যুদ্ধ থেকে যাদের সবচেয়ে বেশি লাভ, সেই অস্ত্র কোম্পানিগুলোকে সাধারণত “লোভী ব্যবসায়ী” হিসেবে দেখা হয়, যারা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে মুনাফা বাড়ায়। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল, কারণ এই পুরো ব্যবসাটাই আসলে রাষ্ট্রের হাতে গড়া আর রাষ্ট্রের হাতেই চলা।
১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে একটা কমিটি গঠিত হয়েছিল, যার কাজ ছিল অস্ত্র ব্যবসার তদন্ত করা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ডুপন্ট, জেপি মরগানের মতো কোম্পানি কীভাবে বিশাল মুনাফা করেছিল, সেটাই ছিল তদন্তের বিষয়। সেই সময় ধারণা ছিল, এই ধনী শিল্পপতিরা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশে দেশে শত্রুতা উসকে দিচ্ছেন, শুধু নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য।
সে সময়ের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছিল, অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে তারা এখন বিশ্ব-রাজনীতিতে একটা বিপজ্জনক শক্তি, শান্তির পথে বাধা, যুদ্ধের প্রচারক। এমনকি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো ব্যবসাপন্থী পত্রিকাও তখন এই “মৃত্যু-ব্যবসায়ীদের” সমালোচনা করেছিল।
বেসরকারি স্বার্থ যে বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি করছে, এই ধারণা কখনোই পুরোপুরি মুছে যায়নি। বরং এখন এটা আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ গত বছর বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় পৌঁছেছে ঐতিহাসিক এক উচ্চতায়, প্রায় দুই দশমিক নয় ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিপুল টাকার সুফল পাচ্ছে ইসরায়েলের এলবিট, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং-লকহিড-নর্থ্রপ-আরটিএক্সের মতো বড় কোম্পানি, জার্মানির রাইনমেটাল, আর যুক্তরাজ্যের বিএই সিস্টেমসের মতো প্রতিষ্ঠান।
শান্তিকর্মীরা ঠিকই বলেন, এই “মৃত্যু-ব্যবসায়ীরা” ২০২০-এর দশকে রীতিমতো ফুলেফেঁপে উঠেছে, আর গাজা, ইরান, ইউক্রেন, সুদানের যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের লাভও তত বাড়বে। কিন্তু “সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স” নামে যে পরিচিত ধারণাটা আছে, সেটা মূলত এই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে যে বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রকেই দখল করে ফেলেছে। বাস্তবতা কিন্তু উলটো দিক থেকেও দেখা দরকার।
শুধু বেসরকারি কোম্পানি একা এই শিল্পের বৃদ্ধির জন্য দায়ী না। রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, ক্রেতা হিসেবে, আবার অনেক সময় মালিক হিসেবেও। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোম্পানিগুলোর মালিকানা আর একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই শিল্পের বিস্তার আসলে রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক-সামরিক প্রয়োজনেই ঘটে চলেছে।
বিশ্বে সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রই সবার শীর্ষে, বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশের বেশি একাই খরচ করে দেশটা, আর বিশ্বের মোট অস্ত্র রপ্তানির বিয়াল্লিশ শতাংশও তাদের দখলে, ২০২৪ সালে যার পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের সেরা একশোটা অস্ত্র কোম্পানির মধ্যে ঊনচল্লিশটাই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত, আর মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক তাদেরই।
এই কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে টাকা তোলে। কিন্তু বাস্তবে এদের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যেমন লকহিড মার্টিনের চুয়াত্তর শতাংশ শেয়ারের মালিক সম্পদ-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এই কোম্পানির বেশিরভাগ বিক্রিও কিন্তু হয় নিজের সরকারের কাছেই, যেমন লকহিড মার্টিনের ২০২৫ সালের পঁচাত্তর বিলিয়ন ডলার বিক্রির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই গেছে মার্কিন সরকারের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের অর্ধেকের বেশি চলে যায় ঠিকাদার কোম্পানিগুলোর হাতে, আর তার একটা বড় অংশ পায় মাত্র পাঁচটা বড় কোম্পানি।
এই যে বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানি আর সরকারের মধ্যে একটা নকল দূরত্ব দেখানো হয়, তাতে দুই পক্ষেরই লাভ। মানবাধিকার লঙ্ঘনে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্ন উঠলে কোম্পানি বলে, আমরা তো সরকারের রপ্তানি-নীতি মেনেই বিক্রি করেছি। আর সরকারকে প্রশ্ন করলে তারা বলে, এটা কোম্পানির বাণিজ্যিক গোপনীয়তার বিষয়, আমরা বলতে পারি না। এভাবেই দুই পক্ষ মিলে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যায়।
চীনের অস্ত্র শিল্প যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গঠিত। এখানে বেশিরভাগ কোম্পানিই সরাসরি রাষ্ট্রায়ত্ত, আর প্রতিরক্ষা খাতকে চীন সরকার নিজের সাতটা কৌশলগত শিল্পের একটা হিসেবে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। চীনের সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম হলেও গত তিন দশক ধরে প্রতি বছর বেড়েছে, আর এখন বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় বারো শতাংশ তাদের দখলে।
চীনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা পাকিস্তান, যাকে যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, সবই সরবরাহ করা হয়েছে।
রাশিয়ার অস্ত্র শিল্পও প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা মূলত নিজেদের দেশেই অস্ত্র তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে, এমনকি আগে বেসরকারিকরণ হওয়া কিছু কোম্পানিকেও জোর করে আবার রাষ্ট্রের অধীনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র সংস্থা রসটেক, যার আওতায় আছে বিখ্যাত কালাশনিকভ কোম্পানিও, রাশিয়ার প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ সামরিক উৎপাদন একাই নিয়ন্ত্রণ করে। রসটেকের প্রধান সের্গেই চেমেজভ পুতিনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বৃত্তের একজন বলে পরিচিত, দুজনে পূর্ব জার্মানিতে গুপ্তচর সংস্থার হয়ে কাজ করার সময় থেকেই পরিচিত। প্যান্ডোরা পেপারস ফাঁস হওয়ার পর জানা যায়, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চেমেজভ পরিবার বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে চারশো মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ গড়ে তুলেছে।
ইউরোপের চিত্রটা আবার মিশ্র। যুক্তরাজ্য তাদের অস্ত্র শিল্পকে অনেকটাই বেসরকারিকরণ করেছে, কিন্তু মহাদেশীয় ইউরোপে সরকারি মালিকানার অংশ এখনো বেশি, যেমন ফ্রান্সের থ্যালেসের এক-চতুর্থাংশ মালিক ফরাসি রাষ্ট্র নিজেই, ইতালির লিওনার্দোর ত্রিশ শতাংশ ইতালীয় রাষ্ট্রের।
শুধু বড় শক্তিগুলোই না, তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এখন নিজেদের অস্ত্র শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এখন তাদের অস্ত্র রপ্তানির একটা বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে। ভারতে আবার শিল্পপতি গৌতম আদানির প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলি অস্ত্র কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ড্রোন তৈরি করছে, যা ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে তুলেছে।
এই সব দেশ একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে আছে। ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে গাজা-লেবাননে অভিযান চালাচ্ছে, যেখানে ব্যবহৃত অনেক অস্ত্রই আসছে অন্য পশ্চিমা দেশ থেকে। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাচ্ছে, আবার ইরানের কাছ থেকে ড্রোন প্রযুক্তি নেওয়ার বদলে তাদের অস্ত্র পাঠাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িত থাকার পাশাপাশি সুদানের এক সশস্ত্র বাহিনীকেও সহায়তা দিচ্ছে। এই জালের মতো সম্পর্কের কারণেই একটামাত্র দেশ বা কোম্পানিকে আলাদা করে দায়ী করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
মার্কিন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রভাব হয়তো কমছে বলে অনেকে মনে করেন, কিন্তু সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবার ওপরে, সবচেয়ে বেশি খরচ করে, সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করে, সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র একা এই সামরিকীকরণের কারণ না। চীন দ্রুত নিজের শক্তি বাড়াচ্ছে, রাশিয়া যুদ্ধ-অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে, আর ভারত, সৌদি আরব, তুরস্কের মতো দেশও নিজেদের অস্ত্র শিল্প গড়ে তুলছে।
আজকের অস্ত্র ব্যবসা তাই একটা জটিল জাল, যেখানে রাষ্ট্র আর বেসরকারি কোম্পানির মধ্যেকার সীমারেখা প্রায় মুছে গেছে। সৌদি বা আমিরাতি কোম্পানির সঙ্গে মার্কিন কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি অস্ত্রের মুনাফা আসলে কার পকেটে যায়, বা কোন দেশের রপ্তানি-নিয়ম সেখানে প্রযোজ্য হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর যত দিন স্পষ্ট না হবে, অস্ত্র ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করার যেকোনো চেষ্টাও ততদিন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এই লেখাটি বিশ্ব অস্ত্র শিল্পের কাঠামো নিয়ে একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ।
