প্রতিদিন তেরোটা কফিন নামে ঢাকার এয়ারপোর্ট, কার্গো গেট দিয়ে

ঢাকার এয়ারপোর্টে একটা গেট আছে, যেখানে ফুল দিয়ে কাউকে বরণ করা হয় না। কার্গো গেট। মালামাল নামে যেই গেট দিয়ে।

ওই গেট দিয়ে গত বছর নেমেছে চার হাজার আটশো তেরোটা কফিন। ভাগ করলে দাঁড়ায়, প্রতিদিন গড়ে তেরোটা। প্রতিদিন, ছুটির দিনেও।

অপেক্ষমাণ পরিবারগুলির জন্য ওইখানে বসার জায়গা নাই। টয়লেট নাই। তারা দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর কফিন খুলে মুখটা দেখে।

তিরিশ বছর ধরে এই গেট দিয়ে ঢুকেছে সাতান্ন হাজারের বেশি লাশ। সংখ্যাটা কল্পনা করা সম্ভবত কঠিন। বরং আপনি ভাবেন, একটা আস্ত উপজেলা শহরের সব মানুষ, কফিনে।

➖

হাবিব খালাসির কফিনটা নেমেছিল এই গেট দিয়েই।

ফরিদপুরের ভাঙ্গার মানুষ, তেত্রিশ বছর, এক সন্তানের বাবা।

২০১৯-এ সৌদি গিয়েছিলেন ভাগ্য ফেরাতে। রিয়াদের বাইরে মরুভূমিতে, একটা পুরানো উটের ছাউনি ভাঙার কাজ করতে গিয়ে মাথায় লোহার টুকরা পড়ে শেষ।

তার ছোট ভাই ফোনে সাংবাদিককে বলেছিলেন, ভাই যখন টাকা পাঠানো শুরু করলো, ভাবছিলাম কষ্টের দিন শেষ।

কষ্টের দিন শেষ হওয়ার হিসাবটা এখানে একটু খুলে বলা দরকার। বিদেশ যেতে একজন বাংলাদেশির গড় খরচ প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ টাকা। আর গিয়ে সে মাসে কামায় গড়ে বিয়াল্লিশ হাজার টাকা।

মানে একজন সৌদিগামী শ্রমিকের শুধু যাওয়ার খরচ তুলতেই লাগে প্রায় দুই বছর।

প্রথম দুই বছর মানুষটা আসলে নিজের জন্য খাটে না। পরিবারের জন্যও খাটে না। খাটে দালালের ঋণ শোধ করতে।

আয়ের তুলনায় বিদেশ যাওয়ার খরচে বাংলাদেশ পৃথিবীতে এক নম্বর।

হাবিব খালাসিদের মৃত্যুর পর কী হয়? যেই দেশে মৃত্যু হয়েছে সেই দেশ একটা সার্টিফিকেট লিখে দেয়, স্ট্রোক, নয়তো হার্ট অ্যাটাক।

বাংলাদেশ সেই কাগজ মেনে নেয়। যাচাই করে না, প্রশ্ন করে না। অথচ এই মানুষগুলিই যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক মেডিকেলে ‘সম্পূর্ণ সুস্থ’ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল।

সুস্থ শরীরে গেলো, তিরিশ-চল্লিশ বছর বয়সে ‘হার্ট অ্যাটাকে’ ফিরলো। তিরিশ বছরে সাতান্ন হাজার বার। কোনো জাতীয় তদন্ত নাই।

কুমিল্লার এক মারা যাওয়া শ্রমিক কাজী সালাউদ্দিনের স্ত্রী ইয়াসমিন বেগম এখনো অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানেন, তার স্বামীর হার্টের কোনো অসুখ ছিল না।

কিন্তু সার্টিফিকেটে লেখা হার্ট অ্যাটাক। এর ব্যাখ্যা আজও তিনি পান নাই।

➖

এইবার আমলে নেওয়া যাক যারা জীবিত আছে, তাদের হিসাব।

শফিকুল ইসলামের গল্পটা ব্লুমবার্গ ছেপেছে এই বছরের জানুয়ারিতে। মাঠে কাজ করা মানুষ, ধারদেনা করে সাড়ে চার হাজার ডলার জোগাড় করলেন, মালয়েশিয়ায় কনস্ট্রাকশনের চাকরির প্রতিশ্রুতিতে।

কুয়ালালামপুরের বাইরে এক ভাঙা দালানের তিনতলায় তাকে নামিয়ে দেওয়া হলো। গাদা করা পুরানা ম্যাট্রেস, মেঝেতে গর্ত-করা দুইটা টয়লেট, গোসলের জন্য একটা হোস।

তাকে বলা হলো, অপেক্ষা করো। তিনি অপেক্ষা করলেন। সেটা একশো সাতচল্লিশ দিন।

তার চাকরি কোনোদিন আসে নাই। নিয়োগকর্তা ফোন ধরা বন্ধ করে দিলো। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলো। আর দেশে, প্রতিদিন, ঋণের সুদ বাড়তে থাকলো।

শফিকুল ইসলাম একা না। ২০২২ থেকে ২০২৪-এ প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি গেছে মালয়েশিয়ায়।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছেন, তাদের বিশাল অংশ প্রতারিত। তারা ভুয়া নিয়োগকর্তা, অস্তিত্বহীন চাকরি, ঋণের দাসত্বে বন্দী।

অন্য এক হিসাবে দেখা গেছে, দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ মালয়েশিয়ায় বসে ছিল সম্পূর্ণ বেকার। ধার করে টিকিট কিনলো, বিদেশে গেলো, তারপর মাসের পর মাস কোনো কাজই নাই।

এত বড় প্রতারণা সম্ভব হলো, কারণ মালয়েশিয়া যাওয়ার পুরো রাস্তাটাই ছিল একটা চক্রের দখলে। এবং চক্রের বাইরে দিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

সরকারের বেঁধে দেওয়া খরচ ছিল ঊনআশি হাজার টাকা। বাস্তবে মানুষ দিয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। প্রায় সাত গুণ।

দেড় হাজার এজেন্সির মধ্যে মাত্র একশোটাকে বাছাই করা হয়েছিল, আর পুরো সিস্টেম চলতো একটা সফটওয়্যারে, সিন্ডিকেটের ফি না দিলে সফটওয়্যারে অর্ডারই আসতো না।

জনপ্রতি দেড় লাখ টাকা, নগদে। না দিলে পাসপোর্ট আটকা।

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধান বলছে, দশ বছরে এই সিন্ডিকেট-ফি বাবদ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে একশো কোটি ডলারের বেশি।

এবং এই চক্রের মাথায় ছিলেন খোদ প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী, যেই মন্ত্রণালয়ের নামের মধ্যেই “কল্যাণ”। তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন চব্বিশ হাজার কোটি টাকার মানবপাচার-মামলায়।

তাছাড়া তদন্তে নাম আছে সাবেক অর্থমন্ত্রীর, সাবেক পুলিশপ্রধানের।

যেই দপ্তরের কাজ শ্রমিককে দালালের হাত থেকে বাঁচানো, সেই দপ্তরের মন্ত্রীই ছিলেন সবচেয়ে বড় দালাল।

গল্পটার সবচেয়ে অপমানজনক মোড় যদিও এটা না। তা হলো, মালয়েশিয়া এরপর বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে।

সেই চিঠি ক্ষমা চেয়ে না। ক্ষতিপূরণ দিয়ে না। চিঠি দিয়েছে এই বলে যে, তদন্তগুলি বন্ধ করেন, কারণ এইসব অভিযোগ “মালয়েশিয়ার সুনাম নষ্ট করে।”

আমাদের শ্রমিক ঠকলো, আমাদের মন্ত্রী খেলো, আর সুনামের চিন্তা তাদের।

➖

যাদের বৈধ পথে এই দশা, তারা তখন কী করে? তারা সাগরে নামে।

গত বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকা মানুষের জাতীয়তার তালিকায় এক নম্বরে সিরিয়া না, সুদান না, আফগানিস্তান না।

বাংলাদেশ।

বিশ হাজারের বেশি মানুষ, মোট আগমনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তালিকার বাকি সবার দেশে যুদ্ধ চলে। আমাদের দেশে যুদ্ধ নাই, তবু সাগরে আমরাই সবচেয়ে বেশি।

পথটাও জানা। ঢাকা থেকে দুবাই বা মিশর হয়ে বিমানে লিবিয়া, এই পর্যন্ত সব বৈধ, টিকিট-ভিসা সব আসল।

লিবিয়ায় নামার পর “কাগজপত্র প্রসেসিংয়ের” জন্য পাসপোর্টটা নিয়ে নেয়। তারপর কাজ করানো হয় বেতন ছাড়া। তারপর একদিন মানুষটা জানতে পারে, তাকে বেচে দেওয়া হয়েছে আরেক দালাল বা মালিকের কাছে।

বেচে দেওয়া হয়েছে, এই বাক্যটা রূপক না। আন্তর্জাতিক গবেষণা-সংস্থার রিপোর্টের ভাষায়, এই বাজারে “অভিবাসী হলো লেনদেনযোগ্য সম্পদ।”

লিবিয়া-পথের তিরানব্বই শতাংশ যাত্রী নির্যাতন, মুক্তিপণ-আদায় বা আটকের শিকার হয়।

সুনামগঞ্জের শাকিল এক বছরের বেশি বেঁচে ছিলেন দিনে এক বেলা খেয়ে, শক্ত বাসি রুটি আর আধা লিটার পানি।

আরিফ নামে আরেক ব্যক্তির গল্পটা ঈদের রাতের, কোরবানির ঈদ, ২০২৪। ত্রিশজনের নৌকায় পঞ্চাশজন তুলে দালালরা ছেড়ে দিলো সাগরে। নব্বই মিনিটের মাথায় নৌকা উল্টালো।

আরিফ প্রথমে ধরলেন একটা তেলের ড্রাম। পরে আরেক বাংলাদেশি তার হাতে তুলে দিলো একটা বাতাস-ভরা বালিশ।

ওই বালিশ ধরে তিনি ভেসে ছিলেন সাত ঘণ্টা। সাঁতরে লিবিয়ার তীরে ফিরলেন। আর তারপর পুরস্কার হিসাবে পেলেন লিবীয় পুলিশের জেল, দুই মাস, আর নিয়মিত নির্যাতন আছেই।

এই রুটটা এখন একটা আস্ত শিল্প। বছরে অন্তত ষোলো-উনিশ কোটি ডলারের ব্যবসা, সামনের হিসাবে পঁচিশ কোটি ছাড়াবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব-চোরাচালান বাজারগুলির একটা।

এবং গবেষণা বলছে সবচেয়ে ভয়ের কথা, বৈধ আর অবৈধ পথের দালাল-নেটওয়ার্ক আসলে আলাদা না। যেই চক্র লাইসেন্স নিয়ে সৌদি পাঠায়, সেই চক্রই ঠেলে দেয় লিবিয়ার নৌকায়। একই হাত, দুই ব্যবসা।

আর যারা সাগর পার হয়ে ইতালি পৌঁছায়?

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি নিজে বলেছেন, তার দেশের ওয়ার্ক ভিসা কেনাবেচা হচ্ছে, একেকটা পনেরো হাজার ইউরো পর্যন্ত দামে, এবং এই তথ্য তাকে দিয়েছে খোদ বাংলাদেশ-কর্তৃপক্ষ।

ওইখানে পৌঁছে বহু বাংলাদেশির ঠাঁই হয় ক্ষেতের পাশের ঝুপড়ি-বস্তিতে।

ইতালির কৃষিতে প্রতি চারজন মজুরের একজন কাজ করে গ্যাংমাস্টার-চক্রের অধীনে। যেই ব্যবস্থাকে ইতালির তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, “এইটা একটা মাফিয়া।”

ঢাকার দালাল থেকে লিবিয়ার মিলিশিয়া হয়ে ইতালির মাফিয়া, পুরো চেইনটা খেয়াল করেন। প্রতিটা হাত বদলে মানুষটার দাম বাড়ে, আর মর্যাদা কমে।

➖

এতগুলি ঘটনার একটা যোগফল আছে। সেই যোগফলটা লেখা আছে পাসপোর্টে। হেনলি পাসপোর্ট-সূচকে বাংলাদেশ এখন একশোতম।

গত বছরের শুধু প্রথম চার মাসে সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি বিদেশের এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত এসেছে, হাতে বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও।

এক দিনে, গত আগস্টে, কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট ফিরিয়ে দিয়েছে দুইশো চারজনকে।

আরব আমিরাত গত অক্টোবরে নয়টা দেশের ভিসা স্থগিত করেছে। তালিকাটা হল, সুদান, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লিবিয়া, লেবানন, ক্যামেরুন, উগান্ডা এবং বাংলাদেশ।

তালিকার প্রায় প্রত্যেকটা দেশে যুদ্ধ চলে, নয়তো রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছে। আমরা ওই তালিকায় ঢুকেছি শান্তিতে থেকেই।

ওমান দরজা বন্ধ করেছে, মালদ্বীপ বন্ধ করেছে, মালয়েশিয়া বন্ধ করেছে। জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় পর্যন্ত ভিসা না পেয়ে সিরিজ মিস করেছেন।

একটা দেশের সাধারণ মানুষের কাগজকে পৃথিবী আর বিশ্বাস করে না, এর চেয়ে বড় জাতীয় অপমান কমই আছে।

এই অপমানটা এনেছে কারা? কাদের বদৌলতে? ভিসা-জালিয়াতি করা শ্রমিক?

নাকি যেই চক্র জাল কাগজ বানিয়ে, ভুয়া চাকরি দেখিয়ে, সাত গুণ টাকা নিয়ে মানুষগুলিকে ওই কাউন্টারে দাঁড় করিয়েছে?

পৃথিবী শাস্তি দিচ্ছে যাত্রীকে। কিন্তু অপরাধ তার নয়।

➖

শেষ হিসাবটা করি, রাষ্ট্রের হিসাব।

এই প্রবাসীরা গত অর্থবছরে দেশে পাঠিয়েছে সাড়ে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাটা মাথায় ঢোকানোর সহজ উপায় হল, বাংলাদেশের পুরো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর চেয়ে ছোট।

প্রবাসীরা এক বছরে যা পাঠায়, রাষ্ট্রের সিন্দুকে মোট যা আছে, তার চেয়ে বেশি।

রাষ্ট্র এতে কৃতজ্ঞ। এতটাই কৃতজ্ঞ যে টাকাটার উপর আড়াই শতাংশ বোনাস দেয়, বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বাজেট।

কিন্তু খেয়াল করেন, বোনাসটা আসলে টাকার উপর। মানুষটার উপর না।

মানুষটার জন্য বরাদ্দ কী তাহলে?

মৃত্যু হলে তদন্ত? হয় না।

বিদেশে দুর্ঘটনার বিমা? আছে, তবে মজার ব্যাপার হলো, সেই বিমার প্রিমিয়ামটা শ্রমিক নিজেই দিয়ে যায়, দেশ ছাড়ার সময় ফির সাথে কেটে রাখা হয়।

মানে নিজের ক্ষতিপূরণের টাকাটাও সে নিজেই জমা দিয়ে যায়। বিদেশি মালিকের গায়ে আঁচড়ও লাগে না।

আর দূতাবাসের সহায়তা? বৈরুতে যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়া রিপন বেপারীর ভাষায়, “রেমিট্যান্স কমলে সরকার আমাদের কথা বলে, তারপর ভুলে যায়।”

আর মরে গেলে? কফিন ফেরত আনার খরচ বাবদ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। জীবিত অবস্থায় আড়াই শতাংশ, মৃত অবস্থায় পঁয়ত্রিশ হাজার, এই হলো চুক্তি।

একটা পুরানা কলামে এক সাংবাদিক তাদের নাম দিয়েছিলেন “রেমিট্যান্স মেশিন।”

নিষ্ঠুর নাম, কিন্তু নির্ভুল, এই মেশিনের কোনো শোরুম নাই, ওয়ারেন্টি নাই, সার্ভিস সেন্টার নাই। এই মেশিন জমি বেচে, ভিটা বেচে, নিজের দামটা নিজে দিয়ে, নিজেই নিজেকে রপ্তানি করে।

তারপর দালাল ভাগ নেয়। মন্ত্রী ভাগ নেয়। বিদেশি সিন্ডিকেট ভাগ নেয়। লিবিয়ার মিলিশিয়া ভাগ নেয়। ইতালির মাফিয়া ভাগ নেয়।

সবাই মানুষটার শরীর থেকে ভাগ নেয়। শুধু তার নিজের রাষ্ট্র শরীরটা নেয় না।

রাষ্ট্র নেয় টাকাটা। আর শরীরটা ফেরত পাঠায় কার্গো গেটে।
মালামালের গেট। রাষ্ট্রের খাতায় সে তো চিরকাল মালামালই ছিল।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন

এমন আরো পড়ুন