ধরা যাক, মালয়েশিয়া থেকে ছেলে মাকে বিশ হাজার টাকা পাঠাল।
টাকাটা বৈধ পথে এসেছে বলে সরকার খুশি হয়ে উপরে আরও পাঁচশো টাকা দিল। প্রবাসী আয়ের প্রণোদনা, চালু হয়েছিল উনিশ সালে শতকরা দুই টাকা দিয়ে, বাইশে বেড়ে আড়াই।
মা গেলেন বাজারে, বিকাশের দোকানে, টাকাটা তুলতে।
দোকানদার গুনে হাতে টাকা দিলেন। সেখানে কাটা গেল প্রায় তিনশো আশি টাকা। ক্যাশ-আউট চার্জ, হাজারে সাড়ে আঠারো।
সরকার দিল পাঁচশো, কোম্পানি নিল পৌনে চারশো। রাষ্ট্রের উপহার আর কোম্পানির ভাড়া, একই হাতে এসে প্রায় কাটাকুটি।
মা টেরও পেলেন না। কেউই পায় না। এই চার্জটা এত পুরানা অভ্যাস যে মনে হয় প্রকৃতির নিয়ম, বৃষ্টির মতো।
অথচ হিসাবটা ছোট না। এই প্রণোদনা দিতে রাষ্ট্রের খরচ বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা, জনগণের করের টাকা।
গত বছর প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন রেকর্ড, বত্রিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রাষ্ট্র পাইপের মুখে ভর্তুকি দিচ্ছে, আর পাইপের শেষ মাথায় ভাড়া উঠিয়ে নিচ্ছে একটা কোম্পানি।
এই লেখাটা সেই তিনশো আশি টাকার একটা ময়নাতদন্ত।
টাকাটা কোন আইনে কাটা যায়, কার পকেটে জমে, আর পাশের দেশ ভারতে কেন কাটে না।
➖
প্রথমে আইনটা বোঝা যাক।
বিকাশ যে ব্যবস্থার অধীনে চলে তার নাম এমএফএস, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস।
বাংলাদেশ ব্যাংক এগারো সালে এর নিয়ম বানায়, পরে তা কয়েক দফা হালনাগাদ হয়। মূল কথা দুইটা।
এক, বিকাশের মতো ওয়ালেট-কোম্পানির অন্তত একান্ন ভাগ মালিকানা থাকতে হবে একটা ব্যাংকের হাতে। বিকাশের বেলায় সেই ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক।
শুনতে নিরাপদ লাগে। কোম্পানিটা যেন একটা ব্যাংকের ছাতার নিচেই আছে।
দুই, আর এখানেই গোঁজামিলের শুরু। ব্যাংকের ছাতার নিচে থাকলেও, বিকাশে রাখা টাকা কিন্তু ব্যাংকে রাখা টাকা না।
ব্যাংকে টাকা রাখলে আপনি “আমানতকারী”। ব্যাংক আপনার টাকার দায়িত্ব নেয়, সুদ দেয়, আর নিয়মকানুন কড়া।
কিন্তু বিকাশে টাকা রাখলে আপনি নিছক একজন গ্রাহক, যে কোম্পানির কাছে আপনি কিছু টাকা গচ্ছিত রেখেছেন।
এই গচ্ছিত টাকার নাম ই-মানি।
সোজা কথায়, বিকাশ কোন ব্যাংক না, এটা মানিব্যাগ।
আপনার টাকাটা সেখানে আছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকের আমানত হিসেবে না, একটা কোম্পানির খাতায় ডিজিটাল জমা হিসেবে।
এই ছোট্ট পার্থক্যটাই পরে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যাংকে সুদ আপনার অধিকার, আইনে লেখা। ওয়ালেটে যেটুকু মুনাফা বা সঞ্চয়ের সুযোগ মেলে, সেটা কোম্পানির অফার, দিলে দেয়, শর্ত বদলালে বদলে যায়।
ঋণও তাই। অ্যাপে সম্প্রতি ছোট লোনের ব্যবস্থা এসেছে বটে, কিন্তু কত পাবেন, পাবেন কি না, ঠিক করে কোম্পানি, তার নিজের হিসাবে। ব্যাংকের খাতায় যে ঋণ-ইতিহাস দাঁড়ালে বড় লোনের দরজা খোলে, পনেরো বছরের ওয়ালেট-লেনদেনে সেই দরজা খোলে না।
আর কোম্পানির দিক থেকে দেখেন। সাড়ে আট কোটি মানুষের জমা টাকা একসঙ্গে একটা বিশাল পুকুর, যার নাম ট্রাস্ট ফান্ড।
পুকুরটা থাকে কোম্পানির জিম্মায়। এই জিম্মাদারি কতদূর গড়াতে পারে, তার নমুনা এই দেশেই ঘটে গেছে।
নগদের কারিগরি অংশীদার কোম্পানি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে রাখা সেই টাকা জামানত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে পাঁচশো কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।
তাহলে ই-মানির ব্যবসাটা চলে কীসে? তিনটা চাকায়।
এক, কোটি মানুষের জমা টাকা ব্যাংকে রাখা থাকে, তার ইন্টারেস্ট কোম্পানির, আপনার না।
দুই, ছোট ছোট ফি। টাকা পাঠানো, বিল দেওয়া, মোবাইলে রিচার্জ, প্রতিটাতেই সামান্য করে চার্জ।
আর তিন, এটাই আসল, ওয়ালেটের টাকা নগদ করতে গেলেই চার্জ, হাজারে সাড়ে আঠারো টাকা। এই দেশে টাকা তোলা ছাড়া উপায় নাই বলে চার্জটাও দিতেই হয়।
➖
এবার লোকসানের খাতাটা খুলি। মানুষটার ঠিক কোথায় কোথায় কাটা যাচ্ছে।
প্রথম কাটা, চার্জ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের গবেষকরা পাশাপাশি বসিয়ে মেপেছেন, পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করতে বাংলাদেশে লাগে তিনশো বাহাত্তর থেকে চারশো বাষট্টি টাকা।
পাকিস্তানে সেটা তিনশো ছাপ্পান্ন, মিয়ানমারে দুইশো একত্রিশ। আর ভারতে শূন্য।
দ্বিতীয় কাটা, রাস্তাটা একমুখী। ডিজিটাল টাকা দিয়ে খরচ করার জায়গা এই দেশে দাঁড়ায়ই নাই। দেশের মোট লেনদেন-মূল্যের পঁয়ষট্টি ভাগ এখনো কাগজের টাকায়।
অনলাইন কেনাকাটারও আশি ভাগ ক্যাশ-অন-ডেলিভারি।
পুরা দক্ষিণ এশিয়ায় দোকানে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল দাম মেটান একশোজনে পনেরোজন।
ফলে ওয়ালেটে টাকা আসলে তুলে ফেলা ছাড়া উপায় নাই, আর তোলা মানেই চার্জ।
চক্রটা এভাবে চলে, দোকানে ডিজিটাল চলে না বলে মানুষ ক্যাশ-আউট করে, সবাই ক্যাশ-আউট করে বলে দোকানের ডিজিটাল হওয়ার তাড়াও নাই।
সংখ্যার একটা ধাঁধা এখানে আছে।
দেশে প্রতিদিন যতগুলি লেনদেন হয়, তার তিরাশি ভাগই মোবাইলে। শুনলে মনে হয়, দেশ ডিজিটাল হয়ে গেছে।
কিন্তু টাকার অঙ্কে হিসাব করলে মোবাইলের ভাগ মাত্র সাত ভাগ।
দুইটা আলাদা হিসাব। একটা গুনছে কতবার লেনদেন হলো, আরেকটা গুনছে কত টাকা গেল।
কারণটা সহজ। ওয়ালেটে চলে ছোট ছোট টাকা, মাকে পাঠানো পাঁচশো, দুইশো টাকার বিল, হাজার টাকা তোলা। আর বড় কাজগুলি, জমি কেনা, ব্যবসার পেমেন্ট, বেতন, সেসব হয় ব্যাংকে।
তাই তিরাশি ভাগের সংখ্যাটা যা দেখায়, তা হলো মোবাইলে লেনদেন হয় অনেক। আর সাত ভাগের সংখ্যাটা দেখায়, সেই লেনদেনগুলি ছোট।
দেশের বড় টাকা এখনো ওয়ালেটে ঢোকে না। ওয়ালেটে ঢোকে গরিব মানুষের ছোট টাকা, আর প্রতিবার তুলতে গেলে সেখান থেকেই কিছু কেটে রাখা হয়।
তৃতীয় কাটা, দেয়ালের ভাড়া।
বছরের পর বছর বিকাশ থেকে নগদে টাকা পাঠানোই যেত না। প্রতিটা ওয়ালেট আলাদা দ্বীপ। টাকা সরাতে হলে এজেন্টের কাছে গিয়ে নগদ করে আরেক ওয়ালেটে ভরতে হতো। মানে দুইবার চার্জ।
দেয়ালটা টিকে থাকাতেই কোম্পানির লাভ। টাকা ভেতরে আটকা থাকলে গ্রাহকও আটকা থাকে। নিজের দেয়াল নিজে ভাঙার কারণ কারও ছিল না।
রাষ্ট্র ভাঙতে গিয়েছিল। বিশ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় সুইচ দিয়ে এমন একটা সেবা চালু করেছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় চেষ্টা গত নভেম্বরে। ব্যাংক আর ওয়ালেটের মধ্যে পারাপার চালু হলো। ব্যাংক থেকে ওয়ালেটে ঢোকার চার্জ হাজারে দেড় টাকা, ওয়ালেট থেকে বের হওয়ার চার্জ হাজারে সাড়ে আট।
ঢোকা সস্তা, বের হওয়া প্রায় ছয় গুণ দামি।
কিন্তু এটা চালুর আগের দিন বিকাশ চিঠি দিয়ে জানাল, তারা প্রস্তুত না, জানুয়ারি পর্যন্ত সময় চাই। নগদ বাদ পড়ল, লাইসেন্স নাই বলে।
দেশের সবচেয়ে বড় দুই ওয়ালেটকে ছাড়াই চালু হলো ওয়ালেটে-ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেদিন নিজেই বলেছিলেন, এই আন্তঃলেনদেন আপাতত “তাত্ত্বিক”।
নগদ লাইসেন্স পেল ডিসেম্বরে। বিকাশ জানুয়ারির সময়সীমাও পার করল।
আট মাস পরে আজ, ব্যাংকে টাকা পাঠানো যায়। কিন্তু দেশের এক নম্বর ওয়ালেট থেকে দুই নম্বর ওয়ালেটে আজও টাকা যায় না।
চতুর্থ কাটা চোখে দেখা যায় না বলে সবচেয়ে বড়। দেশে ওয়ালেট-অ্যাকাউন্ট এখন প্রায় চব্বিশ কোটি, কাগজে-কলমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উৎসব।
কিন্তু হিসাবের খাতায় “অ্যাকাউন্ট” শব্দটাই ফাঁকি। একটা ওয়ালেটও অ্যাকাউন্ট বলে গোনা হয়। সঞ্চয় নাই, সুদ নাই, ঋণের পথ নাই।
অ্যাকাউন্ট সবার হয়েছে। ব্যাংকিং কারও হয় নাই।
আইনজ্ঞ লরেন্স লেসিগের একটা বিখ্যাত কথা আছে, কোড-ই আইন।
ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংসদের আইনের চেয়ে বড় আইন হলো নকশাটা নিজে, কী করা যাবে আর যাবে না, লেখা থাকে সফটওয়্যারের ভেতরে।
আমাদের নকশায় লেখা, টাকা ঢুকবে সহজে, ঘুরবে দেয়ালের ভেতরে, বের হবে বড় চার্জ দিয়ে।
➖
বিকাশ কেনিয়ার আইডিয়া, কথাটা অনেকে শুনেছেন। কথাটা শোনা কথা না।
দুই হাজার সাত সালে কেনিয়ায় আসে দুনিয়ায় মোবাইল-মানির প্রথম বড় সাফল্য, এম-পেসা। টেলিকমের ওয়ালেট, এজেন্টের দোকান, ক্যাশ-ইন ক্যাশ-আউট।
মডেলটার জন্ম ওখানে।
সেই এম-পেসার যাত্রা যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, নিক হিউজ, দুই হাজার নয় সালে কামাল ও ইকবাল কাদিরের সঙ্গে মিলে গড়লেন মানি ইন মোশন নামের কোম্পানি।
পরের বছর ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, এগারো সালের জুলাইয়ে যাত্রা।
নাইরোবির মডেল ঢাকায় এনেছে নাইরোবির কারিগরই। বাংলাদেশ নিল কেনিয়ার বংশ।
কিন্তু পাশের ভারত নিল অন্য বংশ। এবং সেটা কোনো জাদুবলে না, তিনটা ধাপে, প্রতিটা ধাপ একটা সিদ্ধান্ত।
প্রথম ধাপ, সবাইকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। চৌদ্দ সাল থেকে ‘জন ধন’ নামের কর্মসূচিতে ভারত খুলল তেপ্পান্ন কোটির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
ওয়ালেট না, সত্যিকারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বড় অংশ নারী আর গ্রামের মানুষের।
শূন্য টাকায় খোলা যায়, সুদ জমে, পরিচয় দাঁড়ায়। এক গবেষকের ভাষায়, এই অ্যাকাউন্টগুলি হলো সকেট, যাতে পরে প্লাগ ঢোকানো যাবে।
দ্বিতীয় ধাপ, প্লাগটা।
ষোলো সালে চালু হলো ইউপিআই। দেশের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে জুড়ে দেওয়া একটা রাস্তা।
এই রাস্তার মালিক কোনো কোম্পানি না। মালিক এনপিসিআই, ব্যাংকগুলি মিলে গড়া একটা অলাভজনক সংস্থা।
ফোনপে বা গুগল পে শুধু অ্যাপ, এই রাস্তার উপরে চলা গাড়ির মতো। আপনার টাকা তারা স্পর্শ করতে পারে না।
কারণ টাকাটা কারও মানিব্যাগে ঢোকেই না। এক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সোজা আরেক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়।
তৃতীয় ধাপ, সবচেয়ে সাহসী, চার্জ শূন্য ঘোষণা।
সরকার নিয়ম করে দিল, ব্যাংক-অ্যাকাউন্ট-ভিত্তিক ইউপিআই লেনদেনে গ্রাহকের ফি শূন্য, দোকানদারেরও ফি শূন্য।
কার্ডে যেখানে দোকানদারের দুই-তিন শতাংশ পর্যন্ত কাটতে পারে, ইউপিআইতে সে পায় পুরো টাকাটাই।
ফল, দোকানদারের ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে আর ভয় নাই।
চা-দোকান, সবজিওয়ালা, অটোরিকশা, সবার কাছে কিউআর কোড। গত বছর এই ফ্রি রাস্তা দিয়ে গেছে একশো বাহাত্তর বিলিয়ন লেনদেন, পৌনে তিন ট্রিলিয়ন ডলার।
এখন একটা ভুল ভাঙা দরকার। ভারতের মানুষ কি নগদ তোলে না?
তোলে, নিশ্চিতভাবেই তোলে, ভারতও যথেষ্ট নগদের দেশ।
কিন্তু তারা তোলে ব্যাংক থেকে, এটিএমে, গ্রামে হলে ব্যাংকের এজেন্টের কাছে, নিজের আমানত থেকে।
সেটা ব্যাংকের সাধারণ সেবা, মাসে কয়েকবার ফ্রি, তারপর বড়জোর একটা বাঁধা চার্জ, তোলা টাকার শতকরা ভাগ না।
আর যেহেতু দোকানে দোকানে ডিজিটাল চলে, নগদ তোলার দরকারটাই কমে গেছে।
ফারাকটা তাহলে এই, ভারতে নগদ তোলা নিজের ব্যাংক-জমার উপর একটা সেবা। এখানে নগদ তোলা একটা কোম্পানির মানিব্যাগ থেকে চার্জ দিয়ে টাকা বের করা।
একই ফোন, একই ইন্টারনেট, একই গরিব মানুষ।
ভারত ঠিক করেছিল টাকার রাস্তাটা হবে সরকারি রাস্তার মতো, সবার। আমরা রাস্তাটা ছেড়ে দিলাম কোম্পানির হাতে, আর কোম্পানি সেখানে টোল বসাল।
➖
এবার সেই প্রশ্নটা, যার উত্তরেই রোগ ধরা পড়ে।
এই দেশে গ্রামে ব্যাংকের শাখা খুলতে কারও তাড়া নাই। কিন্তু মানিব্যাগ খুলতে তাড়া সবার।
ব্যাংকগুলি আনল রকেট, উপায়। টেলিকম কোম্পানিরা বছরের পর বছর দরজায়। আর সবচেয়ে বড় গল্পটা নগদের, কারণ ওখানে রাষ্ট্র নিজের নামটাই ভাড়া দিয়ে দিয়েছে।
থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস নামের এক বেসরকারি কোম্পানি সতেরো সালে ডাক বিভাগের চুক্তি পেল, উনিশে চালু হলো “ডাক বিভাগের নগদ”।
যদিও ডাক বিভাগ বোর্ডে নাই, ব্যবস্থাপনায় নাই, আছে শুধু লোগোতে। পূর্ণ লাইসেন্স ছাড়াই চলল ছয় বছর।
সরকারি উপবৃত্তি আর ভাতা নগদেই নিতে হবে, বিনা টেন্ডারের এই বাধ্যবাধকতায় গ্রাহক দাঁড়াল নয় কোটির উপরে, যাদের সত্তর ভাগই ভাতাভোগী।
ক্ষমতা বদলের পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসক বসিয়েছে।
প্রশ্নটা হল, মানিব্যাগ-ব্যবসায় এত আগ্রহ কীসের?
উত্তরটা আড়াইশো বছর আগে অ্যাডাম স্মিথ লিখে গেছেন। জমিদারদের নিয়ে, তারা ফসল কাটতে ভালোবাসেন সেখানে, যেখানে কখনো বীজ লাগাননি।
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ব্রেট ক্রিস্টোফার্স এই ব্যবস্থার আধুনিক নাম দিয়েছেন খাজনা-পুঁজিবাদ।
মুনাফা আসে উৎপাদন থেকে না। কোন কারখানা লাগে না, খনি লাগে না। লাগে শুধু এমন একটা দরজা, যেটা না পেরিয়ে মানুষের উপায় নাই।
কোটি কোটি গরিব মানুষের টাকার নগদ হওয়ার দরজাটা ঠিক তেমন দরজা।
খাজনার খাতাটা দেখেন। চব্বিশ সালে বিকাশের আয় প্রথমবার পাঁচ হাজার কোটি ছাড়াল, মুনাফা রেকর্ড তিনশো ষোল কোটি।
পঁচিশের প্রথম নয় মাসেই মুনাফা পাঁচশো পাঁচ কোটি, আগের বছরের চেয়ে একশো একত্রিশ শতাংশ বেশি, পুরো আগের বছরকেই ছাড়িয়ে।
খাজনাটা যায় কোথায়?
মালিকানার তালিকাটা পড়েন, ব্র্যাক ব্যাংকের একান্ন ভাগের পরে মানি ইন মোশন, আমেরিকা। আলিপে, আলিবাবার সিঙ্গাপুর কোম্পানি। আইএফসি, বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সফটব্যাংক, জাপান।
সফটব্যাংক আড়াইশো মিলিয়ন ডলার ঢালার পর কোম্পানির দাম প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার।
লেনদেন জনতার, এজেন্টের দোকান জনতার, নগদের দরকারটাও জনতার। খাজনা টোকিও-হাংঝৌ-ওয়াশিংটনের।
অর্থনীতিবিদ কেইনস গত শতাব্দীতে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, পুঁজি সুলভ হতে হতে একদিন খাজনাজীবী শ্রেণিটা এমনিই বিদায় নেবে।
তিনি এর নাম দিয়েছিলেন খাজনাজীবীর স্বেচ্ছামৃত্যু।
কিন্তু একশো বছর পরের খবর হলো, খাজনাজীবী মরে নাই। খাজনাজীবী একটা অ্যাপ পেয়েছে।
➖
তাহলে সমাধান তো জানা। রাষ্ট্র ভারতের মতো একটা ফ্রি রাস্তা বানাবে, টোল আপনিই অর্থহীন হয়ে যাবে।
রাষ্ট্র বানাতে গিয়েছিল। দুইবার। সেই গল্পটাই এই লেখার সবচেয়ে মন খারাপ করা অধ্যায়।
প্রথম চেষ্টার কথা আগেই বলেছি, বিশ সালে চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা পরে প্রকাশ্যে বলেছেন, সরকারের চাপে বন্ধ করতে হয়েছিল।
বন্ধ করতে হয়েছিল কার জন্য, সেটা বোঝা গেল দুই বছর পরে।
বাইশ সালের নভেম্বরে জনগণের পঁয়ষট্টি কোটি টাকায় চালু হলো বিনিময়, ব্যাংক আর ওয়ালেটের মধ্যে অবাধ পারাপারের পাবলিক প্ল্যাটফর্ম।
তারপর নকশাটা দেখেন। টাকা পাঠাতে হলে দুই পক্ষকেই আগে আলাদা নিবন্ধন করে ছদ্মনাম বানাতে হবে, গ্রাহকের চার্জ হাজারে পাঁচ টাকা।
আর বাটন ফোনে চলবেই না, অথচ যার জন্য অন্তর্ভুক্তি, তার হাতে হয়তো বাটন ফোনই।
কেন এমন, তার উত্তর এসেছে ক্ষমতা বদলের পরে। গভর্নর জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মটা বানানো হয়েছিল শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে, একটা শেল কোম্পানির মাধ্যমে।
চব্বিশের জানুয়ারিতে এর পরিচালনার একপেশে চুক্তি গেল ভেলওয়্যার নামের কোম্পানির হাতে, যার মালিক তখনকার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ছেলে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, চুক্তিটা তাদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল।
ভারতের সুইচ চালায় ব্যাংকগুলির অলাভজনক জোট। আমাদের সুইচ গিয়েছিল মন্ত্রীর ছেলের কোম্পানিতে।
গত বছরের আগস্টে বিনিময় বাতিল হয়েছে। গভর্নর নতুন তারিখ দিয়েছেন, সাতাশ সালের জুলাইয়ের মধ্যে পূর্ণ আন্তঃলেনদেন।
ততদিন টোলের কাউন্টার খোলা, একা, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন।
ব্রডশিট আগেও লিখেছে, এই দেশে দায় মুছে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় দায়টাকে অনেক হাতে ছড়িয়ে দেওয়া। এখানেও তাই।
কোম্পানি বলবে, আমরা নিয়মের ভেতরেই চার্জ নিই, এজেন্টের কমিশনও তো দিতে হয়। নিয়ন্ত্রক বলবে, বিকল্প তো বানাতে গিয়েছিলাম।
যারা বিকল্পটা লুটে খেল, তারা এখন পলাতক। সবাই ঠিক। মায়ের হাত থেকে তিনশো আশি টাকা কাটা যাওয়াটাও ঠিক।
➖
সততার খাতিরে উল্টা পিঠটাও লেখা থাকুক।
বিকাশ একটা সত্যিকারের শূন্যতা পূরণ করেছে। মানি অর্ডারে টাকা যেতে লাগত দিনের পর দিন, হুন্ডিতে ঝুঁকি, বিকাশ সেটাকে করেছে এক মিনিটের কাজ।
সাড়ে আট কোটি গ্রাহকের বড় অংশ এমন মানুষ, ব্যাংক যাদের জন্য দরজাই খোলে নাই। কোটি নারীর জীবনের প্রথম আর্থিক অ্যাকাউন্ট একটা ওয়ালেটই।
আর চার্জের একটা ভাগ সাড়ে তিন লাখ এজেন্টের কমিশন, মহল্লার দোকানদারের সংসার।
একইসঙ্গে, ভারতের ছবিও পুরো ঝকঝকে না। সেখানে উননব্বই ভাগ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে ঠিকই, কিন্তু গত বছর তার অর্ধেকও ডিজিটাল লেনদেন করেন নাই।
বাকি অ্যাকাউন্টগুলি খোলা পড়ে আছে, কেউ ব্যবহার করে না।
আর রাস্তাটা ফ্রি রাখতেও খরচ আছে। সেই খরচ কে দেবে, ব্যাংক না সরকার, এই তর্ক ওখানেও চলছে।
ফলে আমাদের সমস্যাটা বিকাশ থাকা না। বিকাশ না থাকলে গ্রামের মানুষ টাকা পেত কী করে?
সমস্যা হলো, বিকাশই একমাত্র রাস্তা।
ফ্রি আরেকটা সরকারি রাস্তা থাকলে মানুষ বেছে নিতে পারত। তাড়া থাকলে টাকা দিয়ে বিকাশে যেত, না থাকলে ফ্রি রাস্তায়।
সেই বিকল্পটা নাই বলে চার্জ দেওয়া ছাড়া উপায়ও নাই।
আর এই চার্জ সবার গায়ে সমান লাগে না। যার মাসে লাখ টাকা ইনকাম, তার কাছে হাজারে সাড়ে আঠারো টাকা কিছুই না।
যার মাসে আট হাজার টাকা ইনকাম, তার কাছে সেটা একবেলার বাজার।
চার্জ যে কমে নাই, তা না। একুশ সালে বিকাশ চালু করে ‘প্রিয় এজেন্ট’, আগে থেকে ঠিক করা দোকান, সেখানে হাজারে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এই জুলাইয়ে সেটা নামল ১৩ টাকা ৯৫ পয়সায়।
পাঁচ বছরে পঁচানব্বই পয়সা। আর যিনি প্রিয় এজেন্ট সেট করেন নাই, তার হার পাঁচ বছরে এক পয়সাও নড়ে নাই। সেই হাজারে সাড়ে আঠারো।
➖
মায়ের হাতে এখন নগদ টাকা, আঁচলে বাঁধা।
যাত্রাটা একবার ভাবেন। মালয়েশিয়া থেকে টাকাটা এসেছে ডিজিটাল হয়ে। ব্যাংক পেরিয়েছে ডিজিটাল হয়ে। ওয়ালেটে ঢুকেছে ডিজিটাল হয়ে।
তারপর শেষ ধাপে এসে আবার কাগজের নোট।
এত প্রযুক্তি, এত বিনিয়োগ, এত উদ্বোধনের পর টাকাটা ফিরে গেল সেখানেই, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল।
দেশের এক নম্বর মানিব্যাগের নাম বিকাশ, মানে উন্নয়ন। দুই নম্বরটার নাম নগদ। নাম দুইটা পাশাপাশি রাখলেই গল্পটা পড়া হয়ে যায়।
টাকা দেশে ফিরেছে, ডিজিটাল যুগও এসেছে। শুধু উন্নয়ন থেকে নগদ পর্যন্ত ওইটুকু পথ পার হতে একটা চার্জ লাগে, যেটা দেন ওই মা।
এবং তিনি জানেনও না যে দিচ্ছেন।