কালেমার পতাকার দড়ি কোনোদিন তার নিজের হাতে ছিলো না

উনিশশো বিরানব্বই সালের তিরিশে এপ্রিল, ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মাইক্রোফোনের সামনে বসলেন কয়েকজন মানুষ।

তাদের কেউ কেউ সদ্য যুদ্ধফেরত, আফগানিস্তানের পাহাড়ে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়ে এসেছেন। ক্যামেরার সামনে, চা-বিস্কুট সহযোগে, তারা একটা সংগঠনের জন্ম ঘোষণা করলেন। হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ।

জায়গাটা খেয়াল করার মতো। গোপন ডেরা না, মাদ্রাসার পেছনের ঘর না, সীমান্তের ওইপারের ক্যাম্প না। জাতীয় প্রেস ক্লাব, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক হৃৎপিণ্ড থেকে কয়েকশো গজ দূরে।

সেই দশকের মিছিলেই রাজপথে স্লোগান উঠল, “আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।”

অর্থাৎ এই দেশে কালেমা-খচিত কালো পতাকার রাজনীতির জন্ম আন্ডারগ্রাউন্ডে হয় নাই। জন্ম হয়েছে মাইক্রোফোনের সামনে। রাষ্ট্র শুনেছে, দেখেছে, এবং কিছু করেনি।

কেন করেনি, সেই প্রশ্নের উত্তরেই আমরা পরের চৌত্রিশ বছরের পুরো গল্পটা দেখতে পাব। কারণ এই পতাকা নিয়ে আমাদের যা কিছু ধারণা, তার গোড়ায় দুইটা ভুল অনুমান বসে আছে।

এক, পতাকাটা আকাশ থেকে পড়েছে, এর কোনো জন্মদাতা নাই, পৃষ্ঠপোষক নাই, বিনিয়োগকারী নাই। দুই, পতাকাটা রাষ্ট্রের শত্রু, আর রাষ্ট্র হল তার শিকারি।

চৌত্রিশ বছরের ঘটনাপঞ্জি পাশাপাশি সাজালে দুইটা অনুমানই ভেঙে পড়ে। জন্মদাতার তালিকায় শুধু দাড়িওয়ালা মোল্লার নাম থাকে না, থাকে ওয়াশিংটন, ইসলামাবাদ, রিয়াদ।

আর শিকারি রাষ্ট্রের গল্পে বের হয়ে আসে একটা ব্যবহারের গল্প। প্রতিটা আমলে, প্রতিটা শাসনে, পতাকাটা কারও না কারও কাজে লেগেছে। কেউ ভাড়া করেছে মাঠে, কেউ গল্পে, কেউ নীরবতায়।

➖

প্রেস ক্লাবের ওই যুদ্ধফেরত মানুষগুলো আফগানিস্তানে পৌঁছাল কীভাবে, গল্পটা সেখান থেকে শুরু করা যাক। কারণ শুরুটা হয়েছিল এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে কেউ প্রত্যাশা করে না।

আমেরিকার নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা নামল। ওয়াশিংটনের কাছে এটা স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুযোগ, রাশিয়াকে তার নিজের ভিয়েতনাম উপহার দেওয়া। কিন্তু আমেরিকা নিজে লড়বে না, লড়বে স্থানীয় মানুষ।

আর মানুষকে লড়াতে হলে এমন একটা মতাদর্শ লাগে, যা মৃত্যুকে পুরস্কার বানায়।

স্বয়ং ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, মার্কিন সরকারের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড নেব্রাস্কা-ওমাহা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছিল পাঁচ কোটি ডলারের বেশি। কীসের জন্য? পাঠ্যবই।

আফগান শিশুদের প্রাথমিক স্কুলের বই, যেখানে ইংরেজি বর্ণমালা শেখানো হয় জে-তে জিহাদ আর কে-তে কালাশনিকভ দিয়ে।

যেখানে অঙ্কের প্রশ্ন সাজানো হয় এভাবে, একজন মুজাহিদের কাছে পাঁচটা বুলেট, সে তিনটা রুশ সেনাকে মারল, বাকি রইল কয়টা?

মৃত্যু আর শাহাদাতকে মহিমান্বিত করা এই বই ছাপা হয়েছিল লাখে লাখে, বিলি হয়েছিল আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের মাদ্রাসায়।

তার বিশ বছর পরে আমরা দেখলাম, ইতিহাসের নির্মম রসিকতা। দুই হাজার দুই সালে আমেরিকা যখন নিজেই তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামল, তখন তাকে আবার টাকা খরচ করতে হলো সেই বইগুলো থেকে অস্ত্রের ছবি মুছে ফল-ফুল বসাতে।

এক প্রজন্মকে যে বই দিয়ে জিহাদ শেখানো হয়েছিল, পরের প্রজন্মের জন্য সেই বই থেকেই জিহাদ মোছা হচ্ছিল, তহবিল একই।

কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। মতাদর্শ আর বইয়ের পাতায় নাই, রাস্তায় নেমে গেছে। আর সেই রাস্তায় হাঁটছিল কয়েক হাজার বাংলাদেশিও।

সংখ্যাটা নিয়ে হিসাব ভিন্ন ভিন্ন, কোনো গবেষণা বলে তিন হাজার, কোনো হিসাব আট থেকে দশ হাজার পর্যন্ত যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের শুরু পর্যন্ত এত সংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ আফগান যুদ্ধে গিয়েছিল, নথিভুক্ত হিসাবেই মারা গিয়েছিল অন্তত চব্বিশ থেকে চৌত্রিশ জন।

তারা গেল কীভাবে, এই প্রশ্নটা সবচেয়ে কম করা হয়। কারণ উত্তরটা কোনো ব্যক্তির দুঃসাহসের গল্প না, একটা অবকাঠামোর গল্প।

ঢাকা থেকে করাচি, করাচি থেকে পেশোয়ার, পেশোয়ার থেকে সীমান্তের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, এই পুরো করিডরটা চালাত পাকিস্তানের হরকাতুল জিহাদ, আর তার পেছনে টাকা ও অস্ত্রের জোগান দিত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, সৌদি দাতব্য তহবিল, আর মার্কিন সিআইএ।

ভিসা, টাকা, প্রশিক্ষক, অস্ত্র, এর কোনোটাই একা জোগাড় করা যায় না। এটা ছিল তিন-চারটা রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রকল্প, যার সবচেয়ে নিচের স্তরে ছিল আমাদের ছেলেরা।

এই যোদ্ধারা কারা ছিল, সেই রাজনৈতিক প্রশ্নটাও এড়ানো যায় না। প্রগতিশীল ধারার লোকেরা এক বাক্যে এই প্রশ্নের ফয়সালা করে দিত এভাবে, মূলত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শিবিরের নেতাকর্মীরাই সীমান্তে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।

দাবিটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখের, ফলে একে ধ্রুব সত্য ধরা যায় না। কিন্তু একটা কাঠামোগত যোগসূত্র নিশ্চয়ই থেকে যায়, যা নিয়ে আলাপ করা যায়।

যারা আফগানিস্তানে গিয়েছিল, তারার ফেরার সময় কেউই খালি হাতে ফেরেনি। সঙ্গে এনেছিল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, আর একটা হিসাব, সোভিয়েতের মতো পরাশক্তিকে যদি হারানো যায়, একটা বাংলাদেশি রাষ্ট্র তো কোন ছার।

➖

উনিশশো একচল্লিশ সালে, অবিভক্ত ভারতে, আবুল আলা মওদুদি গড়লেন জামায়াতে ইসলামী।

মওদুদির চিন্তার মূল প্রস্তাবটা ছিল, ইসলাম নিছক ধর্ম না, একটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর আধুনিক মুসলিম সমাজ ফিরে গেছে ইসলাম-পূর্ব অন্ধকারে, যাকে উদ্ধার করতে লাগবে একটা সংগঠিত বিপ্লবী অগ্রবাহিনী।

এই ধারণাগুলো মিশরে গিয়ে পড়ল সাইয়িদ কুতুবের হাতে, কুতুব সেগুলোকে আরও ধারালো করলেন, আর কুতুবের চিন্তা থেকেই জন্ম নিল সেই স্রোত, যা পরে খাওয়ানো হবে আল-কায়েদাকে, আইএসকে।

গবেষকরা তাই আধুনিক জঙ্গি মতাদর্শের বুদ্ধিবৃত্তিক জনকদের তালিকায় কুতুবের ঠিক পরেই মওদুদির নাম রাখেন।

এই ভূখণ্ডে মওদুদির দলের ইতিহাসটাও জানা।

একাত্তরে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, দলের তখনকার পূর্ব পাকিস্তান প্রধান গোলাম আযম ছিলেন শান্তি কমিটির শীর্ষ সংগঠক, আর দলেরই সশস্ত্র শাখা আল-বদরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবী হত্যা।

অর্থাৎ সংগঠিত ধর্মীয় সহিংসতা এই মাটিতে নতুন ছিল না। এর একটা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ছিল, রাষ্ট্রের জন্মের মুহূর্ত থেকেই।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রথমে দলটাকে নিষিদ্ধ করেছিল, গোলাম আযমের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসনের হাত ধরে জামায়াত ফিরল, বৈধতা পেল, একসময় ক্ষমতার শরিকও হলো।

একটা তফাত এখানে টেনে রাখা জরুরি, নইলে অবিচার হবে। জামায়াত একটা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, নির্বাচন করে, প্রকাশ্যে সশস্ত্র জিহাদ প্রত্যাখ্যান করে, তাকে হুজি বা জেএমবির সঙ্গে এক পাল্লায় মাপা তথ্যগত ভুল।

কিন্তু মতাদর্শের বংশলতিকা অস্বীকার করাও ভুল।

যে “ইসলামি রাষ্ট্র”-এর ধারণা মওদুদি বুনেছিলেন, সেটাই ছিল সেই বৌদ্ধিক জমি, যেখানে পরে অনেক বেশি উগ্র, অনেক বেশি সহিংস সংগঠন শিকড় ছড়িয়েছে। দল আর মতাদর্শ এক জিনিস না, কিন্তু একই মাটিতে জন্মেছে।

মাটি তৈরি ছিল। বীজ এল আফগানিস্তান থেকে। এবার দরকার ছিল শুধু পানি আর ছায়া।

➖

নব্বইয়ের দশকে পতাকাটা তার আন্তর্জাতিক ঠিকানাটাও পাকা করে ফেলল। এই যোগসূত্রটা কোনো অনুমান না, দলিলে লেখা।

আটানব্বই সালের তেইশে ফেব্রুয়ারি ওসামা বিন লাদেন আর আয়মান আল-জাওয়াহিরি যে কুখ্যাত ফতোয়া জারি করলেন, “ইহুদি ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদ”, যাকে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠা-ইশতেহার ধরা হয়, সেই দলিলে সই ছিল মোট পাঁচজনের।

তাদের একজনের পরিচয় লেখা, ফজলুর রহমান, আমির, জিহাদ মুভমেন্ট, বাংলাদেশ। বিন লাদেন, জাওয়াহিরি, আর একজন বাংলাদেশি। এক কাগজে, এক সারিতে।

সেই একই দশকে হুজি-বি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংগঠন আরএসও-র সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালিয়েছে, ভারতের সিমির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বাংলাদেশ তখন দক্ষিণ এশিয়ার জিহাদি মানচিত্রের একটা সক্রিয় নেটওয়ার্ক, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ না।

দেশের ভেতরে পতাকাটা রক্তের স্বাক্ষরও দিয়ে ফেলেছে ততদিনে। দুই হাজার সালের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হলো ছিয়াত্তর কেজির বোমা।

পরের বছর, দুই হাজার একের পহেলা বৈশাখে, রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণে প্রাণ গেল দশজনের।

আর দুই হাজার চারে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজারে গ্রেনেড হামলায় আহত হলেন খোদ ব্রিটিশ হাইকমিশনার, নিহত তিনজন, যে মামলায় পরে হুজি নেতা মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

অর্থাৎ পতাকাটা কী পারে, রাষ্ট্র জানত। প্রশ্ন হলো, জেনে রাষ্ট্র কী করল।

➖

উত্তরটা এল দুই হাজার চার সালের বসন্তে, রাজশাহী-নাটোর-নওগাঁর গ্রামে।

উত্তরবঙ্গ তখন বামপন্থী চরমপন্থীদের, “সর্বহারা”দের উৎপাতে অস্থির। খুন, চাঁদাবাজি, রাতের আতঙ্ক। রাষ্ট্রের হাতে এর দাওয়াই ছিল পুলিশ, আদালত, আইন।

কিন্তু সেই বসন্তে মাঠে নামল অন্য এক বাহিনী, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ, নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম, লোকমুখে “বাংলা ভাই।”

তারা প্রকাশ্যে ঘুরত, মিছিল করত, “অপারেশন” চালাত, মানুষ পিটিয়ে মারত, লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখত। আর প্রশাসন বহু ক্ষেত্রে ছিল নীরব দর্শক, কোথাও কোথাও তারও বেশি।

কতটা বেশি, তার একটা মাপ পাওয়া যায় দুই হাজার সাত সালের তিরিশে জানুয়ারি প্রথম আলোয় ছাপা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

সেখানে লেখা, দুই হাজার চারের এপ্রিলে বাংলা ভাই আর তার আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আবদুর রহমান ট্রাকে করে প্রায় দেড়শো কর্মী নিয়ে নাটোরের এক প্রভাবশালী রাজনীতিকের বাসভবনে গিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন, আর কাজে খুশি হয়ে সেই রাজনীতিক তাৎক্ষণিক উপহার দেন এক বান্ডিল টাকা।

দৃশ্যটা আরেকবার পড়ুন। ট্রাকে দেড়শো সশস্ত্র কর্মী, প্রকাশ্য দিবালোক, ক্ষমতার বাসভবন, টাকার বান্ডিল। এটা কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের বর্ণনা না, একটা লেনদেনের বর্ণনা।

পতাকাটা তখন একটা সার্ভিস দিচ্ছিল, যে সার্ভিসটা দেওয়ার কথা ছিল থানার।

রাষ্ট্র তার সহিংসতার একচেটিয়া অধিকারটা কিছুদিনের জন্য ভাড়া দিয়ে দিয়েছিল।

পরে সেই আমলেই, দুই হাজার পাঁচের ফেব্রুয়ারিতে, জেএমবি নিষিদ্ধ হল, আর দুই হাজার সাতে তত্ত্বাবধায়ক আমলে বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমানের ফাঁসি কার্যকর হয়।

কিন্তু ততদিনে ভাড়াটে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে, সে আর ভাড়াটে থাকতে রাজি না।

➖

জানান দেওয়ার দিনটা ছিল দুই হাজার পাঁচের সতেরোই আগস্ট। সকাল এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটা, মোট আধ ঘণ্টা।

এই আধ ঘণ্টায় দেশের চৌষট্টি জেলার তেষট্টিটায় বিস্ফোরিত হলো প্রায় পাঁচশো বোমা। প্রেস ক্লাবের সামনে, আদালত চত্বরে, সরকারি স্থাপনায়। বাদ শুধু মুন্সীগঞ্জ। মারা গেলেন দুইজন, আহত শতাধিক।

পাঁচশো বোমায় মৃত্যু মাত্র দুই, এই অসামঞ্জস্যের ভেতরেই মূল বার্তাটা ধরা সম্ভব। বোমাগুলো ইচ্ছা করে ছোট বানানো হয়েছিল, কারণ সেদিনের উদ্দেশ্য হত্যা ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল প্রদর্শনী।

ভাবুন, তেষট্টি জেলায় একযোগে বোমা ফাটাতে কী লাগে। প্রতিটা জেলায় প্রশিক্ষিত লোক, বিস্ফোরকের জোগান, পরিবহনের চেইন, ঘড়ি মেলানোর শৃঙ্খলা, আর এমন একটা সাংগঠনিক কাঠামো, যা মাসের পর মাস রাষ্ট্রের চোখ এড়িয়ে পুরোটা সাজাতে পারে।

বোমার সঙ্গে ছড়ানো লিফলেটে শরিয়া কায়েমের দাবি লেখা ছিল, কিন্তু আসল বার্তাটা ছিল ভূগোলে, আমরা সব জায়গায় আছি, একই ঘড়ি ধরে।

চার মাসের মাথায় প্রদর্শনী থামল রক্তে। ঝালকাঠিতে আত্মঘাতী হামলায় খুন হলেন দুই বিচারক। যে হাত টাকার বান্ডিল নিয়েছিল, সে হাতই এবার রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের রক্ত নিচ্ছে।

ভাড়ার চুক্তির এই এক সমস্যা। মেয়াদটা চুক্তিতে লেখা থাকে, কিন্তু ভাড়াটে সেটা পড়ে না।

➖

দ্বিতীয় ভাড়ার মৌসুম শুরু হলো দুই হাজার নয় সাল থেকে, এবং এই ভাড়া আগেরটার চেয়ে অনেক পরিশীলিত। এবার পতাকাটাকে আর মাঠে নামানো হলো না। এবার পতাকাটা কাজে লাগল গল্পে।

বিশ্বজুড়ে তখন “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।” এই বাজারে নতুন সরকার নিজেকে দাঁড় করাল ধর্মনিরপেক্ষতার শেষ প্রহরী হিসেবে, আর বার্তাটা ছিল স্পষ্ট, আমরা আছি বলেই দেশটা আফগানিস্তান হয়ে যাচ্ছে না।

এই বার্তার দুই বড় ক্রেতা ছিল, দিল্লি আর ওয়াশিংটন।

ভারতের কাছে এই সরকার হয়ে উঠল উত্তর-পূর্বের বিদ্রোহী দমন আর সীমান্ত-নিরাপত্তার “নির্ভরযোগ্য অংশীদার”, ওয়াশিংটনের কাছে ওয়ার-অন-টেররের বিশ্বস্ত শরিক।

ফলে দুই হাজার চোদ্দ আর আঠারোর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পরেও সমর্থন টিকে রইল, নির্বাচন বা গুম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই উত্তর তৈরি থাকত, বিকল্পটা ভেবে দেখুন।

এই দ্বিমুখী বিক্রির সবচেয়ে করুণ দৃষ্টান্তটা ব্লগাররা। ব্লগার হত্যা। দুই হাজার তেরোর ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ, পাল্টা মঞ্চে উঠল হেফাজতে ইসলাম, তাদের ভাষায় লড়াইটা “নাস্তিক ব্লগারদের” বিরুদ্ধে।

সরকার এই বাইনারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই দিকেই বেচল। বিদেশের কাছে শাহবাগ দেখিয়ে সে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রহরী, আর দেশের ভেতরে ধর্মীয় ভোটের কাছে সে ঈমানের রক্ষক।

যার প্রমাণ হিসেবে খুন হওয়া ব্লগারদের বিচারের আগে গ্রেপ্তার হলো জীবিত ব্লগাররাই, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে। তারপর চাপাতির ঢেউ।

এই আমলের সবচেয়ে রক্তাক্ত রাতটা এল দুই হাজার ষোলোর পয়লা জুলাই।

গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে পাঁচ তরুণ ঢুকল চাপাতি, পিস্তল আর বোমা নিয়ে, আর বারো ঘণ্টার জিম্মি-নাটক শেষে গোনা গেল বাইশটা লাশ, যার সতেরোটা বিদেশির।

হামলাকারীরা কেউ মাদ্রাসার ছাত্র না। উচ্চবিত্ত পরিবারের, নামী স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে। দায় স্বীকার করল আইএস, তাদের চ্যানেলে ছড়াল হামলাকারীদের ছবি, পেছনে সেই কালো পতাকা।

আর সরকার বলল, দেশে আইএস নেই। এরা “দেশীয় জঙ্গি।”

তবে হোলি আর্টিজানের পরের ইতিহাস শুধু অস্বীকারের না। পরের পাঁচ বছরে রাষ্ট্র চালাল হাজারের বেশি অভিযান, নিহত অন্তত পঁচাশি, গ্রেপ্তার প্রায় আড়াই হাজার। বড় হামলা কার্যত বন্ধ হয়ে গেল। এটা আংশিক সাফল্য ছিল, অস্বীকারের উপায় নাই।

কিন্তু হিসাবের একটা দ্বিতীয় খাতাও আছে, যেটা কেউ খুলে দেখায় না। যে পণ্য দেখিয়ে বৈধতা কেনা হয়, সেই পণ্য পুরোপুরি ফুরিয়ে গেলে দোকান চলে কীভাবে?

পতাকাটা তাই এই আমলেও নামেনি, মাঠে তার উপস্থিতি কমেছে, কিন্তু গল্পে তার উপস্থিতি হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।

সেই গল্পের ছায়ায় “জঙ্গি” তকমাটা নিজেই হয়ে উঠেছিল একটা অস্ত্র, যা মাঝেমধ্যে গিয়ে পড়ত এমন মানুষের গায়েও, যাদের সঙ্গে এই পতাকার দূরতম সম্পর্ক নাই। ভিন্নমতের কর্মী, সমালোচক।

➖

তারপর দুই হাজার চব্বিশের পাঁচই আগস্ট রেজিম পড়ল, শুরু হলো তৃতীয় মৌসুম। এই মৌসুমের দৃশ্যগুলো পরপর সাজালেই ছবিটা ভেসে ওঠে।

প্রথম দৃশ্য কারাগারে, অভ্যুত্থানের ডামাডোলে কাশিমপুর কারাগার ভেঙে পালাল দুইশো দুই বন্দি, পুলিশ সদর দপ্তরের গত ডিসেম্বরের হিসাবে তাদের একশো তেত্রিশ জন এখনো নিখোঁজ।

দ্বিতীয় দৃশ্য আদালতে, পরের মাসগুলোতে জামিনে ছাড়া পেলেন জঙ্গি মামলার তিনশোর বেশি আসামি।

তালিকায় আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা জসীমউদ্দিন রাহমানীর মতো নামও আছে। ব্লগার-হত্যার সেই ঢেউয়ের মূল প্রেরণাদাতা।

তৃতীয় দৃশ্য রাস্তায়, দুই হাজার চব্বিশের অক্টোবরে ঢাকা আর কিশোরগঞ্জের মিছিলে উড়ল কালেমা-খচিত কালো পতাকা, আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো এক আশ্চর্য বিতর্ক।

এক পক্ষ বলল, এ তো কালেমার পতাকা, জঙ্গিবাদের সঙ্গে মেলাবেন না। আরেক পক্ষ ছবি বিশ্লেষণ করে দেখাল, অন্তত একটা পতাকা হুবহু আইএসের নকশার। তৃতীয় পক্ষ বলল, পুরোটাই পতিত শাসনের সাজানো নাটক।

চতুর্থ দৃশ্য বায়তুল মোকাররমে। দুই হাজার পঁচিশের সাতই মার্চ, জুমার নামাজের পর, জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে বেরোল মিছিল। ব্যানারে “মার্চ ফর খিলাফত”, আয়োজক ষোলো বছর ধরে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীর।

পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল, সাউন্ড গ্রেনেড ফাটাল, ছত্রিশজনকে ধরল। কিন্তু আসল খবরটা গ্যাসের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে গেল, তারা মিছিলটা করতে পেরেছে। ঘোষণা দিয়ে, পোস্টার সাঁটিয়ে।

এই পুরো মৌসুমে সরকারের ভাষ্য একটাই, দেশে জঙ্গি নেই। খোদ জঙ্গি-দমন ইউনিটের এক কর্মকর্তা হতাশ হয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, উপরমহল থেকেই যখন বলা হচ্ছে জঙ্গি নেই, তখন আমরা করবটা কী।

“মিডিয়ার সৃষ্টি।” “দেশে আইএস নেই।” “দেশে জঙ্গি নেই।” তিন আমল, তিন শাসন, হুবহু একই বাক্য।

যে আমলে পতাকাটা কাজে লাগে, সে আমলে তার নাম হয়ে যায় “নেই।” অস্বীকার এই গল্পের কোনো দুর্ঘটনা না। অস্বীকার এই গল্পের সবচেয়ে পুরনো ভাড়াটে।

➖

সবচেয়ে নতুন সুতোটা দেশের ভেতরেও না। সেটা বেরিয়ে গেছে বিদেশে, প্রবাসী শ্রমিকের ডরমিটরিতে।

গত বছরের জুনে মালয়েশিয়ায় তিন দফা অভিযানে গ্রেপ্তার হলেন ছত্রিশজন বাংলাদেশি, সবাই বৈধ শ্রমিক, কারখানায়, নির্মাণে, সার্ভিস সেক্টরে।

মালয়েশিয়ার পুলিশপ্রধান জানালেন, এরা একটা আইএস-অনুপ্রাণিত নেটওয়ার্ক, নিজেদের নাম দিয়েছে “গেরাকান মিলিতান রাদিকাল বাংলাদেশ।”

হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রামে দাওয়াত, ভিডিও কলে বাইয়াত, সদস্য-চাঁদা বছরে পাঁচশো রিঙ্গিত। টাকা যাচ্ছিল ই-ওয়ালেট আর আন্তর্জাতিক ট্রান্সফারে, সিরিয়ায় এবং বাংলাদেশে। সদস্য আনুমানিক একশো থেকে দেড়শো।

আর মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, লক্ষ্য ছিল নিজ দেশের সরকার উৎখাত।

ঘটনাটা বিচ্ছিন্নও না। দুই হাজার ঊনিশে সৌদির দাম্মাম থেকে জঙ্গি-সন্দেহে ফেরত এসেছিল চৌদ্দজন, দুই হাজার বাইশে সিঙ্গাপুর থেকে ছাব্বিশজন। এখন মালয়েশিয়া।

হিসাবটা দেখুন, একটা মানুষ লাখ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছে, চাকরি জোটেনি বা জুটলেও বেতন প্রতিশ্রুতির অর্ধেক, দেশে সুদ বাড়ছে, দূতাবাস ফোন ধরে না, রাষ্ট্র তাকে মনে রাখে শুধু টাকা পাঠানোর দিনে।

সেই মানুষটার কাছে কেউ একজন যায়। তার ভাষায় কথা বলে, তার রাগের একটা ব্যাখ্যা দেয়, একটা পতাকা দেখায়, আর বলে, তোমার এই দুর্দশার জন্য দায়ী ব্যবস্থাটাই, চলো ব্যবস্থাটাই পাল্টাই। বছরে পাঁচশো রিঙ্গিত চাঁদা। মাসে বিয়াল্লিশ রিঙ্গিতের কমে একটা পরিচয়, একটা ভ্রাতৃত্ব, একটা ব্যাখ্যা।

নব্বইয়ে পতাকার টাকা আসত বিদেশি দাতব্যের নামে, হুন্ডিতে। আজ যায় ই-ওয়ালেটে। মাধ্যম ডিজিটাল হলেও মডেল ডিজিটাল হয়নি। মডেল আজও একটাই, রাষ্ট্র যেখানে অনুপস্থিত, পতাকা সেখানে উপস্থিত।

➖

চৌত্রিশ বছরের খতিয়ানটা তাহলে এক জায়গায় মেলানো যাক। কারণ এটা কোনো একটা সরকারের ব্যর্থতার গল্প না, এটা একটা কাঠামোর গল্প, যার প্রতিটা স্তর আলাদা, অথচ প্রতিটা স্তর অন্যটার উপর দাঁড়িয়ে।

সবচেয়ে নিচে বৈশ্বিক স্তর, স্নায়ুযুদ্ধের প্রয়োজনে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ-রিয়াদ মিলে যে জিহাদি অবকাঠামো বানিয়েছিল, তার বর্জ্য আজও আমরা বইছি। পরাশক্তির যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু যে দানব তারা লালন করে, সে থেকে যায়।

তার উপরে মতাদর্শের স্তর। মওদুদি থেকে কুতুব, ধর্মকে রাষ্ট্রে আর রাষ্ট্রচিন্তাকে সহিংসতায় রূপান্তরের সেই বৌদ্ধিক জমি, যা রাষ্ট্রের জন্মের আগে থেকেই তৈরি ছিল।

তার উপরে দেশীয় রাজনীতির স্তর। প্রতিটা সরকার, ব্যতিক্রম ছাড়া, পতাকাটাকে নিজের কাজে ভাড়া করেছে। কেউ মাঠের কাজে, কেউ গল্পের কাজে, কেউ নীরবতার কাজে।

আর সবার উপরে, সবচেয়ে সাম্প্রতিক স্তরটা শূন্যতার, যে রাষ্ট্র তার তরুণকে কাজ দেয় না, মর্যাদা দেয় না, ভবিষ্যৎ দেয় না, সে নিজের হাতেই সেই ফাঁকা জায়গাটা বানায়, যেখানে পতাকাটা ঢুকে পড়ে একটা পরিচয়, একটা ভ্রাতৃত্ব, একটা ব্যাখ্যা হাতে।

এই কাঠামোর সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটা স্তর ভেবেছে পতাকাটা তার হাতিয়ার। সিআইএ ভেবেছিল সোভিয়েতের বিরুদ্ধে হাতিয়ার। এক আমল ভেবেছিল সর্বহারার বিরুদ্ধে হাতিয়ার। আরেক আমল ভেবেছিল বিদেশি সমর্থন কেনার হাতিয়ার।

আর পতাকা প্রতিবার প্রমাণ করেছে, হাতিয়ার আসলে তারাই ছিল, পতাকার।

চৌত্রিশ বছর ধরে এই দেশে সবচেয়ে নিশ্চিত চাকরিটা করছে ওই এক টুকরো কালো কাপড়। প্রতি আমলে নতুন নিয়োগকর্তা।

আর বেতনটা প্রতিবার শোধ করেছে সেই মানুষগুলো, যারা কোনো আমলেই নিয়োগকর্তা ছিল না, রমনার বটমূলের শ্রোতারা, ঝালকাঠির দুই বিচারক, গুলশানের অতিথিরা, কুয়ালালামপুরের ডরমিটরির শ্রমিক।

পতাকা ওড়ে না। পতাকাকে ওড়ানো হয়।

ফলে প্রশ্নটা এমন ছিল না, পতাকায় কী লেখা। প্রশ্নটা সবসময় ছিল, দড়িটা কার হাতে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন