দিনরাত স্মার্ট হতে চাওয়া বাংলাদেশ যেই প্রশ্ন কোনোদিন করে নাই

গত বছর পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর আদালতগুলির একটার প্রধান প্রসিকিউটর একদিন অফিসে এসে দেখলেন, তার ইমেইল খুলছে না।

এই প্রসিকিউটরের নাম কারিম খান। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর তিনি। কাহিনী হলো, তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র তার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো, এবং তার মাইক্রোসফট-নির্ভর ইমেইল অচল হয়ে গেলো।

হেগের এই আদালতকে বলা যায় আন্তর্জাতিক আইনের চূড়া। অথচ তাদের ইমেইলের ইনবক্স খোলার ক্ষমতা ছিল অন্য এক রাষ্ট্রের করপোরেশনের হাতে।

তার ফলই ভোগ করতে হয়েছিলো কারিম খানকে।

ইউরোপ ঘটনাটা ভোলে নাই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক প্রতিযোগিতা কমিশনার মার্গ্রেথে ভেস্টাগার পরে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য টাইমস’-কে বলেছেন, একজন বিচারকের ইমেইল যদি একবার বন্ধ করা যায়, সেটা আবারও করা যাবে।

এই নির্ভরতা যেকোনো দিন অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে ইউরোপের বিরুদ্ধেও।

এইখানে একটা জিনিস খেয়াল করার মতো। এই আতঙ্ক গরিব দেশের না। এই আতঙ্ক স্বয়ং ইউরোপের। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী, সবচেয়ে নিয়ন্ত্রণ-সক্ষম ব্লকের।

ইউরোপের ক্লাউড-বাজারে তাদের নিজেদের কোম্পানির ভাগ গত সাত বছরে ঊনত্রিশ থেকে নেমে পনেরো শতাংশে ঠেকেছে।

তিনটা মার্কিন কোম্পানি এখন ইউরোপের ক্লাউড-বাজারের সত্তর শতাংশের মালিক।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে গত নভেম্বরে ফ্রান্স আর জার্মানি রীতিমতো শীর্ষ সম্মেলন ডেকেছে, নাম দিয়েছে ‘ইউরোপীয় ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব সম্মেলন’।

ডিজিটাল পরাধীনতার এই নতুন মানচিত্রে জার্মানিও এখানে উপনিবেশ, ফ্রান্সও উপনিবেশ। এবং বিষয়টা আসলেই অদ্ভুত।

সেদিক থেকে বাংলাদেশের কথা যদি আমরা ভাবতে চেষ্টা করি, বাংলাদেশ তার চরম প্রান্ত মাত্র।

➖

প্রশ্ন হলো, আমরা ডেটা-সার্বভৌমত্ব কথাটা এত বলি, এই সার্বভৌমত্ব জিনিসটা আসলে কী?

একটা ভাড়া বাসার কথা ভাবা যাক। ভাড়াটে হওয়া মানেই পরাধীনতা না। মানুষ সারাজীবন ভাড়া থেকেও স্বাধীন থাকে। যতক্ষণ চুক্তিতে নোটিশের শর্ত আছে, আর শহরে অন্য বাসা আছে।

পরাধীনতা শুরু হয় সেই দিন, যেদিন বাড়িওয়ালা টের পায়, এই ভাড়াটের যাওয়ার জায়গা নাই।

সেই মুহূর্ত থেকে ভাড়া যা খুশি, শর্ত যা খুশি। বাসা একই, ভাড়াটে একই। বদলে গেছে শুধু একটা জিনিস, সেটা বের হওয়ার দরজা।

ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের পুরো তর্কটা এই এক কথায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

প্রশ্নটা কখনোই এমন ছিল না, সার্ভার কার, ক্যাবল কার, অ্যাপ কার?

বরং প্রশ্নটা ছিল, কালকে যদি হঠাৎ শর্ত বদলায়, হঠাৎ দাম বাড়ে, নিষেধাজ্ঞা আসে, সম্পর্ক ভেঙে যায়, তাহলে বের হওয়ার কোন রাস্তা আছে কি? থাকলে তার দাম কত?

