ফোনের ভিতরের ক্যাসিনো, এই অনলাইন জুয়ার আসরের কোনো ঠিকানা নাই

ময়মনসিংহের ত্রিশাল, বৈলর ইউনিয়নের বাশকুড়ি গ্রাম। গত বছরের ৮ অক্টোবর, সকাল এগারোটা।

পঁচিশ বছরের রিয়াদ হোসেন রাজু তার মা বানোয়ারা বেগমকে শ্বাসরোধ করে মারলেন। মায়ের বয়স ষাট। সেই রাত দুইটায় বাবা মোহাম্মদ আলীকে, বয়স সত্তর, কুড়াল দিয়ে।

তারপর শোবার ঘরের মেঝে খুঁড়লেন। চার ফুট গর্ত। দুইজনকেই সেখানে রেখে মেঝেটা আবার সমান করে দিলেন।

রাজু একমাত্র ছেলে। পাঁচ বছর ধরে অনলাইনে জুয়া খেলতেন। ব্যবসার কথা বলে বাবা-মায়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন, তারা দেন নাই।

ঘটনাটা নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এখন আপনাকে একটা সহজ প্রশ্ন করি। ছেলেটা খেলত কোথায়?

ত্রিশালে কোনো ক্যাসিনো নাই। জুয়ার বোর্ড নাই, আসর নাই, দরজায় পাহারাদার নাই। পুলিশ চাইলে ভেঙে দেবে, এমন কোনো ঘরই নাই।

যেই জিনিসটা ওই ঘরের মেঝেতে দুইটা লাশ নামালো, সেটা ছিল ছেলেটার পকেটে। যেমন আপনার পকেটেও এই মুহূর্তে একটা আছে।

➖

ধরেন আপনি আজ রাতেই খেলা শুরু করতে চান। কী কী লাগবে?

একটা মোবাইল নম্বর। আর কিছু না, তালিকা শেষ। নাম লাগবে না। এনআইডি লাগবে না। বয়সের প্রমাণ লাগবে না। সর্বনিম্ন জমা একশো টাকা, এক প্যাকেট বিরিয়ানির দামেরও কম।

টাকাটা আপনি ওয়েবসাইটকে দিবেন না। দিবেন আপনার এলাকারই একটা লোককে, তার দেওয়া বিকাশ বা নগদ নম্বরে। বদলে আপনার অ্যাকাউন্টে ঢুকবে “বট মানি” নামের একটা জিনিস।

জিতলে টাকা ফেরত আসবে একই পথে। তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে।

এটা বানানো গল্প না। ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা বারোটা সাইটে নিজেরা টাকা ঢেলে, বাজি ধরে, তারপর তুলে দেখেছেন। ব্যাংকের চেয়ে মসৃণ।

পাবনার সাঁথিয়ার এক এইচএসসি পড়ুয়া ছেলে শুরু করেছিল ছত্রিশ টাকা দিয়ে। প্রথম দানে জিতল ষোলো হাজার। গল্পের বাকিটা আপনি জানেন, ছয় মাস পর তাকে মোটরসাইকেলটাও বিক্রি করতে হলো।

ওই সাঁথিয়াতেই, যার স্মার্টফোন নাই, তার জন্যও ব্যবস্থা আছে। দিনে দুইশো-তিনশো টাকায় ফোন ভাড়া পাওয়া যায়। শুধু জুয়া খেলার জন্য।

ভাড়ায় ফোন নিয়ে জুয়া। চাহিদা কোন পর্যায়ে গেলে একটা গ্রামে এই ব্যবসা দাঁড়ায়, ভাবেন।

➖

ধরেন রংপুরের একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি একশো টাকা হারলেন। নোটটার তারপরের যাত্রাটা দেখি।

প্রথম ধাপ, এলাকার এজেন্টের বিকাশে।

দ্বিতীয় ধাপ, একটা ব্যক্তিগত এমএফএস অ্যাকাউন্টে। ধরা এড়াতে এজেন্টরা এই নম্বর আর অ্যাকাউন্ট নিয়মিত বদলায়, বর্ণনাটা সিআইডির নিজের।

তৃতীয় ধাপ, বাইন্যান্স, বাইবিট বা বিটগেট, ইন্টারনেটে বসা মুদ্রা বদলানোর দোকান।

আপনার টাকা এখানে হয়ে গেল ইউএসডিটি। ডিজিটাল একটা মুদ্রা, দাম সবসময় এক ডলারে বাঁধা, এবং যার ওয়ালেটের গায়ে কোনো দেশের নাম লেখা থাকে না।

বিকাশে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে জব্দ করতে পারত। এখান থেকে আর পারে না।

চতুর্থ ধাপ, বিদেশি পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেট। ডিবির তদন্তে নামগুলোও এসেছে। পে ক্যাশমা, গো পে, লাকি পে, এলকিউ পে, এক্সি পে, কুল পে।

এই চতুর্থ ধাপের পর বাংলাদেশের কোনো সংস্থার চোখ আর ওই টাকার নাগাল পায় না। কোনোদিন পায়ও নাই।

চার ধাপ, কয়েক মিনিট। আপনার চায়ের দোকানের নোটটা এখন আন্তর্জাতিক।

➖

দুইটা সংখ্যা বলব। একটা মাপা, একটা অনুমান। দুইটা আলাদা রাখা জরুরি।

মাপাটা বিএফআইইউর, টাকার গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, পাঁচ বছরে জুয়ার সন্দেহে চিহ্নিত অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা পড়েছে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি।

ভাগ করে দেখেন, দিনে গড়ে তিন কোটির বেশি। শুধু যেগুলো ধরা পড়েছে, সেগুলোতেই।

অ্যাকাউন্টগুলো কাদের নামে, সেটা আরও বলার মতো। চাকরিজীবীদের নামে যত টাকা গেছে, তার চেয়ে বেশি গেছে গৃহিণী, কৃষক, জেলে আর শিক্ষার্থীর নামে।

খাতায় জেলের নাম, ভিতরে জুয়ার টাকা।

বিএফআইইউ নিজেই সাথে লিখে দিয়েছে, এর বাইরে ক্রিপ্টো আর হুন্ডির পথও চালু। অর্থাৎ ছয় হাজার কোটি হলো ফ্লোর। ছাদ এখনও কেউ মাপে নাই।

অনুমান সংখ্যাটা গোয়েন্দাদের। সিআইডি-ডিবি বলছে, লেনদেন হয় দিনে সাতশো থেকে হাজার কোটি টাকা। কীভাবে তারা হিসাব করলেন, তারা বলেন নাই। ফলে সংখ্যাটা তাদের নামেই থাকুক।

তবে আকারটা বোঝার জন্য একটা ঘটনাই যথেষ্ট। গত ১৬ জুলাই টঙ্গীর এক রিসোর্টে ধরা পড়ল ছয়জন। তাদের কাছে পাওয়া গেল ছয় হাজার ছয়শোটা সিম, প্রতিটাতে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট বসানো।

সিমের সাথে জব্দ হয়েছে সত্তরটার বেশি হ্যান্ডসেট আর একটা মাইক্রোবাস।

দলনেতা আরিফুল ইসলাম রিফাত, বয়স তেইশ। বিএমডব্লিউ চালাতেন, রাত কাটাতেন পঞ্চাশ হাজার টাকার রিসোর্টে। এই এক দলের হাত দিয়েই দিনে ঘুরত প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

রিফাত অবশ্য মালিক না। পুলিশের খাতায় মালিকের নাম “নাথান”, চীনা নাগরিক, পলাতক।

➖

বাংলাদেশে সবচেয়ে চেনা নামটা ১xবেট।

নামটা আপনি হয়তো অন্য জায়গাতেও দেখেছেন। ফুটবল দেখে থাকলে নিশ্চিতভাবেই দেখেছেন। ১xবেট এফসি বার্সেলোনার অফিসিয়াল গ্লোবাল পার্টনার। পিএসজির সাথেও চুক্তি আছে ২০২৮ পর্যন্ত। বিশ্ব বাস্কেটবল সংস্থা ফিবার বৈশ্বিক বেটিং পার্টনার।

মেসি-নেইমারের ক্লাবের পাশে যে লোগো, রংপুরের কিশোরের ফোনে সেই একই লোগো। এইজন্যই জিনিসটাকে জোচ্চুরি মনে হয় না। মনে হয় খেলাধুলার জগতের বৈধ একটা অংশ।

এবার কোম্পানির ভিতরটা দেখেন।

প্রতিষ্ঠাতা তিনজন, রোমান সেমিওখিন, সের্গেই কারশকভ, দিমিত্রি কাজোরিন। তিনজনই রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক শহরের। ২০১৯ সালের তদন্তের পর রুশ কর্তৃপক্ষ তিনজনকেই আন্তর্জাতিক ধরপাকড়ের তালিকায় তোলে।

কাউকে সাইপ্রাস থেকে ফেরানো যায় নাই, একজন, সের্গেই কারশকভ, ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডে মারা যান বলে জানা যায়।

রুশ কৌঁসুলিদের হিসাবে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তাদের আয় ছিল নিজেদের শহরের সমস্ত অঞ্চলের বার্ষিক বাজেটের চেয়ে বেশি।

কোম্পানি চলে কুরাসাওয়ের লাইসেন্সে, ক্যারিবীয় সাগরের একটা দ্বীপ। ডাচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা তাদের আড়াইশোর বেশি ক্রিপ্টো ওয়ালেটে চারশো কোটি ইউরোর লেনদেন খুঁজে পেয়েছেন।

কাঠামোটা সিআইডি ভেঙে দেখিয়েছে বেটউইনারের মামলায়। সবার উপরে রাশিয়ায় বসা “সুপার অ্যাডমিন”। তার নিচে কান্ট্রি ম্যানেজার। তার নিচে বাংলাদেশি ম্যানেজার। সবার নিচে মহল্লার এজেন্ট, যে আপনার বিকাশের টাকাটা নেয়।

এখন এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটা লিখি।

বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত বিদেশি এই প্ল্যাটফর্মগুলোর একজন মালিকও বিচারের মুখোমুখি হয় নাই। একজনও না।

মামলা হয়েছে অনেক। সবগুলো কাদের মহল্লার এজেন্টদের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালে আট মামলায় ষাটজন ধরা পড়েছিল, বেশিরভাগ জামিনে বেরিয়ে আবার কাজে নেমেছে।

কেন এমন হয়, সেটা বুঝতে আইনবিদ হওয়া লাগে না। মালিক রাশিয়ায়, সার্ভার বিদেশে, লাইসেন্স ক্যারিবীয় দ্বীপে। যে দেশ থেকে টাকাটা যায়, সেই দেশের আইনের হাত সীমান্ত পার হয় না।

➖

এত বড় একটা নিষিদ্ধ কারবার, তার প্রচারটা চলে কোথায়? লুকানো কোনো জায়গায় না। আপনার ফেসবুক ফিডে।

ডিসমিসল্যাব নামের গবেষণা সংস্থা ২০২৪ সালের মার্চে মাত্র এক দিন ফেসবুকের বিজ্ঞাপন-ভাণ্ডার ঘেঁটেছিল। ওই এক দিনেই পেল চার হাজারের বেশি সক্রিয় বাংলা জুয়ার বিজ্ঞাপন।

দেড় বছর পর তারা আবার একই কাজ করল। আবারও চার হাজারের বেশি। একটা পেজ একাই চালাচ্ছে তেরোশোর বেশি। মাঝের দেড় বছরে কিছুই বদলায় নাই।

মজার ব্যাপারটা হলো, মেটার নিজের নিয়মেই বাংলাদেশে জুয়ার বিজ্ঞাপন দেখানোর অপশন নাই। অর্থাৎ প্রতিটা বিজ্ঞাপন একসাথে ভাঙছে বাংলাদেশের আইন, আর মেটার নিজের নিয়ম।

গবেষকরা প্রতিবারই মেটার বক্তব্য চেয়েছেন। মেটা একবারও উত্তর দেয় নাই।

গুগলের অবস্থা দেখতে এক গবেষক ছয়টা মোবাইল গেম ত্রিশ ঘণ্টা ধরে খেলেছেন। ফল, প্রতি এগারোটা বিজ্ঞাপনের একটা জুয়ার। এবং সেগুলোর চল্লিশ শতাংশের বেশির গায়ে লেখা “অ্যাডস বাই গুগল”।

গেমগুলোর নাম, লুডু কিং, ক্যারম পুল, এইট বল পুল, ক্রিকেট লিগ, পিৎজা রেডি।

আপনার বাচ্চা লুডু খেলছে। বিরতিতে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে ক্যাসিনোর।

➖

তিনটা কায়দা, একটার চেয়ে একটা সৃজনশীল।

এক নম্বর, “পাত্র চাই”। ফেসবুকে চারশোর বেশি ভুয়া পাত্র-চাই পোস্ট পাওয়া গেছে। মেয়ের ছবি, পারিবারিক বর্ণনা, নিচে একটা লিংক। রিঅ্যাকশন পড়েছে দুই লাখের বেশি।

লিংকে চাপলে খোলে জুয়ার সাইট, কিছু ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা কারবারের সাইট।

দুই নম্বর, খোদ সরকারের ওয়েবসাইট। অন্তত এগারোটা .gov.bd ঠিকানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তিন হাজারের বেশি বাজির পেইজ। বেজা, স্থানীয় সরকার বিভাগ, বিএডিসি, আনসার-ভিডিপি, এমনকি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, কেউ বাদ নাই।

সরকারি ডোমেইনে ক্যাসিনোর পেইজ।

তিন নম্বর কায়দাটা সবচেয়ে নিখুঁত। ২০২৩ সালের নভেম্বরে আরটিভির খবরে র‍্যাব ও বিটিআরসির দুই কর্মকর্তা মানুষকে জুয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।

সেই ফুটেজটাই কেটে, উপরে নতুন কণ্ঠ বসিয়ে বানানো হয়েছে অন্তত ছয়টা জুয়ার বিজ্ঞাপন।

রাষ্ট্র বলল “খেলবেন না”। মেশিন সেই ভিডিও দিয়েই বলাল “খেলুন”।

➖

বিজ্ঞাপনে কী দেখায়, সেটা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন। জৌলুস না, লাস ভেগাস না, নাচগান না।

একটা এআই-বানানো ভিডিওতে অসুস্থ বাচ্চার অস্ত্রোপচারের টাকা নাই, মা ডাক্তারের সামনে কাঁদছেন। আরেকটায় বাজারের মধ্যে স্যুট-পরা লোকের সামনে অপমানিত এক রিকশাচালক।

আরেকটায় আদালতে দাঁড়িয়ে এক আইনজীবী সওয়াল করছেন, জুয়ার আয়ও সম্মানের আয়।

ফর্মুলাটাচিনতে পারছেন। দুঃখ, অপমান, তারপর উদ্ধার। ক্যাসিনোর ব্যাকরণ না, বাংলা নাটকের ব্যাকরণ।

বিজ্ঞাপনটা আপনাকে ফূর্তির লোভ দেখাচ্ছে না। দেখাচ্ছে বিপদ থেকে বের হওয়ার একটা রাস্তা।

শব্দ চয়নও একই নকশার। অ্যাপগুলো নিজেদের বলে “আর্নিং অ্যাপ”। স্লোগান, “পুঁজি ছাড়া ঘরে বসে আয়।”

গত দশ বছর ধরে এই দেশের তরুণদের ফ্রিল্যান্সিংয়ের স্বপ্নটা বেচা হয়েছে হুবহু এই বাক্যে। ভাষাটা এরা ধার করেছে, কারণ ভাষাটা আগেই বিশ্বাস অর্জন করে রেখেছিল।

➖

তারকাদের ব্যাপারটাও সামনে আনা দরকার। এখানে দুইটা আলাদা ঘটনা, গুলিয়ে ফেললে অবিচার হবে।

প্রথম দল ভুক্তভোগী। সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাশরাফি, মুস্তাফিজ, তাদের পুরনো বিজ্ঞাপনের ফুটেজ কেটে, কণ্ঠ ডাব করে জুয়ার বিজ্ঞাপন বানানো হয়েছে। তারা জানতেন না।

ডিপফেক করা হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূস, নাহিদ ইসলামকেও। নকল হয়েছে সময় টিভি, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, আরটিভির পর্দা।

দ্বিতীয় দলটা ভুক্তভোগী না।

সাকিব ২০২২ সালে “বেটউইনার নিউজ” নামের প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করেছিলেন। বিসিবি সভাপতি সরাসরি বললেন, এটা বেটউইনারেরই ছদ্মবেশ, হয় চুক্তি, না হয় জাতীয় দল। সাকিব চুক্তি ছাড়লেন।

তারপর ২০২৫ সালের মার্চে প্রথম আলো দেখাল, তার এক কোটি ষাট লাখ অনুসারীর ভেরিফায়েড পেজে চলছে ১xবেটের প্রচার। সাকিব এর কোনো জবাব দেন নাই।

প্রথম আলোসহ কয়েকটা প্রতিবেদনে আরও নাম এসেছে, পিয়া জান্নাতুল, শবনম বুবলী, মাহিয়া মাহি, পরীমণি। কেউ নিজের ভেরিফায়েড পেজে বিজ্ঞাপন পোস্ট করেছেন, কেউ ভিডিও বার্তায় নিজেকে “অ্যাম্বাসেডর” ঘোষণা করেছেন।

দুঃখপ্রকাশের সবচেয়ে কাছাকাছি গেছেন একজনই। নুসরাত ফারিয়া বলেছিলেন, তিনি ব্যাপারটা পুরোপুরি না বুঝেই করেছিলেন। ব্যাখ্যাটা দেওয়ার মাস আটেক পর তিনি আবার একটা জুয়ার অ্যাপের প্রচারণামূলক গানে হাজির হন।

আর আইনি ব্যবস্থা? জুয়ার প্রচারের দায়ে এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থার খবর পাওয়া যায় নাই।

গত বছরের এপ্রিলে হাইকোর্ট সাত সদস্যের কমিটি করতে বলেছিল, তারকাদের জড়িত থাকার তদন্তসহ, নব্বই দিনে প্রতিবেদন। সেই নব্বই দিন পার হয়েছে বহু আগে। প্রতিবেদনের কোনো খবর নাই।

আরেক রিটে আদালত ত্রিশ দিনের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়েছিল, সেই উত্তরেরও কোনো প্রকাশ্য হদিস নাই।

আদালত জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে। উত্তর আসছে না। এই নীরবতাটাও এই গল্পের একটা চরিত্র।

➖

দামটা কারা দিচ্ছে, সেদিকে যাই। গত এক বছরের পত্রিকা থেকে কয়েকটা নাম আনলেই সেটা পরিষ্কার হবে।

মেরাজুল ইসলাম, ৪৪, কুমিল্লার হোমনা। প্রবাসফেরত। পনেরো দিনে বাইশ লাখ টাকা হেরে কীটনাশক খান। রেখে গেছেন স্ত্রী আর চার ছেলেমেয়ে।

হৃদয় দেব, ১৮, যশোর। বাজারের ফার্মেসিতে কাজ করতেন। কর্মস্থলে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

আসিফ আলী, ২০, রংপুরের কাউনিয়া। বাবার কাছ থেকে নেওয়া ষোলো হাজার পাঁচশো টাকা হেরে তিস্তার পাড়ে কীটনাশক খান।

মাহমুদুল হাসান, ২২, পোশাকশ্রমিক, শ্রীপুর। সেপ্টেম্বরের পুরো বেতন এক রাতে হারিয়ে নিজের শরীরে কীটনাশক পুশ করেন। চার দিন পর হাসপাতালে মারা যান। জুয়ার কারণে সংসার ভেঙেছিল আরও আগে।

ইমরান, ২৮, কক্সবাজার। ঋণে ডুবে রাতে ফাঁস নেন। পরিবার দরজা ভেঙে ঢোকে।

গাজীপুরের মিম আক্তার, ২৮, পোশাকশ্রমিক। জানতে পারেন, স্বামী তার বেতনের পাঁচ হাজার টাকা জুয়ায় হেরে এসেছেন, যে টাকায় ওষুধ কেনার কথা ছিল। প্রতিবাদ করেছিলেন। রাতে ঘুমের মধ্যে তাকে ব্লেড চালিয়ে হত্যা করা হয়।

তালিকাটা সম্পূর্ণ না, আর সম্পূর্ণটা কারও কাছেই নাই। পুলিশ বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কোনো সংস্থাই জুয়া-সংক্রান্ত আত্মহত্যার আলাদা হিসাব রাখে না। আমরা শুধু সেগুলোই জানি, যেগুলো পত্রিকায় উঠেছে।

প্রথম আলো জুয়ার সাইট খোঁজার তীব্রতা মেপে বিভাগওয়ারি একটা সূচক করেছিল। এক নম্বরে রংপুর, একশোতে একশো। দুইয়ে রাজশাহী, অর্ধেকেরও কম নিয়ে।

দেশের সবচেয়ে গরিব বিভাগটাই সবার উপরে।

পেশার তালিকাও মিলে যায়, চা-বিক্রেতা, সেলুনকর্মী, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, বেকার তরুণ। সাধারণ বাজির অঙ্ক হাজার থেকে দশ হাজার টাকা।

যন্ত্রটা বড়লোকের টাকায় চলে না। চলে সেই টাকায়, যেটা হারালে সংসার ভাঙে।

শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশে গবেষণা হয়েছে একটাই, রাজশাহীর দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঁইত্রিশজন ছাত্রকে নিয়ে। নমুনা এত ছোট যে জাতীয় হিসাব হিসেবে নেওয়া যাবে না। তবু ভিতরের কথাটা থেকে যায়, অর্ধেকের বেশি প্রতিদিন খেলে, আর ষাট শতাংশের পরিবারে নিয়মিত অশান্তি।

সাঁইত্রিশজনের মধ্যেই এই অবস্থা।

➖

ধরেন উপরের কোনো গল্প পড়ে কারও হুঁশ ফিরল। সে সাহায্য চায়। নম্বরটা কী, ঠিকানাটা কোথায়?

খুঁজে দেখা হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জুয়ার আসক্তির কোনো সেবা নাই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে এই নামের কোনো কর্মসূচির তথ্য নাই।

ঢাকায় প্রকাশ্যে চিকিৎসার বিজ্ঞাপন দেয় একটাই প্রতিষ্ঠান, মিরপুরের এক বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্র, যারা রোগীর সংখ্যা বা সাফল্যের হার কিছুই প্রকাশ করে না।

তুলনাটা শুনলে ফাঁকটা বোঝা যাবে। ইংল্যান্ডে জুয়ার আসক্তির জন্য এনএইচএসের বিশেষায়িত ক্লিনিক আছে পনেরোটা, প্রথমটা চালু হয় ২০১৯ সালে।

বাংলাদেশে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যেই জড়িত মানুষ পঞ্চাশ লাখ। যদিও সংখ্যাটার ভিত্তি তিনি বলেন নাই। কিন্তু ধরেন সেটা অর্ধেকও সত্যি, পঁচিশ লাখ।

তাদের জন্য সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র কয়টা? শূন্য।

➖

রাষ্ট্র পুরাপুরি বসে ছিল না, কাজ কম হয় নাই। বিটিআরসি ২০২২ সালে তিনশোর বেশি সাইট বন্ধ করেছিল, আজকে সংখ্যাটা সাড়ে চার হাজারের বেশি।

বিএফআইইউ ধাপে ধাপে জব্দ করেছে প্রায় উনসত্তর হাজার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট। হাইকোর্ট দুই দফা আদেশ দিয়েছে।

আর গত ৩০ জুন সংসদ পাস করেছে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ১৮৬৭ সালের সেই ব্রিটিশ আইনের বদলে, যেটায় “অনলাইন” শব্দটাই ছিল না। নতুন আইনে চব্বিশ রকম অপরাধ, আর ওয়েবসাইট থেকে ভিপিএন, মিরর সাইট, ক্রিপ্টো ওয়ালেট, সব আওতায়।

ফল কী দাঁড়াল?

আইন কার্যকরের ঠিক এক সপ্তাহ পর গবেষকরা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে গুনে গুনে দুইশো দশটা সক্রিয় বাজির বিজ্ঞাপন পেয়েছেন। একটা ফেসবুক গ্রুপেরই অনুসারী প্রায় সোয়া লাখ। এজেন্টদের নম্বর ঝুলছে প্রকাশ্যে।

তাহলে আরও কঠিন হলে? এই প্রশ্নের উত্তর ভারত হাতে-কলমে বের করে দিয়েছে, আমাদের কোনো খরচ ছাড়াই।

২০২৫ সালের আগস্টে ভারত টাকার খেলা পুরো নিষিদ্ধ করল। কঠোর আইন, বড় শাস্তি, আট হাজারের বেশি সাইট ব্লক। আমাদের নতুন আইনের বড় ভাই, বলতে পারেন।

তারপর দিল্লিতে জরিপ হলো।

নিষেধাজ্ঞার আগে বিদেশি সাইটে খেলত আটষট্টি শতাংশ, পরে বিরাশি। প্রতিদিন খেলার হার সাড়ে তিন শতাংশ থেকে লাফিয়ে বিয়াল্লিশ। সময় বেড়েছে, খরচও বেড়েছে।

সোজা বাংলায়, নিষিদ্ধ করার পর মানুষ আগের চেয়ে বেশি খেলেছে।

ইউরোপের খাতাও একই কথা বলে। ফ্রান্সে অনলাইন ক্যাসিনো নিষিদ্ধ, ফলে সেখানকার আটত্রিশ শতাংশ খেলোয়াড় চলে যায় বিদেশি অনুমোদনহীন সাইটে। আর অস্ট্রিয়ায়, যেখানে একচেটিয়া মডেল, সেখানে অর্ধেকেরও বেশি, তিপ্পান্ন শতাংশ।

উল্টা দিকে যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন লাইসেন্স দিয়ে তারপর পেমেন্ট আর সার্চ চেপে ধরেছে, তাদের বৈধ বাজার আটানব্বই শতাংশ।

তাহলে বৈধ করাই সমাধান? সেটাও না। ব্রাজিল বৈধ করে মোটা অঙ্কের কর তুলছে, তবু বাজারের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ এখনো অবৈধদের হাতে।

কোনো দেশই এই সমস্যাটার সমাধান করতে পারে নাই। কেউ কেউ শুধু কম হারতে শিখেছে। উদ্বেগের জায়গা হলো, আমরা সেই শেখার তালিকাতেও উঠি নাই।

কারণ যে তর্কটা এখানে হওয়ার কথা ছিল, সেটাই হয় নাই।

বাংলাদেশে “নিষিদ্ধ, নাকি নিয়ন্ত্রণ” প্রশ্নটা যারা তুলেছেন, সবাই আইনজীবী। একজন ব্যারিস্টার ২০২৩ সালেই লিখেছিলেন, নিষেধের বদলে লাইসেন্স-কর-শাস্তির পূর্ণ কাঠামো দরকার। কিন্তু কত রাজস্ব, কত বড় বাজার, একটা সংখ্যাও তিনি দেন নাই।

দেওয়ার মতো সংখ্যা কোথাও নাই বলেই দেন নাই। সিপিডি, পিআরআই, বিআইডিএস, দেশের কোনো অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা এই খাত নিয়ে একটা কাগজও প্রকাশ করে নাই।

গোয়েন্দাদের হিসাবেই যে ব্যবসার দৈনিক লেনদেন কয়েকশো কোটি টাকা, তার অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা শূন্য। আইনটা লেখা হয়েছে সেই শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে।

➖

শেষ কথাটা নতুন আইনের যন্ত্রপাতি নিয়ে।

আইনটা রাষ্ট্রকে অনেক কিছু দিয়েছে। এআই নজরদারি, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন, মুখ চেনার প্রযুক্তি, এনআইডি-সিম-এমএফএস মিলিয়ে একটা জাতীয় কালো তালিকা।

সংসদে প্রশ্ন উঠেছিল, আদালতের অনুমোদন ছাড়া তল্লাশির এই ক্ষমতা নাগরিকের অধিকারে হাত দেবে কি না। সরকারের জবাব ছিল, আদালতে গেলে দেরি হয়ে যায়।

এখন নিজেই মিলিয়ে নেন, এই যন্ত্র কাকে ধরতে পারে।

রাশিয়ার সুপার অ্যাডমিনের এনআইডি নাই। কুরাসাওয়ের লাইসেন্স মুখ চেনার ক্যামেরায় ধরা পড়ে না। নাথানের সিম বাংলাদেশে নিবন্ধিতই না। বার্সেলোনার পার্টনারকে টঙ্গীর রিসোর্টে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এনআইডি, সিম আর বিকাশ অ্যাকাউন্ট, তিনটাই আছে শুধু একজনের।

রংপুরের কাউনিয়ার আসিফ আলী, বিশ বছর। বাবার পকেট থেকে নেওয়া ষোলো হাজার পাঁচশো টাকা।

নতুন আইনটা তার মতো লোকদের জন্যই বানানো। ধরতেও পারবে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন