হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ। এখনও চালু হয় নাই।
কিন্তু গত জুন থেকে এর ঋণের কিস্তি চালু হয়ে গেছে, জানাচ্ছে আজকের পত্রিকা। বছরে এগারোশো কোটি টাকা, চলবে দুই হাজার ছাপ্পান্ন সাল পর্যন্ত।
পরিচালনার চুক্তিটাও এখনো হয় নাই। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে নয় দফা বসেও আয়ের ভাগাভাগি মিটমাট হয় নাই। চুক্তি হলে লাগবে তিন মাস, তারপর পরীক্ষামূলক হস্তান্তরে ছয় মাস থেকে এক বছর।
একুশ হাজার তিনশো কোটি টাকার স্থাপনা। এই খাতে বেবিচকের আয় এখন পর্যন্ত শূন্য টাকা।
➖
গত মাসে টোকিওর কাগজ নিক্কেই এশিয়া একটা হিসাব ছেপেছে, যেটা পড়লে ঢাকার এই টার্মিনালকে আর ব্যতিক্রম মনে হয় না। বরং মনে হয়, একটা বিশ্বব্যাপী ব্যাকরণের স্থানীয় উচ্চারণ।
হিসাবটা আমেরিকার পাঁচটা টেক কোম্পানির। মেটা, ওরাকল, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন।
তাদের খাতায় দেখানো ঋণ এক লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি ডলার। আর খাতার বাইরে, নিচের দিকে ছোট হরফের পাদটীকায়, জমে আছে আরও এক লাখ পঁয়ষট্টি হাজার কোটি ডলার।
মানে লুকানো অংশটাই দেখানো অংশের চেয়ে বড়। অঙ্কটা বাংলাদেশের পুরা অর্থনীতির তিন গুণের বেশি।
কীভাবে সম্ভব, সেটা এক লাইনে বলা যায়। হিসাবের খাতা শুধু ওই টাকাটা লেখে যেটা এই বছর হাতবদল হয়েছে। কিন্তু যেই টাকা দেওয়ার চুক্তিতে সই হয়ে গেছে, এখনো দেওয়ার দিন আসে নাই, খাতা তার কথা জিজ্ঞেস করে না।
দশ বছরের জন্য দোকান ভাড়া নিলে সইয়ের দিনই আপনার ঘাড়ে চব্বিশ লাখ টাকার দায় চাপে। খাতায় উঠবে মাসে বিশ হাজার করে। বাকিটা কোথাও লেখা থাকবে না, অথচ দোকান চলুক না চলুক, টাকাটা আপনাকে দিতেই হবে।
এই না-লেখা অংশটার নামই খাতার বাইরের দায়। ইংরেজিতে অফ-ব্যালান্স-শিট।
টেক কোম্পানিগুলি দোকানের বদলে ভাড়া নিয়েছে ডেটা সেন্টার, সেইসাথে চুক্তি করেছে কয়েক বছরের চিপ কেনার।
মেটার খাতায় ঋণ চৌদ্দ হাজার কোটি ডলার, খাতার বাইরে বিয়াল্লিশ হাজার কোটি। ওরাকলের বাইরের দায় চার বছরে প্রায় ত্রিশ গুণ হয়েছে।
গত নয় জুলাই রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি ওরাকলকে নামিয়ে এনেছে জাঙ্ক শ্রেণির ঠিক এক ধাপ উপরে। জাঙ্ক মানে ঋণদাতার চোখে যার টাকা ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত।
নিয়মটা এমন, ডেটা সেন্টার যতদিন নির্মাণাধীন, ভাড়ার দায় থাকবে পাদটীকায়। যেদিন চালু হবে, সেদিন পুরোটা একসঙ্গে খাতায় উঠবে।
পঁচিশ বছর আগে এনরন নামের একটা কোম্পানি প্রায় একই কায়দায় দেনা সরিয়ে রেখে ধসে পড়েছিল। তফাত একটাই, এনরনেরটা ছিল জালিয়াতি, আজকেরটা নিয়ম মেনে।
ঢাকার টার্মিনালেও ঘটেছে ওই একই জিনিস। কিস্তির চুক্তি সই হয়েছিল বহু বছর আগে, টাকা বের হতে শুরু করল এই জুনে, দরজা খোলার আগেই।
মাঝের পুরা সময়টায় দায়টা ছিল, কিন্তু কোনো খাতায় ছিল না।
কোম্পানির পাদটীকা না পড়ে ঠকে বিনিয়োগকারী, যে নিজের ইচ্ছায় শেয়ার কিনেছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রের পাদটীকায় জামিনদার হয়ে বসে আছে নাগরিক, যাকে কেউ এই বিষয়ে কিছু জানতে চায় নাই।
➖
একশো বছর আগে ভিয়েনার সমাজবিজ্ঞানী রুডলফ গোল্ডশাইড একটা বাক্য লিখেছিলেন, যেটা পরে অর্থনীতিবিদ শুমপেটার বিখ্যাত করেন।
বাজেট হলো সমস্ত মতাদর্শের পোশাক খুলে ফেলার পর রাষ্ট্রের কঙ্কাল।
রাষ্ট্র মুখে যা-ই বলুক, টাকাটা কোথায় যায় দেখলেই বোঝা যায় সে আসলে কী।
গত জুনে সংসদে পাস হয়েছে নয় লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার বাজেট, সুদ পরিশোধেই যাচ্ছে এক লাখ সাতাশ হাজার কোটির বেশি। সংখ্যাগুলি ছাপা আছে, সরকার লুকায় নাই।
কিন্তু এই বইও ওই এক বছরের নগদ হিসাব। পাদটীকায় সই হয়ে বসে থাকা টাকার কথা এখানেও লেখা নাই।
ফলে কয়েকটা বিল রাখা আছে অন্য ঘরে। সেই ঘরের তালিকাটা করা যাক। প্রত্যেকটারই নাম আছে, অঙ্ক আছে, ঠিকানা আছে।
➖
প্রথম বিলটার নাম ক্যাপাসিটি চার্জ।
চুক্তিমতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ বানাক বা না বানাক, তাকে একটা নির্দিষ্ট ভাড়া দিতেই হবে। বাড়িভাড়ার মতো, কেউ থাকুক না থাকুক।
দুই হাজার বাইশ-তেইশে এই ভাড়া ছিল পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। পরের বছর বত্রিশ হাজার। গত অর্থবছরে বেয়াল্লিশ হাজার কোটি। এই সংখ্যা প্রথম আলো ছেপেছে, হিসাব পিডিবির।
জাতীয় রিভিউ কমিটি গত জানুয়ারিতে গুনে দেখিয়েছে, দেশে অলস বিদ্যুৎক্ষমতা সাড়ে সাত থেকে সাড়ে নয় হাজার মেগাওয়াট। কোনো কাজে লাগে না, শুধু ধরে রাখতেই বছরে যায় এগারোশো থেকে আঠারোশো কোটি টাকা।
আসল কৌশলটা চুক্তির ভেতরে লেখা। কেন্দ্র বানানোর ঋণ শোধ হয়ে যায় বারো বছরে, ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় তেরো থেকে বাইশ বছর।
দুই দশকে কেন্দ্রগুলিকে দেওয়া মোট টাকা বেড়েছে এগারো গুণ, ক্যাপাসিটি চার্জ বিশ গুণ।
এই চুক্তিগুলির অনেকগুলি সই হয়েছিল দায়মুক্তি আইনের ছায়ায়, দরপত্র ছাড়া। যেই সরকার সই করেছিল, সে আজ নাই। বিলটা আছে।
এখানে যা ঘটছে তার নাম মৃত হাতের শাসন। অতীতের সই বর্তমানের বাজেট চালাচ্ছে।
➖
দ্বিতীয় বিলের নাম সার্বভৌম গ্যারান্টি।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সরকার তার জামিনদার বা গ্যারান্টর হয়। প্রতিষ্ঠান কিস্তি দিয়ে গেলে সরকারের এক পয়সাও লাগে না, বাজেটে কোনো দাগও পড়ে না। না দিলে পুরোটা সরকারের।
গত অর্থবছর শেষে সরকারের দেওয়া এমন প্রতিশ্রুতির অঙ্ক এক লাখ উনিশ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির দুই দশমিক এক শতাংশ। সংখ্যাটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের, উদ্ধৃত করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিশ্রুতিগুলি কার হয়ে দেওয়া, সেই তালিকাটা পড়লেই ঝুঁকিটা বোঝা যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানের উড়োজাহাজ, বিসিআইসির সার, টিসিবির পণ্য।
বিমান বাংলাদেশ চুয়ান্ন বছরে টেকসই মুনাফায় দাঁড়ায় নাই। বণিক বার্তা লিখেছে, তার নিজের নিরীক্ষাতেই দেনা সাত হাজার কোটি টাকার বেশি, আর বিপিসি ও বেবিচকের কাছে বকেয়া আরও প্রায় আট হাজার কোটি।
আগেও কিস্তি ফেল করায় সরকারকে তার হয়ে শোধ করতে হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সবশেষ পর্যালোচনায় একশো বাইশটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ঊনপঞ্চাশটাই উচ্চ বা অতি উচ্চ ঝুঁকিতে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এদের সম্পদ থেকে বছরে পাঁচ শতাংশ লোকসান যায়। ভারতে ওই সম্পদই দশ শতাংশ লাভ দেয়, ভিয়েতনামে বারো।
➖
তৃতীয় বিলটা সবচেয়ে সাদামাটা। বকেয়া।
বেসরকারি উৎপাদকদের সংগঠনের হিসাবে বিপিডিবির কাছে তাদের পাওনা প্রায় পঁচিশ হাজার কোটি টাকা, ছেপেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। চুক্তিতে বিল শোধের সময় পঁয়তাল্লিশ দিন। বাস্তবে ছয় মাস পার হয়ে যায়।
বকেয়ার সুবিধাটা এইখানে, যতক্ষণ টাকাটা দেওয়া হয় নাই, কাগজে খরচটা ঘটে নাই। ঘাটতি ছোট দেখায়।
তারপর এক বছরের বকেয়া খেয়ে ফেলে পরের বছরের বরাদ্দ। সার আর বিদ্যুতের পুরানা বিল মেটাতে সরকারকে ছাড়তে হয়েছে ছাব্বিশ হাজার পাঁচশো কোটি টাকার বিশেষ বন্ড। গত বছরের কারেন্ট বিল এখন ভবিষ্যতের ঋণ।
চতুর্থ বিলটা কোথাও গোনাই হয় না। পেনশন।
সরকারি কর্মচারীর পেনশনের জন্য আলাদা কোনো তহবিল নাই। প্রতি বছরের পেনশন আসে ওই বছরের বাজেট থেকে।
রাষ্ট্র আজ যাদের বেতন দিচ্ছে, তাদের বুড়া বয়সের পুরা দায়টা বসে আছে ভবিষ্যতের কোনো বাজেটের ঘাড়ে। অঙ্কটা কত, কেউ কোনোদিন হিসাব করে দেখে নাই।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ বলছে, হিসাব করলে দায়টা লাখো কোটি টাকায় দাঁড়াবে, সরকারের মোট স্বীকৃত ঋণকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রত্যয় স্কিম চালুর সময় অর্থ মন্ত্রণালয় নিজেই লিখেছিল, তহবিল ছাড়া এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই না।
➖
পঞ্চম খাতাটা সদ্য খোলা হয়েছে।
দুই হাজার চব্বিশের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল দুই লাখ এগারো হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের সাড়ে বারো শতাংশ। ঠিক এক বছর পর সেটা দাঁড়াল ছয় লাখ চুয়াল্লিশ হাজার কোটিতে, সাড়ে পঁয়ত্রিশ শতাংশ।
এক বছরে বাড়ল চার লাখ কোটি টাকা।
কিন্তু এই এক বছরে নতুন কোনো ঋণ খারাপ হয় নাই। ঋণগুলি আগে থেকেই খারাপ ছিল। কাগজে ভালো দেখানো হচ্ছিল।
তারপর বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম বদলাল। কোন ঋণকে খেলাপি বলা হবে, সেই সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কড়া করা হলো, এবং বিদেশি নিরীক্ষক এনে ব্যাংকের হিসাব যাচাই করানো হলো।
শুধু হিসাবের নিয়ম বদলে দেশের প্রতি তিন টাকা ব্যাংকঋণের এক টাকার বেশি খেলাপি হয়ে গেলো।
তো, এইসব লুকানো দায়ের শেষ পরিণতি কী, সেটাও এই সদ্য খোলা খাতাতেই লেখা আছে। পাঁচটা দুর্বল ব্যাংক জোড়া দিতে সরকারকে দিতে হচ্ছে বিশ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে ব্যাংক মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে আরও ছত্রিশ হাজার সাতশো কোটি টাকা।
গোপন দায় মাফ হয় না। শুধু অপেক্ষা করে, এবং সময়মতো ঠিকই ভাড়া আদায় করে নেয়।
➖
ক্যাপাসিটি চার্জ, গ্যারান্টি, বকেয়া, পেনশন, ব্যাংক। পাঁচটা আলাদা বিল, পাঁচটা আলাদা মন্ত্রণালয়।
সইগুলি হয়েছে বন্ধ ঘরে, কয়েকজনের কলমে। কিস্তিগুলি যাবে সতেরো কোটি মানুষের পকেট থেকে, তিরিশ বছর ধরে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ভোলফগাং স্ট্রেক তার ‘বাইয়িং টাইম’ বইয়ে বলছেন, গত অর্ধশতকে আধুনিক রাষ্ট্র নীরবে চরিত্র বদলেছে। আগে সে চলত করের টাকায়, ফলে জবাব দিতে হতো করদাতার কাছে। এখন সে চলে ধারে, তাই জবাব দিতে হয় ঋণদাতার কাছেও।
স্ট্রেকের ভাষায় এই রাষ্ট্রের মাথার উপর এখন জনগণ দুইটা।
একদল রাষ্ট্রের জনগণ। ভোটার। তার হাতিয়ার ভোট।
আরেক দল বাজারের জনগণ। ঋণদাতা। তার হাতিয়ার সুদের হার।
এখন ফারাকটা দাঁড়ায় ধৈর্য আর অপেক্ষার। ভোটারকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করানো যায়। ঋণদাতাকে ছয় মাসও না।
বাংলাদেশের খাতায় এই কথাটার একটা নির্মম প্রমাণ আছে। বিশ্বব্যাংক লিখেছে, ঋণ শোধ করেই এখন চলে যায় সরকারের মোট আয়ের চেয়ে বেশি টাকা। জনগণের কাছ থেকে বছরে যত টাকা তোলা হয়, পুরানা ধারের কিস্তি আর সুদ মিলিয়ে বেরিয়ে যায় তার চেয়ে বেশি।
রাষ্ট্র এখন করের টাকায় চলে না। চলে নতুন ধারে, যা দিয়ে পুরানা ধার শোধ হয়।
➖
লুকানো খাতা একদিন খোলে। তারপর কী ঘটে, দুইটা দেশ তা জানে।
মোজাম্বিক। দুই হাজার তেরো-চোদ্দ সালে রাষ্ট্রীয় কোম্পানির নামে প্রায় দুইশো কোটি ডলার ঋণ তোলা হয়, কাগজে টুনা মাছ ধরার নৌবহর কেনার জন্য।
প্রতিটা ঋণের পেছনে সরকারি গ্যারান্টি, সংসদ কিছুই জানে না। দুই হাজার ষোলোতে গ্যারান্টিগুলি ফাঁস হয়। আইএমএফ সহায়তা বন্ধ করে, মুদ্রা ধসে যায়, দেশ খেলাপি হয়।
শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসের সতেরো কোটি পঞ্চাশ লাখ ডলারের একটা ঋণে সরকার ছিল গ্যারান্টর। কাগজে দেনাটা এয়ারলাইনের।
দুই হাজার বাইশে রাষ্ট্র খেলাপি হওয়ামাত্র দেনাটা হয়ে যায় রাষ্ট্রের। এখন কলম্বোর সরকার বছরে দুইবার কোষাগার থেকে টাকা ঢেলে এয়ারলাইনকে কিস্তি শোধ করায়।
সারকথা হলো, জামিনদারি ভালো সময় পর্যন্তই শুধু অদৃশ্য থাকে। খারাপ সময়ের প্রথম দিনেই সেটা মূল খাতায় উঠে আসে, সুদে-আসলে।
তাহলে উপায় কী?
প্রশ্নটা এই না যে সরকার এই টাকা কীভাবে শোধ করবে। প্রশ্নটা এই, খরচের আগে দেশ তা জানবে কি না।
দায়গুলি কাঁটায় কাঁটায় মাপা যায় না, কেউ জানে না বিমান কবে কিস্তি ফেল করবে বা কোন কেন্দ্র কবে বসে যাবে। কিন্তু কার হয়ে কত টাকার জামিন দেওয়া আছে, কোন চুক্তিতে আগামী বিশ বছরে কত যাবে, এইটুকু জানা যায়। যোগ করলেই হয়।
কাজটা কেউ করে না, এমনও না।
ফিলিপাইন প্রতি বছর বাজেটের সঙ্গে আলাদা একটা নথি ছাপে, নাম আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি। টেবিল ধরে ধরে লেখা থাকে কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কত ঋণে সরকার গ্যারান্টর, কোন প্রকল্পে ভবিষ্যতে কত টাকা যেতে পারে।
এই বছরের সংস্করণে বাহান্নটা প্রকল্পের চল্লিশটার ভবিষ্যৎ দায় ধরা হয়েছে চারশো চব্বিশ বিলিয়ন পেসো। আগের বছরের চেয়ে আঠারো বিলিয়ন বেশি, তুলনাটাও ওই নথিতেই ছাপা।
চিলি এই প্রতিবেদন ছাপছে দুই হাজার সাত সাল থেকে। আইএমএফের স্বচ্ছতা বিধিতে বাজেটের সঙ্গে ঝুঁকি বিবৃতি রাখার কথা লেখাই আছে।
করার নিয়ম আছে, করে দেখানোর নজিরও আছে। বাংলাদেশের বাজেট বইয়ে সেই পাতাটা নাই।
➖
সততার খাতিরে এই লেখার যুক্তির উল্টা পিঠটাও থাকুক।
বাংলাদেশ কিছুই ছাপায় না, কথাটা অসত্য। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি নীতি বিবৃতিতে ঝুঁকির আলাদা অধ্যায় আছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা আছে, গ্যারান্টির তালিকা আছে, ত্রৈমাসিক ঋণ বুলেটিনও বের হয়।
ফলে সমস্যাটা গোপনীয়তার না। সংখ্যাগুলি ছড়ানো আছে দশটা দলিলে, কোথাও যোগফল নাই।
ক্যাপাসিটি চার্জও বাংলাদেশের আবিষ্কার না, বিনিয়োগ টানতে বহু দেশ এই পথে হেঁটেছে। ফলে সমস্যা ব্যবস্থায় না, দামে আর মেয়াদে।
যেই সংখ্যাগুলি আজকে এত ভয়ানক দেখাচ্ছে, সেগুলিও ভয়ানক দেখাচ্ছে কারণ গত দুই বছরে খাতা কিছুটা খোলা হয়েছে। দায়মুক্তি আইন বাতিল হয়েছে, খেলাপির সংজ্ঞা কড়া হয়েছে, চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি বসেছে, গ্যারান্টির উপর ফি বসেছে।
এর ফল দাঁড়িয়েছে, খেলাপি তিন গুণ। আর আগের আমলের ফোলানো রপ্তানি তথ্য সংশোধনের পর ঋণ-ঝুঁকির রেটিং নেমেছে নিম্ন থেকে মাঝারিতে।
আইএমএফের নিজের গবেষণাতেই লেখা আছে, চেপে রাখা দায় প্রকাশ করলে প্রথম ধাক্কায় রেটিং পড়ে, ঋণের সুদ বাড়ে।
