এআই ব্যবহার লুকাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের, নীতি নাই সরকারের

নয় সেপ্টেম্বর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে একাডেমিক ও গবেষণা সততা নিয়ে কনক্লেভ হয়, প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ করা সম্ভব না। তবে কোন কাজে বা গবেষণায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না, কতটুকু যাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় সেটা স্পষ্ট লেখা থাকা উচিত।

গবেষণার জন্য তিনি ‘এআই ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট’ চালুর প্রস্তাব দেন।

গবেষক সেখানে লিখবেন কোন এআই টুল কী কাজে ব্যবহার করেছেন এবং তথ্যের সত্যতা কীভাবে যাচাই করেছেন। তার যুক্তি, ভাষা-মডেল কোনো উত্তরের দায় নেয় না, ফলে দায় নিতে হবে ব্যবহারকারীকে।

নেচার, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন এবং পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন গত তিন বছরে একই অবস্থানে এসেছে। দেশের উচ্চশিক্ষার তদারকি সংস্থার প্রধান এবার প্রকাশ্যে সেই কথা বললেন।

শিক্ষার্থীদের চর্চা চলছে উল্টা দিকে।

রিসার্চ ফর বাংলাদেশ একশোর বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখেছে, সাতাশি শতাংশ অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন বা থিসিসে কোনো না কোনো মাত্রায় এআই ব্যবহার করেন, কিন্তু সেটা স্বীকার করেন না।

কারণ হিসেবে তারা বলেছেন নম্বর কমে যাওয়া, ফেল বা বাতিল হওয়া এবং নিজের কাজ ছোট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

এআই-ব্যবহার জানাতে বলে এমন কোনো জাতীয় নিয়ম দেশে এখনো নাই। শিক্ষার্থীরা লুকাচ্ছেন শিক্ষকের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায়।

➖

দেশে এআই-ব্যবহারে শাস্তির যে দুইটা ঘটনা খবর হয়েছে, দুইটাই গত ডিসেম্বরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়।

দুইজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষার হলে ফোনে চ্যাটজিপিটি থেকে উত্তর নিতে গিয়ে ধরা পড়েন। একজনের পরীক্ষা বাতিল হয় এবং ভবিষ্যতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া নিষিদ্ধ হয়, আরেকজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাত দিনের কারাদণ্ড দেয়।

বন্ধ-বই পরীক্ষায় বাইরের সাহায্য নেওয়া যেকোনো নিয়মে নকল।

তবে দেশের সংবাদমাধ্যমে একাডেমিক কাজে এআই-ব্যবহারের খবর বলতে এই দুই ঘটনার খবর, ব্যবহারের অন্য কোনো ধরন খবর হয় নাই।

দেশে একাডেমিক সততার যে লিখিত নিয়ম আছে, সেখানে মানদণ্ড হলো মিলের শতাংশ, অর্থাৎ জমা দেওয়া লেখার কতটুকু আগে প্রকাশিত কোনো লেখার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, সেটাই মাপা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল তেইশ সালের জানুয়ারিতে চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধ নীতিমালা পাস করে, একটা থিসিসের আটানব্বই শতাংশ নকল ধরা পড়ার পর।

নীতিমালায় বিশ শতাংশ পর্যন্ত মিল গ্রহণযোগ্য।

বিশ থেকে চল্লিশে দশ হাজার টাকা জরিমানা, চল্লিশ থেকে ষাটে বিশ হাজার, ষাটের উপরে ত্রিশ হাজার টাকা এবং দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা, নয়তো ডিগ্রি বাতিল।

ইউজিসি একুশ সালে ত্রিশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য টার্নইটইন কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সফটওয়্যারটা যে ভাষাগুলোতে মিল খোঁজে, বাংলা তার মধ্যে নাই।

জেনারেটিভ এআই প্রতিবার শব্দ সাজিয়ে নতুন বাক্য তৈরি করে, ফলে কোনো উৎসের সঙ্গে সেই লেখার মিল প্রায় থাকে না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে পঁচিশ সালে পিএলওএস ওয়ানে গবেষণা ছাপা হয়। সেখানে এক শিক্ষার্থী বলেছেন, কুইলবট বা চ্যাটজিপিটি দিয়ে নিজের ফলাফল প্যারাফ্রেজ করে নেন, তাতে মিলের হার শূন্যের কাছে নামে।

আরেকজন বলেছেন, টার্নইটইন বা কোনো এআই ডিটেক্টর দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট পরীক্ষার চর্চা তাদের বিভাগে নাই।

ফলে দেশের একমাত্র লিখিত নিয়ম এআই-ব্যবহার নিয়ে কিছু বলে না, এবং কোন ব্যবহার চলবে, কোনটা চলবে না, সেটা ঠিক হয় শিক্ষকভেদে।

এই বছরের মে মাসে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উনচল্লিশজন শিক্ষকের উপর জরিপ প্রকাশিত হয়।

প্রতি আটজনে একজন বলেছেন তাদের প্রতিষ্ঠানে এআই নিয়ে স্পষ্ট নীতি আছে, প্রতি দশজনে চারজন বলেছেন নাই। তাদের একজনের ভাষায়, প্রতিষ্ঠানে কোনো নীতি বা নির্দেশিকা নাই, আছে শুধু প্লেজিয়ারিজম ধরার সফটওয়্যার।

➖

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা আটটা পাবলিক ও আটটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনশো চুরাশিজন শিক্ষার্থীর উপর জরিপ চালিয়েছেন, ফলাফল গত সেপ্টেম্বরে এফ১০০০রিসার্চে প্রকাশিত।

সাতানব্বই শতাংশ শিক্ষার্থী চ্যাটজিপিটির ফ্রি সংস্করণ ব্যবহার করেন, পেইড সংস্করণ ব্যবহার করেন তিন শতাংশের কম।

এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেখানে বলেছেন, প্রিমিয়াম সংস্করণ কেনার সামর্থ্য তার নাই।

চ্যাটজিপিটি প্লাসের দাম মাসে বিশ ডলার, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মাসের হারে দুই হাজার চারশো ছাপ্পান্ন টাকা, বাংলাদেশের মাথাপিছু মাসিক আয়ের প্রায় বারো ভাগের এক ভাগ।

দাম দেওয়ার উপায়ও সীমিত। পেপ্যাল নাই, আন্তর্জাতিক কার্ড পেতে পাসপোর্ট লাগে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাতে আছে শুধু বিকাশ বা নগদ।

গুগল গত বছর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এক বছরের ফ্রি এআই প্রো দিয়েছিল, সেটা নিতেও লাগত ডুয়াল-কারেন্সি কার্ড।

ফেসবুকের পেজে বিকাশে তিনশো ষাট টাকায় মাসিক শেয়ারড চ্যাটজিপিটি প্লাস বিক্রি হয়, এক অ্যাকাউন্টে দশজন।

বিক্রেতার শর্ত ভাঙলে ক্রেতাকে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকাউন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থী যখন উন্নত এআই ব্যবহার করেন, প্রায়ই সেটা করেন অন্যের লগইনে, কোম্পানির শর্ত ভেঙে, এবং ব্যবহারের পর সেটা ক্লাসে এবং শিক্ষকের কাছে গোপন রাখেন।

➖

রিসার্চ ফর বাংলাদেশের একই জরিপে প্রতি তিনজনে দুইজন শিক্ষার্থী বলেছেন, কেউ কখনো তাদের গবেষণায় উৎসাহ দেয় নাই।

একাডেমিক গবেষণা কীভাবে করতে হয়, তার ন্যূনতম ধারণা আছে বলে মনে করেন মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এই ঘাটতি এআই আসার অনেক আগের।

দেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত কলেজ দুই হাজার দুইশো সাতান্নটা, শিক্ষার্থী সাড়ে তেত্রিশ লাখের বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই বলে, তাদের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ গ্রাম ও মফস্বলের। বাইশ-তেইশ অর্থবছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-বরাদ্দের আটাশি শতাংশ খরচ হয় নাই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও কাছাকাছি।

পঁচিশ-ছাব্বিশ অর্থবছরে সাতান্নটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটে গবেষণার ভাগ একশো টাকায় দেড় টাকার কম।

ইউজিসির পঞ্চাশতম বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, অনুমোদিত পিএইচডি প্রোগ্রাম আছে এমন ত্রিশটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই প্রতিবেদন-বছরে একটাও পিএইচডি বের হয় নাই।

প্রথম আলোর আগস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উনিশ সাল থেকে বাংলাদেশি অ্যাফিলিয়েশনের তিনশো পঁচিশটা গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার হয়েছে।

কারণ পিয়ার রিভিউয়ে কারসাজি, ডেটার অসঙ্গতি, প্লেজিয়ারিজম ও পেপার মিল।

এই প্রত্যাহারের কোনোটার কারণ হিসেবে এআই-লিখিত লেখার উল্লেখ পাওয়া যায় নাই, দেশের নথিভুক্ত গবেষণা-অসদাচরণ এআই ছাড়াই ঘটেছে।

➖

তেইশ সালে পিএলওএস বায়োলজিতে আট দেশের নয়শো আটজন পরিবেশবিজ্ঞানীর উপর গবেষণা প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশ ছিল নমুনায়।

