জেরেমি করবিন ২০২০ সালে লেবার পার্টির হুইপ থেকে বাদ পড়ার পর স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে পার্লামেন্টে ছিলেন। পরে জারা সুলতানার সাথে মিলে একটা নতুন বামপন্থী দল গঠনের ঘোষণা দেন, যেটা এখনও আনুষ্ঠানিক নাম-সংবিধান চূড়ান্ত করার পর্যায়ে আছে। ঘোষণার সময় আট লাখের বেশি মানুষ সাইন-আপ করলেও, প্রাথমিক সদস্যপদ নেওয়া মানুষের সংখ্যা এখন অনেক কম, প্রায় পঞ্চাশ হাজারের মতো। দলের প্রথম সম্মেলনে সাংগঠনিক কাঠামো, সদস্যপদ-নীতি ও সংবিধান নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছে, আর এই সম্মেলন ঘিরেই কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যেমন দ্বৈত-সদস্যপদের নিয়মে কাউকে কাউকে সরিয়ে দেওয়া।

নিচের লেখাটা এই সম্মেলনের ফাঁকে নোভারা মিডিয়াকে দেওয়া করবিনের একটা সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ। দলের ভিশন, সংগঠন-কৌশল, বিদ্যমান সামাজিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্ক, আর সম্মেলনের ভেতরকার টানাপোড়েন নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তার ভিত্তিতে।


করবিনকে প্রশ্ন করা হয়, তার দলের ভিশন কী। উত্তরে তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে গড়া, খোলামেলা, বিস্তৃত, গণতান্ত্রিক প্রচারণা। আর সবচেয়ে জরুরি, যারা জীবনে কখনো রাজনীতিতে জড়াননি, তাদের রাজনীতিতে টেনে আনা। তিনি বলেন, স্থানীয় সমাবেশে ঘুরে ঘুরে এটাই তার চোখ খুলে দিয়েছে। অপরিচিত মানুষ একটা টেবিলে বসে সমাজে কী চায় তা বললে, বেশিরভাগ সময় তারা একই কথা বলে।

এরপর প্রশ্ন আসে নিউ ইয়র্কের জোহরান মামদানির প্রসঙ্গে। করবিন কি তার হয়ে কাজ করেছিলেন? করবিন সাবধানে বলেন, আমেরিকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ যাতে না ওঠে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে চান। তবে স্বীকার করেন, তিনি মামদানির ফোন-ব্যাংকের জন্য মানুষ জড়ো করেছিলেন, আর তাকে একটা আর্সেনাল জার্সিও পাঠিয়েছিলেন। জবাবে মামদানি একটা উষ্ণ বার্তা পাঠান। মামদানির সাফল্যের কারণ হিসেবে করবিন বলেন, তার বার্তা ছিল অসম্ভব রকম সুশৃঙ্খল। যা-ই জিজ্ঞেস করা হোক, তিনি বারবার একই তিনটা পয়েন্টে ফিরে আসতেন।

জিজ্ঞেস করা হয়, করবিনের দলেরও কি এমন তিনটা মূল বার্তা লাগবে? তিনি বলেন হ্যাঁ, আর সেগুলো হলো, সমাজে অন্যায়, আবাসন, মজুরি, গণপরিষেবা, শিক্ষা, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ টেকসইতা, আর যুদ্ধের দিকে ছোটার বদলে শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ। তিনি নিজেই বলেন, এগুলোকে আরও ছোট আর স্পষ্ট করে বলতে হবে। কারণ কাউকে দশ পাতার ইশতেহার দিলে, ভাগ্য ভালো থাকলে সে তৃতীয় পাতা পর্যন্ত পড়বে।

করবিন বলেন, তার দলের সদস্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, ডাক্তার, সব পেশার মানুষ আছে, আর তিনি অনলাইনকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চান। উদাহরণ হিসেবে টানেন প্রতিবন্ধিতা নীতির কথা। সরকার পার্সোনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স পেমেন্ট নিয়ে যে পর্যালোচনা চালাচ্ছে, তার ওপর তার কোনো আস্থা নেই, সরকারের ওপরও নেই। কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষদের ওপর তার আস্থা আছে, তারাই বলতে পারবে নীতি কেমন হওয়া উচিত। একইভাবে জুরি বিচারের অধিকারের ওপর সরকারের হাত দেওয়াকে তিনি নাগরিক স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে দেখছেন, আর এ নিয়ে বড় প্রচারণা চান।

সংখ্যার প্রশ্নে করবিনকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, লেবার পার্টির নেতা থাকাকালে তিনি এক নির্বাচনে তেরো মিলিয়ন ভোট পেয়েছিলেন। নতুন দল চালুর সময় আট লাখ মানুষ সাইন আপ করেছিল, এখন সদস্য মাত্র পঞ্চাশ হাজার। হাজার থেকে মিলিয়নে ফেরার পথ কী? করবিনের উত্তর সোজা। প্রচারণা, স্থানীয় শাখা গঠন, প্রতিটি শহরে গিয়ে দল বানানো, স্থানীয় অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ করা, আর একই বার্তা বারবার বলা। রাজনীতিতে একই কথা দুবার তিনবার বলতে ভয় পাওয়া উচিত না। শ্রোতা প্রতিবারই একটু আলাদা। এখানে তিনি বার্নি স্যান্ডার্সের উদাহরণ দেন, যিনি প্রতিবার একই কথা বলতেন আয়-সম্পদ বৈষম্য নিয়ে, আর নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বলা একজন মানুষ যে ডেমোক্র্যাটিক নমিনেশনের এত কাছে গিয়েছিল, সেটা তার কাছে বিস্ময়কর।

স্থানীয় সংগঠনের কথায় করবিন বলেন, তিনি এখন আর ইসলিংটন নর্থ লেবার পার্টির কাছে মাসিক রিপোর্ট দেন না। বরং একটা খোলা ফোরামে পনেরো-বিশ মিনিট কথা বলেন, তারপর প্রশ্ন নেন। কিন্তু তিনি নিজেই বলেন, শুধু স্থানীয় সংগঠন দিয়ে ব্ল্যাকরককে যুক্তরাজ্যে হাজার হাজার বাড়ি কেনা থেকে ঠেকানো যাবে না। তাই জাতীয় স্কেলে যাওয়া দরকার। পিস অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্টের মাধ্যমে গৃহহীনতা-বিরোধী প্রচারণা, ভাড়াটেদের ইউনিয়নের সাথে কাজ, আর সামনের বছরের শুরুতে একটা বড় আবাসন বিক্ষোভের পরিকল্পনা। আবাসন নিয়ে তার মূল সমালোচনা, কোনো সাইটে সামাজিক আবাসনের শতাংশ কত হবে তা ঠিক করাটাই যথেষ্ট না। প্রতিটা আবাসন প্রকল্পকে যাচাই করতে হবে ওই এলাকার প্রকৃত প্রয়োজনের বিপরীতে। আর প্রয়োজন মানে বিনিয়োগের জন্য ফাঁকা রাখা দামি বাড়ি না, প্রয়োজন মানে কাউন্সিল হাউজিং।

দলের ভেতরকার সমস্যা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে করবিন প্রথমে বলেন কী ঠিক হয়েছে। সম্মেলন হচ্ছে, সংবিধান নিয়ে ভোট হচ্ছে, এটাই তার বড় সাফল্য। কী ভুল হয়েছে, এই কাজে সময় লাগছে বেশি, আর কর্মীরা বারবার সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ, কখনো কখনো তিক্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। তার ভাষায়, সামাজিক মাধ্যম একইসাথে বার্তা পৌঁছানোর দারুণ জায়গা আর মানুষের জন্য বিষাক্ত জায়গা। ক্ষমা চাওয়ার কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, যা ভুল হয়েছে তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী, তিনি সবসময় বিতর্কে শ্রদ্ধাশীল থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে স্বীকার করেন, সংখ্যায় খুব কম হলেও কিছু মানুষ অনুষ্ঠানে গিয়ে শুধু গালিগালাজ করতে চায়, আর এটা যেকোনো জনসমাবেশের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও তিনি জোর দেন, যারা এসেছেন তাদের বেশিরভাগ প্রথমবার রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, কারণ তারা অসম সমাজে বাঁচতে চান না, রাস্তায় গৃহহীন মানুষ দেখতে চান না, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে দেখতে চান না।

এখানে তিনি লেস্টারের এক সমাবেশের কথা বলেন। দশ-এগারো বছরের একটা মেয়ে প্রশ্ন করেছিল, তার বন্ধুদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে তিনি কী করতে পারেন। করবিনের প্রতিক্রিয়া, ত্রিশ বছর আগে দশ বছরের কোনো শিশু “মানসিক স্বাস্থ্য চাপ” শব্দটাই জানত না। তার যুক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটা কারণ গণমাধ্যমের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, আরেকটা কারণ মানুষের দুর্বলতা স্বীকারের ভয়।

দলের কাঠামো গঠনে কার কাছ থেকে শিখেছেন জিজ্ঞেস করা হলে করবিন বলেন, গ্রিসের ইয়ানিস ভারুফাকিসের সাথে কথা বলেছেন। এছাড়া দেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা, আর বলিভিয়ার এমএএস আন্দোলন, যেটা নিজেকে একটা কমিউনিটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্রিটেনের শ্রম আন্দোলনের ইতিহাস থেকেও শিখেছেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি যেভাবে শুরু হয়েছিল, ভিক্টর গ্রেসন ১৯১০ সালে কোলন ভ্যালি উপনির্বাচনে যেভাবে ল্যাঙ্কাশায়ারের প্রতিটা সমাজতান্ত্রিক ক্লাবে গিয়ে মানুষ জড়ো করেছিলেন। তার মতে, প্রযুক্তি এই কাজকে একইসাথে সহজ আর কঠিন করে দিয়েছে।

দল নিয়ে করবিনের একটা সাধারণ তত্ত্ব আছে। কোনো দল তখনই সফল হয়, যখন সমাজে আগে থেকেই একটা গণআন্দোলন থাকে, যাকে দলটি প্রকাশ করতে পারে। লেবার পার্টি সফল হয়েছিল কারণ তার আগেই একটা শ্রম আন্দোলন ছিল। আর চেঞ্জ ইউকে বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রুপ কয়েক মিনিটেই মিলিয়ে গিয়েছিল, কারণ তাদের পেছনে এমন কোনো আন্দোলন ছিল না। এখন তিনি তিনটা শক্তিশালী আন্দোলন দেখছেন। ফিলিস্তিন নিয়ে ব্রিটেনে বিশ লাখের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় হয়েছে বলে তার ধারণা। দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান আবাসন আন্দোলন। আর পরিবেশ আন্দোলন। তিন প্রধান দলই যেটাকে মূলত পাশ কাটাচ্ছে, অথচ বিগত পঞ্চাশ বছরে বিশ্বের অর্ধেক বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই তিন আন্দোলন সবসময় একমত না হলেও, তাদের সাথে কাজ করাটাই দলের কাজ বলে তিনি মনে করেন।

সম্মেলনে কিছু সদস্যকে বহিষ্কারের প্রশ্নে করবিন সরাসরি বলেন, এটা বহিষ্কার না। নিয়ম হলো, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত অন্য কোনো দলের সদস্য থাকা যাবে না, আর অল্প কিছু মানুষ সেই নিয়ম ভেঙেছে। তবে প্রচারণার কাজে তিনি স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজমের মতো সংগঠনের সাথে কাজ করা পুরোপুরি সমর্থন করেন, এমনকি সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির সাথেও।

নেতৃত্বের প্রশ্নে, যেখানে তিনি নিজেই সবচেয়ে পরিচিত মুখ, করবিন সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান। বলেন, আগে দেখা দরকার সদস্যরা কী চায়। তার লক্ষ্য এখন দলকে দাঁড় করানো, শাখা কাঠামো গড়া, সাম্য-টেকসইতা-শান্তির ওপর একটা পরিচয় তৈরি করা। এটাই, তার ভাষায়, তার সারাজীবনের কাজ।

দুটো জিনিস স্পষ্ট। এক, করবিনের কাছে একটা ধারাবাহিক গল্প আছে। তৃণমূল, বিদ্যমান আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়া, স্থানীয় থেকে জাতীয় স্কেলে যাওয়া। দুই, সংখ্যাগুলো তার পক্ষে কথা বলছে না। আট লাখ থেকে পঞ্চাশ হাজার, সম্মেলনের ভেতরের তিক্ত বিতর্ক, বহিষ্কার-না-বহিষ্কার নিয়ে সংজ্ঞাগত প্যাঁচ, আর নেতৃত্বের প্রশ্নে সচেতন এড়িয়ে যাওয়া, এই সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, একটা আন্দোলনকে সংগঠিত দলে বদলানোর কাজটা যতটা মতাদর্শের লড়াই, ততটাই প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

Top Selling Multipurpose WP Theme

Newsletter