ব্রডশিট, ১৮৫৫ ও তিপ্পান্ন

সতেরোশো বারো সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সংবাদপত্রের ওপর কর বসায়। প্রতি পাতার জন্য এক পয়সা।

আইনটার ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রাজস্ব ছিল। কিন্তু ছিল আরেকটা কথাও, এমন প্রকাশনা ঠেকানো, যা “সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা” জাগায়।

ছাপাখানার মালিকরা সেই আইন ভাঙার পথে গেলেন না। কর যেহেতু পাতা গুনে, তারা পাতার সংখ্যা কমিয়ে আনলেন, খবর না কমিয়ে।

পাতাটা এত বড় করা হলো যে আগের চার পাতার খবর এখন এক পাতায় ধরে, করও নেমে আসল চার ভাগের এক ভাগে। ফলে কাগজের কলেবর বাড়তে বাড়তে সেটা একসময় হয়ে দাঁড়াল দুই হাত ছড়ানো এক বিরাট শিট।

ইংরেজিতে তার নাম হলো ব্রডশিট।

দুনিয়া পরে এই মাপটাকে চিনেছে গাম্ভীর্যের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু জন্মের সময় এটা ছিল কেবলই টিকে থাকার হিসাব। সরকারের করের চাপ যত বেড়েছে, কাগজ তত চওড়া হয়েছে।

লোকে করটার নাম দিয়েছিল ‘জ্ঞানের ওপর কর’।

হেনরি হেদারিংটন নামের এক প্রকাশক জেদ ধরে করের স্ট্যাম্প ছাড়াই কাগজ ছেপে যাচ্ছিলেন। দাম রেখেছিলেন এক পয়সা, যাতে গরিবেও পড়তে পারে। সেই অপরাধে তিনি জেল খেটেছেন।

করটা পুরোপুরি উঠতে সময় লেগেছিল একশো তেতাল্লিশ বছর। উঠল, আঠারোশো পঞ্চান্ন সালে।

পরে বাজারে আসল ছোট মাপের কাগজ, ট্যাবলয়েড।

এরপর, একপক্ষে ব্রডশিট আর অন্যপক্ষে ট্যাবলয়েড, শব্দ দুইটা কাগজের মাপ ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেল ঘরানার নাম হয়ে।

কাগজের মাপের পার্থক্যটা আজ প্রায় উঠে গেছে। লন্ডনের নামী ব্রডশিটগুলিই এখন ছোট মাপে ছাপা হয়।

কিন্তু মাপ উঠে গেলেও, ধারণাটা থেকেই গেছে। সহজ পথ আজও একটাই, কাউকে খুশি করা, কখনো পাঠককে, কখনো সরকারকে।

বাংলাদেশে সংবাদপত্র বের করতে চাইলে প্রকাশককে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে একটা ঘোষণাপত্রে সই করতে হয়, তিনি এমন কিছু ছাপবেন না, যা “সরকারের স্বার্থবিরোধী”।

ধারাটা ১৯৭৩ সালের ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের।

কাগজটার সরকারি নাম ঘোষণাপত্র, তবে চরিত্রে সেটা একটা মুচলেকা, ছাপার অনুমতির বদলে আনুগত্যের লিখিত প্রতিশ্রুতি।

সতেরোশো বারোর আইনের ভাষা ছিল “সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা”। উনিশশো তিয়াত্তরের ভাষা “সরকারের স্বার্থবিরোধী”।

মাঝখানে আড়াইশো বছর আর একটা সাম্রাজ্যের আসা-যাওয়া। তিপ্পান্ন বছর ধরে কাঠামোটা টিকে আছে।

গত সোমবার, সাতাশে জুলাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে বসেছিলেন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের সম্পাদকদের সঙ্গে।

অনুরোধ করলেন, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ভালো কাজগুলিও যেন যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়।

কথাটা আপত্তিকর না। তারেক রহমানের গণমাধ্যম-বিষয়ক কথাবার্তায় বরং চোখে পড়ার মতো জিনিসই বেশি।

জুনে সাংবাদিকদের ডেকে বলেছেন, “আমি ভুল করলে আপনারা বলবেন।” শুনিয়েছেন নিজের বিরুদ্ধে আঁকা কড়া কার্টুন নিজেই ছাপতে দেওয়ার গল্প।

দিনটাও বেছেছিলেন ইতিহাস দেখে। ষোলোই জুন। যেদিন বাকশাল চারটা বাদে দেশের সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল।

ওই দিনে দাঁড়িয়ে একজন প্রধানমন্ত্রী বলছেন, মিডিয়ার কণ্ঠরোধের পরিবেশ আর নাই। এর দাম আছে।

কিন্তু পর পর তারিখগুলি পাশাপাশি রাখলে অন্য আরেকটা হিসাবও আমাদের সামনে দাঁড়ায়।

সতেরোই মে, একই সচিবালয়ে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসেছিলেন সম্পাদক পরিষদের নেতারা। নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান প্রমুখ।

দাবি তুললেন, ওই ঘোষণাপত্র-ধারাসহ গণমাধ্যম আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাগুলি বাতিল হোক, সাংবাদিকদের নামে হয়রানির মামলা বন্ধ হোক।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ, সরকার নিয়ন্ত্রক না, সহায়ক হতে চায়।

নির্দেশ দিলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় জুনের মধ্যে আইনি পর্যালোচনা শেষ করবে, জুলাইয়ের মধ্যে নেবে দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

জুলাইয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ একটা এসেছে।

দশই জুলাই সংসদে তথ্যমন্ত্রী জানালেন, আইন সংশোধন হচ্ছে, তবে তিয়াত্তরের আইনটা না, চুয়াত্তরের প্রেস কাউন্সিল আইন।

সাংবাদিকদের জন্য আসছে বার কাউন্সিলের ধাঁচে নিবন্ধন, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত, মিথ্যা বা অনৈতিক রিপোর্টের জন্য আর্থিক জরিমানা, গুজব তদন্তের ক্ষমতা।

সম্পাদকরা মে মাসে চেয়েছিলেন পুরনো একটা ধারা বাতিল হোক। জুলাইয়ে সরকার নতুন একটা নিয়ন্ত্রণের কথা শোনাল।

আর মাসের শেষ সোমবারে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিলেন, ভালো খবরটাও যেন ছাপা হয়।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের এই বছরের সূচকে বাংলাদেশ একশো আশিটা দেশের মধ্যে একশো বাহান্নতম, আগের বছরের চেয়ে তিন ধাপ নিচে।

গত নভেম্বর পর্যন্ত হিসাবেই জুলাই অভ্যুত্থানের মামলায় নাম আছে অন্তত দুইশো ছিয়ানব্বইজন সাংবাদিকের।

গেল ডিসেম্বরে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের দপ্তরে হামলার রাতে ভেতরে আটকা পড়েছিলেন প্রায় ত্রিশজন সাংবাদিক-কর্মী।

নতুন সাইবার আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ধারা রয়ে গেছে, আদালতের অনুমতি ছাড়া আড়ি পাতার ক্ষমতাও।

এর অনেক কিছুই এই সরকারের বানানো না, উত্তরাধিকারে পাওয়া। কিন্তু উত্তরাধিকার সম্পত্তির মতো, নিলে দায়সহ নিতে হয়।

সেই দায় শোধ হচ্ছে কি না, তা দেখতে থাকাই গণমাধ্যমের কাজ।

আমাদের কাগজের নাম ব্রডশিট।

ছাপাখানা আমাদের নাই, তবে অনলাইন যে এই ফর্মের বাইরে, তা নয়, সংবাদপত্রের নিবন্ধন আর ঘোষণার শর্ত কাগজ ছেড়ে স্ক্রিনেও উঠে এসেছে। মাধ্যম বদলায়, শর্তটা থাকে।

তবে নামটা নিয়েছি ওই তিনশো বছরের পুরানা লড়াই থেকে, যেখানে সরকারের চাপের জবাবে কাগজ ছোট না হয়ে বরং বড় হয়েছিল।

সরকারের ভালো কাজ, যা ভালো, তাকে ভালো বলাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।

কিন্তু সরকারকে ভালো দেখানোর দায়িত্ব ঠিক গণমাধ্যমের মাপকাঠি না। সেই কাজের জন্য সরকারের নিজের প্রেস উইং আছে, বাজেটসহ।

মাপকাঠিটা পরিষ্কার।

কার্টুন ছাপতে দেওয়া সহনশীলতা, আর মুক্ত সংবাদমাধ্যম হলো এমন একটা দিন, যেদিন কোনো প্রকাশককে সই করে বলতে হবে না যে তিনি সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবেন না।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন