পুরনো ব্রহ্মপুত্র

ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে যে নদীটা বয়ে যায়, তার নাম পুরনো ব্রহ্মপুত্র।

নামের ভেতরেই একটা স্বীকারোক্তি। পুরনো বলার মানে, একটা নতুন আছে, অন্য কোথাও।

শীতকালে এই নদীর কোনো কোনো জায়গা হেঁটে পার হওয়া যায়। বালুর মধ্যে ছেলেরা ক্রিকেট খেলে, ওইপারে যাওয়ার নৌকা খুঁজে পেতে সময় লাগে। অথচ শহরের পুরনো ঘাট, কাচারি, পারের সড়ক, জমিদারবাড়ির সদর, সবকিছুর মাপ কাটা হয়েছিল অনেক বড় এক নদীর মাপে।

যেন বাড়ির দরজাটা রয়ে গেছে, যে থাকত সে চলে গেছে।

যে থাকত, সে ব্রহ্মপুত্র। তিব্বতের হিমবাহ থেকে নামা পানি আর আসামের পাহাড় ধুয়ে আনা পলি নিয়ে সমস্ত নদীটা একসময় নামত এই খাত দিয়েই, ময়মনসিংহের গা ঘেঁষে, দক্ষিণ-পূর্বে, মেঘনার দিকে।

তারপর সে চলে গেল পশ্চিমে। আজ যে বিশাল স্রোতটাকে আমরা যমুনা নামে চিনি, ওইটাই সে।

উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় নদীগুলোর একটা তার সমস্ত শরীর নিয়ে প্রায় আশি কিলোমিটার সরে গেল। আমরা আজও ঠিক জানি না কবে, জানি না কেন।

যতটুকু জানি, তা দুইটা মানচিত্রের ফাঁক থেকে। মানচিত্র দুইটার পেছনে দুইজন মানুষ।

➖

প্রথমজনের নাম জেমস রেনেল।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নাবিক ছিলেন, জাহাজে বসে বন্দর মাপার কাজটা জানতেন। সেই কাজের সূত্রেই একুশ বছর বয়সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জরিপকারীর চাকরি, বাংলায়।

পলাশীর পরের বাংলা তখন। কোম্পানি মাত্রই দিল্লির দরবার থেকে বাংলার খাজনা তোলার অধিকার আদায় করেছে। কিন্তু যে জমিন থেকে খাজনা উঠবে, তার কোনো মাপা ছবি হাতে নাই। কোন গ্রাম কোন পরগনায়, কোন নদী দিয়ে সৈন্য পাঠানো যায়, কোন ঘাটে শুল্কের চৌকি বসবে, কিছুই কাগজে নাই।

রেনেলের কাজ দাঁড়াল সেই কাগজ বানানো।

‘মানচিত্র’ শব্দটা নিরীহ শোনায়, কিন্তু কোম্পানির দপ্তরে ওটা ছিল দখলের সরঞ্জাম।

যে জমি মাপা যায়, সেই জমির খাজনা ধার্য করা যায়, সেই জমিতে ফৌজ পাঠানো যায়। রেনেল বছরের পর বছর নৌকায় ঘুরে সেই মাপার কাজটাই করলেন। চব্বিশ বছর বয়সে হলেন বাংলার প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল।

তিনি যে বছরগুলোতে নদী মাপছেন, সেই বছরগুলোতেই, কোম্পানির খাজনা-তোলা বাংলায় নামল মন্বন্তর। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে যেটাকে মনে রেখেছে এই দেশ। অনুমান, মারা গিয়েছিল বাংলার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ।

কিন্তু খাজনা আদায় থামে নাই, জরিপও না।

আর যে তলোয়ারের কোপে রেনেল প্রায় মারা যেতে বসেছিলেন, সেটাও কোনো ডাকাতের কোপ না। কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে উত্তরের জেলাগুলোতে তখন লড়ছে ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। তাদেরই একটা দলের সঙ্গে সংঘর্ষে তার শরীর চিরে গিয়েছিল, সেই ক্ষত আর সারে নাই।

যেই মাপাকে বাংলার মানুষের একটা অংশ ঠেকাতে চেয়েছিল অস্ত্র হাতে, সেই মাপার খাতাটাই লন্ডনে নিয়ে গিয়ে তিনি ছাপলেন। বেঙ্গল অ্যাটলাস, সতেরোশো উনআশি। এই ভূখণ্ডের প্রথম জরিপ-করা মানচিত্র।

