নভেম্বর দুই হাজার পঁচিশ, বেলেম, ব্রাজিল। আমাজনের কিনারে বসেছে জলবায়ু সম্মেলন, কপ-থার্টি।
এক হলঘরে জার্মান গবেষণা সংস্থা জার্মানওয়াচ তাদের বার্ষিক ঝুঁকি-সূচক প্রকাশ করছে, সেই রিপোর্টে বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে প্রশংসা রাখা হয়েছে। চল্লিশ বছরে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু একশো গুণেরও বেশি কমিয়ে এনেছে বাংলাদেশ, তাকে বাহবা না দিয়ে উপায় কী।
কথাটা সত্য, এবং এই লেখার কোথাও এই সত্যকে ছোট করা হবে না।
কিন্তু ওই একই সম্মেলনের আরেক হলঘরে আরেকটা হিসাব দেখা যাচ্ছিলো। জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ত্রিশ বছরের দরকষাকষির পর যে তহবিল দাঁড় করানো হয়েছে, লস অ্যান্ড ড্যামেজ, গরিব দেশগুলোর প্রতি হাজার টাকার ক্ষতির বিপরীতে সেখানে জমা পড়েছে এক টাকারও কম।
দরকার বছরে চল্লিশ হাজার কোটি ডলার, সেখানে সিন্দুকে আছে পঁয়তাল্লিশ কোটির মতো।
এক ছাদের নিচে দুইটা ঘর, এক ঘরে মেডেল আর আরেক ঘরে খালি সিন্দুক। মাঝখানে তিরিশ সেকেন্ডের এক করিডোর। ওই তিরিশ সেকেন্ডেই দুনিয়ার আসল কারবার। যেটা এই লেখার বিষয়।
➖
হালের এক বড় ঘূর্ণিঝড়ে উপকূল থেকে বিশ লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, মারা গিয়েছিলেন বিশ জনেরও কম। বিশ লাখ সরলো, বিশ জন মারা গেলো।
তার আঠারো বছর আগে, দুই হাজার নয়ের আইলায়, মৃত্যুর সংখ্যা তিনশো ঊনচল্লিশ। তার দুই বছর আগে সিডরে সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি। শুনলে গা শিউরে ওঠে, কিন্তু এই হিসাবের খাতায় সিডর ছোট অঙ্ক।
কারণ উনিশশো একানব্বইয়ে, গোর্কির রাতে, মারা গিয়েছিলেন এক লাখ আটত্রিশ হাজার মানুষ। শুধু কুতুবদিয়া দ্বীপেই বিশ হাজার, ঝড়ের পর হেলিকপ্টার থেকে দ্বীপে প্রাণের কোনো চিহ্ন দেখা যায় নাই।
উনিশশো সত্তরের ভোলায় সরকারি খাতায় এক লাখ ছিয়াশি হাজার, গবেষকদের হিসাবে সেটা তিন লাখের বেশি, কারো হিসাবে পাঁচ লাখ। মানবজাতির ইতিহাসে ঘূর্ণিঝড়ে এত মানুষ আর কোনোদিন মরে নাই।
এবং তারা মরেছিলেন ঝড়ের শক্তিতে না, একই শক্তির ঝড় পরেও এসেছে, লাখে মৃত্যু আর হয় নাই। তারা মরেছিলেন কারণ কোনো সতর্কবার্তা পৌঁছায় নাই, আর আশ্রয় নেওয়ার মতো একটা পাকা দালান ছিল না।
সেই সত্তর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ বানিয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র, দাঁড় করিয়েছে হাতে-মাইক-নিয়ে-গ্রামে-দৌড়ানো হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবকের বাহিনী, রেডিওর সংকেত থেকে মোবাইলের খুদেবার্তা পর্যন্ত টেনেছে সতর্কতার তার।
