একটা শব্দ কীভাবে খুনের আলামত লুকায়, সেটা দেখতে হলে এই সপ্তাহের চট্টগ্রামের দিকে তাকাতে হবে।
শহরটার অবস্থান হল, এক পাশে সারি সারি পাহাড়, উল্টো পাশে বঙ্গোপসাগর, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী। বৃষ্টির পানির এখানে বেরোনোর পথ মোট দুইটা। হয় পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে নামবে, নয়তো নগরের খাল ধরে নদীতে গিয়ে পড়বে।
এই দুইটা পথই বন্ধ হয়ে গেল। পাহাড় বেয়ে যে পানি নামল, সে ঢলের সঙ্গে নামিয়ে আনল পাহাড়ের গা-ও, চাপা পড়ল নিচের ঘরবাড়ি। আর খালের দিকে যে পানি ছুটল, সে নদীর মুখ পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারল না, থমকে বসে রইল শহরের বুকের ওপর।
হিসাব মিলিয়ে দাঁড়াল, সাত জেলায় একান্নটি মৃতদেহ। দশ লাখেরও বেশি মানুষ পানির কবলে, জনসংখ্যায় যা একটা গোটা সিলেট শহরের সমান।
পৌনে তিন লাখ পরিবার ঘরবন্দি। মৃত্যুতে সবচেয়ে এগিয়ে কক্সবাজার, আটাশজন, যাদের তেরোজন রোহিঙ্গা। কাটা পাহাড়ের ঢালে গড়ে তোলা ক্যাম্পের বাসিন্দা।
দুর্যোগ মন্ত্রণালয় গোটা ঘটনার গায়ে সেঁটে দিল একটাই তকমা, বন্যা।
এই লেখা সেই ‘বন্যা’ শব্দ নিয়ে। কারণ শব্দটা যত সরল শোনায়, ততটা নিরীহ নয়।
➖
আসলে এই সপ্তাহে একটা দুর্যোগ ঘটে নাই। ঘটেছে তিনটা আলাদা চেহারার, আলাদা উৎসের, এবং সবচেয়ে জরুরি কথা, আলাদা দায়ের।
এক নম্বরটা সত্যিকারের বন্যা। উজানের ঢল, ফুলে ওঠা নদী, উপচে পড়া পানি। এর জন্ম প্রকৃতিতে, তাই এখানে রাষ্ট্রের দায় সীমিত। আগেভাগে সতর্ক করা, ঠিকঠাক পূর্বাভাস দেওয়া আর মানুষকে সরিয়ে নেওয়া।
দুই নম্বরটা পাহাড়ধস, এবং এইখানেই গল্পটা ঘোলাটে হয়। পাহাড় প্রকৃতির নিয়মেও ধসে, চট্টগ্রামের বেলে-দোআঁশ মাটির টিলা টানা বৃষ্টিতে এমনিতেই নরম হয়ে খসে পড়ে।
কিন্তু যে ধসগুলো মানুষ মারে, সেগুলোর প্রতিটি বড় তদন্তে ঘুরেফিরে আসে একটাই কথা, কাটা পাহাড়। আর কাটা ঢালের নিচে বসতে দেওয়া বসতি।
খাড়া করে কেটে ফেলা পাহাড় বৃষ্টিতে যেভাবে ধসে, প্রাকৃতিক ঢালের পাহাড় সেভাবে ধসে না। প্রশ্নটা তাই প্রকৃতির না, কে কাটল, কে কাটতে দিল, পাদদেশে ঘর উঠল কার চোখের সামনে, তার।
তিন নম্বরটা জলাবদ্ধতা, যেটা আসলে কোনো ঘটনাই না, একটা অবস্থা। বৃষ্টি হওয়া অপরাধ না। পানির বেরোনোর পথ না থাকাটাই অপরাধ। সেই পথ কোথায় হারাল, তার জবাব লেখা আছে চার-চারটা সরকারি প্রকল্প আর চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার নথিতে।
তিন উৎস, তিন দায়। কিন্তু ব্রিফিংয়ে, শিরোনামে, শোকবার্তায়, তিনটাই গলে মিশে যায় এক শব্দে। ‘বন্যা’।
শব্দটার কেরামতি এখানেই যে ‘বন্যা’ বললে দায় গিয়ে ওঠে আকাশের ঘাড়ে। জলাবদ্ধতা বললে দায় বর্তায় প্রকৌশলীর ওপর। আর পাহাড়ধস বললে আঙুল ওঠে প্রশাসনের দিকে।
আসামি যখন মেঘ, মামলা তখন এমনিতেই খারিজ হয়ে যায়। বাদীপক্ষ আকাশের নামে সমন পাঠাবে কী প্রক্রিয়ায়?
খেলাটা অবশ্য চট্টগ্রামের একচেটিয়া না। গতকাল ঢাকাও ডুবেছিল, আর সেখানকার শব্দ ছিল “বৃষ্টিতে দুর্ভোগ”।
➖
তিন নম্বর ঘটনাটা দিয়েই শুরু করি, কারণ এখানকার সংখ্যাগুলোর মুখে আলাদা করে কিছু বসাতে হয় না, নিজেরাই কথা বলে।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা তাড়াতে সরকারি প্রকল্প চলছে চারটা। কতকাল ধরে? প্রকল্পগুলোর কোনোটার বয়স আট বছর, কোনোটার দশ। এত বছর আর এত টাকা ঢালার পরও মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই শহর কোমরপানির নিচে।
এই চার প্রকল্পে বরাদ্দ চৌদ্দ হাজার কোটি টাকার বেশি, খরচ হয়ে গেছে দশ হাজার চারশো কোটি। টাকাটা চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি পরিবারের হাতে ভাগ করে দিলে ঘরপ্রতি লাখ টাকার ওপরে পড়ত।
কাগজে-কলমে এই প্রকল্পগুলোর কাজ নব্বই ভাগ শেষ। বাস্তবে, মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই চান্দগাঁওয়ের রেললাইন ডুবে গেল আড়াই ফুট পানির নিচে।
কী করে সম্ভব হলো, তার তিনটা গোড়ার কারণ আছে, তিনটাই নথিভুক্ত।
প্রথমত, শহরের পানি বের হওয়ার মূল রাস্তা তার খালগুলো। প্রকল্পে ঢোকানো হয়েছে ছত্রিশটা খাল, বাদ থেকে গেছে একুশটা, অর্থাৎ মোটামুটি প্রতি তিন খালের একটা মেরামতের তালিকাতেই ওঠে নাই।
দ্বিতীয়ত, ১৯৯৫ সালের আদি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় ছিল একগুচ্ছ জলাধার। বাড়তি পানি ধরে রাখার পুকুর, বৃষ্টির জন্য এক ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব। নতুন প্রকল্প সেই জলাধারগুলোকে বাদ দিয়ে দিয়েছে।
তৃতীয় কারণটা সবচেয়ে ভারী। এই বিশাল প্রকল্পের মূল ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিডিএর হাতে। খাল খননে এই সংস্থার আগের অভিজ্ঞতা কতখানি ছিল?
এক ফোঁটাও না। কোনো অভিজ্ঞতা নাই, বিষয়টা দেখার আলাদা বিভাগ নেই, দক্ষ জনবলও নাই।
এটা কোনো সমালোচকের অভিযোগ নয়। খোদ এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী এই এপ্রিলে প্রকল্প ঘুরে দেখে প্রকাশ্যে বলে এলেন, এত বড় কাজ চালানোর সামর্থ্যই সিডিএর নেই, তাদের এই দায়িত্ব দেওয়াটাই ভুল হয়েছিল।
আট বছর আর দশ হাজার কোটি টাকা খরচের পর সরকারেরই একজন মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি, রোগী মারা যাওয়ার পর ময়নাতদন্তে যখন লেখা হয়, চিকিৎসাটাই ভুল ছিল।
➖
তাহলে কাজ না-জানা সংস্থাটার হাতেই প্রকল্প গেল কেন?
সরকারি খাতায় এর উত্তর নাই। কিন্তু কাঠামোটার দিকে তাকালে উত্তরটা নিজেই উঁকি দেয়।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সামলাত একসময় সিটি করপোরেশন। ২০১৭ সালে কাজটা নিজের কাঁধে টেনে নেয় সিডিএ। দুই সংস্থার সেই রশি-টানাটানি আজও থামেনি। একজন খাল কাটে, আরেকজন নালা বাঁধে, আর মাঝখানের জোড়টা কারও খাতাতেই ওঠে না।
অথচ বিষয়টা পুরোপুরি জোড়া দেওয়ারই খেলা। খাল, নালা, জলাধার আর জোয়ার একসঙ্গে না খাটলে সে নামে না। এখানে প্রকল্প ভাগ হয়েছে সংস্থার সীমানা ধরে, পানির গতিপথ ধরে নয়।
কেন সংস্থার সীমানা ধরে? উত্তরটা রুক্ষ রকমের সরল। বড় প্রকল্প মানে বড় বাজেট, আর বাজেট যার হাতে, ক্ষমতা তার। গত পনেরো বছরে সিডিএ একাই বাগিয়েছে আঠারো হাজার কোটি টাকার পঁচিশটা প্রকল্প।
আর তার আসল কাজ, শহরের নির্মাণকাজে নজরদারি, সেই খাতায় কী জমেছে, সেটা একটা সংখ্যাতেই স্পষ্ট। খালের পাড় ঘেঁষে বারো ফুটের মধ্যে স্থাপনা তোলা নিষিদ্ধ, ২০০৮ সালের পরিকল্পনাতেই তা কালো অক্ষরে লেখা।
সেই নিষিদ্ধ জমিনে, সিডিএর চোখের সামনে, দাঁড়িয়ে গেছে এক হাজার আটশো চারটি স্থাপনা।
এখন খাল কাটতে গিয়ে সেই স্থাপনাগুলোই ভাঙতে হচ্ছে। আর ভাঙার জন্য দখলদারদের ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে দুইশো চব্বিশ কোটি টাকা।
➖
এবার দ্বিতীয় ঘটনায় ফেরা যাক, পাহাড়ধস। এখানকার হিসাবটা টাকার নয়, ক্যালেন্ডারের।
২০০৭ সালের ১১ জুন। এক রাতের প্রবল বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের লালখান বাজার, মতিঝরনা, কুসুমবাগসহ নয়টি জায়গায় পাহাড় ধসে প্রাণ গেল ১২৭ জনের। গঠিত হলো তদন্ত কমিটি। ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে হাতে এল ৩৬ দফা সুপারিশ, পাহাড় কাটা বন্ধ করো, ঝুঁকির বসতি সরাও, দায়ীদের ধরো।
২০১৭ সালের ১৩ জুন। রাঙামাটি-বান্দরবান-চট্টগ্রামে ধসে মারা গেল দেড়শোর বেশি মানুষ। আবার কমিটি, আবার সুপারিশ। অক্ষরে অক্ষরে সেই একই সুপারিশ।
২০২৬ সালের জুলাই। আবার।
উনিশ বছর, একের পর এক গণমৃত্যু, স্তূপ হয়ে ওঠা কমিটির নথি, আর সেই ৩৬ দফা সুপারিশের বাস্তবায়ন আজ পর্যন্ত ঠিক কতটা? শূন্য। একটা দফাও না। উনিশ বছরে ওই কাগজ হিমাগার থেকে একবারও বের হয় নাই।
এই উনিশ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ গেছে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের। আর প্রতিবার একই মহড়া মঞ্চস্থ হয়েছে। বর্ষা আসার আগে প্রশাসন “ঝুঁকিপূর্ণ বসতির” তালিকা বানায়, মাইকিং হয়, গুটিকয় পরিবারকে কদিনের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে তোলা হয়। বৃষ্টি থামলে তারা ফিরে যায় সেই একই ঢালে। কারণ যাওয়ার আর কোনো জায়গা তাদের কেউ বানিয়ে দেয় নাই।
পাহাড় কাটাও থামে না, কারণ তালিকায় কখনো তাদের নাম ওঠে না যারা কাটে। নাম ওঠে কেবল তাদের, যারা ঢালের নিচে ঘুমায়।
সবচেয়ে চমকে দেওয়া তথ্যটা হল, এত মৃত্যু, এত কমিটি, এত মাইকিংয়ের পরও চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি কমেনি, বেড়েছে। ২০১৪ সালে এগারোটি পাহাড়ে ঝুঁকির মধ্যে ছিল ৬৬৬টি পরিবার। আজ সেই সংখ্যা ছয় হাজার একশো পঁচাত্তর। এক দশকে প্রায় দশ গুণ।
অর্থাৎ ব্যবস্থাটা ঝুঁকি কমায় না। ব্যবস্থাটা কেবল প্রতি বর্ষায় নতুন করে গুনে রাখে, ঢালের নিচে এবার কতগুলো প্রাণ জমা পড়ল।
এই মৃত্যুকে “প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলা যায়? যে মৃত্যুর মাস আগে থেকে জানা, জুন থেকে জুলাই, জায়গা জানা, এমনকি কোন ঢালের কোন বস্তি সেটা পর্যন্ত নথিতে লেখা, সেই মৃত্যুর দায় প্রকৃতির ঘাড়ে চাপানো প্রকৃতির প্রতি নিছক অবিচার।
তবু এরই ভেতরে মানুষ মানুষের কাজটুকু করে যায়। এই দুর্যোগেই খরস্রোতা সাঙ্গুতে ভেসে যাচ্ছিলেন কয়েকজন তরুণ, জীবন বাজি রেখে তাদের টেনে তুললেন স্থানীয় কিছু যুবক।
রাষ্ট্র যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে মানুষই মানুষের একমাত্র উদ্ধারকারী। ছবিটা একদিনের জন্য ভাইরালও হলো। ছবিটা আপনাদের চোখে পড়েছে।
➖
এর পরের দৃশ্যগুলোও যেন আগে থেকে ক্যালেন্ডারে লেখা।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা যাবেন, ত্রাণের প্যাকেট হাতে ছবি উঠবে, এবারও উঠছে। ঘোষণা আসবে, “একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারও বাদ যাবে না।” ওপর থেকে নেমে আসবে “সর্বোচ্চ সতর্কতার নির্দেশ।”
সংবাদপত্রে প্রথম দিন প্রথম পাতা, পরদিন ভেতরের পাতা, তৃতীয় দিন একেবারে অন্য খবর।
আর পুনর্বাসন? ২০০৭ সালের ধসে ঘরহারা পরিবারগুলো আজ কোথায়, ২০১৭ সালেরগুলো কোথায় গিয়ে ঠেকল, এই ফলোআপ কোনো কাগজেও নেই, কোনো দপ্তরেও নেই। ত্রাণ আছে, পুনর্বাসন নেই। উদ্ধার আছে, প্রতিরোধ নেই।
কেন নেই, তার জবাবটা নির্মম রকম সহজ। দুর্যোগের পরের কাজে বরাদ্দ আছে, ছবি আছে, বাহবা আছে। আর আগের কাজে আছে কেবল একটা না-ঘটা দুর্ঘটনা, যা দিয়ে কোনো প্রেস রিলিজ লেখা যায় না, কোনো ফিতা কাটা যায় না।
সরকার বদলেছে, আমল বদলেছে। প্রকল্পগুলো আগের জমানার, ত্রাণের ছবিগুলো এখনকার। শুধু পানির বেরোনোর পথটা কোনো জমানাতেই বদলায়নি।
➖
শুরুর প্রশ্নে ফিরি, একান্নজন মানুষের মৃত্যু কি স্বাভাবিক?
এই প্রশ্নের উত্তর দুটো, এবং দুটোই সত্য।
না, কারণ এই মৃত্যুর প্রতিটি উপাদান মানুষের হাতে গড়া। কাটা পাহাড় মানুষের কাটা, বাদ-পড়া একুশটা খাল মানুষের বাদ দেওয়া, মুছে ফেলা জলাধার মানুষের মোছা, কাজ না-জানা সংস্থার হাতে দশ হাজার কোটি টাকা মানুষেরই তুলে দেওয়া। এর কোথাও নিয়তি নেই, সবটাই সিদ্ধান্ত।
আবার হ্যাঁ, এবং এই উত্তরটাই বেশি ভয়ের, মৃত্যুগুলো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। উনিশ বছরে আমরা এমন এক জায়গায় এসে ঠেকেছি, যেখানে বর্ষায় পাহাড়ধসের খবর আর খবর নয়, প্রায় রোজকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস। পড়ি, তারপর পাতা উল্টাই।
এই অভ্যস্ততাই আসল কলঙ্ক। আর অভ্যস্ততাটা তিলে তিলে বানানো হয়েছে ওই একটিমাত্র শব্দ দিয়ে।
বন্যা।
শব্দটা কানে যেতেই দায়টা তরতর করে উঠে যায় আকাশে। অথচ আকাশ এবার নতুন কিছু করে নাই। প্রতি বছর যা করে, তা-ই করেছে।
বাকি পুরোটাই তার কাজ, সেই রাষ্ট্রের কাজ। কাটা পাহাড়, বন্ধ খাল, উধাও জলাধার, অচল জলকপাট, হিমাগারে পচতে থাকা ৩৬ দফা সুপারিশ।
একান্নটা মৃত্যুর নাম রাখা হয়েছে বন্যা। নামটা মিথ্যা।