যেই নির্ভরতা থেকে বেরোনো যায়, সেইটা বাণিজ্য। আর যেইটা থেকে বেরোনো যায় না, সেইটা অন্যকিছু। সেইখানেই সার্বভৌমত্ব খোয়ানোর শুরু।

➖

এইবার এই মাপকাঠিটা বাংলাদেশের দিকে ঘোরাই।

আমাদের সাত কোটি মানুষের ফেসবুক-ডেটা বিদেশের সার্ভারে। রাষ্ট্রের নিজের সিস্টেমগুলি বিদেশি ভেন্ডরের হাতে।

নাগরিকের ডিজিটাল জীবনের প্রায় পুরোটাই এমন কোম্পানির প্ল্যাটফর্মে, যাদের সাথে বাংলাদেশের কোনো দর কষাকষির টেবিলই নাই।

এই অবস্থা থেকে বেরোনোর কথা উঠলেই কিছু চেনা সমাধান সামনে আসে। সবচেয়ে চেনা সমাধান হল, “সার্ভার দেশে নিয়ে আসেন।”

শুনতে সার্বভৌম শোনায়। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবতে গেলে এই সমাধানগুলিও একে একে ভাঙতে থাকে।

মার্কিন আইনে ক্লাউড অ্যাক্ট নামে একটা জিনিস আছে। যেকোন মার্কিন কোম্পানিকে আদালত ডেটা হস্তান্তরের নির্দেশ দিলে সে মানতে বাধ্য।

ডেটা পৃথিবীর যেই প্রান্তেই থাকুক, যেই দেশের মাটিতেই থাকুক, মার্কিন প্রশাসন দাবি করলে সেই ডেটা তারা হস্তান্তর করতে বাধ্য।

ফলে মেটা কাল ঢাকায় ডেটা সেন্টার বানালে বাক্সটা হবে ঢাকার, কিন্তু এখতিয়ার ঠিকই থাকবে ওয়াশিংটনের হাতে।

আর বাক্সেরও দাম আছে। হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার পানি খায় ছোট শহরের সমান, বিদ্যুৎ খায় আরও বেশি।

যেই দেশে লোডশেডিং এখনো রুটিন, তাছাড়া ঢাকার ভূগর্ভের পানি প্রতি বছর নামছে, সেইখানে “সার্ভার দেশে নিয়ে আসেন” স্লোগানের পানির বিলটা হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

তার মানে কি সার্ভারের কোনো দামই নাই? আছে।

কিন্তু দামটা সার্বভৌমত্বের না। দামটা লিভারেজ। চুক্তির টেবিলে আপনার নিজের একটা শক্ত জায়গা।

ভারত ডেটা দেশে রাখতে বাধ্য করে সার্বভৌম হয়ে যায় নাই। তারা ডেটাকে বানিয়েছে দর কষাকষির হাতিয়ার।

গুগল-মেটাকে বলেছে, আমার একশো চল্লিশ কোটি মানুষের বাজারে ব্যবসা করতে চাও? তাহলে ডেটা এইখানে রাখো, বিনিয়োগ আনো, কর দাও।

কোম্পানিগুলি মেনেছে, কারণ এত বড় বাজার ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য কারো নাই।

মেটার ডেটা সেন্টার ঢাকায় থাকলে বাংলাদেশের আদালতের হাত সেই ডেটা পর্যন্ত পৌঁছাতো, রাজস্ব বোর্ডের অডিট ঢুকতো, দর কষার একটা টেবিল অন্তত তৈরি হতো।

সেই বিচারে নিজের ডেটা-আইন থেকে রাষ্ট্রের পিছিয়ে আসাটা একটা দর কষাকষির চিপ ছেড়ে দেওয়া। বিনিময়ে কিছু না নিয়ে।

➖

তবে এইখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার। দর কষার সুযোগ পাওয়া এক জিনিস, আর দরে জেতা আরেক জিনিস।

সার্ভার দেশে আনলে সুযোগটা তৈরি হয়, এইটুকুই। জেতার জন্য লাগে আরও অনেক কিছু। চুক্তি পড়ার লোক, শর্ত আদায়ের ক্ষমতা, দরকারে “না” বলার সাহস।

সার্ভার ঘরের চাবি না। সার্ভার বড়জোর দরজার হাতল। হাতল ধরে কেউ ঘরের মালিক হয় না।

অন্যথায় সার্ভার-জাতীয়তাবাদ আসলে ওই একই পুরানো ভুল, যে জিনিস আনলেই ক্ষমতা আসবে এটা ভাবা।