নদী অবশ্য রেনেলের চেয়ে ভালো চিনত আরও অনেকে। মাঝি, জেলে, পাটনি, চরের চাষি, যারা প্রজন্ম ধরে স্রোত পড়তে জানত। কিন্তু তাদের জানাটা কেউ কাগজে তোলে নাই। ফলে দুইশো বছর পরে নিজের নদীর জীবনী লিখতে বসে আমাদের প্রথম দলিল বলতে ওই ব্রিটিশ বিজেতার খাতাই।

সেই খাতায় ব্রহ্মপুত্র পরিষ্কার আঁকা। ময়মনসিংহের পাশ দিয়ে নেমে সে ঘুরছে দক্ষিণ-পূর্বে। আজকের শুকনা নদীটাই মূল নদী, চওড়ায় গঙ্গার সমান ওজনদার।

আর আজকের যমুনা যেখানে, রেনেলের কাগজে সেখানে বড় কিছু নাই। ছোট একটা শাখার কিছু লাইন শুধু, নাম কোনাই নদী।

দ্বিতীয় লোকটাও কোম্পানিরই লোক, নাম উইলকক্স। ষাট বছর পরে, আঠারোশো আটাশ থেকে ত্রিশে, তিনি একই এলাকা মাপতে এলেন। কিন্তু তার কাগজে দেখা গেল, নদীটা আর ময়মনসিংহের দিকে যায় না।

মূল স্রোত সোজা দক্ষিণে নামছে, ওই কোনাই নদীর খাত গিলে, ফুলে, আজকের যমুনা হয়ে।

দুই খাতার মাঝখানে ষাট বছরের অন্ধকার। ওই অন্ধকারেই দেশের সবচেয়ে বড় নদী তার ঠিকানা বদলেছে।

➖

অন্ধকারটা অবশ্য পুরো ফাঁকা না। মাঝখানে আরও একজন সাক্ষী ঘুরে গেছেন।

আঠারোশো সাত থেকে এগারো, স্কটিশ জরিপকারী বুকানন হ্যামিলটন যখন এই অঞ্চল ঘুরছেন, তার নোটবইয়ে নদীটা ধরা পড়েছে মাঝপথে। পুরনো খাতে তখনো পানি, কিন্তু পশ্চিমের নতুন স্রোতটা ফুলছে। সরাটা তখন চলছে, শেষ হয় নাই।

আরও একটা সাক্ষ্য আছে, একটা পুরা শহরের। কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর নথিপত্রে বারবার সরেছে পশ্চিমে। নদী পাড় খায়, হাট পিছায়, ঘর পিছায়, আবার পাড় খায়। একটা শহর কয়েক দশক ধরে পিছু হাঁটছে, কারণ একটা নদী কয়েক দশক ধরে এগিয়ে আসছে।

অথচ আমাদের পাঠ্যবইয়ে, জেলার ইতিহাসে, গল্পটা লেখা এক রাতের নাটকের মত করে। সতেরোশো সাতাশির মহাপ্লাবন, তিস্তার খাত বদল, তার ধাক্কায় ব্রহ্মপুত্রের সরে যাওয়া। ঝরঝরা, নাটকীয়, মুখস্থ করার মতো ইতিহাস।

তিস্তার অংশটুকু সত্যি। ওই নদী আগে নামত সোজা দক্ষিণে, আত্রাই-পুনর্ভবা-করতোয়ার তিন শাখায় ভাগ হয়ে, গঙ্গার দিকে। সাতাশির বন্যায় তিস্তা সত্যিই পুর্বদিক ঘুরে ব্রহ্মপুত্রের কোলে গিয়ে পড়ল।

উত্তরবঙ্গের নদীর নকশা সেবার সত্যিই এক ধাক্কায় বদলেছিল।

কিন্তু গল্পের পরের ধাপটা, তিস্তার ধাক্কায় ব্রহ্মপুত্র সরল, ওইখানে এসে মানচিত্রগুলো বেঁকে বসে।

দুই হাজার একুশ সালে কেমব্রিজের ভূগোলবিদ কিথ রিচার্ডস আর তার দুই সহলেখক সতেরোশো পঞ্চাশ থেকে আঠারোশো পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত যত জরিপ, ম্যাপ আর দলিল খুলে, সব পাশাপাশি ফেলে আবার হিসাব করলেন।

সহলেখকদের একজন হিউ ব্রামার, ষাটের দশক থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর এই বদ্বীপের মাটি আর বন্যা নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী। তাদের রায়, তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের দশ ভাগের এক ভাগ পানিও বহন করে না। ছোট নদীর ধাক্কায় বড় নদী ঘুরে যায় না, যেমন শাখা নড়লে গাছ নড়ে না।

তাহলে কেন সরল, সেই উত্তর গবেষকদের কাছেও নাই। সম্ভাবনার একটা তালিকা শুধু আছে। শত শত বছরের পলি জমে পুরনো খাতের তলা উঁচু হয়ে গিয়েছিল, পানি নিচু রাস্তা খুঁজছিল।

মধুপুরের লাল মাটির চত্বরটা টেকটোনিক চাপে সামান্য কাত হয়ে থাকতে পারে। আর সতেরোশো বাষট্টির সেই ভূমিকম্প, যার জলোচ্ছ্বাস ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, সেটাও তালিকায় আছে।

নদী তার কারণ বলে যায় নাই। সে শুধু পঞ্চাশ বছর ধরে, বছরে এক ফসলের জমির মাপে পাড় ভাঙতে ভাঙতে, হেঁটে চলে গেছে। যারা পারে থাকত তারা জানত নদী ভাঙছে। কেউ জানত না তারা একটা মহাপ্রস্থানের সাক্ষী।

সবচেয়ে বাঁকা তথ্যটা এই, ময়মনসিংহ জেলার জন্মই সতেরোশো সাতাশিতে, কথিত সেই মহাপ্লাবনের বছরে। জেলা যেদিন কোম্পানির খাতায় উঠল, তার নদী সেদিন থেকেই খাতা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

➖

নদীটা যেখানে গিয়ে দাঁড়াল, সেই যমুনা এখন কোথাও তিন কিলোমিটার চওড়া, কোথাও বিশ।

বর্ষায় যমুনা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে নামে চল্লিশ হাজার ঘনমিটার পানি, প্রবাহের হিসাবে দুনিয়ার সাত বড় নদীর একটা। সঙ্গে নামে বছরে তিয়াত্তর কোটি টন পলি। মাপটা কল্পনায় আনতে চাইলে, দিনরাত না থেমে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় পাঁচ ট্রাক বালু।

এই পলি দিয়ে নদী তার মাঝখানে জমি জাগায়, আবার ভেঙে নেয়। এক হিসাবে যমুনায় বড়-ছোট মিলিয়ে পৌনে তিনশোর মতো চর। চরে ধানখেত, হাট, মসজিদ, উঁচু ভিটায় তোলা স্কুলঘর।

নদী সরায় বদলে গেছে শহরের হিসাবও। ময়মনসিংহের ঘাট যখন শুকাচ্ছে, যমুনার পারে তখন ফুলে উঠছে সিরাজগঞ্জ, পাটের নৌকা আর কলকাতাগামী স্টিমারের বন্দর। বাণিজ্য চলে নদীর পিছে পিছে, শহরও।

চরের মানুষ নদীর এই চলাফেরা মুখস্থ করে ফেলেছে। কুড়িগ্রামের সুখী বেগমের বয়স সত্তর, পঞ্চাশ বছরের সংসারে ঘর ভেঙেছেন আর তুলেছেন সাতবার। ভিটা ডোবে, চৌকি আর টিনের চাল নৌকায় ওঠে, নতুন চরে আবার খুঁটি পোঁতা হয়।

টিনের চালটা এই জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদ, কারণ ওইটাই একমাত্র জিনিস যেটা নদীর সঙ্গে সঙ্গে সরতে পারে।

একাশি থেকে তিরানব্বই, বারো বছরে দেশে নদীভাঙনে ঘর হারিয়েছিল সোয়া সাত লাখ মানুষ। অর্ধেকের বেশি এই এক নদীর পারের।

সরকারি খাতায় তারা ওঠে দুর্যোগের ঘরে। নদীর দিক থেকে দেখলে এটা দুর্যোগ না, নিয়মিত চলাফেরা। দুইশো বছর আগে সে সমস্ত শরীর নিয়ে সরেছিল আশি কিলোমিটার, এখন প্রতি বর্ষায় সরে কয়েকশো মিটার। ঘটনা একই, মাপটা ছোট।

➖

মাটির আরও গভীরে নামলে হাঁটার দাগ আরও পুরনো।

আঠারো সালের মার্চে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পলিবিজ্ঞানী, লিজ চেম্বারলিন আর স্টিভ গুডব্রেড, ঢাকার প্রায় একশো কিলোমিটার দক্ষিণে নদীর বাঁক মাপছিলেন। তারা খুঁজছিলেন অন্য জিনিস, দেখতে চাইছিলেন এই বদ্বীপের নদী কত দ্রুত বাঁক বদলায়।

মাঝপথে তাদের চোখে পড়ল সদ্য খোঁড়া একটা পুকুর, খাবার পানি জমানোর জন্য। পুকুরের কাটা পাড়ে মাটির সমান স্তরগুলো ফুঁড়ে খাড়া উঠে গেছে বালুর রেখা। ধারণা হল, এটা ভূমিকম্পের চিহ্ন।

জিনিসটা কত জরুরি বুঝে তারা পুকুরের মালিককে অনুরোধ করলেন পানি ভরা এক রাত পিছিয়ে দিতে, পরদিন ফিরে এসে নমুনা নিলেন। মাটি খুঁড়ে নিচে পাওয়া গেল একটা ভরাট হয়ে যাওয়া খাত। দেড় কিলোমিটার চওড়া, একশো কিলোমিটারের বেশি লম্বা, উপরে ধান, নিচে কাদা।

আড়াই হাজার বছর আগে ওই খাত দিয়ে বইত গঙ্গা।

এটাই ভূমিকম্পের দলিল। মাটি প্রবল কাঁপলে ভেজা বালু কাদার ফাটল দিয়ে উপরে উঠে আসে, তারপর শক্ত হয়ে দাগ রেখে যায়।

বালু কবে শেষবার রোদ দেখেছিল, সেটা মেপে গবেষকরা সময়টা বের করলেন। শিরার জন্ম আর পুরনো খাতের মৃত্যু, দুইটা একই সময়ের। মানে এক বড় ভূমিকম্পেই গঙ্গা সেবার এক ঝটকায় সরে গিয়েছিল।

ধীরে সরা তাই নদীর একমাত্র চাল না। মাটি কাঁপলে সে লাফও দেয়।

গঙ্গার পুরনো লাফ যারা মেপেছেন, তারা হিসাব কষে বলছেন, ওই মাপের ভূমিকম্প এই বদ্বীপে আবার হলে কাঁপুনির মধ্যে পড়বে চৌদ্দ কোটি মানুষ। আর মাটির নিচে সেই চাপ, তাদের ভাষায়, এখনো জমছে।

➖

এই সরতে-থাকা জমিনের উপরেই আমরা আমাদের স্থির জিনিসগুলো বসিয়েছি।

চুরানব্বই থেকে আটানব্বই, চার বছর ধরে যমুনার উপর সেতু উঠল। খরচ ছিয়ানব্বই কোটি ডলার, তখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় নির্মাণ।

নদীটা কোথাও কোথাও বিশ কিলোমিটার চওড়া। সেতুর জায়গায় তাকে দুই পাশে পাথরের বাঁধ দিয়ে নামিয়ে আনা হয়েছে পৌনে পাঁচ কিলোমিটারে। এই কাজের কেতাবি নাম নদী শাসন।

সেতুর নকশা করা হয়েছে একশো বিশ বছরের জন্য। আর নদী শেষবার ঠিকানা বদলেছে প্রায় দুইশো বছর আগে।

জেলার সীমানাও আঁকা নদী ধরে। পাবনা-সিরাজগঞ্জ এইপারে, টাঙ্গাইল-জামালপুর ওইপারে। মাঝখানে নদী, যেন পাকা দেয়াল। অথচ এই দেয়ালই দুইশো বছর আগে ছিল আশি কিলোমিটার পুবে, ময়মনসিংহের পাশে।

তবে ভরসাটা একেবারে অন্ধ না। বাঁধ কাজ করে, সেতুটা সাতাশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে রেলের নতুন সেতুও উঠে গেছে। নদী চলে অনেক ধীর এক ঘড়িতে। এক মানুষের জীবনের মাপে নদী আসলেই স্থির।

রেনেলের অ্যাটলাস এখনো আছে, লন্ডনের সংগ্রহশালায়। আড়াইশো বছর আগের কাগজে নদীটা এখনো ময়মনসিংহের পাশ দিয়ে বইছে।

কাগজের নদী কাগজেই থাকে। আসলটা সরে গেছে আশি কিলোমিটার।

ময়মনসিংহের পাশের শুকনা খাতটা তার ফেলে যাওয়া দাগ। পরের দাগ কোথায় পড়বে, নদী তা এখনো জানায় নাই।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন