শনিবার বিকালে মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির সহায়তা বিতরণের অনুষ্ঠান ছিল।
সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলমান লোডশেডিংয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাসের সমস্যা কমে আসবে।
দুঃখ প্রকাশের কারণও পরিষ্কার। আগের সপ্তাহেই দেশে লোডশেডিংয়ের সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। গ্রামে দিনে দশ থেকে বারো ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
একই বক্তব্যে তিনি বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানের পরিকল্পনা তাদের থাকলে তা সরকারকে দিতে হবে। সেই পরিকল্পনায় যদি তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়, সরকার তা গ্রহণ করবে।
আর সমাধান না হলে বিভ্রান্তিকর রাজনীতি করার জন্য বিরোধী দলকে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
সাথে একটা খোঁচাও দেন প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে যারা হারিকেন হাতে কর্মসূচি করছে, তাদের পেছনে ফ্যান চলছিল।
রাতে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জের জবাব আসলো এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহর কাছ থেকে। লম্বা পোস্ট, চার দফা। চ্যালেঞ্জ গৃহীত।
হাসনাত লেখলেন, সমাধান আগে থেকেই সরকারের সামনে আছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তিন দিন আগে বিবৃতি দিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে মোট পনেরো দফা প্রস্তাব দিয়েছেন।
হাসনাতের অভিযোগ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে বাষট্টি জনের মধ্যে একজনও ওই প্রস্তাব বা নাগরিক সমাজের মতামত পড়ে দেখেন নাই। ছয় মাসের হিসাবটা তিনি মেনে নেন, তবে যোগ করেন, ঘড়িটা বিরোধী দলের না, সরকারের।
ফ্যান নিয়ে করা মন্তব্যের জবাব দেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তার বক্তব্য, কর্মসূচির ফ্যান ও মাইক চলছিল জেনারেটরে, কারণ ওই সময় ওই এলাকায় বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ ছিল না।
এ পর্যন্ত পুরোটাই পরিচিত রাজনৈতিক চাপান-উতোর। কিন্তু ওই একই শনিবারে সিলেটে সরকারের ভেতর থেকেই একটা ভিন্ন হিসাব এসেছে।
দুপুরে সিলেটে কৃষি বিভাগের এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকরা বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে গ্যাস-বিদ্যুতের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
তিনি বললেন, নতুন এফএসআরইউ বসানো, পাইপলাইন টানাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় দরকার।
মালয়েশিয়া থেকে ছোট জাহাজে গ্যাস আনার যে চেষ্টা চলছে, সে প্রসঙ্গে জানালেন, পেট্রোনাসের জাহাজগুলো এখন অন্য কাজে ব্যস্ত, এই মুহূর্তে বাড়তি জাহাজ মিলছে না। শিল্প যে ভুগছে, বাসাবাড়ির জীবন যে ব্যাহত, প্রতিটা অভিযোগ যে সঠিক, সেটাও তিনি স্বীকার করলেন।
পরদিন রোববার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বললেন, এই সংকটের সমাধান ছয় মাস বা এক বছরে সম্ভব না, কমপক্ষে দুই বছর লাগবে।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সময় বেঁধে দিলেন তিন থেকে ছয় মাস। আর তার নিজের দুই মন্ত্রী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দিলেন, ওই সময়ে এ জিনিস সমাধান হয় না।
চ্যালেঞ্জটা বিরোধী দলের কাছে পৌঁছানোর আগে মন্ত্রিসভার ভেতরেই হেরে বসে আছে।
➖
তবু ধরা যাক তর্কটা সত্যিকারের, ধরা যাক দুই পক্ষের পরিকল্পনা মিলিয়ে দেখলে কিছু বের হবে। কিন্তু এই মিলিয়ে দেখলে যা বের হয় তা আরও অস্বস্তিকর।
নাহিদ ইসলামের পনেরো দফার শেষ দফায় লেখা আছে, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ইনভার্টারের শুল্ক শূন্যে নামিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতে যেতে হবে।
দাবিটা সরকার মেনে নিয়েছে, দাবিটা ওঠার দুই মাস আগে।
গত ১১ জুন সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই প্রস্তাব করেছেন, সৌর খাতের মূল সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম কর শূন্য করে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। মেয়াদ ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
সৌর উৎপাদন থাকবে করমুক্ত ২০৩৫ পর্যন্ত, সৌরবিদ্যুতের বিলে মিলবে পাঁচ শতাংশ কর রেয়াত।
একই বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিগত সরকারের ক্যাপাসিটি চার্জকে হরিলুট বলেছেন, জানিয়েছেন বিদ্যুৎ খাতে বছরের ভর্তুকি চল্লিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কাগজে-কলমে সরকারের রোগনির্ণয় আর বিরোধী দলের দাবি প্রায় হুবহু মিলে যায়।
বাজেটে অর্থমন্ত্রী শুল্কের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু কোন পণ্যে আসলে কত শুল্ক বসবে, সেটা লেখা হয় পরে, রাজস্ব বোর্ডের আলাদা এক আদেশে। কত টাকা আদায় হবে, সেটা ঠিক হয় বন্দরে, কারণ সেখানে কাস্টমস নিজে ঠিক করে আমদানি করা জিনিসটার দাম কত ধরা হবে।
জুনে সরকার শুল্ক শূন্য করার ঘোষণা দিল। আগস্টে বিরোধী দল একই জিনিস চাইছে। মাঝখানে যা ঘটেছে, সেটা ঘটেছে ওই দুই জায়গায়। মূলত বন্দরে।
➖
বাজেটের পর রাজস্ব বোর্ড যে আদেশ জারি করে, তাতে সৌর ইনভার্টারের মোট করভার দাঁড়ায় সতেরো শতাংশ। শূন্য না, সতেরো। আর চট্টগ্রাম বন্দরে চালান ছাড়াতে গিয়ে আমদানিকারককে দিতে হচ্ছে আটত্রিশ শতাংশ।
এই হিসাব বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের, ছাপা হয়েছে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে।
শিল্পের বেলায় হিসাবটা আরও উল্টা। আগে কারখানা এসব যন্ত্রপাতি আনত এক শতাংশ শুল্কে। এখন দিতে হচ্ছে সতেরো। যে বাজেট ছাদে সৌর বসানো সস্তা করার কথা বলল, তার পর জিনিসটা হলো সতেরো গুণ দামি।
আটত্রিশে পৌঁছানোর কায়দাটা সহজ। কাস্টমস প্যানেলের দাম ধরে ওজন মেপে, কেজিপ্রতি তিন ডলার। ফলে পঞ্চাশ ডলারে কেনা প্যানেলের দাম কাগজে দাঁড়ায় একশো দশ ডলার, শুল্ক বসে ওই দামের উপর।
আর রাতে বিদ্যুৎ ধরে রাখার লিথিয়াম ব্যাটারিতে করভার গত অর্থবছরে ছিল প্রায় বাষট্টি শতাংশ।
সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছেন, বাজেটে ঘোষিত সুবিধা আমদানিকারকরা পাচ্ছেন না, বন্দরে আসল দামের বদলে ফোলানো দামে শুল্ক নেওয়া হচ্ছে।
একই অভিযোগ তিনি জুলাইয়ের শেষে সিপিডির গোলটেবিলেও করেছিলেন, জ্বালানি মন্ত্রী তখন অনলাইনে যুক্ত। বিল অব এন্ট্রির কাগজ হাতে নিয়ে বলেছিলেন, সদস্যদের মাল কাস্টমসে আটকে আছে, কারো বিশ দিন, কারো পঁচিশ দিন।
দেড় মাসে দুই জায়গায় একই অভিযোগ। সরকারের দিক থেকে খণ্ডনও আসে নাই, সংশোধনও না।
➖
শূন্য থেকে সতেরো কে করল, খুঁজতে গেলে কাউকে পাওয়া যায় না। কোনো মন্ত্রী এটা ঘোষণা করেন নাই, মন্ত্রিসভায় ওঠে নাই, সংসদে ভোট হয় নাই। কোনো দলের ইশতেহারে ছিল না।
সংসদে দেওয়া ঘোষণা ছিল সরকারের সিদ্ধান্ত, আর তাকে উল্টে দেওয়া কাগজে কারো নাম নাই।
এমন সিদ্ধান্ত জ্বালানি খাতে নতুন না। আদেশের ভাষা, কাস্টমসের দাম ধরার নিয়ম, বছরের পর বছর চূড়ান্ত না হওয়া কোনো মাশুল। এখানে ভোট চাইতে হয় না, দুঃখ প্রকাশও করতে হয় না। অথচ কার টাকায় কী হবে, ঠিক হয় এখানেই।
হাসনাত আবদুল্লাহর একমাত্র সুনির্দিষ্ট দাবিটাও আটকে আছে একইরকম একটা কাগজে। তবে অন্য দপ্তরে।
তার প্রশ্ন, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন। এই নীতিতে দেশি বেসরকারি উৎপাদক সরাসরি বড় শিল্পের কাছে বিদ্যুৎ বেচতে পারবে, দাম ঠিক করবে দুই পক্ষ, সরকারের টাকা লাগবে না।
বাকি শুধু চুক্তির ছক আর মাশুল ঠিক করা। মাশুল মানে সরকারি গ্রিডের তার দিয়ে ওই বিদ্যুৎ পাঠাতে উৎপাদক কত দিবে। হাসনাত বলছেন, এটা কয়েক সপ্তাহের কাজ।
নীতিটা আছে, গেজেট হয়েছে গত বছরের ১৪ অক্টোবর। কিন্তু মাশুল আজও ঠিক হয় নাই। ডিসেম্বরে প্রথম আলো সেটা লিখেছে, মে মাসে ব্যবসায়ীরা মাশুল কমানোর দাবি জানিয়েছেন। দশ মাস পার। কয়েক সপ্তাহের কাজটা এখনো ফাইলে।
হাসনাতের ক্ষোভ ন্যায্য, কিন্তু ঠিকানাটা ভুল। তিনি জবাব চাইছেন সংসদ থেকে, ফাইলটা পড়ে আছে অন্য ঘরে।
দাবিটা যে শুধু তার, তাও না। সিপিডির ওই গোলটেবিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবসায়ীদের সমিতির সভাপতি প্রায় একই কথা বলেছিলেন। বিনিয়োগকারীরা আবেদন করে বসে আছেন, সরকারের কোনো দায় নাই, সাত দিনের মধ্যে অনুমতি দিয়ে দিন।
বিরোধী দলের দাবি আর ব্যবসায়ীদের চাহিদা এক জায়গায় মিলে গেছে। এতে দোষের কিছু নাই, নীতিটাও খারাপ না। তবে ঘাটতির সময় কে আগে বিদ্যুৎ পাবে, সেই হিসাবে এই প্রস্তাব বড় শিল্পের পক্ষে যায়। কথাটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।
বিরোধীদলের নিজের কাগজেও গোলমাল আছে। নাহিদ ইসলামের এক নম্বর দফা বলছে, তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ বন্ধ রেখে সবার সাথে আলোচনা করে নীতি ঠিক করতে হবে। তিন দিন পর হাসনাত চাইছেন, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ বেচাকেনার নীতি এখনই চালু হোক।
কোনটা দলের অবস্থান, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নাই।
➖
যা নিয়ে এতসব তর্ক, সেটা এখন প্রতি রাতে রেকর্ড ভাঙছে।
৩ আগস্ট রাত একটায় সারা দেশে লোডশেডিং ৩,৫১২ মেগাওয়াট, ইতিহাসে প্রথমবার সাড়ে তিন হাজার পার হলো। ৯ আগস্ট বিকাল তিনটায় ৩,৬৭১, ওই রাতেই একটায় ৩,৭৫৭। দশ ঘণ্টায় দুইবার রেকর্ড।
আওয়ামী লীগ আমলে সর্বোচ্চ ছিল ২০২৩ সালের ২৭ জুন, ৩,৪১৯।
এই অন্ধকারটা আসছে কোথা থেকে, হিসাবটা এবার মেলানো যাক।
প্রথম ভাগ গ্যাস। জ্বালানি আর মেরামত মিলিয়ে একচল্লিশটা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। গ্যাসকেন্দ্রগুলো ন্যূনতম চালু রাখতে দিনে লাগে একশো কোটি ঘনফুট গ্যাস, পাচ্ছে সত্তর।
কারণ জুলাইয়ে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের আগুন, যার ফলে দিনের ষাট কোটি ঘনফুট এক ধাক্কায় চলে গিয়েছিল, ফিরেছে আংশিক।
দ্বিতীয় ভাগ কয়লা। আদানি থেকে চৌদ্দশো মেগাওয়াট আসার কথা, ঝাড়খণ্ডে বন্যায় কয়লা ভিজে যাওয়ায় আসছে আটশো। বড়পুকুরিয়ার তিন ইউনিটের দুইটা বন্ধ, কয়লা খালাস আটকে পটুয়াখালী চলছে অর্ধেক ক্ষমতায়।
আর তৃতীয় একটা ভাগ আছে, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলছে না, সেটা হলো তেল।
তেলের কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, অথচ চলছে দুই হাজারের মতো। এখানে জাহাজে আগুন লাগে নাই, কয়লাও ভিজে নাই। তেল পোড়ানো দামি, ডলার লাগে।
মানে ঘাটতির প্রথম দুই ভাগ দুর্ঘটনা। তৃতীয় ভাগ সিদ্ধান্ত। তিন হাজার মেগাওয়াট বসে আছে টাকা খরচের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
আসল ঝগড়াটা আসলে এখানেই, যদিও কেউ নাম ধরে বলছে না।
নাহিদ ইসলামের বিবৃতিতেই আছে, রিজার্ভে ব্যবহারযোগ্য ডলার বত্রিশ বিলিয়ন, আগস্টের প্রথম আট দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৯১৫ মিলিয়ন। তার দাবি, টাকা নাই বলে সংকট না, সময়মতো জ্বালানি কেনা হয় নাই বলে সংকট। সরকার বলছে ডলার নাই।
এদিকে খোলা বাজারে এলএনজির দাম উঠেছে প্রায় বাইশ ডলারে, কিছুদিন আগেও ছিল অনেক কম। ফলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়, এই দামে জ্বালানি কিনে এখনই কত টাকা পোড়ানো হবে। আজ রাতের কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঝুলছে এই একটা প্রশ্নের উত্তরে।
➖
আর বাকি সমাধানগুলোর কোনোটাই তিন মাসে ধরা দেয় না।
জুলাইয়ের গোলটেবিলে মন্ত্রী বলেছিলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসবে।
এই টার্মিনাল আসলে জাহাজ, সাগরে নোঙর করা থাকে, বিদেশ থেকে আসা তরল গ্যাসকে আবার গ্যাসে ফিরিয়ে পাইপে করে দেশে পাঠায়। দেশে এমন জাহাজ আছে দুইটা, জুলাইয়ে তার একটায় আগুন লেগে এবারের সংকট।
মন্ত্রীর সামনে বসা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সমিতির সভাপতি ডেভিড হাসনাত পাল্টা হিসাব দিয়েছিলেন। চুক্তি সইয়ের পরও একটা জাহাজ বসাতে লাগে দুইটা শীতকাল, কারণ সাগরের তলায় পাইপ টানার কাজ বর্ষায় হয় না।
সৌর দিয়েও এই শীত পার হবে না। রবিবার সিপিডি সাড়ে তিনশো পোশাক কারখানার তথ্য নিয়ে একটা গবেষণা প্রকাশ করেছে।
পোশাক খাতের সবচেয়ে জ্বালানিঘন ধাপ ওয়াশিং আর ডায়িং, সেখানে তাপ আসে গ্যাসের বয়লার থেকে, ছাদের প্যানেল ওই বয়লারের বদলি হয় না।
দশ শতাংশ ছাদ-সৌর বসালে কারখানার মাসিক জ্বালানি খরচ কমে সাড়ে পাঁচ শতাংশ। সৌর দরকার, কিন্তু ডিসেম্বরে ডায়িংয়ের বয়লারে সে গ্যাস দিবে না।
তাহলে সামনের শীতে সরকারের হাতে সিদ্ধান্ত থাকে দুইটা। দামি জ্বালানি কিনতে কত টাকা ঢালা হবে। আর যে গ্যাস আছে, তা কে পাবে আর কে পাবে না।
দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটা এখনই নেওয়া হচ্ছে, শুধু ঘোষণা ছাড়া। আগের সংকটে কর্ণফুলী গ্যাসের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, চট্টগ্রামের সরবরাহ কমিয়ে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে বলেই সেখানে সংকট বাড়ছে।
যুগান্তর লিখেছে, নতুন গ্যাস সংযোগের আঠারোশো সাতান্নটা আবেদন ঝুলে আছে, সাড়ে পাঁচশো প্রতিষ্ঠান টাকা জমা দিয়ে চার বছর অপেক্ষা করছে। টাকা নেওয়া হয়েছে, গ্যাস দেওয়া হয় নাই। এটাও বণ্টনের সিদ্ধান্ত, শুধু কেউ স্বাক্ষর করে নাই।
প্রশ্নটা যে করা যায়, সেটা অন্যরা করেও দেখিয়েছে। জুলাইয়ের গোলটেবিলে বুয়েটের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেছিলেন, সবাইকে সবসময় বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে না, এটা মেনে নিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে।
ব্যবসায়ী নাসিম মনজুর বলেছিলেন, কখন বিদ্যুৎ থাকবে না আগে থেকে বলে দিন, কারখানা সেই হিসাবে চলবে, অনিশ্চয়তাই আমাদেরকে মারছে।
ক্যাবের শামসুল আলম বলেছেন, কাকে গ্যাস দেওয়া হবে আর কাকে না, সেই কঠিন বাছাইয়ে সরকারকে আসতেই হবে।
বিশেষজ্ঞ, শিল্পপতি, ভোক্তা সংগঠন, তিন দিক থেকেই প্রশ্নটা উঠেছে। ওঠে নাই শুধু রাজনীতিতে। প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জে এই প্রশ্ন নাই।
নাহিদ ইসলামের পনেরো দফার পাঁচ নম্বরে গ্যাস বরাদ্দে অগ্রাধিকার সূচকের কথা আছে, কিন্তু কার আগে কার লাইন কাটা যাবে, সে নাম সেখানেও লেখা নাই। কারণটা কঠিন না।
শুল্কের আদেশ লিখলে কেউ টের পায় না, বণ্টনের তালিকা লিখলে ভোটে তার দাম দিতে হয়।
➖
উপরে বলা শুল্কের গল্প আর বিদ্যুৎ বেচার গল্প, দুইটা আলাদা দপ্তরের ঘটনা। তবু পাশাপাশি রাখলে একই ছবি দেখা যায়। এই লেখার আসল কথা সেই ছবিতে।
দুইটা ক্ষেত্রেই বড় সিদ্ধান্তটা হয়েছে সবার সামনে। শুল্ক শূন্য হবে, এটা অর্থমন্ত্রী বলেছেন সংসদে দাঁড়িয়ে। বেসরকারি বিদ্যুৎ সরাসরি বেচা যাবে, এটা ছাপা হয়েছে সরকারি গেজেটে।
দুইটাই সরকারের ঘোষিত অবস্থান, দুইটার পেছনেই রাষ্ট্রের সিলমোহর।
আর দুইটা ক্ষেত্রেই সেই সিদ্ধান্ত অকেজো হয়ে গেছে ছোট একটা কাগজে। শুল্কের বেলায় কাগজটা রাজস্ব বোর্ডের আদেশ, যেটা শূন্যকে সতেরো বানিয়েছে, আর বন্দরের ওজন-মাপা হিসাব, যেটা সতেরোকে আটত্রিশ।
বিদ্যুতের বেলায় কাগজটা লেখাই হয় নাই, গ্রিডের মাশুল কত হবে সেই একটা সংখ্যার অভাবে পুরা নীতি দশ মাস ধরে বসে আছে। কে শূন্যকে সতেরো করল, কে মাশুলের ফাইল আটকে রাখল, কোনোটার উত্তরে কারো নাম পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ ঘোষণা এক জিনিস, আর ঘোষণাটা শেষ পর্যন্ত কাজ করবে কি না, সেটা ঠিক হয় অন্য জায়গায়। সেই জায়গাটা সংসদ না, নির্বাচনও না। সেখানে কেউ ভোট চায় না, কেউ চ্যালেঞ্জ জানায় না, কেউ ক্ষমাও চায় না।
অথচ শুল্ক কত, মাশুল কত, দাম কত ধরা হবে, দেশের জ্বালানির আসল প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হয় সেখানেই।
➖
একটা সৎ কথা এখানে বলা দরকার। আজকে রাতের অন্ধকারের বড় কারণ এই দুই কাগজ না। আসল কারণ পুড়ে যাওয়া জাহাজ, ভেজা কয়লা, আর তেল কেনার টাকা।
তাহলে এই দুই উদাহরণ কেন। কারণ সংকটের বাকি সব সমাধানে হয় বছর লাগে, নয় টাকা। টার্মিনালে দুই বছর, কূপে দুই বছর, তেলের কেন্দ্র চালাতে ডলার। এই দুইটা কাজে কোনোটাই লাগে না।
শুল্কের বেলায় দরকার শুধু আদেশ শুধরানো, বিদ্যুতের বেলায় একটা সংখ্যা বসানো।
যে দুইটা কাজ কালকেই বিনা পয়সায় করা যেত, আটকে আছে সেই দুইটাই। যে ব্যবস্থায় ফ্রি জিনিসও কাগজে আটকায়, সেখানে টাকা লাগা সিদ্ধান্তগুলোর ভাগ্য কী, বোঝা কঠিন না।
আর অন্ধকারের সাথে এই দুই কাগজের সম্পর্কটাও সোজা। মার্চেন্ট পাওয়ার চালু হলে ব্যবসায়ীদের হিসাবে অল্প সময়ে হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে আসতে পারত, দিনের লোডশেডিংয়ের একটা অংশ সেখানেই কমতো।
আর যার সামর্থ্য আছে, সে এখন গ্রিডের আশা ছেড়ে নিজের ছাদে প্যানেল বসিয়ে বাঁচতে চাইছে। রাষ্ট্র মুখে বলছে বসাও, শুল্ক শূন্য। আর বন্দরে সেই পালানোর পথের উপরেই আটত্রিশ শতাংশ টোল বসিয়ে রেখেছে, ব্যাটারিতে বাষট্টি।
শনিবারের তর্কটা এসবের অনেক উপরে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনা চেয়েছেন, বিরোধী দল পনেরো দফা দেখিয়েছে।
কিন্তু সরকারের সবচেয়ে বড় ঘোষণা যেখানে গিয়ে উল্টে গেল, আর বিরোধী দলের সবচেয়ে বাস্তব দাবি যেখানে গিয়ে আটকে আছে, সেই জায়গাটা দুই পক্ষের কারো বক্তব্যে নাই।
➖
সততার খাতিরে কয়েকটা কথা লেখা থাকুক।
হাসনাত আবদুল্লাহ পোস্টে যেটাকে ছয় মাসের আলটিমেটাম লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখের প্রস্তাবটা ছিল তিন থেকে ছয় মাস, আর কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম শিরোনামে লিখেছে তিন মাস। জবাব দিতে গিয়ে সময়সীমা খানিক টেনে লম্বা করা হয়েছে।
সৌরের শুল্ক শূন্য করার ঘোষণাটা সরকার আন্তরিকভাবেই দিয়েছিল বলে ধরে নেওয়ার কারণ আছে। বাজেটে সৌর উৎপাদনের কর-অব্যাহতি আর বিলের রেয়াতও বহাল।
শুল্কের হিসাবগুলো এসেছে ওই ব্যবসায়ী সমিতির নিজস্ব বিশ্লেষণ থেকে, শুল্ক কমলে যাদের সদস্যরাই লাভবান হবেন। তেলের কেন্দ্র বসে থাকার হিসাবটা যুগান্তরের। আর মার্চেন্ট পাওয়ারে হাজার মেগাওয়াটের সম্ভাবনাটাও ব্যবসায়ীদেরই দাবি, নিরপেক্ষ কারো হিসাব না।
মার্চেন্ট পাওয়ারের মাশুল চূড়ান্ত না হওয়ার সর্বশেষ খবর মে মাসের। এই লেখা ছাপা হওয়ার আগে যদি প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে থাকে, দশ মাসের হিসাবটা সেদিন থেকে বন্ধ। তবে দশ মাস যে গেছে, তা গেছেই।
আর মহেশখালীর আগুন, যেখান থেকে এই দফার সংকটের শুরু। ওই দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্তের প্রতিবেদন আজও প্রকাশিত হয় নাই।
আগুনের চার দিন পর পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল, স্থানীয় দল ত্রুটির কারণই শনাক্ত করতে পারে নাই। রক্ষণাবেক্ষণের গাফিলতি না নিছক দুর্ঘটনা, দেশ এখনো জানে না।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি পনেরো দফার চার নম্বরে আছে। অন্তত এই একটা দফায় বিরোধী দলের অবস্থান অকাট্য।
➖
শনিবারের মাঠে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরিকল্পনা থাকলে সংসদে আনুন। বিরোধী দল বলছে, বিশেষ অধিবেশন ডাকুন।
দুই পক্ষই সংসদ দেখাচ্ছে। অধিবেশনে কেউ বসছে না।
আর যেখানে অধিবেশন লাগে না, সেখানে কাজ থেমে নাই।
একটা আদেশ সংসদে ঘোষিত শূন্যকে সতেরো বানিয়ে রেখেছে। একটা হিসাবের নিয়ম পঞ্চাশ ডলারের প্যানেলকে একশো দশ ডলার ধরে শুল্ক কাটছে। একটা মাশুলের ফাইল দশ মাস ধরে কোনো টেবিলে পড়ে আছে।
এর কোনোটার জন্য ভোট লাগে নাই, বাজেট লাগে নাই, দুই বছরও লাগে নাই।
সামনের শীতে সরকারকে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে, তার সবগুলোই এই ধরনের। দামি জ্বালানি কিনতে কত টাকা ঢালা হবে। যে গ্যাসটুকু আছে, কার চুলা আর কার কারখানায় সেটা যাবে।
আর সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে ওইসব ঘরেই, যেখানে চ্যালেঞ্জও পৌঁছায় না, পনেরো দফাও না।
তিন মাসের ঘড়ি আর ছয় মাসের ঘড়ি নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু দেশের বিদ্যুতের সময় মাপা হচ্ছে অন্য ঘড়িতে। বন্দরের ইয়ার্ডে, রাজস্ব বোর্ডের দপ্তরে, আর একটা চূড়ান্ত না হওয়া ফাইলে।
ওই ঘড়ির কাঁটা কেউ কাউকে দেখায় না।