সুদানে দুই বছরের বেশি সময় ধরে লড়াই চলছে দেশের নিয়মিত সেনাবাহিনী (এসএএফ) আর একটা আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে।
যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ ছিল, এই দুই বাহিনীর একীভূত করা নিয়ে বিরোধ। আরএসএফ-কে নিয়মিত সেনাবাহিনীর অধীনে মিশিয়ে ফেলার কথা ছিল।
কিন্তু তাতে আরএসএফ প্রধান হেমেদতি নিজের কমান্ড, সোনার খনি, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ হারাতেন।
ফলে ২০২৩ সালে মিলে যাওয়ার বদলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
কিন্তু এই যুদ্ধ দুই বছর ধরে টিকে আছে মূলত বাইরের মদদে। তিনটা বিদেশি শক্তির আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে।
➖
প্রথমত, আরব আমিরাত বারবার অস্বীকার করলেও জাতিসংঘের নিজস্ব প্যানেল অব এক্সপার্টস, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদন, আর অসংখ্য সাংবাদিকতা তদন্ত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। আমিরাত অস্ত্র, অর্থ, আর রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে আরএসএফ-কে টিকিয়ে রেখেছে।
বিনিময়ে তারা পাচ্ছে দারফুরের সোনা, কৃষিজমি, আর লোহিত সাগরের বন্দরে প্রবেশাধিকার। আমিরাতের সোনার বিরাট চালান আসে সুদান থেকে।
জাতিসংঘের তদন্ত দল সরাসরি বলেছে, যেসব রাষ্ট্র জেনেশুনে গণহত্যার ঝুঁকি সত্ত্বেও অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যায়, তারা গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে দায়বদ্ধ হতে পারে।
➖
আমিরাতের বিপরীতে তুরস্ক দাঁড়িয়েছে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশে, প্রায় ১২ কোটি ডলার মূল্যের বায়রাক্তার ড্রোন আর অস্ত্র সরবরাহ করে, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে।
এই অস্ত্র বিক্রি করেছে তুর্কি কোম্পানি বায়কার, যার সহ-মালিক এরদোয়ানের জামাতা। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই অস্ত্র মালি আর ইরিত্রিয়ার মতো তৃতীয় দেশ হয়ে সুদানে পৌঁছেছে বলে একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে।
তুর্কি প্রশিক্ষকরাও সরাসরি মাঠে ছিলেন সেনাবাহিনীকে ড্রোন চালানো শেখাতে। এই ড্রোনের প্রভাব সামরিকভাবে বিশাল, খার্তুম পুনর্দখলে সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছে এগুলোই।
কিন্তু মানবিক মূল্যও বিশাল, জাতিসংঘের হিসাবে ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই সুদানে বেসামরিক মৃত্যুর ৮০ শতাংশের বেশি ঘটেছে ড্রোন হামলায়।
ন্যাটোর সদস্য একটা দেশ হয়েও তুরস্ক এভাবে অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়াটা আন্তর্জাতিক অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর জন্যই একটা বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
➖
এছাড়া, রাশিয়ার ভাড়াটে বাহিনী ভাগনার গ্রুপ (এখন সরকারি নাম আফ্রিকা কর্পস) সুদানে বরাবরই একটা জটিল ভূমিকা রেখেছে।
শুরুর দিকে তারা আরএসএফ-কে সহায়তা দিয়েছিল সোনার খনির বিনিময়ে, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র হয়ে অস্ত্র সরবরাহের একটা পুরনো নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
রাশিয়ার সামরিক পণ্যবাহী উড়োজাহাজ ইস্তাম্বুল থেকে পোর্ট সুদান পর্যন্ত ওড়ার তথ্যও পাওয়া গেছে, যা দেখায় এই সরবরাহ-নেটওয়ার্কগুলো কতটা জড়াজড়ি করা।
ভাগনারের আগ্রহ আদর্শিক না, নিছক লেনদেনভিত্তিক, যে পক্ষ সম্পদ দেবে তার পাশেই তারা দাঁড়ায়, এই নীতি নিয়েই তারা আফ্রিকাজুড়ে কাজ করে।
➖
এই তিনটা শক্তিরই যুক্তি প্রায় একই ছাঁচের, আমরা শুধু স্থিতিশীলতা চাই, আমরা মধ্যস্থতা করতে চাই। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটা পক্ষই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, একদিকে অস্ত্র দিয়ে, আরেকদিকে সেই অস্ত্র থেকে মুনাফা তুলে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একাধিকবার সর্বসম্মতভাবে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে, কিন্তু কার্যকর করার কোনো প্রকৃত ব্যবস্থা নেই।
ফলাফল, একটা যুদ্ধ যেখানে সুদানের ভেতরের দুই পক্ষের চেয়ে বাইরের শক্তিগুলোর স্বার্থই বেশি নির্ধারক হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি, জাতিসংঘের একটা স্বাধীন তদন্ত দল ৩৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে বলছে, অক্টোবরে দারফুরের এল-ফাশের দখলের সময় আরএসএফ যা করেছে তা গণহত্যা।
জাতিগত ভিত্তিতে হত্যা, গণধর্ষণ, এমনকি জোরপূর্বক গর্ভধারণ করানোকেও তারা বিবেচনা করছে গণহত্যার একটা রূপ হিসেবে।
➖
সুদান কার্যত দুই ভাগ। সেনাবাহিনীর সরকার পোর্ট সুদানে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আরএসএফ-এর সমান্তরাল সরকার নিয়ালায়, স্বীকৃতি নেই বললেই চলে। দুই পক্ষেরই আলাদা মুদ্রা, আলাদা কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতি প্রথম বছরেই সংকুচিত হয়েছে প্রায় ত্রিশ শতাংশ। সাধারণ মানুষ টিকে আছে মূলত আন্তর্জাতিক ত্রাণ আর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর ভর করে।
দুই কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট বলছে জাতিসংঘ নিজেই। অথচ আমিরাত, তুরস্ক, রাশিয়া, প্রতিটা শক্তিই সম্পদ আর প্রভাবের হিসাব কষছে।
মূল্য দিচ্ছে সাধারণ সুদানি মানুষ।