উনিশশো পঁচাশি সালের বাইশে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের প্লাজা হোটেলে বৈঠকে বসেন পাঁচ দেশের অর্থমন্ত্রী আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানরা।
আমেরিকা, জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন। প্রস্তুতি চলেছিল জুলাই থেকে, গোপনে। সিদ্ধান্তও মোটামুটি আগেই ঠিক করা ছিল।
বৈঠক শেষে আসল এক পাতার ঘোষণা, ডলারের দাম কিছুটা কমা কাম্য।
পরের সোমবার ডলার পড়ল চার শতাংশ। ভেতরের খসড়ায় লক্ষ্য লেখা ছিল দশ থেকে বারো শতাংশ, সেই কাগজ তখন প্রকাশ হয় নাই। দুই বছরে ডলার নেমে দাঁড়াল চল্লিশ শতাংশ।
টোকিওতে বানানো যে শার্ট নিউ ইয়র্কের দোকানে দশ ডলারে বিক্রি হতো, দুই বছর পরে তার দাম বিশ ডলার হয়ে গেল।
ঘোষণার কোথাও বাংলাদেশের নাম নাই। প্রসঙ্গও ওঠে নাই। তখন বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানি, তিরাশি-চুরাশি অর্থবছরে, পুরো বছরে, তিন কোটি ষোল লাখ ডলার।
ঊননব্বই-নব্বইয়ে সেই সংখ্যা হল বাষট্টি কোটি, ছয় বছরে বিশ গুণ।
আর তিরাশির ওই পুরো এক বছরের রপ্তানি আজকের গার্মেন্টস ওঠায় মোটামুটি এক বেলায়।
➖
আমেরিকার হিসাবটা ছিল নিজের।
আগের পাঁচ বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল চুয়াল্লিশ শতাংশ, আর দামি ডলারে আমেরিকার বানানো জিনিস বিদেশির কাছে দামি, বিদেশির জিনিস আমেরিকানের কাছে সস্তা।
ফলে দোকান ভরছিল জাপানি গাড়ি আর টেলিভিশনে, বন্ধ হচ্ছিল ওহাইও-মিশিগানের কারখানা। কংগ্রেসে জমছিল শুল্ক বসানোর বিল।
তখন শুল্কের বদলে পাঁচ দেশ রাজি হলো মুদ্রায়, ডলারটাই সস্তা করা হবে।
ডলার সস্তা হওয়ার মানে ঠিক উল্টা, বিদেশি জিনিস আমেরিকায় দামি। শার্ট একই, সেলাই একই, বদলায় কেবল বিনিময় হার।
জাপান অবশ্য শার্টের ব্যবসা ততদিনে প্রায় ছেড়ে দিয়েছে, তার মন গাড়ি আর ইলেকট্রনিকসে। সস্তা শার্টের জায়গা তখন কোরিয়ার রাজধানী সিউল, আর পরের দফা চাপটা পড়ল সিউলের ওপরেই।
কোরিয়া আমেরিকার কাছে যত পণ্য বিক্রি করত, তত কিনত না। সেই ফারাক কমাতে ওয়াশিংটন চাইল ওনের দাম বাড়ুক।
আটাশি সালে কোরিয়া আর তাইওয়ানকে মুদ্রা-কারসাজিকারক ঘোষণা করা হলো। তিন বছরে ওনের দাম উঠল প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
একইসময়ে মুদ্রার সঙ্গে যোগ হলো মজুরি। ছিয়াশি সালে কোরিয়ায় ধর্মঘট হয়েছিল দুইশো ছিয়াত্তরটা। সাতাশিতে, সামরিক শাসন ভাঙার বছরে, তিন হাজার সাতশো ঊনপঞ্চাশটা।
রাস্তায় বারো লাখ শ্রমিক, দাবি পঁচিশ থেকে ষাট শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি, বড় অংশই জিতল।
শার্ট বেচে লাভ থাকে সামান্য। একদিকে ওনের দাম বাড়ায় সেই শার্টের ডলার-দাম উঠছে, অন্যদিকে সদ্য বৃদ্ধি পাওয়া মজুরি সামগ্রিক খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সেইসাথে নিউ ইয়র্কের ক্রেতা শার্টপিছু এক পয়সাও বেশি দেবে না।
