বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া চীনে যায় প্রতি বর্গফুট পঁয়তাল্লিশ থেকে পঁচাত্তর সেন্টে। চীন সেটা প্রক্রিয়াজাত করে, রঙ লাগায়, তারপর ইউরোপ-আমেরিকার ব্র্যান্ডের কাছে বিক্রি করে।
একটা সনদ থাকলে ওই একই চামড়া বাংলাদেশ নিজেই বিক্রি করতে পারত দেড় থেকে দুই ডলারে।
সনদটা দেয় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ নামের একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা।
তারা দেখে, চামড়া বানাতে গিয়ে কারখানা পরিবেশ নষ্ট করছে কি না। তাদের ছাড়পত্র ছাড়া বড় ব্র্যান্ড এখন চামড়া নেয় না।
ভারতের দেড়শোর বেশি ট্যানারির এই ছাড়পত্র আছে। পাকিস্তানের আশির বেশি।
বাংলাদেশের প্রায় সব ট্যানারি যেখানে, সেই সাভার চামড়া-শিল্পনগরীতে একজনেরও নাই। কারণটা কোনো ষড়যন্ত্র না, বর্জ্যের ব্যবস্থা।
চামড়া প্রক্রিয়া করলে বিষাক্ত পানি বের হয়। সেই পানি শোধন করার জন্য সাভারে একটা কেন্দ্রীয় শোধনাগার আছে, যেটা দিনে চোদ্দ হাজার ঘনমিটার পানি পরিষ্কার করতে পারে।
কোরবানির মৌসুমে বর্জ্য ওঠে বত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজারে। বাড়তিটা যায় সোজা ধলেশ্বরী নদীতে। নদী দূষিত, ছাড়পত্র নাই, চামড়া পঁয়তাল্লিশ সেন্টে।
এই শোধনাগার যে প্রকল্পের অংশ, সেটা অনুমোদন পেয়েছিল ২০০৩ সালে। বরাদ্দ ১৭৫ কোটি টাকা, মেয়াদ তিন বছর। শেষ হয়েছে ২০২১ সালের জুনে, সাড়ে আঠারো বছরে, ৯৩৮ কোটি টাকায়।
মাঝপথে চীনা ঠিকাদার শোধনাগারের কাজ ফেলে চলে গেছে, কেউ ফেরায় নাই।
প্রকল্পটা চালিয়েছে বিসিক। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, দেশি শিল্পের দেখভালের সরকারি সংস্থা।
সরকারের সাম্প্রতিক সমাধান হলো, সাভারের দায়িত্ব বেপজার হাতে তুলে দেওয়া। রূপরেখা তৈরি হয়ে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।
বেপজা মানে সেই সংস্থা, যারা রপ্তানির জন্য আলাদা করে রাখা শিল্প-এলাকাগুলি চালায়, যেগুলিকে আমরা ইপিজেড নামে চিনি।
একটা ব্যর্থ শোধনাগার এক সংস্থার খাতা থেকে আরেক সংস্থার খাতায় উঠছে। শোধনাগার যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।
আমরা এভাবেই তর্ক করি। সংস্থা নিয়ে, বরাদ্দ নিয়ে, জমি নিয়ে। ইপিজেড বেশি পেল না বিসিক কম পেল।
অথচ দুই সংস্থার মাঝখানে যে জিনিসটা কাজ করে না, সেটা সংস্থা না। সেটা কতগুলি নিয়ম, যেগুলি চার দশক ধরে ঠিক করে দিচ্ছে এই দেশে কোন শিল্প বাঁচবে আর কোনটা বাঁচবে না।
➖
প্রথমে একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার, কারণ ধারণাটা প্রায় সবার।
ধারণাটা হলো, বাংলাদেশের গার্মেন্ট মানে ইপিজেড, ইপিজেড মানে বিদেশি বিনিয়োগ, আর এই বিদেশিদের দাপটেই দেশি শিল্প বাড়তে পারেনি।
সংখ্যা অন্য কথা বলে।
গত অর্থবছরে দেশের আট ইপিজেড থেকে রপ্তানি হয়েছে ৮৪১ কোটি ডলারের পণ্য। দেশের মোট রপ্তানির মাত্র সাড়ে সতেরো শতাংশ। শ্রমিক পাঁচ লাখ উনষাট হাজারের মতো।
অথচ পুরা পোশাকশিল্পে কাজ করে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ মানুষ।
মানে দেশের রপ্তানির চার-পঞ্চমাংশের বেশি আর পোশাকশ্রমিকের সিংহভাগই ইপিজেডের দেয়ালের বাইরে। সাভার-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের সাধারণ জমিতে, দেশি মালিকের কারখানায়।
এই গার্মেন্ট শিল্পের জন্মও ইপিজেডে হয় নাই।
দেশের প্রথম রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা, দেশ গার্মেন্টস, দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। সাতাত্তর-আটাত্তরে, কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে।
চুক্তির জোরে ১৯৭৯ সালে প্রায় একশো ত্রিশ জন কর্মী ও ব্যবস্থাপক ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিতে যান কোরিয়ায়, দাইয়ুর কারখানায়। ফিরে এসে তাদের বড় অংশ ‘দেশ গার্মেন্টস’ ছেড়ে নিজেরাই কারখানা খোলেন, বা নতুন কারখানায় যোগ দেন।
একটা কারখানা থেকে একটা শিল্প ছড়িয়ে পড়ল। দেশের প্রথম ইপিজেড, চট্টগ্রামে, চালু হয়েছে তার পরে, ১৯৮৩ সালে।
অর্থাৎ ইপিজেড শিল্পটা বানায় নাই। শিল্পটা আগে এসেছে, ইপিজেড পরে।
বিদেশি টাকার হিসাবটাও মিলিয়ে নেওয়া যাক।
বেপজার সবচেয়ে বড় গর্ব, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট বিদেশি বিনিয়োগের উনত্রিশ শতাংশই এসেছে তাদের অঞ্চলগুলিতে।
সংখ্যাটা যত বড় শোনায়, ভিত্তিটা তত ছোট। ওই বছর সারা দেশে বিদেশিরা বিনিয়োগ করেছে সাকুল্যে ১৪৭ কোটি ডলার।
দেশের অর্থনীতির আয়তনের তুলনায় আধা শতাংশও না, এশিয়ার তলানিতে।
তাহলে “বিদেশি বিনিয়োগ এসে দেশি শিল্পকে সরিয়ে দিয়েছে” কথাটা দাঁড়ায় না। বিদেশি বিনিয়োগ আসলে আসেই নাই।
দেশি শিল্পকে যে জিনিসটা আটকেছে, সেটা লেখা আছে দেশের নিজের নিয়মে।
➖
গার্মেন্ট শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল কাদেরের সবচেয়ে টেকসই কীর্তি তার কারখানা না।
কারখানা অনেক আগেই ইতিহাস। টিকে আছে একটা নিয়ম, যেটা চালু করানোর কৃতিত্ব তাকেই দেওয়া হয়। সরকারি নাম বন্ডেড ওয়্যারহাউস, সবাই ডাকে বন্ড বলে।
বন্ডের কথাটা সরল। আপনি যদি রপ্তানিকারক হন, তাহলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনেন, কোনো শুল্ক দিতে হবে না। শর্ত একটাই, ওই কাঁচামাল দিয়ে যা বানাবেন, সেটা বিদেশে বিক্রি করতে হবে।
দেশের বাজারে বিক্রি করতে চাইলে আগে অনুমতি, তারপর মালভেদে চল্লিশ থেকে উননব্বই শতাংশ শুল্ক।
এই সুবিধার লাইসেন্স এখন প্রায় ছয় হাজার প্রতিষ্ঠানের হাতে।
এখন খেয়াল করেন, বন্ড কিন্তু শুল্ক কমায়নি। শুল্ক যা ছিল তা-ই আছে, শুধু একদল মানুষকে সেটার বাইরে রাখা হয়েছে।
এটা ইচ্ছাকৃত। আশির দশকে রাষ্ট্রের আয়ের বড় ভরসা ছিল আমদানির শুল্ক। সবার জন্য শুল্ক কমিয়ে দিলে রাষ্ট্র চলত না। তাই শুল্ক রইল, শুধু যাদের বিদেশে বেচতে হবে তাদের ছাড় দেওয়া হলো।
সিদ্ধান্তটা তখন যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু তার ফল বুঝতে হলে শুল্কটা কীভাবে সাজানো, সেটা একবার দেখতে হবে।
বাংলাদেশে শুল্ক বসে সিঁড়ির মতো।
একদম নিচের ধাপে কাঁচামাল, শুল্ক পাঁচ শতাংশ। কারখানার যন্ত্রে তারও কম। মাঝের ধাপে সেই মাল, যেটা দিয়ে আরেকজন কিছু বানাবে। সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ। শুল্ক দশ-বারো শতাংশ।
আর সবার উপরের ধাপে তৈরি পণ্য। শুল্ক পঁচিশ থেকে শুরু, তার উপর আরও দুই রকমের বাড়তি শুল্ক চেপে কোনো কোনো পণ্যে হার ওঠে সাতাশি শতাংশে।
সিঁড়িটার মানে এক লাইনে বলা যায়। যত তৈরি জিনিস, তত উঁচু দেয়াল।
ভাবনাটা ছিল, দেশি কারখানা সস্তায় কাঁচামাল আনবে, আর উঁচু দেয়ালের আড়ালে নিশ্চিন্তে বেচবে। ভাবনাটা কাজও করেছে। এতটাই করেছে যে বিদেশি সাবান, বিস্কুট বা জুতা বাংলাদেশের দোকানে প্রায় পৌঁছায়ই না। সাতাশি শতাংশ দেয়াল পেরিয়ে আসা কারও পোষায় না।
ফলে দেশি উৎপাদক দাম ঠিক করে দেশি প্রতিযোগী দেখে। দুনিয়ার দাম তার দেখা লাগে না।
অর্থনীতিবিদ জায়েদি সাত্তার হিসাব করে দেখিয়েছেন, দেশের বাজারের জন্য বানালে এই দেয়াল উৎপাদকের লাভ একশো থেকে চারশো শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
শুনতে দেশি শিল্পের জয়ের গল্প মনে হয়। এইখানেই প্রথম ফাঁদ, আর ফাঁদটা ধরতে কোনো অর্থনীতি জানা লাগে না।
ভাবেন, আপনি একজন উদ্যোক্তা। আপনার সামনে দুইটা রাস্তা। দেশের বাজারে বিক্রি করবেন, যেখানে দেয়ালের আড়ালে দাম চড়া রাখা যায়। নাকি রপ্তানি করবেন, যেখানে দুনিয়ার সবার সঙ্গে দুনিয়ার দামে লড়তে হবে?
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দুই রাস্তার ব্যবধান মেপে দেখেছে। একই মাল রপ্তানি করলে দেশে বিক্রির তুলনায় প্রায় তিপ্পান্ন শতাংশ কম মেলে।
আপনি কোন রাস্তা নেবেন? সবাই সেটাই নেয়।
বাংলাদেশ কেন গার্মেন্টের পরে দ্বিতীয় কোনো বড় রপ্তানি-পণ্য পেল না, এত বছরেও, উত্তরটা এইখানে। এক গবেষণা-সংস্থা পোশাকের বাইরের ১,৩৭৭ রকম পণ্য ঘেঁটে দেখেছে, এর ৩৯ শতাংশ বিশ্ববাজারে লড়ার ক্ষমতা রাখে।
পণ্য আছে, বানানোর লোকও আছে।
রপ্তানি হয় না, কারণ রপ্তানি করলে লোকসান।
গার্মেন্ট রপ্তানি করে কারণ তার জন্মই দেয়ালের বাইরের দিকে। শুরু থেকেই তার দেশি বাজার বলে কিছু ছিল না।
➖
সিঁড়িটার আরেকটা ফল আছে, তা এই লেখার সবচেয়ে মূল কথা।
দেশের দোকানে যা বিক্রি হয়, তার কারখানা এই দেশে আছে। সাবান, বিস্কুট, টাইলস, রঙের কৌটা, সবই দেশে বানানো হয়।
কিন্তু ওই কারখানাগুলি চলে যা দিয়ে, সেগুলি নাই। কাপড় রঙ করার রাসায়নিক প্রায় পুরোটাই আসে বিদেশ থেকে। কারখানার যন্ত্র আর যন্ত্রাংশও।
