লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা একজন শিক্ষক। দুই হাতে মোটা লাঠি। সামনে আট-নয় বছরের একটা শিশু।
হাত ক্লান্ত হলে তিনি লাথি মারলেন। তারপর বসে শিশুটার মুখে-পেটে ঘুষি। সমান বয়সী আরও কতগুলো শিশু লাইন বেঁধে বসে দেখছে।
ভিডিওটা কিছুদিন আগে দেশের অসংখ্য মানুষ দেখেছেন।
প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হকও দেখেছেন। তারপর তিনি একটা কথা লিখেছেন, যেটা ভিডিওর চেয়েও ভারী।
দৃশ্যটা তার কাছে নতুন না।
তিনি নিজে হেফজখানার ছাত্র ছিলেন। তার মনে আছে, হুজুরের ছুড়ে মারা বেতের আগা এক সহপাঠীর ঊরুতে গেঁথে গিয়েছিল, রক্তে পায়জামা ভিজে গিয়েছিল।
মনে আছে, কারও হাত-পায়ে শিকল দিয়ে ভারী গাছের টুকরা বেঁধে দেওয়া হতো, যেন মাদ্রাসা থেকে পালাতে না পারে।
এবং মনে আছে অভিভাবকদের কথাটা। সন্তানকে ভর্তি করিয়ে তারা বলে যেতেন, “হুজুর, গোশত আপনার, আর হাড্ডি আমার।”
এই লেখাটা ওই নয়টা শব্দ নিয়ে।
কারণ বাক্যটা আদর করে বলা হলেও এটা আসলে একটা চুক্তি। শিশুর শরীরের মালিকানা ভর্তির দিনই হাতবদল হয়ে যায়। মাংসের ওপর যা খুশি করার অধিকার শিক্ষকের, বাবা-মা ফেরত চান কেবল কঙ্কাল।
এরপর ওই শরীরের ওপর যা কিছু ঘটে, বেত, শিকল, এবং যে কথা কেউ উচ্চারণ করে না, সবকিছুর অনুমতিপত্র ওই এক বাক্যে স্বাক্ষরিত হয়ে আছে।
➖
গত মে মাসের ১৯ তারিখ সারা দেশ যখন পল্লবীর সাত বছরের রামিসার হত্যা নিয়ে উত্তাল, সেদিনই বনশ্রীর একটা মাদ্রাসায় পাওয়া গেল দশ বছরের আবদুল্লাহর ঝুলন্ত লাশ।
ময়নাতদন্তে তার পায়ুপথে যৌন নির্যাতনের আলামত।
একই সপ্তাহে কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরে তেরো বছরের এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠল খোদ মুহতামিমের বিরুদ্ধে।
নেত্রকোনার মদনে এক মহিলা মাদ্রাসার বারো বছরের ছাত্রী তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত তার শিক্ষক, তিনি পলাতক।
সংখ্যার হিসাবে গেলে গোলকধাঁধায় পড়তে হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, গত বছর মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার অন্তত ৫২ শিশু, তিনজন মারা গেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের হিসাবে ২০২০ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে অন্তত ২১১টি ঘটনা। কোনো কোনো সংকলন বছরে নয়শোর ওপরে সংখ্যা দেয়।
পাঁচটা সংস্থার পাঁচ রকম সংখ্যা। মানে কেউ গোনে না, সবাই আন্দাজ করে। এবং আন্দাজের ওপর দাঁড়িয়ে কারও কাছে জবাব চাওয়া যায় না।
তবে একটা হিসাব তুলনা করার মতো করে করা হয়েছে। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির তথ্যে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট যৌন নিপীড়নের ৩৯টি ঘটনার ২৩টি ঘটেছে মাদ্রাসায়।
অথচ দেশে মাদ্রাসার ছাত্রসংখ্যা স্কুল-কলেজের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। মাথাপিছু হিসাবে ঝুঁকিটা প্রায় সাড়ে সাত গুণ।
এখানে সততার খাতিরে উল্টো পিঠটাও বলা দরকার। শিশু যৌন নিপীড়নের সিংহভাগ ঘটে শিশুর নিজের বাড়িতে বা পরিচিত পরিবেশে। মাদ্রাসা এই দেশের একমাত্র বিপজ্জনক জায়গা না।
কিন্তু মাদ্রাসার বিপদটার নিজস্ব একটা বন্দোবস্ত আছে। বন্দোবস্তটা কীভাবে দাঁড়াল, এই লেখা তারই হিসাব।
➖
হিসাবে ঢোকার আগে একটা প্রশ্নের জবাব দেওয়া দরকার, নইলে পুরা লেখাটাই অসৎ থেকে যেতে পারে।
বাবা-মা কেন দিয়ে যান?
