প্যারিসের দশম ফৌজদারি আদালতে এই অক্টোবরে বিচার হবে একটা বাক্যের। বাক্যটা হল, “যতদিন নিপীড়ন থাকবে, প্রতিরোধ শুধু অধিকার না, কর্তব্যও।”
কথাটা কোজো ওকামোতো নামের এক জাপানি মিলিট্যান্টের। বাহাত্তর সালে তেল আবিবের বিমানবন্দরে হামলায় ছাব্বিশজন নিহত হয়েছিলেন, তিনি তার একজন অংশগ্রহণকারী।
আর বিচারের বিষয় হল, গত মার্চে তার এই উদ্ধৃতি স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক সদস্য।
বিচার হবে তার।
ফরাসি প্রসিকিউটরের খাতায় এই শেয়ারের অর্থ করা হয়েছে “সন্ত্রাসবাদের পক্ষে অনলাইন সাফাই” হিসাবে। সম্ভাব্য সাজা সাত বছরের কারাদণ্ড, সঙ্গে এক লাখ ইউরো জরিমানা।
সেই অভিযুক্তের নাম রিমা হাসান। বয়স চৌত্রিশ। ফ্রান্সের ইতিহাসে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রথম ইউরোপীয় এমপি।
তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অভিযোগকারীদের পরিচয় সামনে আনলেই এই মামলার চরিত্র ধরে ফেলা যায়। একটা অভিযোগ এসেছে প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্টের দপ্তর থেকে, যে পদটা সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীন।
আরেকটা এসেছে অতি-ডান ন্যাশনাল র্যালির এক এমপির কাছ থেকে, যিনি পোস্টটা প্রসিকিউটরের নজরে আনতে পেরে প্রকাশ্যে উল্লাস করেছেন।
➖
রিমা হাসানের জীবনী পড়লে মনে হয়, ফিলিস্তিনের গত পঁচাত্তর বছরের ইতিহাস একটা মানুষের শরীরে সংকুচিত হয়ে ঢুকে পড়েছে।
উনিশশো আটচল্লিশের নাকবায় তার দাদা-দাদি উচ্ছেদ হন গালিলির আল-বিরওয়া গ্রাম থেকে। মাহমুদ দারবিশের সেই গ্রাম, যেটা আজ আর মানচিত্রে নাই। পরিবার আশ্রয় নেয় সিরিয়ায়।
হাসানের জন্ম আলেপ্পোর শরণার্থী শিবিরে, ফিলিস্তিনি বাবা আর সিরিয়ান মায়ের ঘরে, এবং সিরিয়ার আইনে মায়ের সূত্রে নাগরিকত্ব বর্তায় না বলে জন্মের মুহূর্তে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রহীন।
পৃথিবীর কোনো দেশের খাতায় তার নাম ছিল না।
শৈশবে ফ্রান্সে আসা, আন্তর্জাতিক আইনে পড়াশোনা, শরণার্থী শিবির নিয়ে গবেষণা-সংগঠন গড়া, তারপর দুই হাজার চব্বিশে জঁ-লুক মেলঁশোর বামপন্থী লা ফ্রঁস আঁসুমিজের হয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচন।
প্রচারের কেন্দ্রে ছিল একটাই প্রশ্ন, এবং সেটা তিনি কখনো আড়াল করেননি, “আমি ফিলিস্তিনের প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেই নির্বাচিত হয়েছি। আমি বরাবর বলেছি, ফিলিস্তিন একটা ইউরোপীয় ইস্যু, এবং এটাই আমার ম্যান্ডেটের হৃৎপিণ্ডে থাকবে।”
কথাটা তিনি রেখেছেন। এবং সেটা রাখার মূল্য কত, সেই হিসাবটাই এখন ফরাসি প্রজাতন্ত্রের নথিতে জমা হচ্ছে।
➖
দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই বছরে হাসানের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম দাঁড়িয়েছে ষোলোটায়।
প্রায় সবগুলিই সন্ত্রাস-সংক্রান্ত অভিযোগে, প্রতিটাই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নিয়ে তার বক্তব্যের জেরে। তেরোটা ইতিমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে, সংখ্যাটাই বলে দেয় অভিযোগগুলির ওজন কত।
তবু পুলিশি তলব এসেছে ছয়বার, হেফাজত আর জিজ্ঞাসাবাদে কেটেছে পঁয়তাল্লিশ ঘণ্টার বেশি।
প্রতিটা তলবে তিনি হাজির হয়েছেন পার্লামেন্টারি ইমিউনিটি না খাটিয়ে। কারণ সেটাই তার রাজনীতির সারমর্ম, একই অভিযোগে যেসব সাধারণ ফরাসি নাগরিক আদালতে ঘুরছেন, তাদের কোনো ইমিউনিটি নাই।
তবে ফরাসি রাষ্ট্র যে মাত্রায় পৌঁছে গেছে, তার পুরো ছবিটা ধরা পড়ে নজরদারির খতিয়ানে।
হাসানের ভাষ্য, তিন মাস ধরে তাকে জিওলোকেট করা হয়েছে, আর তার গতিবিধি ট্রেস করতে কাজে লাগানো হয়েছে জাতীয় রেল কোম্পানি এসএনসিএফ, এয়ার ফ্রান্স, এমনকি ইউরোপোলকে।
মহাদেশীয় অপরাধ-দমন সংস্থা, যার কাজ মাদক-চক্র আর মানবপাচারিদের ধরা, তাকে নামানো হয়েছে একজন পার্লামেন্ট সদস্যের ট্রেন-টিকিটের পেছনে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্তা মেৎসোলার সঙ্গে দেখা করে হাসান একটা তথ্য নিশ্চিত হয়ে নিয়েছেন, যেটা তার নামের পাশে ইতিহাসে লেখা থাকবে, একটা টুইটের জন্য পুলিশ হেফাজতে যাওয়া প্রথম ইউরোপীয় এমপি তিনি।
এপ্রিলের সেই হেফাজতের দিনটা আলাদা করে বলার মতো, কারণ ওই দিন ফরাসি রাষ্ট্রযন্ত্রের একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে কাজ করেছিল, তবে বিচারের কাজে না। হাসান হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই মিডিয়ায় খবর ছড়াল, তার কাছে মাদক পাওয়া গেছে।
এক দিনে সাতশো আর্টিকেল, চব্বিশ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল বিএফএম-টিভি একাই দিল বারোটা হেডলাইন অ্যালার্ট। পরে টক্সিকোলজি রিপোর্ট তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করল।
এবং মামলার নথি বলছে, খবর ছড়ানোর মুহূর্তে রিপোর্টটা প্রসিকিউটরের হাতেই ছিল।
মিথ্যাটা ছড়াল কে, হাসানের অভিযোগ সেখানে নির্দিষ্ট, “খোদ বিচার মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের কাছে মিথ্যা তথ্য ফাঁসে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। এটা প্রতিশোধপরায়ণ কোনো একক পুলিশের কাণ্ড না। এটা এসেছে মন্ত্রণালয় থেকেই।”
যে বিচারব্যবস্থার কাজ তাকে বিচার করা, সেই ব্যবস্থাই বিচারের আগে রায় ছড়িয়ে দিচ্ছিল সংবাদমাধ্যমে।
➖
মামলায় কাজ না হলে ফরাসি ডানপন্থার হাতে আরেকটা প্রস্তাব ছিল, হাসানের ফরাসি নাগরিকত্বই বাতিল করা হোক। দাবিটা তুলেছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মাক্রোঁ শিবির, ডান ও অতি-ডানের কয়েক ডজন এমপি।
নির্বাচিত প্রতিনিধির নাগরিকত্ব কাড়ার এই ব্যবস্থার জন্ম কোথায়, হাসান সেটা মনে করিয়ে দেন, “ভিশি শাসনামলে, নাৎসি-অধিকৃত ফ্রান্সের সেই সরকারের হাতে।” তার ভাষায়, “এই প্রবণতা ফ্যাসিবাদের ডিএনএ-র মধ্যেই থাকে।”
প্রস্তাবটা শেষমেশ বাতিল হয়েছে। কিন্তু কেন হয়েছে, সেই কারণটাও আরেকটা পরিহাস।
অনৈতিক বলে বাদ পড়ে নাই, গণতন্ত্রের পরিপন্থী বলেও না। বাদ পড়েছে কারণ নাগরিকত্ব গেলে হাসান রাষ্ট্রহীন হয়ে যাবেন, আর আন্তর্জাতিক আইনে সেটা নিষিদ্ধ।
পরিহাসটা হাসানের চোখ এড়ায় নাই।
“যারা আমার ফিলিস্তিনি পরিচয় অস্বীকার করে বলত, তুমি সিরিয়ায় জন্মেছ, তুমি সিরিয়ান, তাদেরকেই শেষে স্বীকার করতে হলো যে আমি সিরিয়ান না। কারণ সিরিয়ান হলে আমার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকত, আর তাহলে হয়তো তারা প্রক্রিয়াটা চালাতে পারত।”
যে রাষ্ট্রহীনতা তার জীবনের প্রথম ক্ষত, সেই রাষ্ট্রহীনতাই শেষ পর্যন্ত তার ঢাল হয়ে দাঁড়াল।
➖
রিমা হাসান আসলে কোথায় আঘাত করছেন, সেটা না টানলে তার বিরুদ্ধে এত আয়োজনের কারণটা বোঝা যায় না। জায়গাটা প্রতীকী কিছু না। জায়গাটা টাকার।
ইউরোপ আর ইসরায়েলের গোটা সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে আছে একটামাত্র চুক্তির উপর, নাম অ্যাসোসিয়েশন এগ্রিমেন্ট।
এই চুক্তির জোরেই ইসরায়েলি পণ্য ইউরোপের বাজারে বাড়তি সুবিধা পায়, দুই পক্ষে বছরে চার হাজার কোটি ইউরোর বেশি বাণিজ্য চলে, আর ইউরোপ হয়ে যায় ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় খদ্দের।
এখন মজাটা হলো, এই চুক্তির দুই নম্বর ধারাতে লেখা আছে একটা শর্ত। সম্পর্কটা টিকবে ততক্ষণ, যতক্ষণ ইসরায়েল মানবাধিকার মানবে।
হাসানের পুরো লড়াইটা এই এক লাইনের উপর। তিনি আইনজীবীর সরল যুক্তিটা ধরিয়ে দেন, তোমার নিজের হাতে লেখা শর্ত তুমি নিজেই মানছ না, হয় শর্তটা কার্যকর করো, আর নাহয় মেনে নাও কথাটা লোক-দেখানো।
পার্লামেন্টে এই কথা তিনি বহুবার তুলেছেন, বহুবার আটকে গেছেন। তার ভাষায়, প্রতিবার তার রাস্তা আগলে দাঁড়িয়েছে “একটা রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, আর সবার উপরে এমন এক ইউরোপীয় কমিশন, যারা এসব শোনার নামগন্ধও রাখে না।”
তার পাশে দাঁড়িয়েছে গুটিকয় দেশ। স্পেন, আয়ারল্যান্ড, আর হাতে গোনা কেউ কেউ।
ভেতরের দরজা বন্ধ দেখে তখন রিমা হাসানরা চেষ্টা চালালেন বাইরের দরজায়, যদিও সেটাও ইউরোপীয় ব্যবস্থারই অংশ।
নিয়মটা হলো, কোনো দাবিতে যদি দশ লাখ নাগরিকের যাচাই করা সই জমা পড়ে, তাহলে কমিশন সেটার জবাব দিতে বাধ্য। এই জানুয়ারিতে চালু হওয়া সেই উদ্যোগের অন্যতম মুখ ছিলেন হাসান।
দশ লাখ হতে লাগল তিন মাস, পনেরোই জুলাই মধ্যরাতে গোনা শেষ হলে সংখ্যাটা দাঁড়াল বারো লাখ নিরানব্বই হাজার নয়শো চোদ্দ। নিয়মে সাত দেশ লাগত, সই এসেছে চোদ্দ দেশ থেকে।
আর সবচেয়ে বেশি সই আসল স্বয়ং ফ্রান্স থেকে। চার লাখ পঁয়ষট্টি হাজার, দরকারি সীমার আট গুণ বেশি।
এই কাগজে-কলমের লড়াইয়ের পাশাপাশি চলেছে শরীর দিয়ে লড়াইটাও।
যে জন্মভূমিতে তার ঢোকা সারা জীবনের জন্য নিষিদ্ধ, গত বছরের জুনে ঠিক সেদিকেই তিনি জাহাজ ভাসিয়েছিলেন, গাজামুখী ফ্রিডম ফ্লোটিলায়। ইসরায়েল জাহাজ আটকে তাকে ফেরত পাঠায়।
অক্টোবরে তিনি আবার যান, আবার তাকে ফেরানো হয়। আর প্যারিসের বিমানবন্দরে পা রেখেই তিনি সোজা ফেরেন পার্লামেন্টে, সেই একই দাবি নিয়ে।
➖
ফরাসি রাষ্ট্র আসলে হাসানের একটা টুইটের সঙ্গে লড়ছে না, লড়ছে তার পুরো চিন্তার ছকটার সঙ্গে।
হাসানের নিজের হিসাবে, ফিলিস্তিন নিয়ে ফরাসি আলাপে চারটা কথা বলা কার্যত নিষিদ্ধ, এমনকি বাম শিবিরেও।
জায়নবাদ যে একটা ঔপনিবেশিক মতাদর্শ, এই কথা। শরণার্থীদের ফিরে আসার অধিকারের কথা। সশস্ত্র প্রতিরোধ আদৌ বৈধ কি না, সেই তর্ক। আর দুই-রাষ্ট্রের ছক ছেড়ে এক রাষ্ট্রের কথা।
এই চারটা ট্যাবু চিরতরে ভেঙে ফেলা, এটাই তার ঘোষিত রাজনীতি। আর মামলাগুলো নেমে এসেছে এই ঘোষণার কারণেই।
দুই-রাষ্ট্র প্রসঙ্গে তার অবস্থান নিছক তাত্ত্বিক জেদ না। “আমি অসলো-পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ,” তিনি বলেন, “অসলো চুক্তির নকশা যখন হচ্ছে, তখনই মোটামুটি আমার জন্ম। এটাতে আমার আর বিশ্বাস নাই। বহু আগেই এটা অচল হয়ে গেছে।”
এই অবস্থান নিয়ে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে একটা পাল্টা যুক্তিও তিনি দিতে পারেন নাই। যা বললেন, তা হলো, ম্যাডাম হাসান বিপজ্জনক, তিনি ঘৃণা ছড়ান।
আর এই জবাবহীনতাটাকেই রিমা হাসান ঘটনাটা খুলে দেখানোর টুল হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
“সবাই একটা নৈতিক আতঙ্কে ভুগছে,” তিনি বলেন, “কারণ আসল প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তাদের কাছে নাই। ফ্রান্স গণহত্যায় জড়িত কি না, উত্তর নাই। অস্ত্র এখনো পাঠানো হচ্ছে কি না, উত্তর নাই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হবে কি না, উত্তর নাই।”
তারপর যোগ করেন সেই লাইন, “যে তর্কে আগেই হেরে বসে আছে, সেন্সরশিপই তার শেষ হাতিয়ার।”
এই উত্তরহীনতার সবচেয়ে প্রকাশ্য প্রদর্শনী হয়েছে এই সপ্তাহের সোমবার, ব্রাসেলসে।
ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বসেছিলেন একটা প্রশ্ন নিয়ে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হবে কি না। ঘরের সাতাশটা দেশ একমত যে বসতিগুলো অবৈধ, একটাও দ্বিমত নাই।
তবু কমিশনকে নড়ানোর জন্য যতগুলো ভোট দরকার, ততগুলো ভোট জুটল না।
অন্যায়ের প্রশ্নে সাতাশে সাতাশ, প্রতিকারের প্রশ্নে শূন্য। ইউরোপের গোটা পররাষ্ট্রনীতি এই এক সমীকরণে ধরে ফেলা সম্ভব।
তবু ফাঁকফোকর গলে সত্যিটা মাঝেমধ্যে বের হয়ে যায়, ভুল দরজা দিয়ে। ইউরোপের পররাষ্ট্রনীতিপ্রধান কাজা কালাস একটা একান্ত আলাপে ইসরায়েলি ব্যবস্থাকে দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্টহাইডের সঙ্গে মিলিয়েছিলেন, পরে কথাটা ফাঁস হয়ে যায়।
স্ট্রাসবুর্গের অধিবেশনে হাসান তাকে সরাসরি ধরলেন, “ম্যাডাম কালাস, এই কথা একান্তে বলার না। এই পোডিয়াম থেকে বলার, কারণ এটা আপনার দায়িত্ব।”
তার মতে, অ্যাপার্টহাইড নিছক একটা রাজনৈতিক গালি না, রোম সংবিধিতে এটা সংজ্ঞায়িত মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা অ্যামনেস্টি আর হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একুশ সাল থেকে নথিবদ্ধ করে আসছে।
➖
ইসরায়েল নিয়ে হাসানের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত কথাটা নিছক নিন্দাবাক্য হিসাবে পড়া যাবে না।
প্রশ্নটা হল, সবচেয়ে একঘরে হওয়ার মুহূর্তেই ইসরায়েল সবচেয়ে বেপরোয়া কেন, ফ্লোটিলার ইউরোপীয় নাগরিকদের গায়েও তারা হাত তুলছে কেন?
এই প্রশ্নে রিমা হাসানের জবাব, “এটা স্ববিরোধ না। ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শক্তি যত একঘরে হয়েছে, ততই সে সর্বনাশের ভিতরে ঢুকেছে।”
তার ভাষ্যে, “ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করাই এই গণহত্যার উদ্দেশ্য। কিন্তু পাশাপাশি আমরা যা দেখছি, সেটা একইসঙ্গে ইসরায়েলি আত্মহত্যা। একটা আতঙ্কিত রাষ্ট্র শেষ শক্তি খরচ করছে এমন একটা মতাদর্শ বাঁচাতে, যেটা আর টিকবে না বলে তারা নিজেরাও জানে।”
➖
হাসান জানেন এই লড়াইয়ের ঘড়ি চলে বছরে না, প্রজন্মে।
ফ্রান্সেরই একটা নজির তিনি টানেন, “দশ বছর আগে এই দেশে বয়কটের ডাক দেওয়ার জন্য মানুষকে আদালতে তোলা হতো। এমন লোক আমি চিনি, এখন যাদের বয়স চল্লিশ-পঞ্চাশ, দোকানের সামনে স্রেফ লিফলেট বিলি করার দায়ে যারা ফৌজদারি সাজা খেটেছেন।”
এক দশক পর ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত রায় দেয়, বয়কট মতপ্রকাশেরই অংশ।
আজ যারা একই যন্ত্রের নিচে, ব্রিটেনে নিষিদ্ধ প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মী থেকে ইউরোপজুড়ে মামলায় পড়া ছাত্র-সংগঠকরা, তাদের উদ্দেশে রিমা হাসানের কথা প্রায় উইলের মতো শোনায়।
“এই লড়াই আমাদের যে কারও চেয়ে বড়, তাৎক্ষণিক প্রতিদানের আশা এখানে চলে না। অ্যাপার্টহাইডের বিরুদ্ধে একটা প্রজন্ম লড়েছে, ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে একটা, আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে একটা। আজকের প্রজন্মকে গড়ছে গাজা। আমরা দীর্ঘ এক ইতিহাসের কেবল একটা প্রজন্ম।”
তারপর সেই বাক্য, যা এই গোটা মামলার উপরই তার রায়, “পরাজয় আর ব্যর্থতাকে যেন না গুলিয়ে ফেলি। কোনো ফ্রন্টে হার হতে পারে, তবু লড়াই চলতে থাকে।”
অক্টোবরের ঊনিশ-বিশ তারিখে প্যারিসের আদালতে মামলাটা উঠবে। এক পক্ষে গোটা ফরাসি প্রজাতন্ত্র, তার প্রসিকিউটর, প্রিফেক্ট, মন্ত্রণালয়, তিন মাসের নজরদারি, ইউরোপোল।
অন্য পক্ষে সেই নারী, জন্মের দিন পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র যাকে নিজের বলে স্বীকার করে নাই।
রাষ্ট্রহীন একজন মানুষকে থামাতে লাগছে একটা আস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র। তর্কে কে হারছে, এর চেয়ে পরিষ্কার সাক্ষী আর নাই।