মানে তৈরি জিনিসের কারখানা আছে, কারখানার পেছনের কারখানা নাই।
কেন নাই, উত্তরটা আবার সিঁড়িতে।
যে সুতা বানায়, রাসায়নিক বানায়, যন্ত্রাংশ বানায়, তার পণ্য কেনে আরেকটা কারখানা। এই মাল সিঁড়ির মাঝের ধাপে, তাই তার দেয়াল নামমাত্র, দশ-বারো শতাংশ।
আর তার সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য ক্রেতা রপ্তানিকারক, যে বন্ডের জোরে ওই একই মাল বিদেশ থেকে আনতে পারে শুল্ক ছাড়া।
অর্থাৎ মাঝের ধাপের উৎপাদক দুই দিক থেকেই খোলা মাঠে। দেশের বাজারে তার দেয়াল নাই, রপ্তানিকারকের বাজারে তার নিশ্চিত ক্রেতা নাই।
কোন শিল্পটা হলো আর কোনটা হলো না, সেটা তাই দৈব না। দেয়াল যেখানে, বিনিয়োগ সেখানে। দেয়াল যেখানে নাই, শিল্পও সেখানে নাই।
➖
তবু মাঝের ধাপে একটা শিল্প দাঁড়িয়ে গেছে, এবং সেটা ছোটখাটো কিছু না।
গার্মেন্ট নিয়ে সবচেয়ে চালু কথাটা হলো, ওটা আসলে একটা বড় দর্জি কারখানা। কাপড় বাইরে থেকে আনি, এখানে কেটে সেলাই করি, তারপর জাহাজে তুলে দিই। নিজের বলতে কিছু নাই।
আশির দশকে কথাটা ঠিক ছিল।
তারপর সেলাইয়ের পেছনে সুতা আর কাপড়ের একটা আস্ত শিল্প দাঁড়িয়ে গেছে। মিল-মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য কারখানা এখন ১,৮৬৯টি।
কেউ তুলা থেকে সুতা কাটে, কেউ সুতা থেকে কাপড় বোনে, কেউ রঙ করে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ প্রায় দুই হাজার তিনশো কোটি ডলার।
গেঞ্জি-জাতীয় পোশাকের কাপড়ের পঁচাশি শতাংশ এখন দেশেই তৈরি হয়। শার্ট-প্যান্টের কাপড়ে চল্লিশ শতাংশ।
দেয়াল ছাড়া এই শিল্পটা দাঁড়াল কীভাবে, সেটা জানা জরুরি।
ইউরোপ তখন শর্ত দিত, শুল্ক ছাড়া পোশাক ঢোকাতে চাইলে কাপড়টা নিজের দেশে বানাতে হবে। বিদেশি কাপড়ে সেলাই করা পোশাকে ছাড় নাই।
ওই শর্ত মেটাতেই গার্মেন্টের পেছনে সুতা আর কাপড়ের কারখানা উঠল, বিশেষ করে গেঞ্জি-জাতীয় পোশাকে।
২০১১ সালে ইউরোপ গরিব দেশগুলির জন্য শর্তটা শিথিল করে দিল। বিদেশি কাপড়ে বানানো পোশাকেও ছাড় মিলতে লাগল। যে চাপে শিল্পটা উঠেছিল, সেই চাপ উঠে গেল।
তারপর থেকে এই শিল্পের ভরসা একটাই। তার ক্রেতা, গার্মেন্ট।
আর গার্মেন্টের হাতে সবসময় একটা বিকল্প ছিল, বন্ডের পথে শুল্কমুক্ত বিদেশি সুতা আর কাপড়।
যতদিন দেশি মাল সস্তা ছিল, বিকল্প কাগজে ঘুমিয়ে ছিল।
➖
২০২৫ সালে বিকল্প জেগে উঠল।
ভারত সরকার নিজের সুতাকলগুলিকে ভর্তুকি দেয়, যাতে তারা কম দামে বেচতে পারে। সেই সস্তা সুতা বাংলাদেশে ঢুকতে লাগল বন্ডের পথে, শুল্ক ছাড়া, দেশি সুতার চেয়ে কম দামে।
মিল-মালিকদের হিসাবে এক বছরে ভারতীয় সুতার আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৩৭ শতাংশ। বিদেশ থেকে যত সুতা আসে, তার ৭৮ শতাংশই এখন আসে এক দেশ থেকে, ভারত।
খেয়াল করেন, এখানে কেউ আইন ভাঙছে না। গার্মেন্ট-মালিক বন্ডের নিয়ম মেনেই দেশি সুতার বদলে ভারতীয় সুতা কিনছেন। যে নিয়ম তাকে শুল্ক ছাড়া কাঁচামাল আনার অধিকার দিয়েছে, তিনি সেই অধিকারটাই ব্যবহার করছেন।
আইন ভাঙার পথও আছে। শুল্ক বিভাগের তদন্তে একের পর এক রপ্তানিকারকের গুদামে বন্ডের মাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, রপ্তানির প্রমাণও নাই।
শুল্ক না দেওয়া মালের একটা অংশ চুপিচুপি দেশের বাজারে চলে যায়। কিন্তু সেটা এই গল্পের উপরি। মূল ধাক্কাটা আসছে বৈধ পথেই।
ধাক্কার চেহারাটা এরকম। গত ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের পাঁচশোর বেশি সুতাকলের পঞ্চাশটা পুরোপুরি বন্ধ। আরও পঞ্চাশটা চলছে অর্ধেক ক্ষমতায়।
গুদামে জমে আছে প্রায় সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকার সুতা, কেনার লোক নাই।
মিল-মালিকদের সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের নিজেরই পাঁচটা মিল বন্ধ হয়ে গেছে।
১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিল। সুপারিশ, মোটা সুতা বন্ড-সুবিধার বাইরে যাক। মোটা সুতা মানে সেই সুতা, যেটা দেশের মিলগুলি নিজেরাই দিব্যি বানাতে পারে।
গার্মেন্ট-মালিকদের দুই সংগঠন ছুটল উল্টা দিকে, বাণিজ্য উপদেষ্টার কাছে, সিদ্ধান্ত ফেরানোর আবেদন নিয়ে। তাদের যুক্তিও ফেলনা না, সস্তা সুতা বন্ধ হলে রপ্তানির খরচ বাড়বে।
২২ জানুয়ারি মিল-মালিকরা পাল্টা ঘোষণা দিলেন, সাত দিনের মধ্যে সুপারিশ কার্যকর না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সব টেক্সটাইল মিল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।
২৭ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হলো। আশ্বাস মিলল, কর্মসূচি স্থগিত হলো। সিদ্ধান্তটা আজও ঝুলে আছে।
ঘটনাটা আরেকবার দেখেন। এখানে বিদেশি কেউ নাই। দুই পক্ষই দেশি শিল্প, দুই পক্ষই লাখ লাখ মানুষের নিয়োগকর্তা।
আর লড়াইটা ঠিক সেই জায়গায় বেধেছে, যেখানে বাধার কথা ছিল। সুতাকল সিঁড়ির মাঝের ধাপে। দেশের বাজারে তার দেয়াল নাই, আর তার একমাত্র বড় ক্রেতার হাতে শুল্কমুক্ত বিকল্প। দুই দিকের খোলা মাঠে প্রথম বড় ঝড়টা এসেছে, এই যা।
সুতাকলের দুর্দশার কারণ অবশ্য একটা না। গ্যাসের দাম, ব্যাংকের সুদ, গত বাজেটে কর ১৫ থেকে বেড়ে ২৭ শতাংশ, সবই আছে।
কিন্তু যে কারণটা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে, সেটা বন্ড।
চল্লিশ বছর আগে রপ্তানি বাঁচাতে যে ছাড়টা দেওয়া হয়েছিল, সেই ছাড় এখন দেশি শিল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্যের ক্রেতা কেড়ে নিচ্ছে।
আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে নিজের দুই শিল্পের মাঝখানে, কোনদিকে যাবে ঠিক করতে না পেরে।
➖
অথচ কোনদিকে যেতে হবে, সেটা রাষ্ট্রের নিজের চিঠিতেই লেখা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির যুক্তির মধ্যে একটা তারিখ আছে। জাতিসংঘের খাতায় বাংলাদেশ এখনো স্বল্পোন্নত দেশ, সেই পরিচয়েই সে ধনী দেশগুলির বাজারে পণ্য পাঠায় বিনা শুল্কে।
পরিচয়টা ছাড়ার দিন ঠিক ছিল ২৪ নভেম্বর ২০২৬। সরকার তিন বছর পেছানোর আবেদন করেছে, জাতিসংঘ সম্ভবত রাজিও হবে।
কিন্তু বের হতে হবেই। আর বের হলে বিনা শুল্কে ঢোকার নিয়ম বদলে যায়।
ইউরোপের সেই পুরনো শর্তটা, যেটা একদিন এই দেশে সুতা-কাপড়ের শিল্প দাঁড় করিয়েছিল, তার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। স্বল্পোন্নত পরিচয় গেলে শর্তটা ফিরে আসে।
তখন শুল্ক-ছাড় পেতে হলে কাপড়টা দেশে বোনা হতে হবে। সুতা বাইরে থেকে আনা চলবে, কিন্তু বিদেশি কাপড় এনে কেটে-সেলাই করা শার্ট আর শুল্কমুক্ত ঢুকবে না।
এইবার হিসাবটা মেলান। গেঞ্জি-জাতীয় পোশাকে বাংলাদেশ শর্তটা প্রায় মিটিয়ে ফেলেছে, কাপড়ের পঁচাশি শতাংশই দেশে তৈরি।
কিন্তু শার্ট-প্যান্টের কাপড়ের ষাট শতাংশ এখনো আমদানি করা, সেই কাপড় দেশে ঢোকে বন্ডের পথেই, শুল্ক ছাড়া।
সুতা যারা বানায় আর কাপড় যারা বোনে, তারা আলাদা কেউ না। একই শিল্প, একই সংগঠন, একই বন্ডের চাপে বসে যাচ্ছে।
আজ যে সুবিধা তাদের ক্রেতা কেড়ে নিচ্ছে, কয়েক বছর পরে সেই সুবিধাই গার্মেন্টের ইউরোপের দরজা বন্ধ করে দেবে।
গার্মেন্ট আজ যাকে বসিয়ে দিচ্ছে, কালকে তাকেই তার সবচেয়ে বেশি দরকার।
সময় পেছানোর আবেদনটাও এই আলোতেই পড়া উচিত। দুনিয়ার সবচেয়ে উদার বাণিজ্য-সুবিধা ভোগ করা একটা খাত বলছে, আরও তিন বছর না পেলে সে টিকবে না।
সময় সম্ভবত মিলবে। কিন্তু আবেদনটা নিজেই একটা স্বীকারোক্তি। এত বছরের সুবিধা তাকে লড়তে শেখায়নি, সুবিধার উপর নির্ভরশীল করেছে।
➖
রাষ্ট্র দুই শিল্পের মাঝখানে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কেন, তার একটা ইতিহাস আছে।
এই রাষ্ট্র চার দশক ধরে শিল্পকে শুধু দিয়েছে। রপ্তানি করলে সরকার নগদ টাকা দেয়, এই সুবিধা পায় তেতাল্লিশ খাত।
অঙ্কটা ছয় বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গত অর্থবছরে ৭,৮৩০ কোটি টাকা। সঙ্গে বন্ড, করের ছাড়, আরও কত কী।
ফলাফল, তেতাল্লিশ খাত টাকা পেয়েছে, রপ্তানিতে দাঁড়িয়েছে একটা।
কোরিয়া-তাইওয়ানও একসময় শিল্পকে এভাবে টাকা দিয়েছিল, তফাত ছিল শর্তে। কোরিয়ায় নিয়ম ছিল, সরকার টাকা দিবে, বিনিময়ে কোম্পানিকে রপ্তানির লক্ষ্য ছুঁয়ে দেখাতে হবে। না পারলে টাকা বন্ধ।
ওইখানে সরকারি সুবিধা ছিল বেতনের মতো, কাজ দেখিয়ে নিতে হতো। বাংলাদেশে সুবিধা উত্তরাধিকারের মতো। একবার পেলে প্রাপ্য, কেউ প্রশ্ন করে না।
যে রাষ্ট্র কোনোদিন কারও সুবিধায় হাত দেয় নাই, সে হঠাৎ একদিন গার্মেন্টের মতো শক্তিশালী খাতের সুবিধা কাটবে, এমনটা ভাবার কারণ কম।
তাহলে দেশি শিল্প বাঁচবে কীভাবে?
এই প্রশ্ন উঠলেই একটা চেনা উত্তর আসে। ইপিজেড তো অনেক পেল, এবার বিসিককে দাও। বড়দের পিছে অনেক টাকা গেছে, এবার ছোটদের সংস্থার পালা।
শুনতে ন্যায্য। কিন্তু হিসাবটা মেলে না।
বিসিক ছোট উদ্যোক্তাকে যা দেয়, সেটা হলো জমি। শিল্পনগরীর প্লট।
অথচ ছোট উদ্যোক্তার জমির অভাব নাই। কয়েক বছর আগে একুশটা শিল্পনগরীতে এগারোশো প্লট খালি পড়ে ছিল, বিসিককে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উদ্যোক্তা খুঁজতে হয়েছে।
অভাবটা টাকার। ব্যবসা শুরু বা বড় করার ঋণ দেশের ছোট প্রতিষ্ঠানগুলির সাতাত্তর শতাংশই পায় না।
মানুষটার দরকার ঋণ, রাষ্ট্র দিচ্ছে জমি।
আর জমি দেওয়াই রাষ্ট্রের একমাত্র অভ্যাস। একশো অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঘোষণা নেমে এসেছে পাঁচে, কারণ জমিতে গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সামর্থ্য নাই।
আবার বাণিজ্য-ঘাটতি বাড়তেই ঘোষণা এসেছে নতুন আরেক রকম শিল্প-এলাকার। আরেক টুকরা জমি।
তাহলে দেশি অর্থনীতির মূল্যায়ন হবে কবে?
যেদিন এই সিঁড়িটা ভাঙা শুরু হবে। রপ্তানি করা আর দেশে বেচার লাভ যেদিন কাছাকাছি আসবে। দেশি মিলের সুতা আর বন্ডের বিদেশি সুতা যেদিন এক দরে দাঁড়াবে।
সেদিন কোন শিল্প বাঁচবে, সেটা ঠিক করবে বাজার। মন্ত্রণালয়ের চিঠি না, সমিতির তদবির না, কোনো সংস্থার বরাদ্দ না।
সেই দিনটা না আসা পর্যন্ত হিসাবটা যেমন চলছে তেমনই চলবে।
সাভারের চামড়া চীনে যাবে পঁয়তাল্লিশ সেন্টে, আর দেড় ডলার তুলবে সেই দেশ, যাদের শোধনাগার চলে।
মাঝখানের এক ডলার, প্রতি বর্গফুটে, বছরের পর বছর, ওই টাকাটা কারও না কারও মজুরি হতো, কারও কারখানা হতো, কারও ঋণের কিস্তি হতো।
ওই এক ডলার এই লেখার একমাত্র দাবি।
চামড়ায় হোক, সুতায় হোক, রঙে-রাসায়নিকে হোক, যে দাম আমরা বানাতে পারতাম অথচ অন্যকে বানাতে দিচ্ছি, সেই দামটা দেশে রাখার ব্যবস্থার নাম শিল্পনীতি।
বাকি সব জমির হিসাব।