শহুরে পাঠকের কাছে সহজ উত্তর তৈরি আছে, অসচেতনতা, ধর্মান্ধতা। উত্তরটা আরামদায়ক, কারণ এতে দায়টা গরিবের ঘাড়ে যায়।
তথ্য অন্য কথা বলে। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে এ দেশে যে কয়টা বড় জরিপ হয়েছে, তার একটাতে দেখা যায়, মাদ্রাসার ছাত্রদের পরিবারের ষাট শতাংশই দরিদ্র। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অতি-দরিদ্র।
গ্রামাঞ্চলে চালানো আরেক গবেষণায় সম্পর্কটা আরও পরিষ্কার। বাবার আয় যত বাড়ে, ছেলেকে মাদ্রাসায় দেওয়ার হার তত কমে।
তবু এখানে একটা মোচড় আছে। ওই গবেষকরাই যখন পরিবারগুলোকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, মাদ্রাসায় দিলেন কেন, তখন বেশিরভাগ উত্তর এসেছে ধর্মের কথা বলে।
প্রায় অর্ধেক পরিবার তাই বলেছে। টাকার অভাবের কথা কেউ বলেননি।
দুইটা তথ্য পরস্পরবিরোধী না। অভাব ঠিক করে দেয়, সামনে কী কী রাস্তা খোলা আছে। বিশ্বাস ঠিক করে দেয়, ওই রাস্তাগুলোর কোনটা নেওয়া হবে।
কেউ বলেন না, গরিব বলে দিলাম। বলেন, দ্বীনের জন্য দিলাম। দুইটাই সত্যি, শুধু একটা মুখে আসে, আরেকটা আসে না।
আসল প্রশ্নটা মাদ্রাসায় দেওয়াও না। আসল প্রশ্ন আবাসিক রাখা।
কারণ হিসাবটা সেখানে গিয়েই কঠিন হয়ে যায়। আবাসিক মাদ্রাসা যা দেয়, এ দেশে আর কেউ তা দেয় না। তিন বেলা খাবার। মাথার ওপর ছাদ। চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনা। পড়াশোনা।
অনেক জায়গায় পুরাটাই বিনা পয়সায়, মানুষের দানে চলা লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে।
এর প্রতিদ্বন্দ্বী কে? সরকারি স্কুল দুপুরের খাবারটাই নিয়মিত দিতে পারে না, থাকা-খাওয়া তো অনেক দূরের কথা। গরিবের শিশুকে রাত্রিযাপনসহ রাখার মতো কোনো ব্যবস্থা রাষ্ট্রের হাতে নাই।
মানে ধর্মপ্রাণ বাবা ছেলেকে বাড়ির পাশের মক্তবেও পাঠাতে পারতেন, যদি সেই সুযোগ থাকত। বিশ্বাস তাকে মাদ্রাসা পর্যন্ত নিয়ে যায়। অভাব তাকে বোর্ডিংয়ে রেখে আসে।
এখানে এসেই “গোশত আপনার, হাড্ডি আমার” কথাটার আরেকটা মানে দাঁড়ায়। এটা শুধু কর্তৃত্ব তুলে দেওয়ার ভাষা না, এটা একটা মিনতিও।
এত বড় দান যিনি করছেন, আমার সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন, রাখছেন, পরকাল দিচ্ছেন, তার কাছে আমার তো দেওয়ার মতো কিছু নাই। যা আছে, ওই একটাই। শিশুটা।
➖
সাধারণ স্কুলে শিক্ষক পেটালে সেটাকে বলে নিষ্ঠুরতা। মাদ্রাসায় পেটালে সেটার নাম কড়াকড়ি। এবং কড়াকড়ির অর্থ এখানে দোষ না, বিজ্ঞাপন।
যে হুজুর যত কঠোর, অভিভাবকের চোখে তিনি তত নিষ্ঠাবান।
কারণটা হেফজের ভেতরেই আছে। কোরআন মুখস্থ করা মূলত শরীরের কাজ। ভোররাত থেকে বসে থাকা, দুলে দুলে পড়া, সবক ধরে রাখা।
অগ্রগতি মাপা হয় শরীর দিয়ে, তাই শাসনও চলে শরীরের ওপর। শরীরকে বশ মানানো আর আয়াত মুখস্থ করা এখানে একই প্রক্রিয়ার দুই নাম।
ফলে ব্যথা এখানে শাস্তি না। ব্যথা পাঠ্যক্রমের অংশ।
এই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে জোড়া লাগানো আছে আদব। আদব মানে শুধু ভদ্রতা না। আদব মানে শিক্ষকের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন না তোলা।
সাধারণ স্কুলে যে ছেলে নালিশ করে, সে অবাধ্য। এখানে যে নালিশ করে, সে বেয়াদব।
এখন তিনটা জিনিস পাশাপাশি রাখেন। শিশুর শরীর তার নিজের না। শরীরে ব্যথা পাওয়া স্বাভাবিক। আর অভিযোগ করা নিজেই একটা অপরাধ।
যে লোক একটা শিশুকে নিঃশব্দে নিপীড়নের শিকার বানাতে চায়, তার জন্য এই তিনটা জিনিসই যথেষ্ট। এখানে তাকে কিছু বানাতে হয় না। ব্যবস্থাটা অন্য উদ্দেশ্যে সবকিছু আগেই বানিয়ে রেখেছে।
একটা কথা পরিষ্কার থাকুক। বেত আর ধর্ষণ এক জিনিস না, এই লেখা দুটোকে এক পাল্লায় মাপছে না।
কথাটা হলো, প্রথমটা দ্বিতীয়টার রাস্তা বানিয়ে দেয়। যে শরীর প্রতিদিন মার সহ্য করতে শেখে, সেই শরীর আর জানে না কোন স্পর্শে “না” বলার অধিকার তার আছে।
➖
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে কম আলোচিত প্রথাটার নাম খেদমত।
দেওবন্দি শিক্ষাধারায় ছাত্র শিক্ষকের ব্যক্তিগত সেবা করে। কাপড় ধোয়া, খাবার আনা, গা টিপে দেওয়া, প্রয়োজনে একই ঘরে রাত কাটানো।
এটা ফাইফরমাশ না, এটা সম্মানের কাজ।
কারণ এই ধারার বিশ্বাসে ইলম একমাত্র কিতাবে থাকে না, থাকে আলেমের ব্যক্তির ভেতর। কাছে থাকলে জ্ঞান সঞ্চারিত হয়। শিক্ষকের নৈকট্য তাই নিজেই একটা ডিগ্রি।
গত ২৩ জুলাই টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের এক মাদ্রাসায় এগারো বছরের এক শিশুকে দুই দিনে একাধিকবার যৌন নির্যাতন করা হয়। নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে ঘটনার বিবরণে একটা শব্দবন্ধ আছে, “সেবার কথা বলে।”
এর পাঁচ দিন পর দেশের সবচেয়ে পরিচিত ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ কওমি মাদ্রাসা সংস্কারে ছয় দফা প্রস্তাব দেন।
তার তৃতীয় প্রস্তাবের ভেতরে ছোট একটা লাইন, শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সেবা নেওয়ার প্রচলন “সম্পূর্ণ বন্ধ” করতে হবে।
দুটো বাক্য পাশাপাশি পড়েন। ভেতরের একজন সংস্কারক যে প্রথা তুলে দিতে বলছেন, অপরাধ ঘটেছে ঠিক সেই প্রথার রাস্তা ধরে।
প্রথাটা ভেতর থেকে কেমন দেখায়, তারও কিছু বিবরণ আছে। ২০২২ সালে তিন জেলার মাদ্রাসা ঘুরে সাংবাদিকরা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
মোহাম্মদপুরের এক হাফেজিয়া মাদ্রাসার বারো বছরের ছাত্র তার দিনের হিসাব দিয়েছে এইভাবে।
ঘুম ভাঙে ভোর সাড়ে তিনটায়। তালিম, নামাজ, তারপর হুজুরের কাজ। “সকালে হুজুরের বিছানা কইরা দেই, চা আইনা দেই। প্রতি সপ্তাহেই হুজুরের কাপড়ও ধুয়ে দেই।”
কেন করো, জিজ্ঞেস করায় বলেছে, “ওস্তাদের সম্মানে এই ধরনের কাজ করি।” তার ভাষ্য, কেউ জোর করে না।
নারায়ণগঞ্জের এক ছাত্রের কথায় জিনিসটা আরও দৃশ্যমান হয়।
“প্রতিটি শাখায় হুজুরদের প্রিয় ও অপ্রিয় ছাত্র থাকে। অনেক সময় তাদের দিয়ে ঘাড় টেপানো হয়, মাথার চুল টানানো হয়। আর এটা না করার কী আছে? একজন না করলে আরেকজন করবে।”
আরেকজন আরও কম শব্দে। “হুজুর যখন বলে না করার তো কোনো উপায় থাকে না।”
কেউ জোর করে না, আবার না বলার উপায়ও নাই।
কাজের তালিকাটাও ছাত্রদের মুখেই আছে। খাবার তুলে দেওয়া, পানি এগিয়ে দেওয়া, মশারি টানানো, কাপড় ধোয়া, বাজার, গা মালিশ। মাথাব্যথা করলে চুল টেনে দেওয়া।
শেখানো হয়, এগুলো সওয়াবের কাজ, ওস্তাদের দোয়া জীবনে লাগবে। কুমিল্লার এক খাদেম, নিজে হেফজ পাস করা যুবক, পুরো চক্রটা এক বাক্যে বলে দিয়েছেন।
“আমরাও করে এসেছি। দোয়ার ব্যাপার আছে।”
তবে সবচেয়ে জরুরি কথাটা বলেছেন একজন শিক্ষক, গর্ব করে।
সাধারণ শিক্ষায় ছাত্ররা শিক্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, “কিন্তু আমরা যদি বলি, তোমরা কাল চুল কেটে আসবে, কেউ এটা নিয়ে কিছু বলবে না। আমরা এখানে এমন আদব-কায়দা শেখাই। এখানে ছাত্ররা কখনও ওস্তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না।”
যে জায়গায় ছাত্র কখনো ওস্তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, সে জায়গায় ওস্তাদ যা করবেন, তার বিরুদ্ধেও কেউ দাঁড়াবে না।
ওই প্রতিবেদনে আরেকটা তথ্য আছে। খাদেম প্রথা আছে আবাসিক কওমি মাদ্রাসায়। অনাবাসিক কওমিতে নাই, আলিয়ায় নাই, সুন্নি ঘরানায় নাই।
ফলে প্রথাটা ধর্মের না, আবাসিকতার।
➖
এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা যদি করি, এতগুলো শিশু, এত বছর ধরে, কেউ কিছু বলে না কেন?
সহজ উত্তর হলো ভয়। টাঙ্গাইলের নয় বছরের মেয়েটাকে বলা হয়েছিল, কাউকে বললে দা দিয়ে কোপানো হবে, জবাই করা হবে, জিন দিয়ে ভয় দেখানো হবে।
কিন্তু ভয় দিয়েও পুরোটা ব্যাখ্যা হয় না।
মনোবিজ্ঞানী জেনিফার ফ্রেইড এই গভীরতার একটা নাম দিয়েছেন, বিশ্বাসভঙ্গের ট্রমা।
সরল করে বললে, শিশু যখন বেঁচে থাকার জন্য নিপীড়কের ওপরেই নির্ভরশীল, তখন ঘটনাটা মনে রাখাই তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আবাসিক মাদ্রাসার শিশুর নির্ভরতা প্রায় নিরঙ্কুশ। খাওয়া হুজুরের হাতে, থাকা হুজুরের ঘরে, শিক্ষা হুজুরের মুখে, আর তার ছোট বোঝাপড়ায় পরকালটাও।
পালিয়ে বাড়ি ফেরার রাস্তাও নাই, কারণ বাড়ির মানুষই তাকে এখানে রেখে গেছে। গোশত হস্তান্তর করে।
ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান মুসা আল হাফিজ নিজেই কথাটা বলেছেন। এই শিশুরা জানে না গুড টাচ আর ব্যাড টাচ কী।
মানে শরীরের সীমারেখার কোনো শব্দ তাদের দেওয়া হয়নি। যা ঘটেছে সেটা বর্ণনা করার মতো একটাই বিভাগ তার অভিধানে আছে, গুনাহ।
গুনাহের সমস্যা হলো, শিশুর বোঝাপড়ায় সে নিজেও তাতে জড়িয়ে গেছে।
সে তাই বলে না। আংশিকভাবে বলতে পারে না বলে। আর আংশিকভাবে, বললে নিজেই আসামি হয়ে যাবে বলে।
➖
শিশু যদি বলেও ফেলে, যিনি শুনলেন সেই অভিভাবকের সামনেও সহজ কোনো রাস্তা নাই।
অভিযোগ করা মানে আগে ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে বের করে আনা। কিন্তু যে কারণে ভর্তি করা হয়েছিল, সংসার চালাতে না পারা, সেটা তো বদলায় নাই।
তারপর মামলার খরচ। থানা-আদালতে দৌড়ানোর দিনগুলোর হারানো মজুরি।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা টাকায় না। গ্রামে মাদ্রাসা কেবল একটা স্কুল না। মাদ্রাসা মানে মসজিদ, জানাজা, মিলাদ, বিয়ের হুজুর।
যে পরিবার হুজুরের নামে থানায় যায়, সে গ্রামের ধর্মীয় জীবনের পুরো নেটওয়ার্কটার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
টাঙ্গাইলের এক মা বলছেন, শুরুতে অনেকে পাশে ছিল। জামিনের পর তিনি একা। বাকিরা সরে গেছে, কারণ হিসাবটা তাদেরও করতে হয়।
ফলে বেশিরভাগ ঘটনা যে থানার বদলে সালিশে গিয়ে চাপা পড়ে, সেটাও অসচেতনতা না। বিচার অনিশ্চিত, দীর্ঘ, দামি। মীমাংসা তাৎক্ষণিক, আর সমাজব্যবস্থা অটুট থাকে।
আর মুখ খুললে লাভ হবে, সেই নিশ্চয়তাও কেউ দেয় না। টাঙ্গাইলের ওই মা এখন যে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না, সেটা মামলার না। “মেয়ে তো বিয়া দেওন লাগবো। আমি গরিব মানুষ।”
অপরাধ করল একজন শিক্ষক। সমাজের খাতায় দাগ পড়ল নয় বছরের মেয়েটার গায়ে।
➖
অভিযুক্তের কী হলো, সেটা শেষ পর্যন্ত দেখা যাক।
টাঙ্গাইল সদরের ফাতেমা (রা.) মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষক ওবায়দুল্লাহ। অভিযোগ, তিনি জিনের ভয় দেখিয়ে শিশুদের শরীরের সংবেদনশীল জায়গায় হাত দিতেন, মুঠোফোনে ধারণ করতে বলতেন।
ভুক্তভোগীর মায়ের দাবি, শিকার পঁচিশ-ছাব্বিশজন।
এলাকাবাসী বিক্ষোভ করল। ওবায়দুল্লাহ গ্রেপ্তার হলেন। মামলা হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে, যে আইনে জামিন পাওয়া কঠিন।
দুই মাস পর তিনি জামিনে বের হলেন।
তারপর যা করলেন, সেটা এই দেশে সম্পূর্ণ বৈধ। তিনি নতুন নামে আরেকটা মাদ্রাসা খুললেন। আগের মাদ্রাসার জায়গায় এখন ইকরা মাদ্রাসা, তার হেফজখানায় অন্য দশটা শিশু পড়ে।
নাম বদলের কারণ জানতে চাইলে তিনি নিজেই বলেছেন, গ্রেপ্তারের খবর প্রচারে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল, তাই নতুন পরিচয়।
টাঙ্গাইল থানার ওসিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জামিনে ছাড়া পাওয়া কেউ আবার মাদ্রাসা খুলতে পারেন কি না। তার উত্তর, জামিনের পর কে কোথায় কী করছে, সেটা তাদের নজরদারিতে থাকে না।
তদন্ত কর্মকর্তা যোগ করেছেন, জামিনের পর কে কী করবে সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
আর কওমি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী ক্যামেরার সামনে স্বীকার করেছেন, “আইনগতভাবে তো কিছু করার ক্ষমতা বোর্ডের নাই।”
দেশে কওমি ঘরানার নিবন্ধিত মাদ্রাসা প্রায় চল্লিশ হাজার। বোর্ড অন্তত ছয়টা। শিশুর নিরাপত্তা দেখার আইনি ক্ষমতা, শূন্য।
➖
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র দেখে না কেন।
উত্তরের একটা অংশ ইতিহাসে। কওমি মাদ্রাসার জন্মই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বাইরে, ১৮৬৬ সালের দেওবন্দে, সরকারি পয়সা না নেওয়ার পণ নিয়ে।
রাষ্ট্রের অনুদান নাই মানে রাষ্ট্রের খবরদারিও নাই। দেড়শো বছর ধরে এই স্বাধীনতাই ঘরানাটার আত্মপরিচয়।
কিন্তু উত্তরটার আরেকটা অংশ অনেক জাগতিক, এবং সেটা কওমি ঘরানার একজন শীর্ষ ব্যক্তির মুখ থেকেই শোনা ভালো।
শায়খ আহমাদুল্লাহ তার প্রস্তাবের ভূমিকায় লিখেছেন, রাষ্ট্রীয় অনুদান ছাড়া, জনগণের দানে চলা লিল্লাহ বোর্ডিং আর এতিমখানাগুলো লাখো এতিম ও দরিদ্র শিশুর শিক্ষা, আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসার দায়িত্ব বহন করছে।
এবং তারপর তার নিজের বাক্য, “ফলে একদিকে রাষ্ট্র একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকছে।”
কথাটা অভিযোগ হিসাবে বলা হয় নাই। কিন্তু কথাটার মধ্যে হিসাবের জায়গা আছে, এবং হিসাবটা নির্মম।
যে শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র নেয়নি, মাদ্রাসা তাকে ভাত দেয়, ছাদ দেয়। বিনিময়ে রাষ্ট্র ঘরের ভেতরটা দেখতে চায় না।
২০১৮ সালে এই বোঝাপড়া একটা আইনি চেহারাও পেল।
দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হলো, এবং সেই আইনের গোড়াতেই লেখা থাকল, স্বীকৃতিটা দেওয়া হচ্ছে কওমি মাদ্রাসার “স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বজায় রাখিয়া।”
রাষ্ট্র সনদে সিল দিল। চাবিটা চাইল না।
আশ্চর্যের কিছু নাই যে এই ছায়ায় শুধু নিষ্ঠাবানরা না, ব্যবসায়ীরাও ঢুকেছে। ভাড়া ঘর, দুইজন শিক্ষক, একটা সাইনবোর্ড, এতেই দাঁড়িয়ে গেলো প্রতিষ্ঠান।
খোদ আহমাদুল্লাহকেই ষষ্ঠ প্রস্তাবে লিখতে হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত ও মানহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। ভেতরের মানুষও জানেন, দরজাবন্ধ ঘরে কারা ঢুকে পড়েছে।
➖
এই জায়গায় এসে অনেকের মনে হবে, এসব তাহলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রোগ।
ভুল হবে। এটা দরজাবন্ধ প্রতিষ্ঠানের রোগ, ধর্ম যার সবচেয়ে মজবুত তালা মাত্র।
গত দুই দশকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিশু নিপীড়ন তদন্তগুলো হয়েছে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান ঘিরে। আয়ারল্যান্ডে রাষ্ট্র নিজে শিশু-প্রতিষ্ঠান চালাত না, চালাত চার্চ, রাষ্ট্র টাকা দিত আর পরিদর্শন রাখত কাগজে।
২০০৯ সালে রায়ান কমিশনের তদন্তে বের হলো, দশকের পর দশক ধরে চলা নিপীড়ন ব্যতিক্রম ছিল না, ছিল বন্দোবস্তের স্বাভাবিক ফল।
অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল কমিশন চার্চের সঙ্গে বোর্ডিং স্কুল, খেলার একাডেমি, এতিমখানা সব মিলিয়ে একই ছবি পেল। বদ্ধ প্রতিষ্ঠান, প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব, বাইরের চোখের অনুপস্থিতি।
ধর্ম যেটাই হোক, উপাদান এই তিনটাই।
চার্চের প্রতিকারের ধরনটাও দেখার মতো। প্রধান দাওয়াই ছিল বদলি। অভিযুক্ত যাজককে চুপচাপ অন্য প্যারিশে পাঠিয়ে দেওয়া, যেখানে তার অতীত কেউ জানে না।
ওবায়দুল্লাহর নতুন সাইনবোর্ডটা ওই বদলিরই দেশি সংস্করণ। শুধু চার্চের বদলির জন্য একটা আমলাতন্ত্র লাগত, চিঠি লাগত, সিদ্ধান্ত লাগত। এখানে কিছুই লাগে না।
ওই তদন্তগুলো একটা সাবধানবাণীও দিয়ে গেছে।
আমেরিকার জন জে কলেজের গবেষণায় হাজার হাজার কেস ঘেঁটে দেখা গেছে, ব্যাপারটা যাজকদের যৌন অভিমুখের না। যার হাতে যে শিশু ছিল, শিকার হয়েছে সে-ই।
বাংলাদেশের তথ্য একই কথা বলে। বালক মাদ্রাসায় ভুক্তভোগী ছেলে, মহিলা মাদ্রাসায় মেয়ে। নেত্রকোনার অন্তঃসত্ত্বা কিশোরী, চট্টগ্রামের রাহমানিয়া একাডেমির ছয় ছাত্রী, বনশ্রীর আবদুল্লাহ।
কাঠামো এক, কর্তৃত্ব এক। শুধু ঘরে কে ছিল, সেটাই ঠিক করে দেয় ভুক্তভোগী কে।
➖
কাঠামোর ভেতরের মানুষগুলোর দিকেও একবার তাকানো দরকার। কারণ হুজুরও এই ব্যবস্থার বানানো মানুষ।
আহমাদুল্লাহর চতুর্থ প্রস্তাবটা উল্টো করে পড়লে বর্তমান শিক্ষকশ্রেণির একটা ছবি ফুটে ওঠে।
তিনি চাইছেন নিয়োগে অভিজ্ঞ, পরিপক্ব ও বিবাহিত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার, শিক্ষকদের জন্য ফ্যামিলি কোয়ার্টার, নিয়মিত ছুটি।
মানে এখন যারা পড়াচ্ছেন, তাদের বড় অংশ তরুণ, অবিবাহিত, ছাত্রদের সঙ্গেই থাকেন, ছুটি পান না।
অর্থনীতির ছবিটা আরও মলিন।
এক জরিপে দেখা গেছে, কওমি শিক্ষকদের চুরাশি শতাংশের প্রধান অভিযোগ বেতন কম। গ্রামের হেফজখানার শিক্ষক আর শহরের বড় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের আয়ে ফারাক কয়েক গুণ।
এই শিক্ষকদের প্রায় সবাই এসেছেন এই ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই। যে ছেলেটা আট বছর বয়সে গোশত হয়ে ঢুকেছিল, বেত খেয়েছিল, খেদমত করেছিল, বিশ বছর পর সে-ই এখন লাঠিটা ধরে আছে।
এটা কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার কথা না। চক্রটা এখানে মানুষের ভেতর দিয়ে ঘোরে, এইটুকুই কথা। প্রতিষ্ঠান নিজের কর্মী নিজেই বানায়, নিজের ছাঁচ নিজে তৈরি করে।
তার একটা ভালো নমুনা আছে এক টিকটক ভিডিওতে। এক শিক্ষক শিশুর মুখে বেত দিয়ে খোঁচা মারার ভিডিও নিজে পোস্ট করেছেন, ক্যাপশনে লিখেছেন, বাচ্চাদের কান্না করাতে ভালোই লাগে।
কথাটা তিনি লুকিয়ে বলেননি, বলেছেন প্রকাশ্যে। যে জগতে নিষ্ঠুরতা নিষ্ঠার প্রমাণ, সে জগতে কথাটা স্বীকারোক্তি না।
➖
কাগজে অবশ্য সব নিষেধ লেখা আছে।
২০১১ সালে হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর শারীরিক ও মানসিক শাস্তিকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন।
ওই বছরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করে এগারো ধরনের শাস্তি নিষিদ্ধ করেছে, তালিকায় মাদ্রাসার নাম আলাদা করে আছে। শিশু আইন ২০১৩ আছে। সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ আছে।
পনেরো বছর ধরে এই কাগজগুলো আছে। কিন্তু প্রতিকারের লক্ষণ নাই।
কারণটা কাগজের নকশার মধ্যে। ওই নীতিমালা ভাঙলে শাস্তির যে পথ, সেটা সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধি ধরে। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সরকারি কর্মচারী না, তার প্রতিষ্ঠান সরকারের খাতাতেই নাই।
তবু ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে, পরে ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে, প্রথমবারের মতো “বলাৎকার” শব্দটা আইনি সংজ্ঞা পেল, এবং লেখা হলো, ধর্ষণ অর্থে বলাৎকারও অন্তর্ভুক্ত হবে।
তারিখটা খেয়াল করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের জন্ম ২০০০ সালে। মানে পঁচিশ বছর ধরে এই দেশের প্রধান শিশু-সুরক্ষা আইনে ছেলেশিশুর সঙ্গে যা ঘটে, তার কোনো নাম ছিল না।
➖
কওমি পক্ষের একটা আপত্তি আছে, এবং সেটাও ফেলনা না।
এই দেশে মাদ্রাসার দিকে নজরদারির কথা প্রায় প্রতিবারই এসেছে জঙ্গি সন্দেহের ফাইল হাতে, শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্ন নিয়ে না। দরজা বন্ধ রাখার অভ্যাসটা ফলে শুধু গোপনতার লোভ না, একটা অভিজ্ঞতাও।
বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের মহাপরিচালক দাবি করেছেন, তিন মাসে ৫৭টা অভিযোগের ৫২টাই মিথ্যা। প্রমাণ দেননি, তদন্তের কথাও বলেননি।
মিথ্যা অভিযোগ সত্যিই ঘটে। নেত্রকোনার শিক্ষক মোজাফ্ফর সাত বছর জেল খেটে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
যে ব্যবস্থায় তদন্ত নাই, সে ব্যবস্থা নিরপরাধ হুজুরকেও বাঁচায় না, শিশুকেও না।
তাহলে দাঁড়াল কী।
একটা শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ব্যথাই পাঠ্যক্রম। একটা প্রথা, যেখানে শিশুর সেবা শিক্ষকের প্রাপ্য। একটা চুক্তি, যেখানে না-দেখার বিনিময়ে রাষ্ট্র লাখো শিশুর দায় থেকে ছাড় পেয়েছে।
আর অভাব, যেটা অভিভাবককে ওই চুক্তিতে আনে, পরে চুপও করায়।
এই সবকিছুর গোড়ায় সেই নয়টা শব্দ। গোশত আপনার, হাড্ডি আমার।
ছয়টা বোর্ড, চল্লিশ হাজার প্রতিষ্ঠান, একটা রাষ্ট্র, দুইটা মন্ত্রণালয়, একটা হাইকোর্ট। এতগুলোর মাঝখানে আট বছরের একটা শিশুর সম্পদ একটাই, তার শরীর।
রাষ্ট্রকে আগে বিকল্পটা বানাতে হবে। সব শিশু বাড়িতে থেকেও যেন খেতে-পড়তে পারে। যে রাষ্ট্র গরিবের শিশুকে খাওয়াতে পারে না, নজরদারির কথা তার মুখে মানায় না।
এরপর আসে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। সেখানে সিসিটিভির চেয়ে জরুরি তিনটা জিনিস, শিক্ষকের নিয়োগ ও পরিচয়ের একটা খাতা, খেদমতের প্রথা বন্ধ করা, আর অভিযোগ করা পরিবারকে একা না রাখা।
কোনোটাই হয় নাই। এদিকে টাঙ্গাইলের সেই মা এখনো মামলাটা চালাচ্ছেন, একা।