তিন দিক থেকে চাপে সিউলে সস্তা শার্টের অঙ্ক আর মিলছিল না। ফলে বিষয়টা দাঁড়াল, সেলাই মেশিন সরাতে হবে এমন কোনো দেশে, যেখানে অঙ্কটা এখনো মেলা সম্ভব।
➖
চুয়াত্তর সালে জেনেভায় ধনী দেশগুলো নিজেদের কাপড়ের বাজার বাঁচাতে একটা চুক্তি করেছিল, মাল্টি-ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট।
নিয়মটা হলো, প্রতিটা রপ্তানিকারক দেশের জন্য বছরে বাঁধা কোটা, তার বেশি পোশাক আমেরিকা-ইউরোপে ঢুকবে না। কোরিয়া, হংকং, তাইওয়ান সেই কোটায় আটকে গেল।
তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না। চুয়াত্তরে বাংলাদেশের রপ্তানি করার মতো শার্টই ছিল না। যার রপ্তানি নাই, তার কোটাও নাই।
এই ফাঁকটাই চোখে পড়েছিল কিম উ-চুংয়ের। কোরিয়ার বহুজাতিক কোম্পানি দাইয়ুর চেয়ারম্যান, আমেরিকার শার্ট-বাজার তার কাছে তখন কোটায় বন্ধ।
দরকার এমন একটা দেশ যার কোটা এখনো ফাঁকা।
ঢাকায় তিনি পেলেন নুরুল কাদেরকে। সাবেক আমলা, একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের প্রথম সংস্থাপন সচিব।
আটাত্তরের চার জুলাই দুজনের চুক্তি হলো, পরের বছর ঢাকা থেকে একশো ত্রিশজন গেল কোরিয়ার পুসানে, দাইয়ুর কারখানায়, ছয় মাসের প্রশিক্ষণে।
তাদের আঠারোজন নারী। ফিরে এসে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে তারা চালু করল ‘দেশ গার্মেন্টস’ নামের কারখানা। ছয়টা লাইন, ছয়শো শ্রমিক, তেরো লাখ ডলারের বিনিয়োগ, প্রথম চালান জার্মানিতে।
কাদের যখন দাইয়ুর সঙ্গে পথ ধরছেন, প্রায় সেই সময়েই একই হিসাব কষে চট্টগ্রামে আসলেন আরেক কোরিয়ান, ইয়াংওয়ানের কিহাক সাং।
কাহিনী একই, কোরিয়ার কোটা শেষ, বাংলাদেশের কোটা নাই, ইউরোপের বাজার খোলা। আশি সালের মে মাসে যৌথ কারখানা, আড়াইশো শ্রমিক, প্রথম ক্রেতা এক সুইডিশ কোম্পানি।
একাশি সালের জুনে নুরুল কাদের দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তিটা নিজেই ভেঙে দিলেন, কমিশন আর দেবেন না, একাই চালাবেন।
এদিকে পুসান-ফেরত ওই একশো ত্রিশজনের একশো পনেরোজন কয়েক বছরের ভেতরে ‘দেশ গার্মেন্টস’ ছেড়ে গেল। কেউ খুলল নিজের কারখানা, কেউ ধরল অন্যের নতুন কারখানার ভার।
ছয় মাসের একটা প্রশিক্ষণ এভাবে ছড়িয়ে পড়ল গোটা একটা শিল্পে।
চুরাশি-পঁচাশিতে বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা পাঁচশো সাতাশি। প্লাজা বৈঠকের আগেই।
➖
পঁচাশির পরে কোরিয়ার সস্তা-শার্ট ব্যবসার সংকটটা আর সাময়িক রইল না। মুদ্রা আর ফিরবে না, মজুরিও কমবে না।
বের হওয়ার পথ একটাই, আর সেই পথের মাথায় বাংলাদেশ ততদিনে সাত বছরের অভিজ্ঞ।
কিহাক সাং ছিয়াশি সালে বাংলাদেশি অংশীদারদের ভাগ কিনে নিলেন, একই বছর চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে কারখানা তুললেন, নব্বইয়ে তুললেন আরও বড় আরেকটা।
কোরিয়ায় যে বছরগুলোতে সেলাই-ব্যবসার হিসাব ভেঙে পড়ছে, চট্টগ্রামে সেই বছরগুলোতেই ঢুকছে কোরিয়ান পুঁজি। আজকে শুধু এই এক কোম্পানির অধীনে বাংলাদেশে কাজ করে সত্তর হাজার মানুষ।
রপ্তানি বাড়ল নব্বইয়ের দশকজুড়ে বছরে পনেরো শতাংশ হারে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশ এই এক শিল্পের, কারখানায় চল্লিশ লাখ শ্রমিক।
এর কারণ, সেলাইয়ের অর্ডার সবসময় খোঁজে সবচেয়ে সস্তা জায়গা, আর কোন জায়গা সস্তা, সেই হিসাব কষা হয় অন্যের মুদ্রায়, ঢাকায় না।
সিউলের অঙ্ক না মেলায় অর্ডার ঢাকায় এসেছিল, ঢাকার অঙ্ক যেদিন আর মিলবে না, যাওয়ার রাস্তাও তৈরি হয়ে যাবে। যে ইয়াংওয়ান একদিন চট্টগ্রামে এসেছিল, তার কারখানা আজকে ভিয়েতনামে, ইথিওপিয়ায়, উজবেকিস্তানে।
শিল্পটা চোখে পড়ার মতো বড় হতেই, পঁচাশি-ছিয়াশি থেকে, আমেরিকা আর কানাডা বাংলাদেশের ঘাড়েও কোটা বসাল।
যে ফাঁক দিয়ে ঢোকা, বড় হওয়ামাত্র সেই ফাঁক মাপমতো ছোট করে দেওয়া হলো।
➖
কোটা-মুক্ত গরিব দেশ সেই দশকে আরও অনেকগুলো ছিল, মজুরিও কোথাও কোথাও ঢাকার চেয়ে কম। তবু অর্ডারের স্রোত সবার ঘরে ঢোকে নাই।
তাছাড়া আমাদের ব্যাংকেও ডলার নাই। এমন দেশে বিদেশি কাপড় এনে শার্ট বানিয়ে রপ্তানি, এই প্যাঁচটা খোলা হয়েছিল ঢাকায় বসে।
সমস্যাটা সোজা, কাপড় কিনতে ডলার লাগে, সেই ডলারই দেশে নাই। নুরুল কাদের দর কষে বের করলেন দুটো পথ।
এক, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি। বিদেশি ক্রেতার অর্ডারের কাগজটাকে জামানত রেখে কাপড় বাকিতে আনা, দাম শোধ হয় শার্ট রপ্তানির পর, নিজের পকেটের ডলার লাগে না।
দুই, বন্ডেড ওয়্যারহাউস, কারখানার ভেতরে এমন গুদাম, যেখানে আমদানি করা কাপড় রপ্তানির শর্তে ঢোকে বলে তার ওপর আমদানি শুল্ক বসে না।
চল্লিশ বছর পরেও পুরা শিল্পটা এই দুই ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
➖
জাপান শার্ট ছেড়ে ধরেছিল গাড়ি আর ইলেকট্রনিকস। কোরিয়াও ধরল একই সিঁড়ি।
যেই কোরিয়া আশির দশকে সস্তা শার্টের রাজধানী, চব্বিশ সালে তার রপ্তানি প্রায় একাত্তর হাজার কোটি ডলার। এর চার ভাগের এক ভাগই সেমিকন্ডাক্টর চিপ।
কোরিয়া এখন শুধু চিপ বেচে যা আয় করে, বাংলাদেশের সব খাতের সব রপ্তানি মিলিয়ে তার সাড়ে তিন ভাগের এক ভাগ করে।
ভিয়েতনামের হিসাবটা আরও কাছের, কারণ ভিয়েতনাম শার্ট ছাড়ে নাই। বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানিতে সে এখন বাংলাদেশের সমকক্ষ, বছরে চার হাজার চারশো কোটি ডলার।
তবে ওই কাপড় ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির নয় ভাগের এক ভাগ মাত্র।
তার এক নম্বর খাত ইলেকট্রনিকস, এবং সেই খাতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারীর নামটা চেনা। স্যামসাং, কোরিয়ার কোম্পানি।
ভিয়েতনামে স্যামসাংয়ের ছয়টা কারখানা, সাতাশি হাজার শ্রমিক। চব্বিশ সালে সেখান থেকে তাদের রপ্তানি পাঁচ হাজার চারশো কোটি ডলারের ফোন আর যন্ত্রাংশ।
কারখানা যার মাটিতে, রপ্তানি তার খাতায়, মালিক যে দেশেরই হোক।
চট্টগ্রামে ইয়াংওয়ানের বানানো জ্যাকেট যে হিসাবে বাংলাদেশের রপ্তানি, ঠিক সেই হিসাবেই ভিয়েতনামের কারখানায় বানানো স্যামসাংয়ের ফোন ভিয়েতনামের।
এক কোরিয়ান কোম্পানি ভিয়েতনাম থেকে বছরে যা রপ্তানি করে, গোটা বাংলাদেশ সব খাত মিলিয়ে তত করে না।
পঞ্চাশ বছর আগে কোরিয়ানরা ঢাকায় এনেছিল সেলাই মেশিন। ভিয়েতনামে নিয়ে গেছে ফোনের কারখানা।
বাংলাদেশের রপ্তানির চার-পঞ্চমাংশ আজও সেই সেলাই মেশিনের। দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চামড়া, বছরে একশো চোদ্দ কোটি ডলার, গার্মেন্টসের পঁয়ত্রিশ ভাগের এক ভাগ।
চল্লিশ লাখ মানুষের মজুরি, বড় অংশ নারীর জীবনে প্রথম নিজের আয়, চার দশকের এই প্রাপ্তি মিথ্যা না।
কিন্তু জাপান সস্তা শার্ট বানানো ছেড়ে চলে গেছে গাড়িতে, কোরিয়া চিপে। ভিয়েতনাম শার্ট ছাড়ে নাই, তবে তার পাশে দাঁড় করিয়েছে ফোন, ইলেকট্রনিকস, আরও অনেক কিছু।
শুধু বাংলাদেশ চল্লিশ বছরেও শার্টের পাশে দ্বিতীয় কিছু দাঁড় করাতে পারে নাই।
➖
বাংলাদেশ এখনো জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়। এই তালিকায় নাম থাকলে ইউরোপের বাজারে পোশাক পাঠানো যায় বিনা শুল্কে, আর বাংলাদেশের পোশাকের প্রায় অর্ধেক ক্রেতাই ইউরোপে।
মানে পুরা হিসাবটা দাঁড়িয়ে আছে একটা সরু সুতোয়। দেশের রপ্তানির চার-পঞ্চমাংশ এই এক শিল্পে, সেই শিল্পের অর্ধেক এই এক বাজারে, আর সেই বাজার খোলা থাকে এই এক শর্তে।
আগামী নভেম্বরে জাতিসংঘ বাংলাদেশের নাম এই তালিকা থেকে কেটে দেবে এমন কথা আছে। নাম কাটলে কয়েক বছরের ভেতরে ইউরোপের ওই বিনা শুল্কের সুবিধাও উঠে যাবে।
শুল্ক বসলে এক হিসাবে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি পড়তে পারে প্রায় অর্ধেক, চুয়াল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত।
ফলে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার জাতিসংঘকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে, নাম কাটার কাজটা আরও তিন বছর পিছানো হোক। সিদ্ধান্ত হবে সেপ্টেম্বরে, নিউ ইয়র্কে।
চুয়াত্তরে এই শিল্পে ঢোকার সুযোগ এসেছিল একটা কারণেই। বাংলাদেশ গরিব, রপ্তানি নাই, তাই কোটাও নাই।
পঞ্চাশ বছর পরে সেই শিল্প টিকিয়ে রাখার আবেদনটাও দাঁড়ানো একই কথার উপরে। গরিবের তালিকায় নামটা আরও কিছুদিন থাক।