এছাড়া, দাওয়াইয়ের দিকটাও নিষ্কলঙ্ক না।
ভর্তুকি কমাও, দাম বাড়াও, এই পরামর্শে লুকানো দায় মোছে না। এই বছর পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ঊনিশ শতাংশের বেশি। ক্যাপাসিটি চার্জের বিল তখন বাজেটের পাতা থেকে নেমে আসে গ্রাহকের মিটারে।
আবার উল্টা পথে গিয়ে ধার শোধ বন্ধ করে দেওয়াও এখানে চলে না।
বুর্কিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট টমাস সাংকারা ১৯৮৭ সালে আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বিদেশি ঋণ আসলে দখলেরই নতুন কায়দা, এই ঋণ শোধ করা যাবে না। তবে শর্ত একটাই, সিদ্ধান্তটা নিতে হবে সবাই মিলে।
কারণ কোনো দেশ একা শোধ বন্ধ করলে তাকে একাই শাস্তি পেতে হবে। ওই মঞ্চেই তিনি বলেছিলেন, একা বললে পরের সম্মেলনে তিনি আর থাকবেন না।
তিন মাস পর তাকে খুন করা হয়।
বাংলাদেশে ঋণের বিদেশি দিকটা আছে। রূপপুরের রুশ ঋণ, টার্মিনালের জাপানি ঋণ, সরকারি ঋণের প্রায় চল্লিশ শতাংশই বাইরের।
কিন্তু ষাট শতাংশ দেশের ভেতরের। সেই অংশটা কিনে রেখেছে এই দেশেরই ব্যাংক, এবং ব্যাংকের টাকাটা মানুষের জমানো আমানত।
ফলে রাষ্ট্র ধার শোধ না করলে বিদেশি পাওনাদারের আগে ধাক্কাটা খাবে দেশের মানুষই, এইবার তার সঞ্চয়ের খাতায়।
➖
শেষ হিসাবটা মিলিয়ে নেওয়া যাক।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বুলেটিন বলছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের স্বীকৃত ঋণ বাইশ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বাজেটের প্রায় আড়াই গুণ।
এর বাইরে আছে গ্যারান্টির এক লাখ উনিশ হাজার কোটি। বকেয়ার পঁচিশ হাজার কোটি। আর পেনশনের সেই অঙ্ক, যেটা কেউ কোনোদিন বসায় নাই।
বিদেশি ঋণদাতার জন্য প্রতিটা কিস্তির তারিখ ছাপা আছে। পনেরোই মার্চ, পনেরোই সেপ্টেম্বর।
নাগরিকের জন্য কোনো তারিখ ছাপা নাই। তার কিস্তি আসে অন্য নামে। মিটারে, ভ্যাটে, চালের দামে, ব্যাংক জোড়া দেওয়ার বরাদ্দে।
দুইজনই একই রাষ্ট্রের পাওনাদার-দেনাদারের হিসাবে আছে। ফারাকটা হলো, একজন চুক্তি পড়ে সই করেছে। আরেকজন জামিনদার হয়ে গেছে না জেনেই।
তৃতীয় টার্মিনালের দরজা যেদিন খুলবে, কিস্তির খাতায় ততদিনে অন্তত দুই বছরের দাগ পড়ে গেছে। সেদিন ফিতা কাটা হবে, ছবি হবে, ভাষণে থাকবে জাতির স্বপ্নের কথা।
বাজেট মিথ্যা বলে না। বাজেট শুধু সবটা বলে না।