স্টারলিংক ও মাস্কবাদ

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিডিও কলে ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

এরপর নির্দেশ যায়, নব্বই কার্যদিবসের ভেতর বাংলাদেশে স্টারলিংকের সেবা চালুর কাজ শেষ করতে হবে।

বারো দিন পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম নিজের ফেসবুকে লেখেন, স্টারলিংককে আনার মূল কারণ ইন্টারনেট শাটডাউনের ঘটনা চিরতরে বন্ধ করা।

বাকি তারিখগুলো বিটিআরসির নথিতে।

২৬ মার্চ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের নতুন নির্দেশিকা জারি হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি স্টারলিংকের আবেদন জমা পড়ে।

২১ এপ্রিল কমিশন সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত, ২৮ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন, ২৯ এপ্রিল লাইসেন্স হস্তান্তর।

আবেদন থেকে লাইসেন্স, দুই সপ্তাহ।

একই কোম্পানি ভারতে আবেদন করে বসে আছে ২০২২ সাল থেকে।

টেলিযোগাযোগ বিভাগের অভিপ্রায়পত্র মেলে ২০২৫ সালের মে মাসে। লাইসেন্স জুনে, মহাকাশ নিয়ন্ত্রক ইন-স্পেসের ছাড়পত্র জুলাইয়ে।

অক্টোবরে শুরু হয় বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা।

ফোর্বস ইন্ডিয়ার গত ২৫ জুনের প্রতিবেদন বলছে, ভারতীয় গ্রাহক এখনো স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের সংযোগ নিতে পারেন না।

চার বছরের অপেক্ষা, এক বছরের বেশি সময় হাতে লাইসেন্স, একটাও বিল ছাপা হয় নাই। অন্যদিকে ঢাকায় ফোনালাপ থেকে সেবা চালু, তিন মাসের মধ্যে।

সেদিনের ভিডিও কলটা দেখে মনে হয়েছিল, একটা রাষ্ট্র একটা কোম্পানিকে ডেকে আনছে।

দলিলগুলো পড়লে এখন উল্টাটা মনে হয়। এই লেখা সেই দলিলগুলো নিয়ে।

➖

লাইসেন্সে স্টারলিংককে যা করতে বলা হয়েছে, সেটা আগে বোঝা দরকার। কারণ পরের পুরা হিসাবটা এর উপর দাঁড়ানো।

শর্ত হলো, সেবা চালুর আগে কোম্পানিটিকে বাংলাদেশের মাটিতে অন্তত একটা গেটওয়ে বসাতে হবে।

গেটওয়ে জিনিসটা মাটির উপরে বসানো একটা স্টেশন, যেখানে সারি সারি অ্যান্টেনা আকাশের দিকে তাক করা থাকে। মাথার উপর দিয়ে যাওয়া স্যাটেলাইট থেকে সংকেত এই স্টেশনে নামে, তারপর এখান থেকেই সেটা দেশের সাধারণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে গিয়ে ঢোকে।

ফলে গ্রাহকের ছাদের স্টারলিংকের ছোট থালাটা ইন্টারনেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না। সেটা কেবল স্যাটেলাইট পর্যন্ত পৌঁছায়, বাকি পথটা যায় এই স্টেশনের ভেতর দিয়ে।

এই স্টেশনটা কোন দেশে বসবে, প্রশ্নটা সেখানেই। কারণ যে দেশে স্টেশন, সেই দেশের সরকার ওই ট্রাফিক দেখতে পারে, থামাতেও পারে।

নির্দেশিকা বলছে, বাংলাদেশে বসে যারা স্টারলিংক ব্যবহার করবেন, তাদের ট্রাফিক দেশের ভেতরের স্টেশন দিয়েই যেতে হবে।

আর বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্টারলিংককে যুক্ত থাকতে হবে দেশের লাইসেন্সপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে, সংক্ষেপে আইআইজির সঙ্গে।

আইআইজি হলো সেই দরজা, যেটা দিয়ে বিদেশ থেকে আসা ইন্টারনেট দেশে ঢোকে। বাংলাদেশে এই দরজা চালানোর লাইসেন্স হাতেগোনা কয়েকটা কোম্পানির, এবং এই দরজার চাবি শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল এই দরজাগুলোতেই তালা দিয়ে।

ইন্টারনেট শাটডাউন চিরতরে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিটা সত্যি হতে হলে ওই তালাগুলো অকেজো হওয়া দরকার ছিল। লাইসেন্সের শর্ত বলছে, সেগুলো আগের জায়গাতেই আছে।

ডেইলি স্টারের নথি অনুযায়ী, দেশের ভেতরের ব্যবহারের জন্য স্টারলিংক ব্যান্ডউইথ নিচ্ছে দুইটা আইআইজি অপারেটরের কাছ থেকেই।

মানে আকাশ থেকে নামা সংযোগ মাটিতে এসে সেই পুরোনো পাইপেই ঢোকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন কথাটা নির্দেশিকা জারির দিনেই প্রথম আলোকে বলেছিলেন, দেশি আইআইজি থেকে ব্যান্ডউইথ নিলে ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা সরকারের হাতেই থেকে যাবে।

কথাটা ছাপা হয়েছিল লাইসেন্স দেওয়ার এক মাস আগে। শর্ত বদলায় নাই।

নতুন করে যোগ হলো আরেকটা জায়গা।

নির্দেশিকা বলছে, স্টারলিংক তার গেটওয়েতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ঢুকতে দেবে, আর আড়ি পাতার প্রযুক্তি নিজের কাছে রাখবে। প্রযুক্তিটা রাষ্ট্রের না, কোম্পানির।

গত ১৩ জানুয়ারি স্টারলিংক জানায়, তারা নজরদারি সংস্থা এনটিএমসিকে তথ্য দেখার একটা জানালা খুলে দিয়েছে।

তৃতীয় আরেকটা দূরের হিসাবও আছে।

গত বছরের ২৪ জুলাই স্টারলিংক বিশ্বজুড়ে আড়াই ঘণ্টা বন্ধ ছিল, চার মহাদেশে একসঙ্গে। কারণ স্যাটেলাইট না, আবহাওয়া না, কোনো সরকারও না। কোম্পানির নিজের কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার।

সফটওয়্যার হোঁচট খেলে স্যাটেলাইট আকাশে ঘুরতে থাকে, নিচে কেউ ইন্টারনেট পায় না।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশের ইন্টারনেট বন্ধ করতে লেগেছিল সরকারের একটা নির্দেশ।

এখন সেটা তিন জায়গা থেকে হতে পারে। ঢাকার আইআইজি, কালিয়াকৈরের স্টেশন, আর ক্যালিফোর্নিয়ার একটা সার্ভার।

প্রথমটা সরকারের। শেষ দুইটা একটা বিদেশি কোম্পানির, যার একটা বাংলাদেশে বসানো, আরেকটা নাগালের বাইরে।

➖

কোম্পানিটা আসলে কী বেচে, সেই প্রশ্নের একটা জুতসই উত্তর এ বছর ছাপা হয়েছে।

ইতিহাসবিদ কুইন স্লোবোডিয়ান আর প্রযুক্তি-লেখক বেন টারনফের বই “মাস্কিজম”, বাংলায় বললে মাস্কবাদ। নিউ ইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে মার্ক ও’কনেল বইটার দীর্ঘ আলোচনা লিখেছেন।

বইয়ের প্রস্তাবটা সরল। মাস্ককে ব্যক্তি হিসেবে পড়ে লাভ নাই, তিনি একটা ব্যবস্থার লক্ষণ। লেখকদ্বয়ের ভাষায়, ফোর্ডবাদ যদি হয়ে থাকে বিশ শতকের অপারেটিং সিস্টেম, মাস্কবাদ একুশ শতকের একটা সম্ভাব্য অপারেটিং সিস্টেম।

ফোর্ডবাদ মানে হেনরি ফোর্ডের কারখানা-দর্শন, শ্রমিককে এত মজুরি দাও যেন সে নিজের বানানো গাড়িটা কিনতে পারে। ভোগ ছড়িয়ে দাও, বাজার বড় করো।

মাস্কবাদ উল্টা পথের। অল্প কয়েকজনের জন্য বিরাট সুবিধা, বাকিরা হিসাবের বাইরে। লেখকেরা এর নাম দিয়েছেন দুর্গ-ভবিষ্যৎবাদ।

শিকড়টা তারা টেনেছেন মাস্কের বেড়ে ওঠার দেশে। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেকে ভাবত ভবিষ্যতের রাষ্ট্র।

আইবিএমের মেইনফ্রেম কম্পিউটার বসিয়ে সেখানে কালো শ্রমিকের হিসাব রাখা হতো, কে কোথায় কাজ করবে, কে কোন এলাকায় ঢুকতে পারবে।

মাস্ক বড় হয়েছেন প্রিটোরিয়ায়। শহরের মাঝখানে সাদা অভিজাতের সবুজ পাড়া, চারপাশে ঘিরে কালোদের টাউনশিপ।

এই ছবিটাই স্লোবোডিয়ান আর টারনফের মূল কথা। মাস্কের ভবিষ্যৎ সবার জন্য খোলা কোনো জায়গা না, দেয়ালের ভেতরে থাকা কিছু লোকের জন্য বানানো, এবং এই দেয়ালটাই নকশার মূল অংশ।

জিনিসটা কেমন দাঁড়ায়, বাংলাদেশের হিসাব দিয়ে দেখা যায়।

সংযোগ নিতে শুরুতেই সাতচল্লিশ হাজার টাকার যন্ত্র, তারপর মাসে ছয় হাজার, সস্তা প্যাকেজে চার হাজার দুইশো। প্রথম বছরের খরচ লাখ টাকার কাছাকাছি।

ফল যা হওয়ার তাই। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রাহক এক হাজার নয়শো তেত্রিশ। বাংলা ট্রিবিউন লিখছে, সেবাটা মূলত করপোরেট আর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারে আটকে আছে।

➖

তবে মাস্কবাদের আসল বিক্রয়পণ্য গাড়ি বা রকেট বা ইন্টারনেট নয়। স্লোবোডিয়ান আর টারনফ সেটার নাম দিয়েছেন, ভাড়ায় দেওয়া সার্বভৌমত্ব।

ফর্মুলাটা এরকম। পৃথিবী অস্থির, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি নিরাপত্তা চায়, আর মাস্ক বলেন, আমার অবকাঠামোতে প্লাগ লাগান, স্বনির্ভর হয়ে যাবেন।

বইয়ের সবচেয়ে ধারালো বাক্যটা এই ফর্মুলার পরিণতি নিয়ে। মাস্কের কাছ থেকে প্লাগ খুলতে গিয়ে আবিষ্কার করবেন, সকেটটার মালিকও তিনি।

এবার শফিকুল আলমের ফেসবুক পোস্টটা আরেকবার পড়ুন। শাটডাউন চিরতরে বন্ধ করতে স্টারলিংক আনা হচ্ছে।

এটা ওই বিক্রয়বাক্যেরই বাংলা অনুবাদ। রাষ্ট্রের নিজের ব্যর্থতার বিমা কেনা হচ্ছে একটা বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে, এবং কেনার মুহূর্তে ব্যর্থতাটা সার্বভৌমত্বের ঘাটতি থেকে বদলে যাচ্ছে মাসিক বিলের খাতে।

আর যিনি বেচছেন, তার নিজের সাম্রাজ্যটা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক উল্টা ভিত্তির উপর।

মাস্ক প্রকাশ্যে রাষ্ট্রকে গালি দেন, কিন্তু স্পেসএক্সের জন্ম মার্কিন সামরিক চুক্তিতে, টেসলার বাড়বাড়ন্ত সরকারি ভর্তুকি আর সস্তা ঋণে, নাসার মহাকাশযাত্রা এখন তার রকেটের উপর নির্ভরশীল।

সার্বভৌমত্ব নামের পণ্যটার কারখানা চলে আরেক রাষ্ট্রের কোষাগারের টাকায়।

সেই রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে তিনি কী করেন, তারও নমুনা আছে।

সরকারি দক্ষতা দপ্তরের প্রধান থাকাকালে তার তদারকিতে মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়া হয়। নিউ ইয়র্ক রিভিউয়ের হিসাবে সাহায্য বন্ধের প্রথম এক বছরে আনুমানিক সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ শিশু।

মাস্কের নিজের ব্যাখ্যাটা যান্ত্রিক। পশ্চিমা সভ্যতার মৌলিক দুর্বলতা সহমর্মিতা, তার ভাষায় এমপ্যাথি এক্সপ্লয়েট, সিস্টেমের একটা ফুটা, যেটা দিয়ে দুর্বলেরা ঢুকে পড়ে।

যে লোক সহমর্মিতাকে সফটওয়্যারের বাগ মনে করেন, তার কোম্পানিকে দেশের আকাশে সুইচসহ ঢুকতে দেওয়ার আগে অন্তত এই বাক্যটা পড়ে নেওয়া দরকার ছিল।

➖

‘মাস্কবাদ’ ব্যবস্থাটার রাজনৈতিক নাম। স্লোবোডিয়ান আর টারনফ দেখিয়েছেন জিনিসটার রাজনীতি কেমন।

ব্যবস্থাটা টাকার হিসাবে কীভাবে চলে, সেই প্রশ্নের উত্তর এসেছে অন্য দিক থেকে।

গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারোফাকিসের দাবি, আমরা যে ব্যবস্থায় ঢুকছি সেটা আর পুঁজিবাদ না, টেকনো-সামন্তবাদ। পুঁজিবাদ চলত মুনাফায়, সামন্তবাদ চলত খাজনায়, এখন ক্লাউড-পুঁজির মালিকেরা মুনাফার জায়গায় ফিরিয়ে এনেছে খাজনা।

খাজনা মানে জমির ফসল না ফলিয়েও জমির মালিকানার জোরে আদায় করা ভাগ।

ক্লাউড-খাজনা হলো প্ল্যাটফর্মে ঢোকার ভাড়া। যে ব্যবসায়ী প্ল্যাটফর্ম ছাড়া চলতে পারেন না, ভারোফাকিসের ভাষায় তিনি করদ পুঁজিপতি। জমিদারের প্রজা, তবে দলিলে লেখা থাকে অংশীদার।

বাংলাদেশের কাগজপত্রে এই সম্পর্কটা লেখা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির নিজের নামে একটা স্যাটেলাইট আকাশে ঘুরছে। সেই প্রতিষ্ঠান এখন স্টারলিংকের অনুমোদিত রিসেলার, আড়াই মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে যন্ত্র আর ডেটা প্যাকেজ কিনে বেচবে, হার্ডওয়্যারে পনেরো আর সেবায় পাঁচ শতাংশ ছাড়ে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ বানাতে ২০১৮ সালে খরচ হয়েছিল প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। গত জুনে সংসদে জানানো হয়, পাঁচ অর্থবছরে তার মোট রাজস্ব সাতশো চৌষট্টি কোটি।

নিজের অবকাঠামো বানাতে গিয়ে যে টাকা ওঠে নাই, অন্যের অবকাঠামো বেচে সেটা কমিশনে উঠবে।

রাষ্ট্রও খাজনার খাতায় আছে, তবে আদায়কারী হিসেবে না। বিটিআরসি স্টারলিংকের কাছ থেকে প্রথম দুই বছর কিছুই পাবে না, তৃতীয় বছর থেকে রাজস্বের তিন শতাংশ, ষষ্ঠ বছর থেকে সাড়ে পাঁচ।

গত ৫ জুলাই যোগ হয়েছে নতুন আরেকটা খাত। সরকার অনুমোদন দিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে আনফিল্টার্ড ইন্টারনেট রপ্তানি করতে পারবে স্টারলিংক, আর মূল ব্যান্ডউইথ দিবে রাষ্ট্রীয় সাবমেরিন কেবল কোম্পানি।

আনফিল্টার্ড মানে যে ট্রাফিক রাষ্ট্রের ছাঁকনির ভেতর দিয়ে যায় না। নিজের নাগরিকের জন্য ছাঁকনি বহাল, ভাড়াটিয়ার আঞ্চলিক ব্যবসার জন্য ছাঁকনি নাই।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী ডেইলি স্টারকে বলেছেন, এই ব্যান্ডউইথ দেশের ভেতরে ঢুকবে না, সরাসরি অন্য দেশে যাবে।

কথাটা সত্যি ধরে নিলেও রাষ্ট্রের ভূমিকা বদলায় না। স্টারলিংক নেপাল আর ভুটানে ইন্টারনেট বেচবে, আর সেই ইন্টারনেট বাংলাদেশের সমুদ্রতলের কেবল দিয়ে গিয়ে পৌঁছাবে।

মাঝখানে বাংলাদেশ পাবে ব্যান্ডউইথের ভাড়া।

➖

জমিদারির আসল ক্ষমতা খাজনা আদায় না, উচ্ছেদ।

ভারোফাকিস লিখেছেন, পুরোনো জমিদারের লাঠিয়াল লাগত, ক্লাউড-জমিদারের লাগে না। একটা লিংক সরিয়ে দিলেই প্রজা বাজার থেকে উধাও।

স্টারলিংকের বেলায় লিংকটার নাম কাভারেজ, অর্থাৎ কোন এলাকায় সেবা চালু থাকবে সেই সিদ্ধান্ত।

রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনের পাল্টা অভিযানের এক পর্যায়ে খেরসনে কাভারেজ বন্ধের নির্দেশ দেন মাস্ক। নজরদারি ড্রোন অন্ধ হয়ে যায়, দূরপাল্লার কামান লক্ষ্য হারায়।

স্পেসএক্স প্রতিবেদনটা অস্বীকার করেছে।

ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের লেখা মাস্কের জীবনীতে আরেকটা ঘটনা আছে। সেভাস্তোপোলে রুশ নৌবহরে হামলার জন্য ইউক্রেন সেবা চালুর অনুরোধ করেছিল, মাস্ক রাজি হন নাই, বিস্ফোরক-ঢোকানো ড্রোনগুলো পরে সংযোগ হারিয়ে তীরে ভেসে ওঠে।

আবার সংযোগ বন্ধ করাটাই একমাত্র ব্যবহার না। চালু রাখাটাও অন্য দেশের ভেতরে ঢোকার রাস্তা।

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট গত জুনে জেরুজালেমের এক সম্মেলনে বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি কয়েক হাজার স্টারলিংক রিসিভার ইরানে পাচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রয়টার্স বক্তব্যটা ছেপেছে।

তার নিজের ভাষায় লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার ফেলে দেওয়া।

অর্থাৎ এক দেশের ইন্টারনেট সরঞ্জাম আরেক দেশে ঢুকেছে সেই দেশের সরকার ফেলার উদ্দেশ্যে, আর কাজটার কথা স্বীকার করেছেন উদ্যোগ নেওয়া রাষ্ট্রের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই।

ইরানে স্টারলিংকের কোনো অনুমোদন নাই, তবু যন্ত্র আছে, চলেও।

➖

তবে এই পুরা যুক্তির উল্টা দিকেও কয়েকটা শক্ত কথা আছে, সেগুলো না বললে হিসাবটা অসম্পূর্ণ থাকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে আক্রমণকারী কোনো বিদেশি জমিদার ছিল না, ছিল রাষ্ট্র নিজে। ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড বন্ধ হয়, মধ্যরাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক, চলে ২৩ জুলাই পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা পূর্ণ ব্ল্যাকআউট ৫ অগাস্ট।

ডিজিটালি রাইটের গবেষণা বলছে, ভিপিএন পর্যন্ত বন্ধ করা হয়েছিল। নাগরিকের ফোনে সরকারি খুদে বার্তা গিয়েছিল, ডেটা সেন্টারে আগুনের গল্প লিখে।

ই-ক্যাবের হিসাবে ক্ষতি প্রায় সতেরোশো কোটি টাকা। যে রাষ্ট্র এটা করেছে, তার হাত থেকে সুইচ সরানোর তাগিদ কল্পনা না।

একইভাবে, প্রযুক্তিটার উপকারও বাস্তব।

ফাইবার যেখানে পৌঁছায় না বা কেটে দেওয়া হয়, আকাশের সংযোগ সেখানে আলাদা রাস্তা। দুর্যোগে, চরে, পাহাড়ে, গভীর সমুদ্রে। গত মার্চে ট্রেনেও পরীক্ষামূলক সংযোগ চালু হয়েছে।

আর শাটডাউন বন্ধের আসল কাজটা রাষ্ট্র নিজেই করেছে, কক্ষপথে না, কাগজে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া টেলিযোগাযোগ সংশোধন অধ্যাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করার ক্ষমতা আইন থেকেই তুলে দেওয়া হয়েছে।

একই সংশোধনীতে এনটিএমসি বিলুপ্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট গঠনের বিধান হয়, যে সংস্থা নিজে আড়ি পাততে পারবে না, কেবল কারিগরি সহায়তা দেবে।

অধ্যাদেশ জারির সাত দিন পর দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়।

এর তিন মাস পর, গত ২০ মে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনটিএমসির জন্য একটা কেনাকাটার প্রস্তাব অনুমোদন করে।

কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। কাজ পেয়েছে ঢাকার গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসি, উন্মুক্ত দরপত্রে না, নয়টি বাছাই করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত দরপত্রে।

যে সংস্থাকে বিলুপ্ত করার কথা ছিল, তার নামেই কেনাকাটা।

জিনিসটা অবশ্য শাটডাউন না। ইন্টারনেট পুরো বন্ধ করা আর নির্দিষ্ট কনটেন্ট ছেঁকে ফেলা আলাদা কাজ। আইন থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রথমটা।

এর অর্থ, আইন সুইচটা কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ছাঁকনিটা রেখে দিয়েছে, এবং ছাঁকনির জাল আগের চেয়ে ঘন হচ্ছে।

তবু যে কাজটা স্টারলিংকের নামে বিক্রি হয়েছিল, সেটুকু করল একটা অধ্যাদেশের কয়েক লাইন। বিনা মাসিক ফিতে, বিনা সাতচল্লিশ হাজারে।

➖

আঠারো মাস আগের সেই ভিডিও কলে ফিরি।

টেবিলের একপাশে সাড়ে সতেরো কোটি মানুষের রাষ্ট্র, তার প্রতিনিধি প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস, আরেক পাশে একজন ব্যক্তি, ইলন মাস্ক। কথা হয়েছিল ইন্টারনেট সেবা নিয়ে।

রাষ্ট্র পেয়েছে দুই হাজার গ্রাহকের একটা সেবা, একটা রিসেলার চুক্তি, আর প্রতিবেশী দেশে ব্যান্ডউইথ পাঠানোর ভাড়া।

বিপরীতে দিয়েছে দুই সপ্তাহে লাইসেন্স, নিজের স্যাটেলাইট কোম্পানিকে দোকানদারি, নজরদারি সংস্থার সামনে একটা জানালা, যার পাল্লা অন্যের হাতে।

এইদিকে শাটডাউন বন্ধ করেছে দেশের আইন। আইনটা এই দেশের। সংসদ বদলালে আইনও বদলায়, নাগরিক সংসদ বদলাতে পারে।

স্টারলিংকের সুইচটা এই দেশের না। ভোট দিয়ে তার নাগাল পাওয়া যায় না, আদালতেও না।

স্লোবোডিয়ান আর টারনফের কথাটাই তাই শেষ হিসাব। স্বনির্ভর হতে গিয়ে আমরা একজনের অবকাঠামোয় প্লাগ লাগিয়েছি।

প্লাগটা হয়তো আমাদের, কিন্তু সকেটটা না।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন