“আমরা একটা ধর্মযুদ্ধের মধ্যে আছি। আমি ইসরায়েলের পক্ষে। নিজেকে বাঁচাতে যা করতে হয় করো। জায়গাটা গুঁড়িয়ে দাও।”
এটা বলেছিলেন লিন্ডসি গ্রাহাম, ২০২৩ সালের অক্টোবরে, ফক্স নিউজে, গাজা নিয়ে। তখন গাজায় নিহতের সংখ্যা হাজার ছুঁইছুঁই, শিশু মৃত্যুর হিসাব সবে শুরু হচ্ছে।
একই মানুষ এনবিসিতে হিরোশিমা-নাগাসাকির উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, ইসরায়েলকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য যত বোমা দরকার তত দেওয়া উচিত।
গাজায় মানবিক সাহায্য নিয়ে যাওয়া জাহাজে গ্রেটা থুনবার্গ আছেন শুনে লিখেছিলেন, “আশা করি গ্রেটা আর তার বন্ধুরা সাঁতার জানে!”
ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে বলেছিলেন, “গাজার মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী, যাদের জন্ম থেকেই শেখানো হয় ইহুদিদের ঘৃণা করতে।”
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় বলেছিলেন, “আমেরিকা যদি ইসরায়েলের সাপোর্ট বন্ধ করে, ঈশ্বর আমেরিকার সাপোর্ট বন্ধ করবেন।”
২০২৬ সালের মার্চে, ইরান-যুদ্ধ চলাকালীন, ফক্স নিউজে তিনি বলেন, “এই শাসনব্যবস্থা উৎখাত হলে আমরা একটা নতুন মধ্যপ্রাচ্য পাব, আর প্রচুর টাকা কামাব।”
➖
এই লিন্ডসি গ্রাহাম শনিবার রাতে মারা গেছেন। একাত্তর বছর বয়সে, ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলের বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। শুক্রবার তিনি কিয়েভে ছিলেন জেলেনস্কির সঙ্গে, দশমবারের মতো।
রোববার সকালে এনবিসির “মিট দ্য প্রেস”-এ হাজির হওয়ার কথা ছিল। সেই অনুষ্ঠানে তার বদলে এসেছেন ট্রাম্প আর নেতানিয়াহু, তার স্মৃতিচারণ করতে।
তার মৃত্যুতে কারা শোক করছেন, সেটাই বলে দেয় তিনি ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, “ইসরায়েল তার সবচেয়ে বড় বন্ধুদের একজন হারাল। আমি হারালাম একজন প্রিয় বন্ধু।”
সিএনএনে নেতানিয়াহু যোগ করেন, “ইসরায়েলে শোক, ইরানে উৎসব, কারণ লিন্ডসি কখনো ভালো আর মন্দকে গুলিয়ে ফেলেননি।”
জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির, যিনি নিজে একজন দণ্ডিত উগ্রপন্থী, বলেন গ্রাহাম ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন “কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এটাই সঠিক।”
ট্রাম্প লেখেন, “আমার পরিচিত সবচেয়ে মহান মানুষ আর সিনেটরদের একজন মারা গেছেন!”
➖
এই শোকযাত্রার তালিকাটাই আসলে একটা অভিযোগনামা।
যাদের “সবচেয়ে বড় বন্ধু” ছিলেন গ্রাহাম, সেই ইসরায়েল গাজায় যা করেছে তাকে আন্তর্জাতিক আদালত গণহত্যার সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছে।
গ্রাহাম সেই গণহত্যার সবচেয়ে সোচ্চার মার্কিন সমর্থকদের একজন ছিলেন, শুধু নীরব সমর্থক না, সক্রিয় উসকানিদাতা।
তিনি নেতানিয়াহুকে “কোচিং” দিতেন কীভাবে ট্রাম্পকে যুদ্ধে টানতে হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ইসরায়েলে গিয়ে মোসাদের সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান করতেন।
সেই তথ্য নিয়ে নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেন, একটা বিদেশি রাষ্ট্রের নেতা সিচুয়েশন রুমে ঢোকার নজিরবিহীন ঘটনা, আর তারপরই আসে ইরান-হামলার সিদ্ধান্ত।
গলফ কোর্সে ট্রাম্পকে ইরান-যুদ্ধে রাজি করিয়েছিলেন বলে তিনি নিজেই প্রকাশ্যে দাবি করতেন।
তাহলে তার মৃত্যুতে মানুষ কেন খুশি, এই প্রশ্নটা আসলে ভুলভাবে সাজানো।
প্রশ্নটা বরং এভাবে হওয়া উচিত, এমন একজন মানুষের মৃত্যুতে শোক না পাওয়াটাই কি স্বাভাবিক না, যিনি একটা পুরো জনগোষ্ঠীকে “গুঁড়িয়ে দেওয়ার” ডাক দিয়েছিলেন, যিনি পারমাণবিক বোমা ফেলার ইতিহাসকে ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যিনি মানবিক সাহায্যের জাহাজে থাকা মানুষদের ডুবে মরার কামনা করেছিলেন?
➖
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক সরাসরি সম্প্রচারে বলেছেন, “ইরানের মহান জাতিকে অভিনন্দন, যুদ্ধবাজ ও ইরানবিরোধী মার্কিন সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম জাহান্নামে গেছেন।”
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্দি লিখেছেন, “দুঃখের বিষয়, আমি চেয়েছিলাম সোমবারের তেলের দাম দেখে তারপর জাহান্নামে যাক।”
মাত্র কদিন আগে, খামেনির শেষকৃত্যের শোভাযাত্রায়, গ্রাহামের ছবি বহন করা হচ্ছিল ভবিষ্যৎ লক্ষ্যবস্তুদের তালিকায়। মৃত্যুর পর সেই ছবিতে লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে আপডেট করা হয়েছে, পাশে লেখা, “আমরা আপডেট করতে থাকব।”
রাজনৈতিক শুদ্ধতার বিচারে মৃত মানুষ নিয়ে উদযাপন অশোভন, এটা মানি।
কিন্তু রাজনৈতিক শুদ্ধতা একটা বিলাসিতা, যা তারাই বহন করতে পারে যাদের ঘরের ওপর বোমা পড়ে না।
গাজায় যে মা তার চার সন্তানকে ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়েছেন, তার কাছে গ্রাহামের মৃত্যুতে শোক না পাওয়াটা অশোভন কিছু না, এটা নিছকই একটা ন্যূনতম মানবিক প্রতিক্রিয়া।
➖
গ্রাহামকে বোঝার জন্য অবশ্য তার রাজনৈতিক রূপান্তরটাও জানা দরকার, কারণ এই রূপান্তরটাই দেখায় তিনি কোনো গভীর বিশ্বাস থেকে এই অবস্থানে আসেননি, এসেছেন ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার হিসাব থেকে।
২০১৫ সালে তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন “বর্ণবাদ-উসকানিদাতা, বিদেশীবিদ্বেষী, ধর্মীয় গোঁড়া।” দুই বছরের মধ্যে তিনি ট্রাম্পের গলফ-সঙ্গী, পররাষ্ট্রনীতির কানপরামর্শদাতা, সিনেটে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভোট।
সাবেক রিপাবলিকান কৌশলবিদ স্টিভ শ্মিটের ভাষায়, গ্রাহাম ছিলেন “একজন সরল, বিয়োগান্তক মানুষ, যার নৈতিক কোনো কেন্দ্র ছিল না, জীবনের বিশাল শূন্যতা তিনি ভরে ফেলেছিলেন ‘ প্রাসঙ্গিক থাকার অদম্য তৃষ্ণা দিয়ে।”
এই তৃষ্ণাই তাকে ঠেলে দিয়েছিল ইসরায়েল লবির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বরে পরিণত হতে। তিনি ইসরায়েলে যেতেন, মোসাদের সঙ্গে বসতেন, ফিরে এসে সেই তথ্য ব্যবহার করতেন ট্রাম্পকে প্রভাবিত করতে।
নিজের ভাষায়, “তারা আমাকে এমন জিনিস বলে যা আমাদের নিজের সরকারও বলে না।”
একজন মার্কিন সিনেটর যিনি নিজের দেশের গোয়েন্দা সংস্থার বদলে একটা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন, আর সেই তথ্য দিয়ে নিজের প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন।
এই ঘটনাটা নিজেই একটা প্রশ্ন যা মার্কিন গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।