যেসব দেশে ইংরেজির দখল কম, সেখানকার তরুণ গবেষক পেপার পড়তে ইংরেজিভাষীর প্রায় দ্বিগুণ সময় নেন, লিখতে দেড় গুণ, এবং ভাষার কারণে তাদের লেখা প্রত্যাখ্যাত হয় আড়াই গুণ বেশি।

গত ডিসেম্বরে সায়েন্সে কর্নেল ও বার্কলের গবেষকরা একুশ লাখ প্রিপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, এলএলএম ব্যবহার শুরুর পর গবেষকদের প্রকাশনা বেড়েছে এক-তৃতীয়াংশ থেকে প্রায় ষাট শতাংশ পর্যন্ত।

সবচেয়ে বেশি বেড়েছে যাদের প্রথম ভাষা ইংরেজি না।

এশিয়ার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা গবেষকদের প্রকাশনা সাইটভেদে বেড়েছে তেতাল্লিশ থেকে উননব্বই শতাংশ।

গবেষণার প্রধান লেখকের পূর্বাভাস, বিজ্ঞানের উৎপাদন সেসব অঞ্চলের দিকে সরবে, যারা এতদিন ভাষার বাধায় পিছিয়ে ছিল।

এই হিসাবে সবচেয়ে বেশি লাভ বাংলাদেশের সেই শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষকের, যিনি ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে আটকে যান।

➖

উগান্ডায় সানবার্ড এআই নামের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে পাঁচশো ঘণ্টার বেশি রেডিও অনুষ্ঠান এবং হাজার হাজার পৃষ্ঠা বই ও স্কুলের পাঠ্য ডিজিটাল করেছে।

এই উপকরণ দিয়ে তৈরি মডেলের নাম সানফ্লাওয়ার, পঁচিশ সালের অক্টোবরে উগান্ডার আইসিটি মন্ত্রণালয় সেটা উদ্বোধন করে।

উগান্ডার একত্রিশটা ভাষার চব্বিশটায় অনুবাদে মডেলটা চ্যাটজিপিটি ও জেমিনি ২.৫ প্রো-কে ছাড়িয়ে গেছে।

মডেলের নতুন আপডেট সাতষট্টিটা আফ্রিকান ভাষা বোঝে, ছোট সংস্করণগুলো স্মার্টফোনে চলে এবং উন্মুক্ত লাইসেন্সে যে কেউ বিনা খরচে বদলে নিতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে এইচথ্রিডি আফ্রিকার প্রথম সমন্বিত ওষুধ-আবিষ্কার কেন্দ্র।

এরসিলিয়া নামের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে তারা এমন এআই টুল বানিয়েছে, যা দিয়ে প্রোগ্রামিং না-জানা ল্যাবের বিজ্ঞানীও ওষুধের সম্ভাব্য অণু বাছাইয়ের মডেল চালাতে পারেন।

তাদের কর্মশালায় আবেদন এত বেশি পড়েছিল যে দশজন আবেদনকারীর মধ্যে জায়গা পেয়েছেন এক-দুইজন।

পরে বিনামূল্যের অনলাইন কোর্সে যোগ দেন একশো ষাটজনের বেশি গবেষক, যাদের অধিকাংশের কম্পিউটেশনের অভিজ্ঞতা সামান্য বা শূন্য, সবচেয়ে বেশি এসেছিলেন নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে।

প্রোটিনের গঠন বের করার এআই আলফাফোল্ড চব্বিশ সালে রসায়নে নোবেল এনেছে।

গুগল ডিপমাইন্ডের হিসাবে এর ব্যবহারকারী একশো নব্বইটা দেশের ত্রিশ লাখের বেশি গবেষক, তার মধ্যে দশ লাখের বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে।

যে গবেষণায় একসময় কোটি টাকার ল্যাব ও বছরের পর বছর লাগত, ম্যালেরিয়া বা যক্ষ্মার প্রোটিন নিয়ে আফ্রিকার তরুণ গবেষকরা এখন সেটা করছেন ফ্রি ডেটাবেজ থেকে।

নাইজেরিয়ার এদো রাজ্যে বিশ্বব্যাংক চব্বিশ সালে স্কুল-পরবর্তী ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে জিপিটি-ফোর দিয়ে ছয় সপ্তাহ পড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীরা যতটা এগিয়েছে, সাধারণ পড়াশোনায় তাতে দেড় থেকে দুই বছর লাগে, এবং মেয়েরা এগিয়েছে বেশি।

এই কাজগুলোর কোনোটাতেই এআই শিক্ষার্থী বা গবেষককে একা ছেড়ে দেয় নাই। প্রতিটাতে আগে থেকে ঠিক করা ছিল কোন কাজে টুল লাগবে, এবং সঙ্গে ছিল প্রশিক্ষণ বা শিক্ষকের তত্ত্বাবধান।

➖

তেইশ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসের সায়েন্স পো লিখিত কাজে চ্যাটজিপিটি নিষিদ্ধ করে, শাস্তি বহিষ্কার পর্যন্ত।

নিউ ইয়র্ক সিটির স্কুলগুলোতে চ্যাটজিপিটি ব্লক হয়, জার্নাল সায়েন্স এআই-লিখিত যেকোনো লেখা নিষিদ্ধ করে।

নিউ ইয়র্ক নিষেধ তুলে নেয় চার মাস পরে, সায়েন্স নীতি বদলায় নভেম্বরে, ঘোষণা দিলে এআই-ব্যবহার অনুমোদিত।

যে মীমাংসায় এসে প্রতিষ্ঠানগুলো থেমেছে, সেখানে এআই লেখক হতে পারে না, কারণ দায় নিতে পারে না। ব্যবহার অনুমোদিত, কোন কাজে কতটুকু তা ঠিক করেন শিক্ষক বা জার্নাল।

অপরাধ ধরা হয় ব্যবহার গোপন করাকে।

প্রিন্সটন শিক্ষার্থীদের বলে এআই-ব্যবহার ‘ডিসক্লোজ’ করতে, সাইট করতে না, কারণ এআই কোনো উৎস না, অ্যালগরিদম।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে পঁচিশ সাল থেকে পরীক্ষা ছাড়া সব অ্যাসাইনমেন্টে এআই অনুমোদিত, শিক্ষার্থী শুধু জানান কোথায় ব্যবহার করেছেন।

তার নিজের দক্ষতা দেখা হয় আলাদা মূল্যায়নে, শিক্ষকের সামনে।

প্রকাশক এলসেভিয়ারের জার্নালে ঘোষণার বাক্য নির্ধারিত। লেখক জানাবেন কোন টুল কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন এবং লিখবেন, ব্যবহারের পর তিনি লেখাটা পর্যালোচনা ও সম্পাদনা করেছেন, প্রকাশিত লেখার পুরা দায় তার।

মিসরের সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইউনিভার্সিটিজ পঁচিশ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা ও গবেষণায় যেকোনো এআই-ব্যবহার ঘোষণা বাধ্যতামূলক করেছে।

ঘোষণায় থাকবে টুলের নাম, সংস্করণ, উদ্দেশ্য এবং মানুষের অংশ কতটুকু।

পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সব স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে তিন ক্রেডিটের এআই কোর্স বাধ্যতামূলক করেছে।

আগস্টের খসড়া নীতিতে তারা এআই-ব্যবহার জানানো বাধ্যতামূলক করেছে, সঙ্গে বলেছে প্রতিটা কোর্সের শুরুতেই শিক্ষক লিখে দিবেন কোন কাজে এআই চলবে।

এই সব নীতিতে আগে ঠিক করা হয়েছে কোন ব্যবহার বৈধ, তারপর শিক্ষার্থীকে জানাতে বলা হয়েছে।

কোন ব্যবহার বৈধ সেটা লেখা না থাকলে ফর্মে এআই-ব্যবহারের কথা লেখা মানে নিজের দোষ নিজে স্বীকার করা।

রিসার্চ ফর বাংলাদেশের জরিপের সাতাশি শতাংশ শিক্ষার্থী এখন এই স্বীকারোক্তিটাই এড়িয়ে যাচ্ছেন।

➖

এআই-ব্যবহার ধরার জন্য বাজারে কয়েকটা ডিটেক্টর সফটওয়্যার আছে।

তেইশ সালে স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এমন সাতটা ডিটেক্টরে একানব্বইটা টোফেল রচনা পরীক্ষা করেন।

রচনাগুলো লিখেছিলেন এমন শিক্ষার্থীরা, যাদের প্রথম ভাষা ইংরেজি না, এবং প্রত্যেকে লিখেছিলেন নিজের হাতে, কোনো এআই ছাড়া।

ডিটেক্টরগুলো গড়ে একষট্টি শতাংশ রচনাকে এআই-লিখিত বলে রায় দেয়, প্রায় সবগুলো রচনা অন্তত একটা ডিটেক্টরে ধরা পড়ে।

অথচ মার্কিন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের রচনায় একই ডিটেক্টর প্রায় কোনো ভুল করে নাই।

অর্থাৎ একই সফটওয়্যার ইংরেজিভাষী কিশোরের লেখাকে মানুষের লেখা বলে চিনেছে, আর বিদেশি শিক্ষার্থীর নিজের লেখাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এআইয়ের লেখা বলেছে।

গবেষকরা এর কারণ পেয়েছেন শব্দভান্ডারে। সরল শব্দ ও চেনা বাক্যগঠনকে ডিটেক্টর এআই-লেখার লক্ষণ ধরে নেয়, অথচ দ্বিতীয় ভাষায় লেখা মানুষ ঠিক এভাবেই লেখেন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিও এই সরল শব্দে লেখা। ডিটেক্টর দিয়ে বিচার শুরু হলে এআই না ব্যবহারেও সবচেয়ে বেশি অভিযোগের মুখে পড়বেন তারাই।

একই গবেষণায় আরেকটা ফল আছে।

রচনাগুলো চ্যাটজিপিটি দিয়ে ইংরেজিভাষীর ঢঙে নতুন করে লিখিয়ে নিলে ভুল রায় বারো শতাংশের নিচে নেমে আসে।

ফলে যে শিক্ষার্থী নিজে লিখেছেন তিনি ধরা পড়েন, এবং যিনি এআই দিয়ে লেখা ঘষে নিয়েছেন তিনি পার পেয়ে যান। ডিটেক্টর এখানে সততার শাস্তি দেয়, আর এআই-ব্যবহারকে আরও গোপন করতে শেখায়।

নির্মাতারা নিজেরাও এই সীমা মেনেছে। ওপেনএআই তেইশ সালে নিজেদের বানানো ডিটেক্টর চালুর ছয় মাসের মাথায় বন্ধ করে দেয়।

সেটা এআই-লেখার মাত্র চারভাগের একভাগ ধরতে পারত, এবং মানুষের লেখার নয় শতাংশকে ভুল করে এআই-লিখিত বলত।

একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় টার্নইটইন এআই ডিটেক্টর ব্যবহার বন্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, টার্নইটইন নিজে যে এক শতাংশ ভুলের হার দাবি করে, সেটা সত্য ধরলেও বছরে পঁচাত্তর হাজার লেখার মধ্যে প্রায় সাড়ে সাতশো শিক্ষার্থী মিথ্যা অভিযোগের মুখে পড়তেন।

টার্নইটইন নিজেও বলে, তাদের এআই-স্কোর একমাত্র প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা উচিত না।

ডিটেক্টরের রায় একটা সম্ভাবনার হিসাব, প্রমাণ না। কিন্তু যে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সেই হিসাব যায়, তার হাতে নির্দোষ প্রমাণের কোনো উপায় থাকে না, কারণ নিজে লিখেছেন সেটা দেখানোর কোনো নথি সাধারণত কারো কাছে থাকে না।

মানুষ পরীক্ষকও এই কাজে ভালো না। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা তেইশ সালে জিপিটি-ফোরের লেখা উত্তর আসল পরীক্ষার খাতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, ফলাফল প্রকাশিত হয় চব্বিশ সালে।

পরীক্ষকরা এসব উত্তরের চুরানব্বই শতাংশ চিনতে পারেন নাই, এবং এআই-উত্তরগুলো গড়ে শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে।

এসব কারণে পাকিস্তানের খসড়া নীতিতে আলাদা ধারা রাখা হয়েছে যে শুধু ডিটেক্টরের রিপোর্ট দেখে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।

ইউজিসি চেয়ারম্যানও কনক্লেভে বলেছেন, মূল্যায়নে কেবল সফটওয়্যারের উপর ভরসা না করে মৌখিক পরীক্ষা, গবেষণার খসড়া সংরক্ষণ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের মতো পদ্ধতি চালু করতে হবে।

ওই অনুষ্ঠানে আলোচকদের একজন ছিলেন টার্নইটইনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক।

➖

কনক্লেভের তিন দিন আগে, ছয় সেপ্টেম্বর, ইউজিসি ভবনে আঠারোটা পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে অংশীজন সংলাপ হয়।

বিষয় ছিল সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধ নীতিমালার খসড়া। সংলাপে অংশীজনেরা পরামর্শ দেন, গবেষণা ও একাডেমিক কাজে এআই-ব্যবহারে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও যথাযথ স্বীকৃতির বিষয়টাও নীতিমালায় যোগ হোক।

খসড়া পরিমার্জনের পর কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সভায় উঠবে, তারপর যাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ফলে দেশে এআই-ব্যবহারের প্রথম জাতীয় নিয়ম সম্ভবত আসবে চৌর্যবৃত্তির নীতিমালার অংশ হিসেবে, মিলের শতাংশ হিসাবসর কাঠামোর ভিতরে।

ইউজিসি উচ্চশিক্ষায় এআইয়ের আলাদা জাতীয় নীতিমালার কথাও বলেছে।

এপ্রিলে চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনে এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সেই নীতিমালার কাজ চলছে। পাঁচ মাসে কোনো খসড়া প্রকাশ পায় নাই।

আইসিটি বিভাগের জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০-এর খসড়া ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে, এখনো মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায় নাই।

খসড়ার শিক্ষা-অংশে আছে ‘এআই-প্রতিরোধী মূল্যায়ন’, পরীক্ষার নিরাপত্তা জোরদার এবং এআই টুলের উপর অতিনির্ভরতা সীমিত করার কথা।

কোন ব্যবহার অনুমোদিত, বা ব্যবহার কীভাবে জানাতে হবে, খসড়ায় সেই কথা নাই।

জুনে প্রধানমন্ত্রী এআইয়ের যুগের জন্য পাঠ্যক্রম আধুনিক করার কথা বলেছেন, আগস্টে শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে এআই-ব্যবহারে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন।

সরকারের বক্তৃতায় এআই গ্রহণের নির্দেশ, কিন্তু একমাত্র প্রকাশিত জাতীয় খসড়া লেখা হয়েছে সেই ব্যবহার ঠেকানোর ভাষায়।

➖

ভারতে চ্যাটজিপিটির সস্তা ‘গো’ সংস্করণ পঁচিশ সালের নভেম্বর থেকে এক বছরের জন্য ফ্রি, প্রচারের সময়ে যারা সাইন আপ করেছেন তাদের জন্য।

দেশটার কারিগরি শিক্ষা পরিষদ অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য দেড় লাখ ফ্রি লাইসেন্সও নিয়েছে, মেয়াদ ছয় মাস।

জানুয়ারিতে ওপেনএআইয়ের দেশভিত্তিক শিক্ষা-কর্মসূচির প্রথম দলে কাজাখস্তান পেয়েছে এক লাখ পঁয়ষট্টি হাজার চ্যাটজিপিটি এডু লাইসেন্স। দাম দিয়েছে দেশের বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হোল্ডিং। বাংলাদেশ সেই দলে নাই।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি মে মাসে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি নবায়ন করেছে, বছরে এক কোটি ত্রিশ লাখ ডলারে। চার লাখ সত্তর হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং তেষট্টি হাজার শিক্ষক-কর্মী মিলিয়ে মাথাপিছু খরচ বছরে প্রায় সাড়ে চব্বিশ ডলার, খুচরা দামের দশ ভাগের এক ভাগ।

এই দামেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে তেত্রিশ লাখ শিক্ষার্থীকে লাইসেন্স দিতে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা লাগবে, শিক্ষার্থীপ্রতি প্রায় তিন হাজার টাকা।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে খরচ করে আটশো টাকার কম, এবং এই খরচ চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের আয় থেকে, ইউজিসি কোনো পরিচালন বাজেট দেয় না।

লাইসেন্সের টাকা দিতে হবে প্রতি বছর, এবং চুক্তি শেষ হলে দেশের হাতে কোনো মডেল বা অবকাঠামো থাকবে না।

➖

লাইসেন্সে ভাষার সমস্যা সমাধান হয় না। লাইসেন্সে কতটুকু কাজ করা যাবে তা মাপা হয় টোকেনে, এবং চ্যাটজিপিটির বর্তমান টোকেনাইজারে একই লেখা বাংলায় ইংরেজির চেয়ে প্রায় দেড় গুণ টোকেন নেয়, কিছু জনপ্রিয় উন্মুক্ত মডেলে সাড়ে চার গুণ।

কোন বাংলা, ভারতের না বাংলাদেশের, লেখা পড়িয়ে মডেলগুলো শেখানো হয়েছে, কোম্পানিগুলো তা প্রকাশ করে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস ও জার্নাল, বাংলা একাডেমির অভিধান ও পরিভাষার বড় অংশ কোনো উন্মুক্ত ভাণ্ডারে ওঠে নাই।

এই কাজে রাষ্ট্রের বড় উদ্যোগ ছিল কম্পিউটার কাউন্সিলের বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প। ষোলো সালে তিন বছরের জন্য শুরু হয়ে প্রকল্পটা চলেছে এই জুন পর্যন্ত, বরাদ্দ প্রায় একশো উনষাট কোটি টাকা। বাইশ সালে এর ষোলোটা লক্ষ্যের মধ্যে পূর্ণ হয়েছিল একটা।

দেশে মডেল বানানোর দক্ষতা আছে, ঘাটতি কম্পিউটিংয়ের। হিসাব নামের প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা মেটার উন্মুক্ত মডেলের উপর প্রায় সাঁইত্রিশ বিলিয়ন টোকেন বাংলা লেখা পড়িয়ে টিটুএলএলএম নামের মডেল বানিয়েছেন এবং সবার জন্য খুলে দিয়েছেন।

তাদের গবেষণাপত্রে লেখা আছে, কম্পিউটিংয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ছোট মডেলেই থামতে হয়েছে।

কাজাখস্তান ওপেনএআইয়ের লাইসেন্স পাওয়ার এক বছরেরও বেশি আগে নিজের ভাষার মডেল কাজএলএলএম বানিয়েছে। এর নেতৃত্বে ছিল নাজারবায়েভ বিশ্ববিদ্যালয়, সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় ভাষা-কেন্দ্র।

প্রশিক্ষণের কারিগরি অবকাঠামো দিয়েছে মোবাইল অপারেটর বিলাইনের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান কিউকোড। বিলাইন কাজাখস্তানের বেশিরভাগ মালিকানা ভিওন গ্রুপের, যে গ্রুপ বাংলাদেশে বাংলালিংকেরও মালিক।

ভারতের ইন্ডিয়াএআই মিশনে সরকার নিজে ডেটা সেন্টার বানায় নাই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জিপিইউ তালিকাভুক্ত করে গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপের জন্য ভাড়ায় ভর্তুকি দিচ্ছে।

দেশি মডেল বানাতে সর্বম এআইয়ের ছয় মাসের কম্পিউটিং বিলের প্রায় চল্লিশ শতাংশ দিয়েছে ভারত সরকার, আটানব্বই কোটি রুপির বেশি, টাকার হিসাবে প্রায় একশো ছাব্বিশ কোটি।

তুলনার জন্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে তেত্রিশ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে যদি ক্যালিফোর্নিয়ার দরে চ্যাটজিপিটি এডুর লাইসেন্স দেওয়া হয়, মাথাপিছু বছরে প্রায় তিন হাজার টাকায়, তাহলে বছরে খরচ দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। সর্বমের পুরা ভর্তুকি সেই এক বছরের লাইসেন্স খরচের প্রায় আট ভাগের এক ভাগ।

বাংলাদেশে এমন অংশীদারত্বের পক্ষগুলো আছে। আরো আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জুড়ে রাখা গবেষণা-নেটওয়ার্ক বিডিরেনের ট্রাস্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ইউজিসি বিডিরেন নামে একটা ট্রাস্ট বানিয়েছে, যেটা নিজের নেটওয়ার্কে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করেছে এবং যার চেয়ারম্যান ইউজিসি চেয়ারম্যান নিজে।

জুনের শেষে বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে আড়াইশো মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আছে, এবং বিনিয়োগের খাতের মধ্যে এআই আছে।

রাষ্ট্রের কাজ এই পক্ষগুলোকে এক জায়গায় আনা। বেসরকারি কম্পিউটিংয়ে ভর্তুকি দিতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস ও জার্নাল উন্মুক্ত ভাণ্ডারে তোলার নিয়ম করতে হবে, এবং শর্ত রাখতে হবে যে মডেল ও ডেটা ছাড়া হবে উন্মুক্ত লাইসেন্সে।

➖

এআই শেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করে, এমন নিশ্চয়তা কোনো গবেষণায় মিলে নাই। তুরস্কে প্রায় এক হাজার মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর উপর হোয়ার্টনের গবেষকদের পরীক্ষা পঁচিশ সালে পিএনএএসে ছাপা হয়েছে।

সাধারণ চ্যাটজিপিটি-ধাঁচের টুল হাতে পাওয়া শিক্ষার্থীরা অনুশীলনে আটচল্লিশ শতাংশ ভালো করেছে, পরে এআই ছাড়া পরীক্ষায় তারা পিছিয়ে গেছে সতেরো শতাংশ।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করছেন খোলা ফ্রি চ্যাটবট, এবং তাদের বড় অংশকে কেউ গবেষণা করার পদ্ধতি শেখায় নাই। তুরস্কের পরীক্ষায় ক্ষতি হয়েছিল এই দুই শর্তে।

সায়েন্সের গবেষণা পর্যবেক্ষণমূলক। প্রকাশনা বেড়েছে, কিন্তু এলএলএম দিয়ে ঘষামাজা করা জটিল ভাষা এখন আর লেখার মানের নির্ভরযোগ্য সংকেত না, এবং বেশি পেপার মানে ভালো গবেষণা, সেই হিসাব কেউ দেখায় নাই।

ঘোষণার নিয়ম আছে এমন জার্নালেও ঘোষণা আসে কম। এই বছর পিএনএএসে প্রকাশিত আরেক গবেষণা পাঁচ হাজারের বেশি জার্নাল দেখেছে, তার সত্তর শতাংশের এআই-নীতি আছে, তবু তেইশ সালের পরের পঁচাত্তর হাজার পেপারের মধ্যে এআই-ব্যবহার ঘোষণা করেছে মাত্র ছিয়াত্তরটা।

নীতির মতভেদও শেষ হয় নাই। চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক থিসিসে ডেটা তৈরি, মূল লেখা ও ভাষা-পরিমার্জনসহ ছয়টা কাজে এআই নিষিদ্ধ করেছে, নিউ ইয়র্ক সিটি এই মাসে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের এআই-ব্যবহারে এক বছরের বিরতি দিয়েছে।

এআইয়ের পক্ষে বহুল উদ্ধৃত একটা গবেষণাও এপ্রিলে প্রত্যাহার হয়েছে।

চীনের হাংঝো নর্মাল ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক আগের একান্নটা গবেষণার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে দাবি করেছিলেন, চ্যাটজিপিটি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ফলে বড় উন্নতি আনে। স্প্রিংগার নেচারের একটা জার্নালে পঁচিশ সালের মে মাসে প্রকাশিত লেখাটা আড়াইশোর বেশি গবেষণায় উদ্ধৃত হয়েছিল।

বাইশে এপ্রিল জার্নাল লেখাটা প্রত্যাহার করে, কারণ বিশ্লেষণে এমন অসঙ্গতি পাওয়া গেছে যে সম্পাদক এর ফলাফলের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না।

➖

ইউজিসির অভিন্ন চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধ নীতিমালার খসড়া মার্চ থেকে ঘুরছে। নয় মার্চ একুশটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-নিশ্চয়তা কর্মকর্তাদের নিয়ে কর্মশালায় খসড়ার বিষয় ছিল উদ্ধৃতি, ডেটা-ব্যবহার ও গবেষণার নৈতিকতা।

এআইয়ের উল্লেখ ছিল না।

ছয় সেপ্টেম্বরের সংলাপে এআই-ব্যবহারের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও স্বীকৃতি যোগ করার পরামর্শ এসেছে অংশীজনদের কাছ থেকে। পরিমার্জিত খসড়া এখনো কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সভায় ওঠে নাই, এবং এআই নিয়ে তাতে কী লেখা হচ্ছে, কমিশন প্রকাশ করে নাই।

কমিশনের খসড়ায় ঘোষণার ফর্মের আগে লেখা থাকা দরকার কোন কাজে এআই বৈধ, এবং প্রতিটা কোর্সের শিক্ষক সেটা সিলেবাসে লিখে দিবেন। খসড়ায় এটাও লেখা থাকা দরকার যে শুধু ডিটেক্টরের রিপোর্ট দেখে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।

ঘোষণা হবে বর্ণনামূলক, কোন টুল কী কাজে লাগানো হয়েছে এবং তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, চেয়ারম্যান নিজে যেমন প্রস্তাব করেছেন।

বিদেশি লাইসেন্সে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকা খরচের পথে যাওয়ার আগে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের নিজের এআই বানানোর কাজও শুরু করা দরকার, সরকার ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থিসিস, জার্নাল এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম উন্মুক্ত লাইসেন্সে এক ভাণ্ডারে তোলার দায়িত্ব নিতে পারে ইউজিসি। ভাণ্ডারটা রাখার ও পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো তৈরি আছে। আগস্টে বিডিরেনের মাধ্যমে ইউজিসি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণা-সামগ্রীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রবেশাধিকার বাড়ানোর চুক্তি করেছে। বিদেশি জার্নাল যে পথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছায়, দেশের নিজের ভাণ্ডার ও মডেলও একই পথে পৌঁছাতে পারে।

কম্পিউটিংয়ের খরচ ভাগ করে নিতে পারে মোবাইল অপারেটর ও ব্যাংক, ভারত যেভাবে বেসরকারি জিপিইউর ভাড়ায় ভর্তুকি দিচ্ছে।

জুনে ভিওন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এআইসহ যে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিয়েছে, উচ্চশিক্ষার বাংলা মডেল সেখানে নির্দিষ্ট একটা প্রকল্প হতে পারে। মডেল বানানোর কাজ খোলা প্রতিযোগিতায় যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব ও দেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে।

এই অংশীদারত্বের চুক্তিতে শুরুতেই লেখা থাকা দরকার বাজেট, সময়সীমা, এবং মডেল ও ডেটা উন্মুক্ত লাইসেন্সে ছাড়ার শর্ত। আইসিটি বিভাগের খসড়া নীতিমালায় এর কোনোটাই এখনো লেখা হয় নাই।

কনক্লেভে চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ভাষা-মডেল কোনো উত্তরের দায় নেয় না, দায় নিতে হবে ব্যবহারকারীকে। দেশের সব শিক্ষার্থীর কাছে সেই দায় চাওয়ার আগে কমিশনকে লিখে দিতে হবে কোন ব্যবহার বৈধ।

রাষ্ট্রকেও ঠিক করতে হবে, তারা কোন ভাষার, কার বানানো টুল দিয়ে কাজ করবেন।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন