গত ছয়ই জুলাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করলেন ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। তথ্যটা সকলেরই জানা।
আলোচনার বিষয়, বিশ্বকাপ ম্যাচের একটা লাল কার্ড।
চলতি বিশ্বকাপে আমেরিকার প্লেয়ার ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড খেয়ে পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ হয়েছেন। ট্রাম্প ইনফান্তিনোকে বললেন, সিদ্ধান্তটা আরেকবার দেখেন।
ফিফা ওই লাল কার্ড নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দিল।
ইউরোপের ফুটবল-মহল প্রতিবাদে ফেটে পড়ল, কিন্তু তাতে কিছুই বদলাল না।
খেলাটার দেড়শো বছরের ইতিহাসে রেফারির সিদ্ধান্ত ছিল মাঠের শেষ কথা। সেই সিদ্ধান্তের ওপরে এখন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের টেলিফোন বসে গেছে।
এবং যে সংস্থা নিজেকে বলে রাজনীতির ঊর্ধ্বে, সে ওই ফোনকল ধরে তা মেনে নিয়েছে।
আজ রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এই বিশ্বকাপের ফাইনাল। কিন্তু এই লেখা খেলার আগাম রিপোর্ট না।
এই লেখার প্রশ্নটা ওই টেলিফোনের, খেলাটা আসলে কার?
প্রশ্নটা নতুন না। সাতশো বছর ধরে ক্ষমতা আর জনতা এই একই প্রশ্নে লড়ছে।
আর সেই লড়াইয়ের পুরো খতিয়ান না টানলে বোঝা যায় না, আজ রাতের ফাইনালে আসলে কী কী বিক্রি হচ্ছে, আর কারা তার দাম দিচ্ছে।
➖
আগে এই বিশ্বকাপের সীমান্ত-নীতিটা নথিভুক্ত করা যাক, কারণ এই আয়োজন শুরু হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, খেলার মাঠের চেয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের ভূমিকা এবার বড়।
ইরানের দর্শকরা টিকিট কেটেছিলেন। আয়োজক দেশ তাদের দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পর সেইসব টিকিট বাতিল হয়ে গেল।
আফ্রিকার সেরা রেফারিদের একজন, সোমালিয়ার ওমর আবদুলকাদির আরতান, তার নিজের ভাষায় “সঠিক কাগজ, সঠিক ভিসা” নিয়ে মায়ামি বিমানবন্দরে নামলেন।
তাকে এগারো ঘণ্টা জেরা করে ফেরত পাঠানো হলো।
পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমি তো স্রেফ একজন রেফারি, জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা ছুঁতে এসেছিলাম। এগারো ঘণ্টার জেরায় রাষ্ট্র তার কাছে কী জানতে চেয়েছিল, সেটা আজও জানা যায় নাই।
ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ঢুকতেই পারেননি। ভিসা মেলেনি।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দর্শকদের প্রকাশ্যে সতর্ক করলেন, খেলা দেখে চলে যেয়ো, বেশিদিন থেকো না।
প্রেসিডেন্ট নিজে হুমকি দিলেন, যেসব শহরের রাজনীতি তার অপছন্দ, সেই বস্টন-সিয়াটল থেকে ম্যাচ সরিয়ে নেবেন। নিয়ম অনুযায়ী সেই এখতিয়ার তার নেই, আছে ফিফার।
কিন্তু বাস্তবে ফিফারও যে নেই, সেটা তো ছয়ই জুলাইয়ের ফোনকলেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল।
➖
এখন জিজ্ঞেস করা যায়, একটা খেলা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর এত মাথাব্যথা কেন। এর উত্তর দুইটা সংখ্যায়।
জাতিসংঘের সদস্য একশো তিরানব্বইটা দেশ। ফিফার সদস্য দুইশো এগারো।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সংগঠনের চেয়ে ফুটবলের সংগঠনে আঠারোটা পতাকা বেশি ওড়ে। যে জাতিগুলোকে পৃথিবী রাষ্ট্র মানতে রাজি হয়নি, ফুটবল তাদের অনেককে মেনে নিয়েছে।
ফিলিস্তিন তার একটা, জাতিসংঘে পূর্ণ আসন নেই, অথচ ফিফার খাতায় সে একটা দেশ, বিশ্বকাপ বাছাইয়ে খেলে।
আর দর্শকের হিসাবে গত বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছিল দেড়শো কোটি মানুষ, পুরো আসর মিলিয়ে সেটা স্পর্শ করেছিলো পাঁচশো কোটিকে।
পুরা মানবজাতিরই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। কোনো নির্বাচন, কোনো ধর্মীয় উৎসব, কোনো যুদ্ধ এত মানুষকে একসঙ্গে এক দিকে তাকাতে বাধ্য করতে পারেনি।
এত বড় জমায়েতের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে, এটা তাই কোনোদিনই নিছক খেলার প্রশ্ন না। শেষপর্যন্ত ক্ষমতার প্রশ্ন।
এবং ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা এই প্রশ্নটা ধরে ফেলেছিল অনেক আগে।
➖
তেরোশো চোদ্দ সালে লন্ডনের মেয়র রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের নামে ফরমান জারি করে শহরে ফুটবল নিষিদ্ধ করলেন।
কারণ হিসেবে লেখা হলো, খেলাটাকে ঘিরে “বিশাল জনতার হুড়োহুড়ি”, যা থেকে “অনেক অনিষ্টের আশঙ্কা।”
পরের সাড়ে তিনশো বছরে ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের রাজারা এই খেলা নিষিদ্ধ করলেন তিরিশ বারের বেশি। তিরিশবারই ব্যর্থ হলেন।
কারণটা বোঝা কঠিন না। এই খেলার জন্য জমিদারি লাগে না, দামি সরঞ্জাম লাগে না, লাগে শুধু একটা গোল জিনিস, কাপড়ের পুঁটলি হলেও চলে।
ফলে খেলাটা যেখানে যায়, সেখানেই গরিবের বড় জমায়েত বসে যায়। আর গরিবের বড় জমায়েতের চেয়ে ভয়ের জিনিস ক্ষমতার অভিধানে দ্বিতীয়টা নাই।
ছয়শো বছর পরে ভয়টা একই রইল, শুধু ভয় পাওয়ার লোক বদলাল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইংল্যান্ডে পুরুষরা ফ্রন্টে, অস্ত্র-কারখানা চালাচ্ছে মেয়েরা। কাজের ফাঁকে তারা ফুটবল দল বানাল, এবং তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত দলটার একটা ম্যাচ দেখতে এক বড়দিনের পরদিন মাঠে এল তিপ্পান্ন হাজার দর্শক।
শ্রমিক-ঘরের মেয়েরা পুরুষদের সমান গ্যালারি ভরাচ্ছে, ফুটবলের অভিভাবক ভদ্রলোকদের এটা সহ্য হলো না।
উনিশশো একুশ সালে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দিল, খেলাটা “মেয়েদের জন্য অনুপযুক্ত”, এবং মেয়েদের ফুটবল নিষিদ্ধ করা হল।
নিষেধাজ্ঞাটা তোলা হয় পঞ্চাশ বছর পর। একটা গোটা প্রজন্মের মেয়েরা খেলাটা ফেরত পাওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে গেল।
দুটো নিষেধাজ্ঞার কারণ এক। খেলাটার কোনো দোষ ছিল না। দোষ ছিল, ভুল মানুষেরা খেলাটার দখল নিচ্ছিল।
আর এই “ভুল মানুষদের” হাতে খেলাটা কী করতে পারে, তার নথিভুক্ত প্রমাণ আছে যুদ্ধক্ষেত্রে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কোনো জেনারেলের হুকুম ছাড়াই ব্রিটিশ আর জার্মান সেনারা দুই পরিখার মাঝখানের জমিতে উঠে এসেছিল। একাধিক সৈনিকের চিঠির সাক্ষ্যমতে, তারা ফুটবল খেলেছিল।
যে মানুষগুলোকে দুটো সাম্রাজ্য জন্মশত্রু বলে শিখিয়েছিল, একটা বল তাদের নব্বই মিনিটের জন্য স্রেফ খেলোয়াড় বানিয়ে দিয়েছিল।
জেনারেলরা হিসাবটা ধরে ফেলেছিলেন। শত্রুকে মানুষ ভাবতে শুরু করলে সৈনিক আর গুলি চালায় না।
পরের বছরগুলোতে তাই বড়দিন এলেই গোলাবর্ষণ বাড়ানোর নির্দেশ যেত, যাতে দৃশ্যটা আর ফিরতে না পারে।
উল্টো দিকের নজিরও আছে, যেখানে খেলাটা দখলদারের মুখের ওপর জবাব হয়ে উঠেছে, এবং জবাবের দাম মেটাতে হয়েছে রক্তে।
উনিশশো বিয়াল্লিশের নাৎসি-দখলি কিয়েভে রুটি-কারখানার শ্রমিকদের একটা দল, যাদের অনেকে যুদ্ধের আগের ডায়নামো কিয়েভের ফুটবলার, জার্মান বাহিনীর দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামে।
রেফারি ছিল এসএস অফিসার, ফলাফল কী হওয়া উচিত সেটাও বলে দেওয়া ছিল।
শ্রমিকরা জেতে পাঁচ-তিনে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খেলোয়াড়দের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, কেউ যায় বন্দিশিবিরে, কাউকে গুলি করা হয়।
আর উনিশশো আটান্নর আলজেরিয়ায় ফরাসি লিগের আলজেরীয় তারকারা, এক রাতে সব ফেলে সীমান্ত পেরিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন এফএলএনের নিজস্ব দল গড়েন।
এই তারকাদের অনেকের সামনেই ফ্রান্সের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ ছিলো।
যে দেশের জন্মই হয়নি, তার জাতীয় দল হয়ে তারা দুনিয়া ঘুরে খেলেন। ফিফা স্বীকৃতি দেয়নি। চার বছর পর আলজেরিয়া স্বাধীন হয়, আর ওই পলাতক ফুটবলাররাই হন জাতির প্রথম নায়ক।
রাজার ফরমান, ভদ্রলোকের নিষেধাজ্ঞা, জেনারেলের গোলাবর্ষণ, এসএস অফিসারের বাঁশি। ছয়শো বছরে ক্ষমতা বারবার চেষ্টা করেছে খেলাটা কেড়ে নিতে, আর প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে।
কারণ কেড়ে নেওয়ার মতো কোনো জিনিস এখানে ছিল না। ছিল শুধু মানুষের জড়ো হওয়ার ইচ্ছা।
তখন ক্ষমতা কৌশল বদলাল। কেড়ে নেওয়া যখন যাচ্ছে না, তখন কিনে নেওয়া যাক।
➖
কেনাবেচার এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাক্ষীর নাম দিয়েগো ম্যারাডোনা।
কারণ তার এক জীবনেই দুইটা পর্ব আছে, খেলাটা যখন গরিবের অস্ত্র, আর খেলাটা যখন বিক্রির পণ্য।
বুয়েনোস আইরেসের ভিয়া ফিওরিতো বস্তিতে পানি ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না।
রাজমিস্ত্রি বাবা ভোর চারটায় কাজে বের হতেন। সেই ঘরের ছেলেটা যখন ইউরোপে খেলতে গেল, বার্সেলোনার গ্যালারি তাকে ডাকত “সুদাকা” বলে, দক্ষিণ আমেরিকার বাদামি চামড়ার জন্য বরাদ্দ গালি।
তারপর সে গেল নাপোলিতে, এমন এক শহরে, যে শহর তার মতোই অপমানিত।
নেপলস তখন পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে গরিব শহরগুলোর একটা। ইতালির শিল্পোন্নত উত্তরের গ্যালারিগুলোতে নাপোলির খেলা পড়লে ব্যানার উঠত, “নেপলসবাসী, ধুয়ে এসো।”
আন্তোনিও গ্রামশি বহু আগেই লিখেছিলেন, উত্তরের বুর্জোয়ারা দক্ষিণকে বানিয়ে রেখেছে নিজেদের “শোষণযোগ্য উপনিবেশ।”
ম্যারাডোনা সই করার দিন পঁচাশি হাজার মানুষ স্টেডিয়াম ভরাট করে ফেলল, আর স্থানীয় এক পত্রিকা যা লিখল, সেটা একটা শহরের আদমশুমারির মত।
“আমাদের মেয়র নাই, ঘর নাই, স্কুল নাই, বাস নাই, চাকরি নাই, পয়ঃনিষ্কাশন নাই। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ আমাদের ম্যারাডোনা আছে।”
তিন বছরের মাথায় জন্মের পর কোনোদিন লিগ না-জেতা নাপোলি ইতালির চ্যাম্পিয়ন।
নেপলসের মানুষ কফিন বানিয়ে ঠাট্টার শোকমিছিল করল, কফিনের গায়ে লেখা ছিলো উত্তরের ক্লাবগুলোর নাম।
তার আগের বছর ছিয়াশির বিশ্বকাপে, মালভিনাস যুদ্ধের মাত্র চার বছর পরে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সে প্রথম গোলটা করেছিল হাত দিয়ে আর দ্বিতীয়টা ছয়জনকে কাটিয়ে।
যেটাকে পৃথিবী ডাকে শতাব্দীর সেরা গোল নামে।
পরে তার নিজের ব্যাখ্যা, ম্যাচটা ছিল “ইংরেজদের পকেট থেকে কিছুটা ফিরিয়ে আনা।”
আমৃত্যু লোকটা দাঁড়িয়েছেন হেরে-যাওয়াদের পাশে, কিউবা, ভেনেজুয়েলা, আর বারবার ফিলিস্তিন। “আমার হৃদয়ে আমি ফিলিস্তিনি”, ঘোষণাটা তার নিজের।
সততার খাতিরে বাকি অর্ধেকটাও লেখা থাকুক। এই একই মানুষ ছবি তুলেছেন নেপলসের মাফিয়াদের সঙ্গে, বিজ্ঞাপন বেচেছেন, নিজেকে ভেঙেছেন, আর মারা গেছেন ষাট বছর বয়সে।
যে বাজার তাকে দেবতা বানিয়েছিল, সেই বাজারই তাকে শেষ পর্যন্ত পণ্য বানিয়ে ছেড়েছিলো।
ম্যারাডোনার শরীরে যা ঘটেছে, গোটা খেলাটার শরীরে ঠিক তা-ই ঘটেছে। হিসাবটা এবার সেই বাজারের।
➖
জুরিখে ফিফার সদর দপ্তর। প্রতিষ্ঠানটা কাগজে-কলমে “অলাভজনক সংস্থা।”
এই অলাভজনক সংস্থার চলতি চার বছরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা তেরো বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় নয় বিলিয়ন আসবে শুধু আজ রাতে শেষ হতে যাওয়া বিশ্বকাপ থেকে।
রিজার্ভে জমা আরও প্রায় চার বিলিয়ন। কাতারের বিশ্বকাপে আয় ছিল সাত বিলিয়ন, রাশিয়ার বিশ্বকাপে সোয়া পাঁচ। প্রতি চার বছরে বৃদ্ধি প্রায় অর্ধেক হারে।
অথচ ফিফা কিছু উৎপাদন করে না। কারখানা নাই, খনি নাই। তার একমাত্র কাঁচামাল ওই আবেগ, যেটা রাজার ফরমানেও মরে নাক, যেটা কেউ কোনোদিন তৈরি করে নাই।
ব্যবসাটা হলো সেই বিনামূল্যের জিনিসের গায়ে মিটার বসানো।
মিটারটা কেমন, এবারের আয়োজনই তার পাঠ্যবই।
টিকিটে “ডাইনামিক প্রাইসিং”, চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, ফাইনালের টিকিট উঠেছে হাজার হাজার ডলারে, টিকিট-আতিথেয়তা থেকে ফিফার আয় এক লাফে তিনগুণ।
এমনকি গরমের অজুহাতে চালু হওয়া পানি-বিরতি নিয়েও সমালোচকদের হিসাব পরিষ্কার, সেখানে নব্বই মিনিট ভাঙে চারটা ভাগে, আর প্রতিটা ভাগে বিজ্ঞাপনের নতুন স্লট।
মুনাফার খাতাটা জুরিখে, কিন্তু খরচের খাতাটা বরাবর আয়োজক দেশের জনগণের।
দক্ষিণ আফ্রিকার বানানো স্টেডিয়ামগুলোর অনেকগুলো আজ খালি পড়ে আছে, রক্ষণাবেক্ষণের টাকা নাই।
ব্রাজিল ঢেলেছিল হাজার কোটি ডলারের বেশি, আমাজনের মানাউসে বানানো স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের পর আর বড় খেলাই হয় না।
সেই আয়োজনের আগে লাখো ব্রাজিলীয় রাস্তায় নেমে লিখেছিল, আমাদের হাসপাতাল চাই, স্টেডিয়াম না।
কাতার এক দশকে খরচ করল দুইশো বিলিয়নের বেশি, আর ব্রিটিশ এক পত্রিকার হিসাবে সেই দশকে কাতারে প্রাণ গেল সাড়ে ছয় হাজার দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকের।
তাদের একটা অংশ দেশে ফিরেছে ঢাকার কার্গো গেট দিয়ে, কফিনে। সেই গেটের হিসাব ব্রডশিটের পাঠক আগে পড়েছেন।
আবেগ জনতার, শ্রম জনতার, স্টেডিয়ামের ঋণ জনতার করের। মুনাফা অলাভজনক সংস্থার।
➖
তবু টাকাটাই শেষ কথা না। এই বিশ্বকাপে টাকার চেয়ে দামি একটা লেনদেন হয়েছে, এবং সেটার হিসাবটাই সবচেয়ে জরুরি।
আমেরিকা এখান থেকে কী পেল?
দুই হাজার পঁচিশের মার্চে ওভাল অফিসে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশে সই করলেন, বিশ্বকাপের জন্য হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্স, চেয়ারম্যান তিনি নিজে।
পাশে ইনফান্তিনো, যিনি ততদিনে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানেরও অতিথি। ইনফান্তিনো ঘোষণা দিলেন, আয়োজনটা আমেরিকাকে দেবে চল্লিশ বিলিয়ন ডলার, দুই লাখ চাকরি, এক কোটি পর্যটক।
সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন, সহ-আয়োজক কানাডা-মেক্সিকোর ঘাড়েই তো আপনি শুল্কযুদ্ধ চাপিয়েছেন, এটা কেমন যৌথ উৎসব?
ট্রাম্পের জবাব নথিভুক্ত করে রাখার মতো। “উত্তেজনা ভালো জিনিস। খেলাটা আরও জমবে।”
ডলারের হিসাবটা আসলে ছোট উত্তর।
বড় উত্তরটা এই, যে বছর আমেরিকার সেনা নেমেছে নিজেরই শহরের রাস্তায়, যে বছর তার এজেন্টরা ঘরে ঘরে ঢুকে মানুষ তুলে নিচ্ছে, যে বছর তার পাঠানো বোমায় গাজা ধ্বংসস্তূপ, ঠিক সেই বছর পৃথিবীর পাঁচশো কোটি মানুষ তাকে দেখল সম্পূর্ণ অন্য চরিত্রে।
বিশ্বের মিলনমেলার হাসিমুখ আয়োজক।
ছোট রাষ্ট্রগুলো খেলা দিয়ে ভাবমূর্তি পরিষ্কার করতে গেলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম তার নাম দেয় “স্পোর্টসওয়াশিং।” আর ধোলাইখানা যখন খোদ পরাশক্তির নিজের উঠানে, তখন শব্দটা আর কেউ উচ্চারণ করে না।
এই ভাবমূর্তি-ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ লুকিয়ে আছে ফিফার নিজের দুটো সিদ্ধান্তের ব্যবধানে।
রাশিয়া ইউক্রেনে ঢোকার চার দিনের মাথায় ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আর গাজায়? ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের হিসাবে এই যুদ্ধে তাদের শত শত খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদ নিহত, তালিকায় জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলারও আছেন।
মাঠগুলোর ওপর দিয়ে ট্যাংক গেছে, কোনোটা এখন তাঁবুর শিবির, কোনোটাকে বন্দিশিবির বানানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘরোয়া লিগ বছরের পর বছর বন্ধ।
ফিলিস্তিনি ফুটবল কর্তারা ফিফার সভায় বারবার ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিতের দাবি তুলেছেন।
ফিফা প্রতিবার বিষয়টা পাঠিয়েছে “পর্যালোচনা কমিটিতে।” এবং কমিটি আজও পর্যালোচনা করছে।
রাশিয়ার বেলায় চার দিন। গাজার বেলায় অনির্দিষ্টকাল। নিষেধাজ্ঞা এখানে আর নীতির প্রশ্ন থাক্র না, এইটা একান্তই হিসাবের প্রশ্ন, অপরাধী কার বন্ধু।
অথচ ফুটবলের খাতাতেই ফিলিস্তিনের একটা প্রাপ্তি আছে, যেটা কূটনীতি তাকে দিতে পারেনি। জাতিসংঘ তাকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়নি, ফিফা দিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় খেলাটা চলছে, ভাঙা দালানের ফাঁকা জায়গায়, পাথর বসানো গোলপোস্টে, কারও কারও পায়ের বদলে ক্রাচে।
যে জাতির মানচিত্র মুছে ফেলার আয়োজন চলছে, তার এগারোজন তরুণ জার্সি পরে দাঁড়ালে ওই নব্বই মিনিট সে একটা স্বীকৃত দেশ।
এই কারণেই খেলাটা নিয়ে এত টানাটানি। এক পক্ষের কাছে এটা টিকে থাকার শেষ ঘোষণা। আরেক পক্ষের কাছে তেরো বিলিয়ন ডলার আর একটা ধোলাইখানা।
➖
সাতশো বছরের খতিয়ানটা মিলিয়ে শেষ করি।
সহজ দুটো রায় হাতের কাছেই আছে। বলা যায়, ফুটবল জনগণের আফিম, পুঁজির খেলনা, বর্জন করো। কিংবা উল্টোটা, ফুটবল জনগণের মুক্তির হাতিয়ার, জয়ধ্বনি করার উছিলা।
দুইটাই আরামদায়ক, দুইটাই ইতিহাসের হিসাবের সঙ্গে মেলে না।
ইতিহাস যা দেখায় তা হলো, খেলাটার দখল নিয়ে একটা লড়াই চলছে রাজার ফরমানের কাল থেকে, এবং লড়াইটার আজও মীমাংসা হয়নি।
ক্ষমতা প্রতিবার খেলাটা কিনে নেয়, টিকিটে, স্পনসরে, টাস্কফোর্সে, টেলিফোনে।
আর জনতা প্রতিবার সেটা ফিরিয়ে আনে, কখনো পরিখার কাদায়, কখনো দখলদারের বিরুদ্ধে পাঁচ-তিন গোলে, কখনো এক পলাতক দলের জার্সিতে, কখনো ধ্বংসস্তূপে পাথরের গোলপোস্ট বানিয়ে।
আজ রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ট্রফিটা উঠবে প্রেসিডেন্টের হাসির পাশে, তেরো বিলিয়ন ডলারের মঞ্চে, ক্যামেরা সেটাই দেখাবে।
ক্যামেরা যেটা দেখাবে না, সেটা হলো, এই মঞ্চটা দাঁড়িয়ে আছে কাতারের সাড়ে ছয় হাজার কবরের ওপর, ইরানি দর্শকের বাতিল টিকিটের ওপর।
এগারো ঘণ্টা জেরা খাওয়া এক রেফারির ফেরত-যাত্রার ওপর, আর একটা টেলিফোনের ওপর, যেটা রেফারির বাঁশির চেয়ে জোরে বাজে।
সাতশো বছর ধরে ক্ষমতা এই খেলাটা কিনতে চাইছে। ফরমান দিয়ে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, গোলাবর্ষণ দিয়ে, এখন তেরো বিলিয়ন ডলার দিয়ে।
কেনা হয়ে গেছে বলে প্রতিবারই তার মনে হয়েছে। আর প্রতিবারই কোথাও না কোথাও সেই মুক্তিকামী জনতা দুইটা পাথর বসিয়ে গোলপোস্ট বানিয়ে ফেলেছে।
হিসাবটা আজও ওই দুই পাথরে আটকে আছে।