এই বাস্তবতার সম্পূর্ণ উল্টা প্রমাণটা দিয়েছে এস্তোনিয়া। ইউরোপের অতি ছোট দেশ, রাশিয়ার ঘাড়ের কাছে। তারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা রেখেছে লুক্সেমবার্গে, নিজের দেশের বাইরে।

পৃথিবীর প্রথম ‘ডেটা-দূতাবাস’, দূতাবাসের মতোই আইনি মর্যাদা, শুধু কূটনীতিকের বদলে সার্ভার।

চুক্তিটা এমন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার, ফেরত নেওয়ার শর্ত সব এস্তোনিয়ার হাতে। ডেটা বিদেশে। কিন্তু দরজার কন্ট্রোল নিজের হাতে।

অন্যদিকে আমাদের গল্পটা হুবহু উল্টা, এবং গল্পটা বলার মতো।

২০০৭ সালে ভোটার তালিকা ডিজিটাল করতে গিয়ে বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলেছিল তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বায়োমেট্রিক ডেটাবেস।

আট কোটি মানুষের আঙুলের ছাপ। কাজটা করেছিল টাইগার আইটি নামের এক ভেন্ডর।

২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির দায়ে সেই টাইগার আইটিকেই সাড়ে নয় বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করলো।

ভেন্ডর তবু নির্বাচন কমিশনের প্রকল্পে থেকে গেলো, কালো তালিকা খাটলো শুধু বিশ্বব্যাংকের নিজের প্রকল্পে, আর ততদিনে এই সিস্টেম চালানোর দ্বিতীয় কোনো হাতও তৈরি হয় নাই।

তারপর দেশের এক দৈনিকের অনুসন্ধানে বেরোলো, আঠারো কোটি মানুষের এই ডেটাবেস ভেন্ডর এক ডেটাবেস-প্রযুক্তি থেকে আরেকটাতে সরিয়ে ফেলেছে, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই।

রাষ্ট্র তা জেনেছে পরে।

আর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এক বিদেশি সাইবার-নিরাপত্তা গবেষক নিছক গুগল করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, সরকারি এক ওয়েবসাইটে পাঁচ কোটি বাংলাদেশির নাম, ফোন নম্বর, এনআইডি খোলা পড়ে আছে।

খবরটা প্রথম ছাপে মার্কিন প্রযুক্তি-সাময়িকী টেকক্রাঞ্চ। আমরা জেনেছি সবার শেষে। সার্ভার দেশেই ছিলো এইসব ঘটনায়।

কিন্তু সার্বভৌমত্ব ছিলো ভেন্ডরের পকেটে।

এস্তোনিয়া আর আমাদের এনআইডি ডেটাবেস, দুইটা গল্প পাশাপাশি রাখলে সূত্রটা নিজেই বেরিয়ে আসে। সার্বভৌমত্ব জিনিসটা চুক্তির জিনিস, সক্ষমতার জিনিস, দলিলের জিনিস।

যার দলিল আছে, তার ডেটা লুক্সেমবার্গে থাকলেও তার। যার দলিল নাই, তার ডেটা নিজের মাটিতে থাকলেও অন্যের।

➖

পৃথিবী এই হিসাবটা ধরে ফেলেছে।

ডিজিটাল যুগে আসল সম্পদ দালান-যন্ত্র না, আসল সম্পদ হলো নিজের ডেটা, নিজের ভাষা, নিজের মডেলের উপর নিয়ন্ত্রণ, আর দরকারে বিকল্পে সরে যাওয়ার ক্ষমতা।

এবং হিসাবটা ধরার একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তও আছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে চীনের এক প্রায়-অচেনা কোম্পানি ডিপসিক ঘোষণা দিলো, তারা চ্যাটজিপিটির সমকক্ষ মডেল বানিয়েছে।

খরচ, কোম্পানির দাবি অনুযায়ী, ষাট লাখ ডলারের কম।

যেই কাজে সিলিকন ভ্যালি শত শত কোটি ঢালে, সেই কাজ হয়ে গেলো এক ভগ্নাংশ দামে।

সেদিন মাঝারি দেশগুলির টনক নড়লো, এই খেলা কেবল তাহলে দুই পরাশক্তির না, আমরাও নামতে পারি। তখন তারাও নামল।

পরামর্শক সংস্থা ডেলয়েটের হিসাবে, চলতি বছর পৃথিবীজুড়ে দশ হাজার কোটি ডলারের বেশি ঢালা হচ্ছে শুধু ‘সার্বভৌম এআই’ অবকাঠামোয়।

চিপ-নির্মাতা এনভিডিয়ার নিজের হিসাবে, শুধু রাষ্ট্রীয় ক্রেতাদের কাছে তাদের চিপ-বিক্রি এক বছরে দ্বিগুণ হয়ে দুই হাজার কোটি ডলারে দাঁড়ানোর কথা।

দুই বছর আগেও ‘সার্বভৌম এআই’ ছিল সেমিনারের শব্দ। আজকে এটা জি-টোয়েন্টির প্রায় প্রতিটা দেশের বাজেট-লাইন।

ভারত এক বিলিয়ন ডলারের জাতীয় এআই মিশনে চৌত্রিশ হাজার জিপিইউ বসিয়েছে। ভারতের যেকোনো গবেষক, স্টার্টআপ ঘণ্টায় পঁয়ষট্টি রুপিতে ভাড়া নিতে পারে।

ভাষিণী নামের সরকারি প্ল্যাটফর্ম বাইশটা ভাষায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। গোন্ডি, বোড়ো, সাঁওতালির মতো ভাষাতেও, যেই ভাষার কথা সিলিকন ভ্যালির কোনো মডেল জানেই না।

সিঙ্গাপুর বানিয়েছে সি-লায়ন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেরোটা ভাষার নিজস্ব মডেল-পরিবার, ওপেন-সোর্স, যে-কেউ নিতে পারে।

ভিয়েতনাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ এআই-আইন করেছে।

আর ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংককে একশোর বেশি দেশের প্রতিনিধি সই করেছেন একটা ঘোষণাপত্রে। ডেটা, কম্পিউটিং আর মডেলের উপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার।

উন্নয়নশীল দুনিয়া জোট বাঁধছে। এবং জোটে কাজও হয়।

গত ডিসেম্বরে ইলন মাস্কের এআই যখন নারী ও শিশুর আপত্তিকর ছবি বানানোর ফিচার ছেড়েছিলো, ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-ফিলিপাইন তিন দেশ মিলে সেটা নিষিদ্ধ করে দিলো।

কোম্পানি নত হয়ে এই ফিচার বদলানোর পর সেইসব নিষেধাজ্ঞা উঠলো।

খেয়াল করেন, কেউই আসলে ‘জিনিস’ কিনছে না। ভারত কিনছে বিকল্প, নিজের গবেষক যেন বিদেশি ক্লাউডের দয়ায় না থাকে।

সিঙ্গাপুর কিনছে বিকল্প, নিজের ভাষা যেন অন্যের মডেলের করুণায় না বাঁচে। তিন দেশের জোট কিনছে ‘না’ বলার ক্ষমতা।

সবাই যা কিনছে, সেটার আসল নাম দরজা।

তবে এই দৌড়ের ভিতরেও একটা সৎ কথা আছে, যেটা বললে গল্পটা জাতীয়তাবাদী রূপকথা হওয়া থেকে বাঁচে। সম্পূর্ণ সার্বভৌম আসলে কেউ না। আমেরিকাও না।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, পৃথিবীর প্রায় দুইশো দেশের মধ্যে মাত্র চৌত্রিশটার নিজের মাটিতে এআই চালানোর মতো কম্পিউটার-শক্তি আছে।

আর নিজে একটা মডেল বানানোর ক্ষমতা? সেটা আছে মাত্র চব্বিশটা দেশের। বাকি সবাই, বাংলাদেশসহ, অন্যের যন্ত্রে ভাড়া খাটা মুসাফির।

ভারতের ওই চৌত্রিশ হাজার জিপিইউ-ও মার্কিন কোম্পানির বানানো, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বসলে এই পুরো ভিতটাই কাঁপবে।

মানে লক্ষ্যটা স্বয়ংসম্পূর্ণতা না। লক্ষ্যটা অনেক বিনয়ী, অনেক বাস্তব। এমন কোনো নির্ভরতায় না ঢোকা, যেখান থেকে বেরোনোর দরজাই নাই।

নির্ভরতা সবার আছে। পার্থক্যটা হলো, কারো নির্ভরতার গায়ে দরজা লাগানো, কারোটার গায়ে দেয়াল।

➖

এখন বাংলাদেশের খাতাটা খুলি। এই খাতাটা অনুমানে না, ঘটনায় ভরা।

“ডিজিটাল বাংলাদেশ” থেকে “স্মার্ট বাংলাদেশ” হয়ে আজকের ডিজিটাল রূপান্তর। স্লোগান বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু কেনাকাটার ধরন বদলায় নাই।

ধরনটা কী, একটা ঘটনাতেই ধরা যায়।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে রাষ্ট্র জাতীয় ডেটা সেন্টার বানিয়েছে। টিয়ার-ফোর, পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানের সনদধারী। কাগজে এটা ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের মুকুট।

বাস্তবে? বানিয়েছে চীনা কোম্পানি জেডটিই, টাকা এসেছে চীনা এক্সিম ব্যাংকের ঋণে।

২০২০ সালে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সব সরকারি ডেটা এইখানে আসবে। সেই সিদ্ধান্ত আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় নাই। সরকারি সংস্থাগুলি এখনো যার যার মতো ছড়িয়ে আছে দেশি-বিদেশি নানা ক্লাউডে।

আর যেই সনদ নিয়ে গর্ব, সেই টিয়ার-ফোর মাপে ভরসাযোগ্যতা। বিদ্যুৎ গেলে চলবে কি না, আগুন লাগলে বাঁচবে কি না। সক্ষমতা মাপে না।

এই দালানে একটা এআই মডেল ট্রেইন করার ক্ষমতা নাই।

অর্থাৎ সার্বভৌমত্বের দালানটা পর্যন্ত ধারের টাকায়, অন্যের নির্মাণে। আর ভিতরে সেই যন্ত্রই নাই, যেই যন্ত্রের জন্য পৃথিবী দৌড়াচ্ছে।

এইটাই প্যাটার্ন। হাই-টেক পার্ক উঠেছে, ল্যাপটপ বিলি হয়েছে, ক্যাবল এসেছে, দালান হয়েছে। জিনিসের তালিকা লম্বা।

কিন্তু দশ বছরের কোনো নীতি-দলিলে একটা প্রশ্নও এমন নাই, কোন চুক্তিতে বেরোনোর ধারা থাকবে, কোন ডেটা এমনভাবে রাখতে হবে যাতে ফেরত আনা যায়।

কোন সিস্টেম চালানোর, এবং দরকারে বদলানোর, লোক দেশে তৈরি হবে।

টাইগার আইটির গল্পটা মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাও ভেন্ডরকে সরাতে পারে নাই, কারণ সিস্টেম বোঝার দ্বিতীয় লোকটাই রাষ্ট্র কখনো বানায় নাই।

ওইটা দুর্নীতির গল্প না শুধু। ওইটা দরজা-না-কেনার গল্প। অথচ দরজা পরে কেনা যায় না। ওইটা ঢোকার সময়েই দর কষে নিতে হয়।

এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা হলো, কেউ হিসাবও রাখছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয় বৈদেশিক ঋণের খাতা রাখে। কত নেওয়া, কবে শোধ, শর্ত কী। কারণ ঋণের ফাঁদ আমরা ইতিহাস থেকে চিনি। কিন্তু ডিজিটাল নির্ভরতার কোনো খাতা কোনো দপ্তরে নাই।

কোন সরকারি সিস্টেম কোন বিদেশি কোম্পানিতে চলে, চুক্তিতে বেরোনোর পথ আছে কি নাই, বিকল্পে যেতে কত লাগবে, এই খতিয়ানটা রাখা কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না।

ঋণের ব্যালান্স-শিট আছে। নির্ভরতার ব্যালান্স-শিট নাই। অথচ দুইটা একই লেনদেন, ভবিষ্যতের স্বাধীনতা বন্ধক রেখে আজকের সুবিধা কেনা।

➖

সাত কোটি মানুষের ডেটা যেই সম্পদ, তার অভিভাবক কে, এই প্রশ্নটা তোলা গেছে, তোলা থাকলো।

কিন্তু তার পরের প্রশ্নটা আরও ছোট, আরও নির্দিষ্ট, এবং সেই কারণেই আরও অস্বস্তিকর।

রাষ্ট্রের কোন দপ্তরটা জানে, আমাদের কোন দরজাগুলি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে?

উত্তরটা সম্ভবত, কোনো দপ্তর না। কারোর হিসাবেই এটা নাই।

স্মার্ট হওয়ার এত আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে সরল হিসাবটাই কখনো কষা হয় নাই, ঢোকার আগে দেখে নেওয়া, বেরোনো যায় কি না।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন