ঢাকার ফার্মগেট বা নীলক্ষেতের দিকে কোনো এক সকালে হাঁটতে বের হলে দৃশ্যটা চোখে পড়বেই। কোচিং সেন্টারের সিঁড়িতে সারি বেঁধে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণী, তাদের হাতে ফটোকপি করা প্রশ্নব্যাংক।
কারও কাঁধে ব্যাগ, ভেতরে সার্টিফিকেটের ফাইল, যেটা কোথাও না কোথাও জমা দিতে হবে আজকে। ব্যাংক ড্রাফট করাতে ভিড়, ছবি তুলতে ভিড়, ফরম পূরণ করাতে ভিড়।
এদের প্রায় সবাই স্নাতক। অনেকেই স্নাতকোত্তর। এবং এদের বেশিরভাগই জানেন, যে পদে তারা আবেদন করছেন, সেখানে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।
তবু আবেদন করতে হয়, কারণ আবেদন না করা মানে এই সম্ভাবনাটুকুও না থাকা।
দৃশ্যটা আজকের না। এটা দশ বছর আগেও ছিলো, পনেরো বছর আগেও ছিলো। একটা পুরা প্রজন্ম এই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বড় হয়েছে।
একথা ভুলে যাওয়া উচিত না যে, এই সিঁড়ি থেকেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কিছু তরুণ রাস্তায় নেমে এসেছিলো। সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। অর্থাৎ প্রশ্নটা ছিলো নিতান্ত জাগতিক, নিতান্তই অর্থনৈতিক।
চাকরিটা কার, কীভাবে ভাগ হবে, যোগ্যতার দাম কতোটুকু।
তারপর যা ঘটলো, আমরা সবাই জানি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। মাঝখানে পড়ে থাকে জুলাই মাস, আর হাজারেরও বেশি মৃত্যু।
উত্তাল সেই দিনগুলোতে ঢাকার দেয়ালগুলো বদলে গিয়েছিলো। কারফিউর ভেতরও, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা অবস্থায়, রাতের অন্ধকারে কেউ কেউ দেয়ালে লিখে আসতো।
সেই লেখাগুলোর ভাষা মনে করুন।
সাত বছর আগের সেই চরিত্র সুবোধকে ফিরিয়ে আনা হলো দেয়ালে, এবার তাকে পালাতে নয়, থেকে যেতে বলা হলো। ধানমন্ডির এক দেয়ালে কেউ লিখলো, ‘এই শহর হোক সকল প্রাণের।’
এই ভাষায় বয়স নেই। শ্রেণি আছে, মালিকানার প্রশ্ন আছে, শহরের অধিকার আছে। কিন্তু বয়সটা কোত্থেকে আসলো?
তারপর বিভিন্ন গণমাধ্যম এর নাম দিলো ‘জেনজি বিপ্লব’। সিএনএন, আল-জাজিরা, এনপিআর, ডয়চে ভেলে, সবার শিরোনামে একই কাঠামো।
কেউ কেউ আরও এগিয়ে বললেন, বিশ্বের প্রথম সফল জেনজি বিপ্লব।
মজার ব্যাপার, এই ‘জেনজি’ নামটা কে প্রথম দিলো তা কেউ বলতে পারে না। নামের কোনো জনক নেই, অথচ নামটা সবার মুখে মুখে।
‘জেনজি’ শব্দটার উৎপত্তি রাজপথের আন্দোলনে না, দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতেও না। শব্দটা এসেছে অন্য একটা জগৎ থেকে, এবং সেখানে আমাদের একটু দৃষ্টিপাত করা দরকার।
লক্ষ করুন, প্রজন্মের ভাগগুলো কীভাবে করা হয়। বুমার, জেনএক্স, মিলেনিয়াল, জেনজি, প্রায় পনেরো বছর পরপর একটা করে দাগ।
দাগগুলো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ধরে টানা না, নিছক জন্মসাল ধরে টানা। বাংলাদেশে ১৯৭১ একটা প্রজন্মকে ভাগ করেছে, ভিয়েতনাম আরেকটা প্রজন্মকে।
কিন্তু জেনজি আর মিলেনিয়ালের মাঝখানে কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো দুর্ভিক্ষ নেই, কোনো অভ্যুত্থান নেই। আছে শুধু একটা সাল।
এই দাগটা টানলো কে, আর কেনই বা?
এখানে বলা যেতে পারে, এই ভাগগুলো যাদের কাজে লাগে, তারা মূলত বাজার-গবেষক।
কারণ পণ্য বিক্রি করতে হলে ক্রেতাকে দলে ভাগ করা লাগে, আর জন্মসাল সবচেয়ে সহজ ভাগ, এখানে কোনো গবেষণা লাগে না, শুধু লাগে আদমশুমারি।
ফলে ম্যাককিনজির মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট লেখে, জেনজিকে কীভাবে বুঝবেন, তারা কী কিনতে চায়।
কার্ড কোম্পানি ভিসার হিসাব বলে, দুনিয়াজুড়ে মানুষ যতো টাকা খরচ করে, তার একটা বড় অংশ ২০৩৫ সাল নাগাদ আসবে এই বয়সীদের পকেট থেকে।
দোষের কিছু না। কিন্তু বয়সভিত্তিক এই ছকটা বানানো হয়েছিলো ক্রেতা চেনার জন্য। সমস্যা হলো, ক্রেতা চেনার ছক দিয়ে বিদ্রোহী চেনা যায় না।
শব্দটা প্রথমে একটা বাজার-বিভাগ, তারপর অন্য কিছু। এটা নতুন না।
ডগলাস কুপল্যান্ড ‘জেনারেশন এক্স’ উপন্যাসটা লেখার পরপরই কর্পোরেশনগুলো তাকে ডাকতে শুরু করে। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তারা একটা কথাই শুনতে চাইতো, এই ছেলেমেয়েদের কাছে পণ্য বেচবেন কীভাবে।
কুপল্যান্ড বিরক্ত হয়ে পরে নিজের বয়সীদের অনুরোধ করেছিলেন, প্রজন্ম নিয়ে তর্কে জড়ানো আপনারা বন্ধ করুন।
সমালোচক টমাস ফ্র্যাংক ও কিথ হোয়াইট আরও সোজাসুজি বলেছিলেন, প্রজন্মের নামগুলো আসলে তরুণদের জন্য বানিয়ে রাখা পোশাক। মাপমতো বানানো, পরিয়ে দেওয়া সহজ, আর সারা জীবন ধরে বিক্রি করা যায়।
তবু শব্দটাকে পুরোপুরি ফাঁপা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ প্রজন্ম বলে জিনিসটা সত্যিই আছে, কেবল, সেটা মাপার নিয়ম নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
কার্ল মানহাইম, হাঙ্গেরিতে জন্মানো জার্মান সমাজবিজ্ঞানী, ১৯২৮ সালে ‘প্রজন্মের সমস্যা’ নামে একটা প্রবন্ধে তিনি দুই রকম প্রজন্মের কথা বলেন।
একরকম হলো নিছক একই সময়ে জন্মানো একদল মানুষ। এটা কেবল একটা সম্ভাবনা, এর বেশি কিছু না। বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে জন্মানো সবাই এক প্রজন্ম না।
আরেকরকম হলো, যখন একদল মানুষ একই বয়সে একটা বড় ঝাঁকুনির ভেতর দিয়ে যায়। যে বয়সে মানুষ প্রথম নিজের চোখে পৃথিবীটা দেখতে শেখে, ঠিক সেই বয়সে।
তখন ওই অভিজ্ঞতাটা তাদের চিন্তার ছাঁচ হয়ে যায়। পরে সারা জীবন তারা দুনিয়াটাকে ওই ছাঁচেই দেখে।
এই মাপকাঠিতে বাংলাদেশের এই তরুণরা সত্যিই একটা প্রজন্ম। তারা একসঙ্গে দেখেছে ফাঁকা ভোটকেন্দ্র, গুমের খবর, হলের সিটের বিনিময়ে মিছিলে হাঁটা, আর সনদ হাতে নিয়ে বেকার বসে থাকা।
ওই কোচিং সেন্টারের সিঁড়িটাও তাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার অংশ।
যে বয়সে নাগরিক হিসেবে প্রথম ভোট দেওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা জেনে গেছে ভোট একটা প্রহসনের নাম। এই সাধারণ আঘাতই তাদের সাধারণ চেতনা তৈরি করেছে।
এই অর্থে ‘জেনজি অভ্যুত্থান’ কথাটা মিথ্যা নয়।
ফলে সমস্যাটা শেষপর্যন্ত দাঁড়ায়, তত্ত্বে নয়, তথ্যে।
সরকারি গেজেটে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের তালিকায় আটশো চুয়াল্লিশটি নাম। প্রথম আলো সেই তালিকার আটশো দশজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, একজন একজন করে।
নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী শ্রমজীবী মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ট্রাকচালক ও তাদের সহকারী, দোকান কর্মচারী এবং পোশাকশ্রমিক।
শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়, সংখ্যায় দুইশো উনসত্তর। নিহতদের মধ্যে অন্তত একশো তেত্রিশজন শিশু। মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়েছে সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে। অর্থাৎ শিল্পাঞ্চলে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নয়।
তালিকায় আছেন গনি মিয়া, বয়স আটত্রিশ। শেরপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ২০২৪-এর জানুয়ারিতে, রিকশা চালাবেন বলে। ছয় মাস পর ফিরে গেলেন কফিনে। লাশ গ্রামে নেওয়ার টাকা ছিলো না।
যে আন্দোলনকে ‘ডিজিটাল নেটিভ’, ‘টিকটক জেনারেশন’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তার সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছেন এমন মানুষেরা, যাদের অনেকে এসেছিলেন কেবল সন্তানসমতুল্য তরুণদের সঙ্গে একাত্মতা জানাতে।
তাহলে ‘জেনজি বিপ্লব’ নামকরণের মাহাত্ম্য কী?
গি দ্যবোর ছিলেন ফ্রান্সের সিচুয়াশনিস্ট আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক, যে গোষ্ঠীর চিন্তা ১৯৬৮-র প্যারিসের ছাত্র-অভ্যুত্থানের দেয়াললিখনে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
১৯৬৭ সালে তিনি লেখেন ‘দ্য সোসাইটি অব দ্য স্পেকট্যাকল’। বইটার মূল কথা অদ্ভুতরকম সহজ।
আধুনিক সমাজে জীবন্ত অভিজ্ঞতা প্রতিস্থাপিত হয়ে যায় তার প্রতিচ্ছবি দিয়ে। যা ঘটে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যা দেখানো হয়। মানুষ অংশগ্রহণকারী থেকে ক্রমশ দর্শকে পরিণত হয়।
কিন্তু দ্যবোরের সবচেয়ে অস্বস্তিকর কথাটা ছিলো প্রতিবাদ নিয়ে।
তিনি দেখিয়েছিলেন, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো হজম করার ক্ষমতা। যে জিনিসটা তাকে আঘাত করতে আসে, সে সেটাকেও গিলে ফেলে, তারপর পণ্য বানিয়ে ফেরত দেয়।
চে গেভারার মুখ এখন টি-শার্টে ছাপা হয়। যে ছবিটা একসময় বিপ্লবের ডাক ছিলো, সেটা এখন দোকানে ঝোলে, দামসহ। বিদ্রোহ তখন আর কারও জন্য হুমকি না। সে তখন একটা দৃশ্য, দেখার জিনিস।
‘জেনজি বিপ্লব’ নামটাও এই কাজটাই করে, একটু অন্যভাবে।
নামটা দিয়ে একটা অচেনা দেশের রক্তাক্ত ঘটনাকে চেনা কাঠামোকে তুলে ফেলা যায়। পাঠককে তখন আর একাত্তর বুঝতে হয় না।
পনেরো বছরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হিসাব বুঝতে হয় না। গনি মিয়া কী কাজ করতেন, সেটা জানতে হয় না।
শুধু জানলেই চলে, তরুণরা রেগে গেছে।
নামটার সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানে। ‘প্রজন্মগত তরঙ্গ’ কথাটার মধ্যেই একটা আশ্বাস আছে। তরঙ্গ আসে, তরঙ্গ চলে যায়। ছেলেমেয়েগুলো বড় হবে, সংসার করবে, শান্ত হয়ে যাবে।
দাবিটা তখন আর সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাবি থাকে না। হয়ে যায় বয়সের একটা ধর্ম, যেটা সময়মতো সেরে যাবে।
দেয়ালের লেখাগুলোর সঙ্গে গত দুই বছরে কী হয়েছে, সেটা দেখলে কথাটা আরও পরিষ্কার হয়।
২০২৫ সালের আগস্টে সাংবাদিকরা ঢাকার দেয়ালের ছবি তুলতে বের হয়েছিলেন। লেখাগুলো তখনো আছে, কিন্তু রং চটে গেছে, ধুলো জমেছে। কেউ মোছেনি, আবার কেউ যত্নও নেয়নি।
এই বছর আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটা কর্মসূচি নিয়েছে। জুলাই-গ্রাফিতির ‘রংকরণ ও পুনর্লিখন’। মূল শিল্পীদের ডেকে আনা হয়েছে। উদ্বোধন হয়েছে উপাচার্যের বাসভবনের প্রধান ফটকে, আনুষ্ঠানিকভাবে।
চব্বিশের কারফিউর রাতে অনুমতি ছাড়া দেয়ালে লেখা দিয়ে শুরু। উপাচার্যের বাসভবনের ফটকে ফিতা কাটা দিয়ে শেষ।
উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই সৎ, স্মৃতি সংরক্ষণ জরুরি কাজ, না করলে দুই বছর পর কিছুই থাকতো না। কিন্তু দ্যবোর বেঁচে থাকলে একটা প্রশ্ন করতেন, এবং প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
যে লেখাটা দেয়ালে উঠেছিলো অনুমতি ছাড়া, সেটা যখন অনুমতি নিয়ে আবার লেখা হয়, সেটা কি আর একই লেখা থাকে?
তবে এসবের চেয়েও জরুরি একটা প্রশ্ন বাকি থেকে যায়। যে প্রশ্ন দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিলো, ওই সাড়ি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ-তরুণীরা কেন বছরের পর বছর একইভাবে দাঁড়িয়ে আছেন?
আন্দোলন তো শুরু হয়েছিলো কোটা নিয়ে। অর্থাৎ গোড়ার প্রশ্নটা ছিলো অর্থনৈতিক। চাকরি কার, কীভাবে ভাগ হবে।
দুই বছর পর সেই প্রশ্নের অবস্থা কী?
পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশ। জাতীয় হারের প্রায় তিনগুণ।
নারী স্নাতকদের ক্ষেত্রে প্রায় বিশ শতাংশ। বেকার স্নাতকের সংখ্যা প্রায় নয় লাখ।
২০২৪-এর আগস্ট থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে চারশোর বেশি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়েছে, কাজ হারিয়েছেন দুই লাখ চল্লিশ হাজারের বেশি শ্রমিক।
কোচিং সেন্টারের সেই সিঁড়িতে ভিড় কমে নাই, বেড়েছে।
সমস্যাটা তাহলে কোনোদিনই শুধু কোটায় ছিলো না। কোটা ছিলো লক্ষণ, রোগ না।
রোগটা হলো, চাকরির সংখ্যাই কম। কোটা সংস্কার হয়েছে ঠিকই, ভাগাভাগির নিয়ম বদল হয়েছে। কিন্তু ভাগ করার জিনিসটা বাড়েনি।
যে তরুণ চাকরির দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলো, সে আজও লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
এই জায়গায় এসে ফ্রানৎস ফানোর কথা মনে পড়ে। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শেষ করেছিলেন ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’। বইটার একটা অধ্যায়ের নাম ‘জাতীয় চেতনার ফাঁদ’।
ফানোর সতর্কবাণীটা ছিলো নির্মম রকমের দূরদর্শী। তিনি বলেছিলেন, ঔপনিবেশিক শাসন চলে যাওয়ার পরও কাঠামোটা থেকে যেতে পারে।
পতাকা বদলায়, সরকার বদলায়। কিন্তু যে বন্দোবস্ত মানুষকে গরিব রেখেছিলো, সেটা যেখানে ছিলো সেখানেই থাকে। মুক্তি তখন একটা অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের জীবনে সেটা আর টের পাওয়া যায় না।
এই প্রসঙ্গেই তার সেই বিখ্যাত উপমাটা। ফানো লিখেছিলেন, একটা সেতু বানিয়ে যদি নির্মাতাদের কিছুই না বাড়ে, তবে সেতুটা না বানানোই ভালো।
মানুষ বরং সাঁতরে পার হোক, খেয়া নৌকায় পার হোক।
সেতু আকাশ থেকে পড়া কোনো উপহার হতে পারবে না। সেটা হতে হবে মানুষের নিজের হাতে গড়া জিনিস, নিজের মাথা আর নিজের পেশির ফসল।
সেতুটাকে নিজের বলে দাবি করতে পারতে হবে।
একটা অভ্যুত্থান যদি নিজের ব্যাখ্যা না পায়, যদি তার মানে ঠিক করে দেয় বাইরের কেউ, তাহলে সেটাও নাগরিকের নিজের জিনিস হয়ে ওঠে না। আমরা তার ওপর দিয়ে হাঁটি ঠিকই, কিন্তু সেটা আমাদের না।
‘জেনজি বিপ্লব’ তেমনই একটা আমদানি করা ব্যাখ্যা। ঘটনাটা আমাদের, নামটা আমাদের না।
কেউ বলতে পারেন, একটা শব্দ নিয়ে এতো টানাটানির কী দরকার, কাজ তো হয়ে গেছে।
দরকার আছে। কারণ নামই ঠিক করে দেয় কার কাছে কী দাবি করা যাবে।
জুলাইকে যদি বলি ‘জেনজি বিপ্লব’, তাহলে এটা একটা প্রজন্মের ঘটনা। প্রজন্ম বড় হয়, শান্ত হয়। দাবিটাও বয়সের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
আর যদি বলি এটা ছিলো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার অভ্যুত্থান, যার কেন্দ্রে ছিলো কাজ, মজুরি, মর্যাদা আর ভোটের অধিকার, তাহলে দাবিটা থেকে যায়।
কারণ ওই জিনিসগুলো কারও বয়সের সঙ্গে যায় না।
গনি মিয়ার পরিবার এখনো আছে। নয় লাখ বেকার স্নাতক আছেন। দুই লাখ চল্লিশ হাজার ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক আছেন। এরা কোনো প্রজন্মের ঘরে পড়েন না।
এরা পড়েন বৃহত্তর অর্থনীতির ভেতরে।
নাম নিয়ে এই তর্কের একটা সহজ সমাধান অবশ্য আমাদের হাতেই ছিলো।
আন্দোলনটা নিজের নাম নিজেই দিয়েছিলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শব্দটা দেয়ালে লেখা ছিলো, স্লোগানে ছিলো, ব্যানারে ছিলো।
বৈষম্য, বয়সের কোনো ব্যাপার এর মধ্যে নাই। এটা একটা অর্থনৈতিক শব্দ, একটা রাজনৈতিক শব্দ। কার কতোটুকু আছে আর কার কিছুই নাই, এই প্রশ্নটাই এই শব্দের ভেতরে।
‘জেনজি’ শব্দটা এই প্রশ্ন করে না। করতে পারে না, কারণ সে বানানোই হয়েছিলো অন্য কাজে।
মনে রাখবেন, বৈষম্য শব্দটা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
যতদিন না ফুরাচ্ছে, ততদিন জুলাইকে ওই নামেই ডাকা উচিত। যে নাম আন্দোলন নিজে বেছে নিয়েছিলো।
কারণ নাম শুধু অতীতের হিসাব না। নাম ভবিষ্যতের দাবিনামাও বটে।