ধরুন, উনিশ বছরের এক তরুণ প্রথমবার মনোরোগ চিকিৎসকের ঘরে ঢুকলেন। মন ভেঙে আছে, ঘুম নেই, কিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছেন না।
ডাক্তার তার কথা শুনলেন কয়েক মিনিট, তারপর বললেন, আপনার মস্তিষ্কে একটা রাসায়নিকের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে।
যেমন ডায়াবেটিসে ইনসুলিন কমে যায়, তেমনি আপনার সেরোটোনিন কমে গেছে। চিন্তার কিছু নেই, ওষুধ আছে। খেলে ঠিক হয়ে যাবে। শুধু কোন ওষুধ আপনার শরীরে খাটবে, সেটা বের করতে একটু সময় লাগবে।
তরুণটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এতদিন সবাই বলত তিনি দুর্বল, মনের জোর নেই, অজুহাত খোঁজেন। আজ একজন বিশেষজ্ঞ বলে দিলেন, দোষ তার না, দোষ একটা অণুর। রোগটা তার চরিত্রে না, রক্তে।
এই দৃশ্যটা গত চল্লিশ বছরে পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটিবার ঘটেছে। প্রায় হুবহু একই সংলাপে। আর এই গোটা দৃশ্যটাই দাঁড়িয়ে ছিল এমন একটা তত্ত্বের উপর, যেটা কোনোদিন প্রমাণিত হয়নি।
২০২২ সালের জুলাইয়ে সেই তত্ত্বের ভিত আনুষ্ঠানিকভাবে ধসে পড়ে।
➖
গল্পটা কোথা থেকে শুরু, সেটা আগে বলি।
১৯৬৫ সাল। মার্কিন মনোরোগবিজ্ঞানী জোসেফ শিল্ডক্রাউট একটা অনুমান হাজির করলেন, বিষণ্নতা হয়তো মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিকের ঘাটতির সঙ্গে জড়িত। অনুমান, নিছক। এর বেশি কিছু তিনি দাবি করেননি।
বরং তার সেই প্রবন্ধে একটা বাক্য আছে, যেটা পরের ষাট বছরে প্রায় কেউ মুখেও আনেনি। শিল্ডক্রাউট নিজেই লিখেছিলেন, ওষুধ কাজ করলেও ওষুধ দেখে রোগের কারণ আন্দাজ করা যায় না। হাতে যা তথ্য আছে, তাতে এই অনুমান প্রমাণও করা যায় না, খারিজও করা যায় না।
অর্থাৎ যাকে এই তত্ত্বের জনক বলা হয়, তিনিই জন্মের সময় সাবধান করে দিয়েছিলেন, এটা নিছক একটা সম্ভাবনা, সত্য বলে ধরে নেবেন না।
কেউ শোনেনি। পরের চার দশকে এই অপ্রমাণিত সম্ভাবনাটাই হয়ে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক একটা বাক্য। আর তার উপর দাঁড়িয়ে গেল বছরে পনেরো বিলিয়ন ডলারের ওষুধের বাজার।
➖
তত্ত্বটার সৌন্দর্য ছিল তার সরলতায়।
বিষণ্নতা একটা জটিল জিনিস। কারও চাকরি নেই, কারও সংসার ভেঙেছে, কেউ একা, কেউ ঋণে ডুবে, কেউ জানেই না কেন তার খারাপ লাগে। এই গোটা জট একটা বাক্যে কেটে যেত, আপনার সেরোটোনিন কম।
এই এক বাক্যে রোগীর কাঁধ থেকে বোঝা নেমে যায়। তার কোনো দোষ নেই, তার পরিবারের কোনো ব্যর্থতা নেই, সমাজের কোনো ভূমিকা নেই, তার জীবনযাপন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু একটা মাপ কম, আর একটা ট্যাবলেট সেই মাপ ঠিক করে দেবে।
কিন্তু ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জোয়ানা মনক্রিফ ও তার সহকর্মীরা এই তত্ত্বের পক্ষে যত বড় বড় গবেষণা ছিল, সব এক জায়গায় জড়ো করলেন।
ছয়টা আলাদা ক্ষেত্রের সেরা প্রমাণ ঘেঁটে তারা ‘মলিকিউলার সাইকিয়াট্রি’ জার্নালে যা লিখলেন, তা এক লাইনে দাঁড়ায়, বিষণ্নতার সঙ্গে সেরোটোনিনের ঘাটতির সম্পর্কের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
গবেষণাপত্রটা ওয়েবসাইট থেকে দশ লক্ষবারের বেশি নামানো হলো। সাধারণ মানুষ থ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তত অবাক হননি। কারণ তারা অনেকেই জানতেন। যেটা ভাঙল, সেটা আসলে ভেতরে ভেতরে অনেক আগেই ফোঁপরা হয়ে গিয়েছিল।
➖
এইখানে এসেই গল্পটা অস্বস্তিকর একটা মোড় নেয়। প্রশ্নটা তখন আর ‘তত্ত্বটা কি ভুল’ থাকে না। প্রশ্নটা হয়, “যারা এটা প্রচার করেছিলেন, তারা কি জানতেন না এটা প্রমাণহীন?”
তথ্য বলছে, জানতেন।
একদল গবেষক ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত মনোরোগবিজ্ঞানের পেশাদার লেখালেখি ঘেঁটে দেখলেন, বিশেষজ্ঞরা আসলে এই তত্ত্বে কতটা আস্থা রাখতেন। যা পেলেন তা চমকে দেওয়ার মতো। একাডেমিক জগৎ এই সরল সেরোটোনিন-তত্ত্বকে কোনোদিনই পুরো বিশ্বাস করেনি, দুই হাজার সালের মধ্যেই তারা এটা মোটামুটি ছেড়ে দিয়েছিল।
মানে পর্দার পেছনে বিজ্ঞানীরা তত্ত্বটা বাতিলই করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পর্দার সামনে, রোগীর কাছে, সেই ঘরের ভেতরে যেখানে উনিশ বছরের তরুণ বসে আছেন, বার্তাটা একই রকম উজ্জ্বল রইল আরও বিশ বছর।
কেন রইল, তার একটা অকপট জবাব দিয়েছেন মনক্রিফ। আশির দশকে প্রথম ‘এসএসআরআই’ বা ‘প্রোজ্যাক’ ধরনের ওষুধগুলো বাজারে আসার ঠিক আগে ‘বেনজোডায়াজেপিন’ নামের একটা ওষুধের বদনাম হয়ে গিয়েছিল, নিছক অনুভূতি ভোঁতা করে দেওয়ার ট্যাবলেট হিসেবে।
ওষুধ-শিল্প বুঝল, নতুন ট্যাবলেট ওই একই কায়দায় বেচা যাবে না।
তাই মানুষকে আগে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার ভেতরে একটা রোগ বাসা বেঁধে আছে, আর সেই রোগের জন্যই ট্যাবলেটটা খেতে হবে। রোগ ছাড়া ওষুধ বেচা মুশকিল। সুতরাং আগে রোগটাই বানানো হলো।
➖
এই বানানোর কাজটা কেমন দেখতে ছিল, সেটা তখনকার বিজ্ঞাপনগুলোতেই ধরা আছে।
নব্বইয়ের দশকে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া এক তথ্যপত্রে সোজা লেখা ছিল, সেরোটোনিন কমে গেলে আপনি বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। লেক্সাপ্রো নামের ওষুধের বিজ্ঞাপন বলত, বিষণ্ন আর উদ্বিগ্ন মানুষের সেরোটোনিনের ভারসাম্য নষ্ট থাকে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল জোলফট নামের ওষুধের টিভি-বিজ্ঞাপন। সেখানে একটা বিষণ্ন গোল বল, মুখ ভার করে গড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তার মাথার উপরে ছোট্ট একটা কালো মেঘ। পাশে লেখা ফুটে ওঠে, তার মাথার রসায়ন গোলমেলে। তারপর ট্যাবলেট খাওয়ার পরে সেই বলটাই লাফাচ্ছে, প্রজাপতি উড়ছে চারপাশে।
গোটা তত্ত্বটা একটা কার্টুন বলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, যাতে বাচ্চাও বোঝে।
একজন সমালোচক পুরো ব্যাপারটা এক লাইনে ধরেছিলেন, ওই গল্পটা সরিয়ে নিলে বিপণন বিভাগের হাতে বলার মতো আর কিছুই থাকে না। কারণ কেমিক্যাল ইমব্যালান্সের গল্প বাদ দিলে ‘এসএসআরআই’ নিছক আরেকটা মুড বদলে দেওয়া রাসায়নিক, ঠিক সেই আগের ওষুধটার মতোই, যার বদনাম থেকে পালাতে গল্পটা বানানো হয়েছিল।
গল্পটাই ছিল আসল পণ্য। ট্যাবলেট ছিল উপলক্ষ মাত্র।
আর গল্পটা এমন খেটেছিল যে আজও পাঁচজনে চারজনের বেশি মানুষ বিশ্বাস করেন, বিষণ্নতা মানে মাথার রসায়নের গোলমাল। ‘প্রোজ্যাক’ বেচা হয়েছিল নব্বইয়ের বেশি দেশে। ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খাচ্ছিলেন, ২০১৬-তে সংখ্যাটা প্রায় দ্বিগুণ, দশ কোটি।
একটা আন্দাজের উপর দাঁড়িয়ে মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপণন-অভিযানগুলোর একটা।
➖
এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন, তত্ত্ব ভুল হোক, গল্প বানানো হোক, ওষুধটা যদি কাজ করে তাহলে আর আপত্তি কীসের? ভুল কারণ দেখিয়েও যদি ঠিক ওষুধ বেচা হয়, ক্ষতি কী?
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই সবচেয়ে বিব্রতকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী আরভিং কার্শ কোম্পানিগুলোর জমা দেওয়া পরীক্ষার ফল নিয়ে বসলেন। শুধু ছাপা-হওয়া ফল না, চেপে-রাখা ফলও, যেগুলো আশানুরূপ না হওয়ায় কোম্পানি কোনোদিন ছাপায়নি। মার্কিন ওষুধ প্রশাসনের কাছে জমা পড়া সব ফাইল তিনি ঘেঁটে দেখলেন।
দুটো জিনিস বেরিয়ে এলো।
এক, জমা পড়া পরীক্ষার মাত্র তেতাল্লিশ শতাংশ ওষুধটাকে চিনির ট্যাবলেটের চেয়ে ভালো দেখাতে পেরেছিল। বাকি সাতান্ন শতাংশ ছিল ব্যর্থ, যার বড় অংশ কোনোদিন আলোর মুখ দেখে নাই।
দুই, এবং এটাই আসল ঘা, ওষুধ খেয়ে রোগীর যতটা উপকার হয়, তার বিরাশি শতাংশ চিনির ট্যাবলেট খেয়েও হয়। মানে নকল ট্যাবলেট খাইয়েও আসল ওষুধের প্রায় সমান ফল। আসল আর নকলের ফারাক বিষণ্নতা মাপার স্কেলে দুই পয়েন্টেরও কম, যাকে ডাক্তারি অর্থে অর্থপূর্ণ বলা কঠিন।
কার্শ তার বইয়ের নাম দিলেন ‘দ্য এম্পারর্স নিউ ড্রাগস’, রাজার নতুন পোশাক। সেই রূপকথার ছেলেটার মতো, যে ভরা রাজসভায় বলে দিয়েছিল, রাজার গায়ে তো কোনো পোশাকই নেই।
এখানে একটা কথা সততার খাতিরে বলে রাখা দরকার, নইলে ছবিটা একপেশে হয়ে যায়। কার্শের ব্যাখ্যা সবাই মানেননি, তার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গভীর, তীব্র বিষণ্নতায় ওষুধে সত্যিকারের উপকার হয় বলে অনেক গবেষণায় ইঙ্গিত আছে, আর যাদের কাজ হচ্ছে তাদের হঠাৎ ওষুধ ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। কার্শ নিজেও ঠিক তা-ই বলেছেন। প্রশ্নটা ‘ওষুধ কাউকে সাহায্য করে কি না’ তা নিয়ে না। প্রশ্নটা, কেন করে, আর কতটা করে।
➖
এই ‘কেন’ প্রশ্নটার ভেতরে ধরা পড়ে গল্পটার আসল তাৎপর্য। সেটা বোঝার জন্য ওই উনিশ বছরের তরুণের ঘরে আরেকবার ফিরে যাওয়া দরকার।
মনে করেন, ডাক্তার তাকে অন্য একটা কথা বলতে পারতেন। বলতে পারতেন, তোমার যে চাকরি নেই, ভবিষ্যৎ অন্ধকার, প্রতি রাতে ভাড়ার চিন্তায় ঘুম আসে না, তোমার মন ভেঙে পড়াটা সেই বাস্তবতার একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু কেমিক্যাল ইমব্যালান্সের গল্প এই গোটা বাস্তবতাটাই মুছে দেয়। সে বলে, সমস্যা তোমার বাইরের দুনিয়ায় নয়, তোমার মাথার ভেতরে। তোমার কাজের শর্তে নয়, তোমার স্নায়ুরসে।
এই সরানোটা নিরীহ না। কারণ এতে একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন চুপচাপ একটা ডাক্তারি প্রশ্নে বদলে যায়। যে অসন্তোষ ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলতে পারত, তাকে বানিয়ে দেওয়া হয় একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের খুঁত। তখন দাওয়াই আর ন্যায্য মজুরি না, নিরাপদ কাজ না, বিশ্রাম না, একটা দৈনিক ট্যাবলেট।
এই বদলের মধ্যে একটা নিখুঁত ব্যবসায়িক যুক্তি লুকানো। সামাজিক অসুখের সমাধান খরচসাপেক্ষ আর ধীর, তার জন্য নীতি বদলাতে হয়, ক্ষমতার ভাগ নাড়াতে হয়। ট্যাবলেটের সমাধান দ্রুত, ব্যক্তিগত, এবং সবচেয়ে বড় কথা, বিক্রয়যোগ্য।
একটা সমাজ যদি একবার মেনে নেয় দুঃখের উৎস স্নায়ুরসে, তবে সেই সমাজ দুঃখটাকেও বাজারব্যবস্থায় বদলে ফেলতে পারে।
তার একটা মাশুল আছে, যেটা টাকায় মাপা যায় না। গবেষণা বলছে, যারা বিশ্বাস করেন তাদের বিষণ্নতা নিছক রসায়নের গোলমাল, তাদের সেরে ওঠার সম্ভাবনা অনেক কম।
তারা নিজেকে বেশি দোষ দেন, বেশি কলঙ্ক বোধ করেন, আর ভাবেন নিজের অবস্থার উপর তাদের কোনো হাত নেই, কারণ দোষ তো ওই বেয়াড়া অণুর, যেটা তিনি নিজে বদলাতে পারবেন না।
গল্পটা তাই শুধু ট্যাবলেট বেচেনি। একটা নীরবতাও বেচেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ শিখেছে, তার ভেঙে পড়ার জন্য দায়ী সে নিজে, তার খুঁতযুক্ত মস্তিষ্ক, তার বেয়াড়া রসায়ন, বাইরের কোনো ব্যবস্থা না।
➖
তাহলে ২০২২ সালের সেই গবেষণার পরে আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে?
এখানে সাবধান হওয়া দরকার, কারণ এই গল্পের দুই পাড়েই খাদ। এক পাড়ে সরল ব্যবসায়িক রূপকথা, বিষণ্নতা মানে কম সেরোটোনিন, ট্যাবলেট খেলেই খেল খতম। এই গল্প ভেঙেছে, ভালো হয়েছে।
কিন্তু উল্টো পাড়ে আরেকটা সরলীকরণ ওত পেতে আছে, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট মানেই বিষ, ওষুধ মানেই ধাপ্পা। এটাও সমান বিভ্রান্তিকর, বরং বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটা সত্যিকারের রোগীকে দরকারি চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
যে তরুণের ওষুধে সত্যিই উপকার হচ্ছে, এই লেখা পড়ে সে যেন বড়ি ছুঁড়ে না ফেলে, সেটাই সবচেয়ে জরুরি অনুরোধ।
সত্যিটা অস্বস্তিকরভাবে ঠিক মাঝখানে। ওষুধ কারও কারও উপকার করে, বিশেষত গভীর সংকটে। কিন্তু কেন করে, তা আজও আমরা জানি না। যে ব্যাখ্যা চল্লিশ বছর ধরে দেওয়া হয়েছিল, সেটা ভুল ছিল। নতুন কোনো পুরো ব্যাখ্যা এখনো হাতে নেই।
ঠিক এইখানে আসল প্রশ্নটা ফিরে আসে, ওষুধের দিকে নয়, গল্পের দিকে। একটা নিছক আন্দাজকে চল্লিশ বছর ধরে প্রমাণিত সত্য বলে চালানো গেল কী করে? খোদ তত্ত্ব-প্রণেতার সাবধানবাণী চাপা পড়ল কী করে? পর্দার পেছনে বাতিল হয়ে যাওয়া একটা ধারণা পর্দার সামনে জ্বলজ্বল করল কীসের জোরে?
জবাবটা বিজ্ঞানের ইতিহাসে নেই। আছে বাজারের ইতিহাসে।
শিল্ডক্রাউট ১৯৬৫ সালে বলেছিলেন, এটা প্রমাণও করা যায় না, খারিজও করা যায় না। বিজ্ঞান সেই বাক্যটাকে সম্মান করতে পারত, অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে পারত। বাজার পারল না। বাজারের একটা পাকা গল্প দরকার ছিল, কারণ অনিশ্চয়তা বিক্রি হয় না।
তাই আন্দাজকে বানানো হলো সত্য। প্রশ্নকে উত্তর, দ্বিধাকে স্লোগান, আর একটা খোলা বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসাকে বছরে পনেরো বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
সেই উনিশ বছরের তরুণ, যিনি ডাক্তারের ঘর থেকে স্বস্তি নিয়ে বেরিয়েছিলেন, তাকে আসলে একটা ওষুধ দেওয়া হয়নি শুধু। একটা গল্প দেওয়া হয়েছিল। নিজের দুঃখকে কীভাবে বুঝবেন, সেই ব্যাখ্যাটা তার হাত থেকে নিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছিল অন্য কারও হাতে।
চল্লিশ বছর ধরে সেই ব্যাখ্যার মালিক ছিল একটা কোম্পানির বিপণন বিভাগ। এখন ভিত ভেঙেছে। ব্যাখ্যার মালিকানা এখনো ফেরত আসেনি।
তথ্যসূত্র
১. Moncrieff J, Cooper RE, Stockmann T, Amendola S, Hengartner MP, Horowitz MA. “The serotonin theory of depression: a systematic umbrella review of the evidence.” Molecular Psychiatry 28, 3243–3256 (2023) — https://www.nature.com/articles/s41380-022-01661-0
২. Moncrieff J, Cooper RE. “Is the chemical imbalance an ‘urban legend’? An exploration of the status of the serotonin theory of depression in the scientific literature.” SSM – Mental Health (2022) — https://www.sciencedirect.com/…/pii/S266656032200038X
..
প্লাসিবো ও চেপে-রাখা ট্রায়াল
৩. Kirsch I. “Antidepressants and the Placebo Effect.” Zeitschrift für Psychologie 222(3):128–134 (2014) — https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC4172306/
৪. Kirsch I, et al. “Initial severity and antidepressant benefits: a meta-analysis of data submitted to the FDA.” PLoS Medicine (2008) — https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/31249537/
৫. Kirsch I. The Emperor’s New Drugs: Exploding the Antidepressant Myth. Basic Books (2010)
..
শিল্ডক্রাউটের সতর্কবার্তা ও তত্ত্বের ইতিহাস
৬. Pies R. “Debunking the Two Chemical Imbalance Myths, Again.” Psychiatric Times — https://www.psychiatrictimes.com/…/debunking-two… (১৯৬৫-এর শিল্ডক্রাউট উদ্ধৃতি এখানে)
৭. Pies R. “Doctor, Is My Mood Disorder Due to a Chemical Imbalance?” Psychiatric Times — https://www.psychiatrictimes.com/…/doctor-my-mood…
..
বিপণন ও বিজ্ঞাপন
৮. Lacasse JR, Leo J. “The Media and the Chemical Imbalance Theory of Depression.” Society (2007) — https://link.springer.com/article/10.1007/s12115-007-9047-3 (লেক্সাপ্রো বিজ্ঞাপন, “বিপণন বিভাগের হাতে কিছুই থাকে না”)
৯. “Doctors Stopped Believing in the ‘Chemical Imbalance’ Theory. But They Didn’t Tell Us.” Mad in America (2022) — https://www.madinamerica.com/…/doctors-stopped…/ (মনক্রিফের বেনজো-উদ্ধৃতি)
১০. Slate. “Why has the misleading chemical imbalance theory of mental illness persisted for so long?” (2022) — https://slate.com/…/ssris-chemical-imbalance-depression…
…
বিশ্বাসের ফল ও রোগমুক্তি
১১. Healy D. “When doctors mislead; the chemical imbalance lie.” — https://davidhealy.org/…/When-doctors-mislead-the… (৯১.৬% মানুষ তত্ত্বটা জানে; যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের prognosis খারাপ, বেশি আত্ম-দোষারোপ ও কলঙ্কবোধ; উনিশ বছরের রোগীর চেম্বার-বিবরণ)
..
সংখ্যা
১২. University of Michigan LSA. “With ‘Chemical Imbalance’ Theory in Doubt, What’s Next for Depression Care?” (2022) — https://lsa.umich.edu/…/with–chemical-imbalance… (পাঁচে চারজনের বিশ্বাস)
১৩. ব্যবহারকারীর সংখ্যা (২০০৫-এ সাড়ে পাঁচ কোটি, ২০১৬-তে দশ কোটি) ও ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার — CCHR-এর সংকলন থেকে: https://www.cchrint.org/…/cchr-lauds-study-disproving…/