সাতানব্বই সালের এক ঘূর্ণিঝড়ের পর সেন্ট মার্টিনের এক কর্মকর্তা ব্ল্যাকবোর্ডে ক্ষতির তালিকা লিখেছিলেন, দুই হাজার দুইশো নারকেল গাছ, আড়াইশো ঘর, বাহান্নটা মাছধরা নৌকা, আর মৃত্যুর ঘরে লিখেছিলেন ‘শূন্য’।
তিন লাখ থেকে শূন্যের দিকে এই যাত্রা কোনো দাতা সংস্থার নথিতে জন্মায় নাই। এটা বানিয়েছে এই দেশের মানুষ, এবং বিলটাও মিটিয়েছে মূলত নিজেরাই।
জলবায়ু খাতে বাংলাদেশ আজকে প্রতি একশো টাকা খরচ করলে আশি টাকার বেশি যায় নিজের পকেট থেকে, বিদেশি সাহায্য বিশ টাকাও ছোঁয় না।
বিষয়টা এমন, যার বাড়িতে আগুন লেগেছে, দমকলের বিলটাও সে-ই দিচ্ছে। আর যে আগুন লাগালো, সে দূর থেকে হাততালি দিচ্ছে, কী চমৎকার নেভান আপনারা!
➖
এই হাততালির একটা আন্তর্জাতিক শব্দভাণ্ডার আছে, সেই ভাণ্ডারে বাংলাদেশের স্থায়ী আসনের নাম “রেজিলিয়েন্সের বিস্ময়”, বা “অভিযোজনের পরাশক্তি”।
বরিশালের ভাসমান সবজি-বাগান নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ফিল্ম হয়, জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থা সেই বাগানকে বৈশ্বিক কৃষি-ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়, বিদেশি গবেষক ঘুরে গিয়ে লেখেন, এই মানুষগুলোর কাছে গোটা মানবজাতির শেখার আছে।
মিথ্যা না একটাও। ভাসমান বাগান সত্যিই বুদ্ধিমান কৌশল, আশ্রয়কেন্দ্র সত্যিই জীবন বাঁচায়, শেখার সত্যিই আছে।
কিন্তু গোলমাল বাধে প্রশংসার ব্যাকরণে।
প্রতিটা বাক্যের কর্তা ভুক্তভোগী আর তার দক্ষতা, দায়ী পক্ষ কোনো বাক্যে ঢোকেই না। “ওরা মানিয়ে নিতে জানে”, এই কথা যত জোরে বলা যায়, “আমরা নিঃসরণ কমাই নাই” ততই আস্তে বলা হয়। সহ্যক্ষমতার গল্প যত মহাকাব্যিক হয়, ক্ষতিপূরণের হিসাব তত পাদটীকায় নেমে যায়।
‘রেজিলিয়েন্স’ তাই শুধু গুণ না, লেনদেনও। এমন একটা সনদ, যেটা ভুক্তভোগীর হাতে ধরিয়ে দিলে চেক লেখার দায় মাফ হয়ে যায়।
লেনদেনের অঙ্কগুলো নিজেরাই কথা বলে। এই বদলে যাওয়া আবহাওয়া যেই গ্যাসের কারসাজি, দুনিয়ার মানুষ গড়ে মাথাপিছু তার পৌনে পাঁচ টন ছাড়ে বছরে, বাংলাদেশের মানুষ ছাড়ে দেড় টনেরও কম।
অথচ পুড়ছে সে। জলবায়ুর ধাক্কায় বাংলাদেশের বছরে ক্ষতি, খোদ বিশ্বব্যাংকের হিসাবেই, প্রায় তিনশো কোটি ডলার। দেশি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে সেটা আরও বেশি।
অন্যদেকে ক্ষতিপূরণের তহবিল? মেসি-রোনালদোসহ দুনিয়ার সেরা দশ ফুটবলার এক বছরে যা রোজগার করেছিলেন, সমস্ত মানবজাতি মিলে তহবিলে জমা করেছে তার অর্ধেকেরও কম।
আমেরিকা একাই নিজের তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে বছরে যে ভর্তুকি দেয়, ক্ষতিপূরণের তহবিলে ঢেলেছে তার হাজার ভাগের এক ভাগ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, তেল-গ্যাস-কয়লা সস্তা রাখতে দুনিয়া ভর্তুকি দেয় প্রতি মিনিটে এক কোটি ডলারের বেশি। সেই ঘড়ি ধরলে, ক্ষতিপূরণের তহবিলে ত্রিশ বছরে যা জমেছে, তা ভর্তুকির মাত্র চল্লিশ মিনিটের সমান।
➖
টাকা যে একেবারে আসে না, তা না। কীভাবে আসে, সেই গল্পটা সম্ভবত আরও শিক্ষণীয়।
উনিশ বছর আগে, কোপেনহেগেনের সম্মেলনে, ধনী দেশগুলো কথা দিয়েছিল, দুই হাজার বিশ সাল থেকে গরিব দেশগুলোকে জলবায়ুর জন্য বছরে দশ হাজার কোটি ডলার দেওয়া হবে।
প্রতিশ্রুতিটা পুরো হলো দুই হাজার বাইশে এসে, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর পর। দেরিটুকু তবু মাফ করা যেত, যদি খামের ভেতরের অবস্থা ঠিক থাকত। খাম খুলে দেখা গেলো, যা এসেছে তার প্রতি দশ টাকার প্রায় সাত টাকাই দান না, ঋণ। সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
এবং সেই ঋণের বড় অংশ বাজারদরের সুদে, ব্যাংকের সাধারণ খদ্দের যে দরে পায়, সেই দরে।
দমকলের উপমাটায় ফিরলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম, প্রতিবেশী আগুন লাগালো, আপনি নিজের টাকায় সেই আগুন নেভালেন, প্রতিবেশী এসে সাহায্যের হাত বাড়ালো, এবং মাস শেষে দেখলেন সেই সাহায্যের ইনভয়েস এসে হাজির, সুদসহ।
যে দেশগুলো এমনিতেই দেনার ভারে নুয়ে আছে, জলবায়ুর ‘সাহায্য’ তাদের খাতায় জমা হচ্ছে নতুন দেনা হিসেবে। ক্ষতিপূরণ শব্দটার এর চেয়ে নিষ্ঠুর অনুবাদ আর হয় না।
➖
যাদের জন্য এত আয়োজন, সেই উপকূলের মানুষের ঘরে রেজিলিয়েন্সের শেষ চেহারাটা গিয়ে দাঁড়ায় এক টুকরা কাগজে, বাসের টিকিট।
আশ্রয়কেন্দ্র ঝড়ের রাতটা বাঁচায়, কিন্তু পরের সকালে খেতের ভেতর ঢুকে পড়া লবণপানি তাতে সরে যায় না। ধান হয় না, পুকুরের মাছ মরে, টিউবওয়েলের পানি নোনতা হতে হতে একদিন গোটা গ্রামের জীবিকাটাই অচল হয়ে পড়ে।
তখন মানুষ যেটা করে, দাতাদের ভাষায় তারও এক মোলায়েম নাম আছে, অভিযোজন। বাস্তবের নাম, গাবুরার কৃষক কোন ইটভাটায় পনেরো ঘণ্টার শিফট দিচ্ছেন, ষোলোজনের সঙ্গে এক ছাপরায় শুয়ে।
স্রোতটা কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা না, চলমান বর্তমান। গত এক দশকে দুর্যোগের ধাক্কায় দেশের ভেতরে মানুষের ঘরছাড়া হওয়ার ঘটনা দেড় কোটি বারের কাছাকাছি।
ঢাকায় প্রতি বছর ঢোকে চার লাখ পর্যন্ত নতুন মানুষ। অন্য এক হিসাব বলছে শহরের বস্তিতে যারা থাকেন তাদের প্রতি দুইজনের একজন এসেছেন নদীভাঙন আর বন্যার তাড়া খেয়ে।
সামনে যা আসছে তা আরও ভারী, বিশ্বব্যাংকের অনুমান, দুই হাজার পঞ্চাশ সালের মধ্যে শুধু জলবায়ুর ধাক্কাতেই ঘর ছাড়তে পারেন এক কোটি তেত্রিশ লাখ মানুষ, কোনো কোনো হিসাবে প্রায় দুই কোটি।
ভাসমান বাগানের ছবি দিয়ে যেই গল্পটা শুরু হয়, ইটভাটার ছাপরায় সেই গল্পের যেই অধ্যায়টা শেষ হয়, সনদে ওই অধ্যায়টার উল্লেখ থাকে না।
➖
সততার খাতিরে উল্টো পক্ষের সাক্ষীদেরও ডাকা দরকার।
প্রথম সাক্ষী বলবেন, টাকা একেবারে আসে নাই তা তো না। আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে, সতর্কব্যবস্থা দাঁড় করাতে দাতাদের অর্থ আর কারিগরি হাত লেগেছে, ইতিহাস থেকে সেটা মোছা যাবে না।
দ্বিতীয় সাক্ষী বলবেন, প্রশংসা কূটনীতিতে কাজেও লাগে, “অভিযোজনের চ্যাম্পিয়ন” তকমা দরকষাকষির টেবিলে বাংলাদেশের গলার জোর বাড়ায়, আর বাংলাদেশ নিজেও তকমাটা যত্ন করে পালে।
কারণ ভিক্ষুকের চেয়ে চ্যাম্পিয়নের কথা লোকে বেশি শোনে।
তৃতীয় সাক্ষী আঙুল তুলবেন ঘরের দিকেই, জলবায়ুর নামে বরাদ্দ টাকার কতটা ঠিক জায়গায় পৌঁছায়, আশ্রয়কেন্দ্রের দরপত্রে কার পকেট ভরে, সে নিরীক্ষা এই লেখার বিষয় না হলেও অস্বীকারের উপায় নাই।
তিন সাক্ষীর প্রত্যেকের কথায় সত্য আছে, কিন্তু কারো কথাতেই সেই একটা প্রশ্নের জবাব নাই, ক্ষতিটা যে করলো, সে দেবে কী?
ডাক্তার রোগীকে বলতেই পারে, আপনার সহ্যশক্তি অসাধারণ, কথাটায় কোনো দোষ নাই। দোষ শুরু হয় তখন, যখন রোগ ছড়ানো লোকটা চিকিৎসার বিল না মিটিয়ে রোগীর হাতে সহ্যশক্তির সনদ ধরিয়ে বাড়ি রওনা দেয়।
আমাদের গল্পে লোকটা তা-ও করে নাই। যাওয়ার আগে সে প্রস্তাব রেখে গেছে, চিকিৎসার টাকাটা চাইলে আমার কাছ থেকে ধার নিতে পারেন, সুদ লাগবে।
বেলেমের সেই করিডোরে একটা শব্দই পুরো কারবার সামলায়। ঢোকার মুখে শুনবেন, বাংলাদেশ পারে। বের হওয়ার মুখে টের পাবেন, পারে বলেই দিতে হবে না।
তিন লাখকে বিশে নামিয়ে এনেছি আমরা, সেন্ট মার্টিনের ব্ল্যাকবোর্ডে শূন্য লিখিয়েছি আমরা। ফলে মেডেলটা আমাদেরই, ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
কিন্তু মেডেল দেখিয়ে যারা চেকবই পকেটে ভরে ফেলে, তাদের জন্য বাংলায় একটা পুরনো শব্দ বহুদিন ধরে খালি পড়ে আছে। প্রশংসা তারা যত খুশি করুক, শব্দটা তাদের প্রাপ্য, ‘দেনাদার’।