধান্ত, শাস্তি দেবে রাষ্ট্র, ব্যক্তি না, আর এই মত ইসলামি চিন্তায় প্রায় সর্বজনীন। শাফিয়ি, মালিকি আর হানাফি তিন ধারাই বলপ্রয়োগ রেখেছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতে।
হাদিসের তিন স্তরের একটা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠও চালু ছিল। হাত রাষ্ট্রের, জিহ্বা আলেমের, অন্তর সাধারণ মুসলমানের।
এই পাঠ আছে ফাতাওয়া আলমগিরিতে, ঔরঙ্গজেবের ফরমায়েশে সংকলিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্ররা যে সিলেবাসে পড়ে, সেটা সেই সিলেবাসেরই কিতাব।
ইমাম নববি দিয়েছেন আরেকটা শর্ত। নিজের, নিজের সম্পদের বা অন্য কারও ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে হাত আর জিহ্বার দায়িত্ব থাকে না, তখন অন্তরে অপছন্দ করাই যথেষ্ট।
ইবনে তাইমিয়্যার কথা আরও সোজা। আপনার সৎকাজের আদেশ নিজেই যেন অসৎ কাজ না হয়ে যায়।
পদ্ধতিও বলা আছে, সূরা নাহলে। “ডাকো প্রজ্ঞা দিয়ে, সদুপদেশ দিয়ে, তর্ক করো উত্তম পন্থায়।”
কুকের আরেকটা পর্যবেক্ষণ, প্রাক-আধুনিক ইসলামে যারা আদেশ-নিষেধ করে বেড়াতেন তারা প্রায় সবাই আলেম। কাজটার জন্য রাষ্ট্রের একটা পদই ছিল, মুহতাসিব, নিয়োগ দিতেন সুলতান। তারও বিচারের ক্ষমতা ছিল না। আগে উপদেশ, তারপর সীমিত প্রয়োগ।
নৈতিক পুলিশি ইসলামের ইতিহাসে একটা সরকারি পদ।
দেওবন্দও এই পথেই দাঁড়িয়েছিল। দারুল উলুম দেওবন্দের জন্ম ১৮৬৬ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের ভাঙনের পর, তলোয়ার ছেড়ে কলম ধরার সিদ্ধান্ত হিসেবে।
সংস্কারের পথ ধরা হয় দুইটা, প্রচার আর আত্মসংশোধন। ওই ধারার সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন তাবলিগ জামাতের ডাকটাও ছিল নিজের দিকেই, “আয় মুসলমানো, মুসলমান বনো।”
সৌদি আরবের ধর্মীয় পুলিশের এক সময় চার হাজার মাঠকর্মী আর উনচল্লিশ কোটি ডলারের বাজেট ছিল। ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিলের প্রবিধানে তাদের ক্ষমতা নামিয়ে আনা হয় এক লাইনে।
কমিটির কেউ কাউকে থামাতে, গ্রেপ্তার করতে, ধাওয়া করতে, পরিচয়পত্র চাইতে বা অনুসরণ করতে পারবে না। সন্দেহজনক কিছু দেখলে তাদের কাজ কর্তৃপক্ষকে জানানো।
যে রাষ্ট্র হিসবাহকে আধুনিক দপ্তর বানিয়েছিল, সে নিজের নিযুক্ত আর বেতনভুক্ত ধর্মীয় পুলিশের হাত থেকেও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তুলে নিয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন একদল ছাত্র, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নাই।
➖
উপরের যুক্তির অন্তত পাঁচ জায়গায় ফাঁক আছে, সেগুলোও লেখা থাকুক।
এক, ছাত্রদের অভিযোগ সত্য ছিল, এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর কোনো রাস্তা তাদের সামনে ছিল না। যে দপ্তরে নালিশ করার কথা, আইন ভাঙছিল সেই দপ্তরই।
দুই, শাস্তির নিষ্ঠুরতায় উপনিবেশ নির্দোষ। ২৯৫ক ধারায় সাজা ছিল দুই বছর, অপরাধ অ-আমলযোগ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাজা করেছিল পাঁচ বছর, অপরাধ আমলযোগ্য। পাকিস্তানের ২৯৫গ ধারায় সাজা মৃত্যুদণ্ড।
ধারাগুলো যত এগিয়েছে, তত ধারালো হয়েছে, এবং প্রতিবার নিজেদের হাতে।
তিন, হুমকিদাতাকে জিতিয়ে দেওয়া দক্ষিণ এশিয়ার একচেটিয়া রোগ না। ১৯৫১ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টও ক্ষিপ্ত ভিড়ের মুখে বক্তৃতা দেওয়া লোকেরই সাজা বহাল রেখেছিল।
চার, ১৯২৫ সালের লাহোরে নিষেধাজ্ঞা পড়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের বাজনায়। ফলে আইনটা কোনো ধর্মের পক্ষে না, হুমকির পক্ষে। কালকে যদি হুমকি অন্য দিক থেকে আসে, আইন সেদিকেই ঝুঁকবে।
পাঁচ, তৌহিদী জনতা আর মব এক জিনিস না। নেত্র নিউজের ডেটা-অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের একশ আটত্রিশটা মব-হত্যার ভুক্তভোগীদের মাত্র পাঁচজন হিন্দু, বেশিরভাগ ঘটনার অভিযোগ চুরি-ছিনতাই।
একই অনুসন্ধানে, পরিকল্পিত খুনকে মবের বেশ পরানোর ঘটনা দুই বছরে চার থেকে বেড়ে চৌত্রিশ। ধর্মের ভিড় পুরা মব-সংকটের ছোট একটা অংশ। তার ভয়ের দিক সংখ্যায় না, নিশানায়। গান, নারীর খেলা, মাজার, বাউল, বইয়ের স্টল, সিনেমা।
➖
বুধবার ভোরে সালিশ শেষ হয়। তিন কনস্টেবল প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি গঠিত, মামলা শূন্য।
ওই দিনই কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে অ্যাশেজ আর নোবেলম্যানের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। আগের দিন ইমাম-উলামা পরিষদ জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়ে জানায়, অনুষ্ঠানটা শরিয়তবিরোধী।
শহীদী মসজিদে আসরের পর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি আবদুর রহিম ডেইলি স্টারকে বলেন, শরিয়তবিরোধী কোনো কনসার্ট তারা হতে দেবেন না।
জেলা প্রশাসন অনুমতি বাতিল করে। কারণ হিসেবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নাই।
আপত্তি এসেছিল ধর্মের ভাষায়, বাতিল হলো লাইসেন্সের ভাষায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সালিশ যখন চলছিল, গান গাইতে আসা শিল্পীরা তখনো পুলিশ লাইনসের ভেতরে আটকা। ফটক খোলে ভোরে।
সালিশে তাদের কথা ওঠে নাই। কোনো পক্ষের দাবির তালিকায় তারা ছিলেন না।