হলিউডের কারখানায় মানুষের গল্প বলার নির্মাতা মার্টিন স্করসেজি

চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতা দর্শক ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। কখনো এটাও হয় যে, কোনো একটা ঘটনার সমীকরণ দর্শক এমন এক অর্থে গ্রহণ করলেন, যেই অর্থে পরিচালক সেটা বানান নাই।

এই যে অর্থপ্রদানের পারস্পরিক অবারিত এলাকা, এর গুরুত্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা নাই, গল্পের প্রবাহে সমূহ ঝুঁকির সম্ভাবনা, এর মধ্যেই গল্পটা শেষ হয়, বের হয়ে আসার পর দর্শক রাস্তায় হাঁটছেন, অথচ চিন্তার জগতে হারিয়ে আছেন একটু আগেই দেখে আসা চরিত্রের মুখ।

প্রচণ্ড ঝড় বইছে, বাবা বাইরে গেছেন, আর প্রতিবেশীশূন্য নতুন বাড়িতে সে একা, কেবলই একা। সেই অনুভূতি রাস্তার ভীড়েও দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে।

আবার এমনও হতে পারে, দর্শক বিস্ফোরণ দেখলেন, উড়ন্ত মানুষ দেখলেন, শহর নগর ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেখলেন, এই সকল কিছুর হিসাব মিলিয়ে বেরও হয়ে আসলেন। কিন্তু বের হলেন সেই রাস্তায়ই, যেই রাস্তা থেকে আড়াই ঘণ্টা আগে প্রেক্ষাগৃহে ঢুকেছিলেন তিনি।

দুইটাই চলচ্চিত্র। কিন্তু, দুইটা কি একই জিনিস? চলচ্চিত্রের একই ধারা?

হলিউডের জন্য এটা খুবই অস্বস্তিকর প্রশ্ন। এই প্রশ্নটা সবচেয়ে জোরে, সবচেয়ে জেদ ধরে তুলতে পেরেছেন যিনি, তিনি হলিউডের গুণী নির্মাতা মায়েস্ত্রো মার্টিন স্করসেজি।

স্করসেজিকে অনেকে চেনেন গ্যাংস্টার ছবির নির্মাতা হিসেবে।

রক্ত, গুলি, মাফিয়া, নিউইয়র্কের অন্ধকার গলি এইসবই তার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু। কিন্তু যারা তাকে গভীরভাবে জানেন, তারা বুঝতে পারেন এই মানুষটার আসল পরিচয় এইভাবে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

আরেকজন মায়েস্ত্রো আকিরা কুরোসাওয়া, তিনি তার ‘ড্রিমস’ ছবিতে ভিনসেন্ট ভ্যান গগের চরিত্রে যাকে অভিনয় করালেন, তিনি স্করসেজি। সেই গল্প বলার আগে আরেকটা ব্যাপার বলে নেওয়া যায়।

এই যে মানুষের মনে বহু অর্থের খেলা, এটা রশোমন-এ কুরোসাওয়া দেখিয়েছেন দারুণভাবে।

শুরুতেই দেখা যায় ভগ্নস্তূপের ছবি। একসময় মহিমান্বিত কোনো প্রাসাদ ছিলো হয়তো, এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। ঝড়ের আভাস দিয়ে ছবি শুরু হয়। তারপর ঘটনার বিবরণ।

একটি খুন। সামুরাই কি তার স্ত্রীর প্রেমিকের হাতে নিহত হয়েছেন? নাকি তিনি নিজেই আত্মহত্যা করেছেন? আমরা সেই একই ঘটনার তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা পাই তিনজনের মুখ থেকে।

মৃত্যুর পর বলা কথায় খুনের শিকার সামুরাইয়ের, তার স্ত্রীর এবং ডাকাতের।

তিনজনের বক্তব্যই পরস্পর সাংঘর্ষিক। এখানে কুরোসাওয়া একই ঘটনার তিনটি রূপকথা তুলে ধরছেন দর্শকের সামনে। যেন বলছেন, সত্য চোখের সামনে নাই, সত্য থাকে আড়ালে।

প্রত্যেকে নিজের সুবিধা মত ঘটনাকে বলে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়। তাহলে সত্যটা কী? কে নির্দোষ আর কে দোষী?

কুরোসাওয়া বহু অর্থের সম্ভাবনা রেখেছেন ছবিটার প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি সংলাপে। কোনো একটা বর্ণনাকে চূড়ান্ত সত্য বলে দাবি করেন নাই। বরং যত্ন করে এড়িয়ে গেছেন।

সিনেমা শেষ হয়ে গেলেও দর্শক ভাববেন, হয়েছিলো কী আসলে? এমনকি শুরুতে যে ভগ্নস্তূপের ছবি দেখানো হয়েছিলো, সেটাও কি সেই প্রাসাদের সত্যিকারের চেহারা? নাকি তাও একটা রূপক?

প্রশ্নের উত্তর নাই। আছে বহু অর্থের, বহু সম্ভাবনার জগৎ।

কুরোসাওয়ার মৃত্যুর পর স্করসেজি লিখেছিলেন। কুরোসাওয়া প্রমাণ করেছেন, সিনেমা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে আমরা সবাই একই গল্পের অংশ, একই মানবতার স্রোতে বহমান।

এইবার, স্করসেজির অভিনয়ের গল্পটা বলি।

স্করসেজি ও কুরোসাওয়ার দেখা হয় ১৯৯০ সালে। সেই সময় কুরোসাওয়া তার ‘ড্রিমস’ ছবির জন্য চিত্রনাট্য লিখছিলেন। কুরোসাওয়ার প্রথম পছন্দ ছিল স্করসেজিকে দিয়েই ভ্যান গগের চরিত্রটা করানো।

স্করসেজিও দ্বিধা করলেন না। গ্রীষ্মে তিনি জাপান গেলেন। কিন্তু শুটিং শুরুর কিছুদিন আগে কুরোসাওয়া হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন স্করসেজি প্রতিদিন সকালে কুরোসাওয়ার বাড়ি যেতেন, বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। তারপর হাসপাতালে গিয়ে কুরোসাওয়ার সঙ্গে দেখা করতেন।

এভাবেই চলতে থাকে কয়েকদিন।

শেষমেশ কুরোসাওয়া সুস্থ হলেন। দুই মায়েস্ত্রো একসঙ্গে কাজ শুরু করলেন। যেখানে স্করসেজি ছিলেন অভিনেতার চরিত্রে আর কুরোসাওয়া পরিচালকের ভূমিকায়।

শুটিং শেষে দুজনে প্রায়ই বসতেন একসঙ্গে। কুরোসাওয়া বলতেন তার নানা অভিজ্ঞতার কথা। একদিন তিনি স্করসেজিকে বললেন, “আমাদের চলচ্চিত্রের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমরা কিন্তু একই জিনিস নিয়ে কথা বলি। মানুষের কথা। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

হলিউডের অস্বস্তি এইখানটাতেই। কুরোসাওয়া যেই ‘মানুষের কথা’ বলার তাগাদা অনুভব করেন, হলিউডের পদ্ধতি তার চেয়ে ভিন্ন। সিনেমার ইতিহাসে হলিউড এক বিরাট যন্ত্র। দক্ষ ও মুনাফাচালিত, সর্বদা মানুষের কথা বলার দায় তার নাই।

থিওডোর এডোর্নো ও ম্যাক্স হর্খেইমার তাদের ‘ডায়ালেক্টিক অব এনলাইটেনমেন্ট’-এ এই যন্ত্রটির নাম দিয়েছিলেন ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ তথা সংস্কৃতি কারখানা।

তারা দেখিয়েছিলেন, যখন বিনোদন একটি শিল্পকারখানায় পরিণত হয়, তখন শিল্পকলা একটি মানসম্মত পণ্য হয়ে ওঠে বটে, তাতে বৈচিত্র্যের ভান থাকে, কিন্তু সারবস্তু একই। যে, ভোক্তাকে যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, প্রতিবারই তা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

তবে আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি মার্টিন স্করসেজিকে যদি আমরা বুঝতে চাই, তাহলে আমাদের তাকাতে হবে আরেকটু পেছনে, গভীর দৃষ্টিতে। লিটল ইটালির সেই ছেলেটার দিকে। কেবল কালচার ইন্ডাস্ট্রি বা হলিউডের একজন নির্মাতার পরিচয়ে নয়।

মার্টিন চার্লস স্করসেজি জন্মেছিলেন ১৯৪২ সালের ১৭ নভেম্বর, নিউইয়র্কের কুইন্সে। বাবা লুচিয়ানো চার্লস কাপড়ের কারখানায় প্রেসার, মা ক্যাথরিন সেই একই শিল্পে সিমস্ট্রেস। সিসিলীয়-আমেরিকান পরিবার।

সাত বছর বয়সে আর্থিক চাপে পরিবার কুইন্সের তুলনামূলক স্বস্তি ছেড়ে চলে আসে ম্যানহাটনের লোয়ার ইস্ট সাইডে, এলিজাবেথ স্ট্রিটের একটি ঘিঞ্জি অ্যাপার্টমেন্টে, লিটল ইটালি।

স্করসেজি পরে বলেছিলেন, সেখানে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ ছিলো। কোনো কথা বলা যেতো না।

তার ছিলো তীব্র অ্যাজমা। বাইরে সবধরনের খেলাধুলা নিষেধ ছিলো। সমবয়সীরা যখন রাস্তায় দৌড়াচ্ছে, মারামারি করছে, তিনি তখন জানালায় বসে বসে দেখছেন। তার পালানোর পথ ছিলো সিনেমা। বাবা তাঁকে নিয়মিত হলে নিয়ে যেতেন।

টেলিভিশনে দেখতেন ওয়েস্টার্ন, যুদ্ধের ছবি এবং ঐতিহাসিক নাটক। ‘সিটিজেন কেইন’, ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’, ‘ইস্ট অব ইডেন’-এর মতো চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের সেরা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বড় হলেন।

১৯৭৪ সালে, ততোদিনে তিনি নির্মাতা, স্করসেজি একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ক্যামেরা নিয়ে ফিরে গেলেন এলিজাবেথ স্ট্রিটের সেই অ্যাপার্টমেন্টে, বসিয়ে দিলেন নিজের বাবা-মায়ের সামনে। ছবির নাম ‘ইতালিয়ানআমেরিকান’।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চার্লস আর ক্যাথরিন স্করসেজি গল্প করছেন। শৈশবের গল্প, সিসিলি থেকে আসা মানুষদের গল্প, অভাবের গল্প, রান্নার গল্প। মা সস রাঁধছেন আর কথা বলছেন। বাবা এক জায়গায় বললেন, “আগেকার মানুষ ভালো গল্প বলতো, কারণ তখন রেডিও-টেলিভিশন ছিলো না।”

এই সামান্য ডকুমেন্টারিই আসলে স্করসেজির ভাবনার জগতটাকে খুব কাছ থেকে দেখায়। তার ক্যামেরার প্রথম ও সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়বস্তু ছিলো তার নিজের মানুষ। তাদের মুখ, তাদের ভাষা, তাদের হাতের রান্না।

স্করসেজি পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে ছবি বানিয়ে এসেছেন। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি বারবার এমন ছবি বানিয়েছেন যা দর্শককে আরামের বদলে অস্বস্তির দিকে ঠেলে দেয়।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর সেই দৃশ্যটা নিশ্চয়ই মনে আছে। ট্র্যাভিস বিকল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কোমরে পিস্তল, নিজের প্রতিবিম্বকে প্রশ্ন করছে, “তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলছ?”

এখানে আর কেউ নাই, তাই সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ। দৃশ্যটা লেখা ছিল না চিত্রনাট্যে, ডি নিরো ইম্প্রোভাইজ করেছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তেই একটা গোটা শহরের একাকীত্ব ধরা পড়ে যায়।

দর্শক এখানে বিনোদিত হন না, অস্বস্তিতে পড়েন। কারণ পর্দায় যে লোকটা নিজের সঙ্গে কথা বলছে, তার সঙ্গে দর্শকের দূরত্ব ততটা বেশি না যতটা তিনি আশা করেছিলেন।

‘গুডফেলাজ’-এ আরেকটা দৃশ্য আছে, যেটা প্রায় প্রত্যেক চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী ভেঙে ভেঙে দেখেছেন।

হেনরি হিল কারেনকে নিয়ে কোপাকাবানা ক্লাবে যাচ্ছে। সামনের দরজায় লম্বা লাইন, কিন্তু হেনরি তাকে নিয়ে যায় পেছনের দরজা দিয়ে, রান্নাঘরের ভেতর দিয়ে, করিডোর ধরে, ওয়েটাররা সরে দাঁড়াচ্ছে, সবাই তাকে চেনে।

ক্যামেরা একটানা যাচ্ছে, কোনো কাট নাই, প্রায় তিন মিনিট। ভেতরে ঢুকতেই সামনের সারিতে টেবিল পাতা হয়ে যায় তাদের জন্য। কারেন মুগ্ধ হয়ে তাকায়, জিজ্ঞেস করে, “তুমি কী করো?” দর্শকও ঠিক কারেনের মতোই মুগ্ধ হয়ে যান।

এখানেই স্করসেজির কারিশমা। তিনি অপরাধ জগতের প্রলোভনকে সমালোচনা করে দেখান না, তিনি সেই প্রলোভনটা দর্শককে অনুভব করান। যাতে ছবির শেষে যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে, দর্শক বুঝতে পারেন তিনি নিজেও একটু আগে ঠিক ওই ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন।

এটাই থিম পার্কের বিপরীত। থিম পার্কের রাইড আপনাকে ভয় দেখায়, কিন্তু নিরাপদে। আপনি জানেন বেল্ট বাঁধা আছে, জানেন শেষে নেমে আসবেন অক্ষত। স্করসেজির ছবিতে সেই বেল্ট নাই।

তাই ২০১৯ সালে যখন এম্পায়ার ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে স্করসেজি মার্ভেলের ছবিগুলো নিয়ে কথা বললেন, কথাগুলো তার জীবনভর করা কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো। তিনি বললেন, তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন দেখতে, কিন্তু এগুলো তো সিনেমা নয়, এগুলো থিম পার্ক।

এটা সেই সিনেমা নয় যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে তার আবেগময়, মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তিনি আরও স্পষ্ট করে বললেন যে, সিনেমা হলগুলো এসব দিয়ে ইনভেইডেড হচ্ছে, ন্যারেটিভ ফিল্মের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

নভেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমসে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখলেন। সেখানে তিনি বললেন, “ফ্র্যাঞ্চাইজ ছবিগুলো মার্কেট-রিসার্চড, অডিয়েন্স-টেস্টেড, ভেটেড, মডিফায়েড। যতক্ষণ না ভোগের জন্য প্রস্তুত।”

স্করসেজি আরও বললেন, “সিনেমা মানে উদ্ঘাটন, মিস্ট্রি, জেনুইন ইমোশনাল ডেঞ্জার। মার্ভেলে এগুলো নেই। সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা, কোনো ঝুঁকি নেই।”

এই কথাগুলো বিতর্কের ঝড় তুলেছিলো। জেমস গান, জস হুইডন, স্যামুয়েল এল জ্যাকসন সবাই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।

ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ১৯৩৫ সালে লিখেছিলেন, শিল্পকর্মের একটা ‘অরা’ থাকে। একটা আভা। আলোর একটা বিচ্ছুরণ, অনুভবযোগ্য কিন্তু স্পর্শের বাইরে। তার অনন্য উপস্থিতি, তার ‘এখানে ও এখন’, তার সত্যতা।

যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনে সেই অরা ক্ষয়ে যায়। মূল শিল্পকর্মের যে একবারই ঘটে যাওয়া, পুনরুৎপাদন-অযোগ্য মুহূর্ত, সেটাই অরা। বেঞ্জামিন বলেছিলেন, পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পের আচারিক ভিত্তি নষ্ট হয় এবং তার সত্যতার সমগ্র ধারণাটাই কেঁপে ওঠে।

স্করসেজি যখন বলেন সিনেমায় উদ্ঘাটন, মিস্ট্রি ও জেনুইন ইমোশনাল ডেঞ্জার থাকতে হবে, তিনি কি এই অরার কথা বলছেন না?

ফ্র্যাঞ্চাইজ ছবিতে এটার বাধ্যবাধকতা নাই কারণ সবকিছু একটা ফর্মুলা মেনে চলে, ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নাই, প্রতিটি ছবি আগেরটার পুনরুৎপাদন। অরা সেখানে টিকে থাকতে পারে না।

‘রেজিং বুল’-এর বক্সিং দৃশ্যগুলোর কথা ভাবুন। সাদা-কালোয় শুট করা, স্লো মোশনে ঘুষি পড়ছে, রক্ত ছিটকে যাচ্ছে ক্যামেরার দিকে, শব্দে বন্য পশুর গর্জন মিশিয়ে দেওয়া।

কিন্তু এটা কোনো ক্রীড়া চলচ্চিত্র নয়। জ্যাক লামোট্টা রিংয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে মার খাচ্ছেন, হাত নামিয়ে রেখেছেন, প্রতিপক্ষকে ডাকছেন আরও মারতে। তিনি জিততে চাইছেন না, তিনি শাস্তি চাইছেন।

বাইরের জীবনে যে ঈর্ষা, যে সহিংসতা, যে সন্দেহ দিয়ে তিনি নিজের সংসার ধ্বংস করেছেন, রিংয়ের ভেতরের এই মার তারই প্রায়শ্চিত্ত।

ছবির শেষে বৃদ্ধ, স্থূল লামোট্টা ড্রেসিং রুমের আয়নার সামনে বসে নিজের সঙ্গে সংলাপ অনুশীলন করছেন। এই দৃশ্যে কোনো বিস্ফোরণ নাই, কোনো চমক নাই। আছে কেবল একজন মানুষের নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া।

তার সাম্প্রতিক ‘কিলার্স অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’-এও একই জিনিস। আশি বছর বয়সে তিনি ওসেজ জাতির গণহত্যার গল্প নিয়ে ছবি বানালেন, আমেরিকার নিজের অন্ধকার ইতিহাস খুলে ধরলেন।

ছবিতে আর্নেস্ট বার্কহার্ট প্রতিদিন তার স্ত্রী মলিকে ইনসুলিনের সঙ্গে মিশিয়ে বিষ দিচ্ছেন। সেই একই হাতে তিনি তাকে যত্ন করছেন, বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছেন, ওষুধ খাওয়াচ্ছেন।

ভালোবাসা আর হত্যা এখানে একই ভঙ্গিতে ঘটছে, একই ঘরে, একই বিছানায়।

এই ভয়াবহতা কোনো ফর্মুলায় ধরা সম্ভব না। কোনো অ্যালগরিদম এই দৃশ্য তৈরি করতে পারবে না, কারণ এর ভেতরে আছে একজন নির্মাতার আজীবনের জমানো দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক অস্বস্তি।

এই প্রসঙ্গে নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির সঙ্গে স্করসেজির সম্পর্কটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দুজনের বন্ধুত্ব ছিল প্রায় দেড় দশকের, কান ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রথম পরিচয়। স্করসেজি বলেছিলেন, কিয়ারোস্তামির ছবি দেখলে তিনি আবার সেই বিশুদ্ধতা খুঁজে পান।

‘ক্লোজ-আপ’, ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হোম?’, ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’, এসব ছবির সঙ্গে সময় কাটানো তার কাছে ছিল একটা পরিশুদ্ধি, যা তাকে মানুষকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

কিয়ারোস্তামির ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম?’ ছবির একটা দৃশ্যের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে পড়বে।

ছবির কেন্দ্রে আহমদ নামের একটি ছেলে। তার বন্ধু মোহাম্মদ রেজার নোটবুক ভুলে তার ব্যাগে চলে এসেছে। কাল স্কুলে নোটবুক না থাকলে মোহাম্মদ রেজাকে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হবে। আহমদ বন্ধুর বাড়ির ঠিকানা জানে না, শুধু জানে ওদের বাড়ি পাশের গ্রামে। সে একা বেরিয়ে পড়ে।

এরপর যা ঘটে সেটা খুবই সাধারণ। একটা ছেলে পাহাড়ি পথে ছুটছে, দরজায় দরজায় জিজ্ঞেস করছে, বড়রা তাকে পাত্তা দিচ্ছে না, ফিরিয়ে দিচ্ছে, নিজের কাজে ব্যস্ত থাকছে। কিন্তু ছেলেটা থামছে না।

এই ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত হলো সেই ফিরতে ফিরতে আসা পথের দৃশ্য। আহমদ একই পাহাড়ি ঢালে বারবার ওঠে, বারবার নামে।

কিয়ারোস্তামির ক্যামেরা তাকে দূর থেকে দেখে। ছোট্ট একটা অবয়ব, বিশাল পাহাড়ের মাঝে। কোনো নাটকীয় সংগীত নেই, কোনো ক্লোজআপ নেই। শুধু একটা শিশু আর একটা পথ।

এই দৃশ্যে ‘অরা’ কোথায়? এখানে কোনো স্পেশাল ইফেক্ট নেই, কোনো চমক নেই। আছে শুধু একটি শিশুর নৈতিক জেদ, বন্ধুকে বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে। এই জেদটা পুনরুৎপাদন করা যায় না, ফর্মুলায় বানানো যায় না।

কারণ এটা একটা নির্দিষ্ট শিশুর, একটা নির্দিষ্ট বিকেলের, একটা নির্দিষ্ট পাহাড়ের গল্প।

কিয়ারোস্তামির মৃত্যুর পর নিউইয়র্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, চার-পাঁচটা ছবি একসঙ্গে দেখার পর তার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ঠিক তেমন, যেমনটা হয়েছিল পঁয়ষট্টি বছর আগে ইতালীয় নিওরিয়ালিজমের ছবি প্রথম দেখে। জগৎ দেখার আগের চোখটাই বদলে গিয়েছিলো তার।

বেঞ্জামিনের ভাষায় বললে, কিয়ারোস্তামির ছবিতে যা আছে তা হচ্ছে অরা, সেই পুনরুৎপাদন-অযোগ্য মানবিক মুহূর্ত, যা কোনো ফর্মুলায় ধরা যায় না। স্করসেজি হলিউডের ভেতর থেকে এই অরার সন্ধান করে গেছেন সারাজীবন।

মার্টিন হাইডেগার ‘দ্য কোয়েশ্চন কনসার্নিং টেকনোলজি’-তে আধুনিক প্রযুক্তির একটা মৌলিক বিপদের কথা বলেছিলেন। তিনি একে বলেছিলেন গেশ্টেল বা এনফ্রেমিং।

আধুনিক প্রযুক্তি সবকিছুকে ‘ব্যবহারযোগ্য সম্পদ’ হিসেবে দেখতে শেখায়। নদী তখন আর নদী থাকে না, হয়ে যায় জলবিদ্যুতের উৎস। বন আর বন থাকে না, হয়ে যায় কাঠের সরবরাহ।

প্রযুক্তি নিজে মন্দ নয়, কিন্তু প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুকে শুধু কাজে লাগানোর বস্তু হিসেবে দেখলে সত্তার স্বরূপ ঢাকা পড়ে যায়।

স্করসেজি নিজে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। ‘দ্য আইরিশম্যান’-এ রবার্ট ডি নিরো, আল পাচিনো ও জো পেশিকে ডিজিটালি তরুণ করা হয়েছে ডি-এজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

কিন্তু সেই প্রযুক্তির পেছনে ছিলেন রক্তমাংসের অভিনেতারা, তাদের পঞ্চাশ বছরের অভিনয়ের অভিজ্ঞতা, তাদের মুখের ভাজে জমে থাকা জীবন।

ছবির শেষ দৃশ্যটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ফ্র্যাঙ্ক শিরান তখন বৃদ্ধাশ্রমে, হুইলচেয়ারে। যাদের সঙ্গে জীবন কেটেছে তারা সবাই মৃত। মেয়েরা কথা বলে না। বড়দিন আসছে, কিন্তু কেউ আসবে না।

নার্স চলে যাওয়ার সময় শিরান বলেন, দরজাটা একটু ফাঁক রেখে দিও। সারা জীবন যে লোক পেছন থেকে গুলি করেছে, যে লোক কখনো দরজার দিকে পিঠ দিয়ে বসেনি, সেই লোক এখন চায় দরজাটা খোলা থাকুক।

এই দৃশ্যে কোনো ডি-এজিং নেই, কোনো ভিজ্যুয়াল কারিকুরি নেই। শুধু একজন বুড়ো মানুষ আর একটা আধখোলা দরজা।

২০২৪ সালে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্করসেজি বললেন, প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া উচিত না, কিন্তু তার দাস হওয়াও উচিত না। আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব এবং সঠিক দিকে চালিত করব।

২০২৫ সালে তাওরমিনা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আরও স্পষ্ট করে বললেন, যে কোনো নতুন টুল আসুক, ব্যবহার করতে শিখুন, কিন্তু সেটা মানবিক হতে হবে, হৃদয়টা থাকতে হবে।

২০২৬ সালের জুনে তিনি ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট ল্যাবস’ নামের একটি জার্মান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানির অ্যাডভাইজার হিসেবে যোগ দিলেন। তাদের ফ্লাক্স মডেল ব্যবহার করে তার পরবর্তী ছবি ‘হোয়াট হ্যাপেনস অ্যাট নাইট’-এর স্টোরিবোর্ড তৈরি করলেন।

ছবিটিতে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও জেনিফার লরেন্স অভিনয় করছেন।

স্করসেজি সত্তর বছর ধরে নিজ হাতে স্টোরিবোর্ড এঁকে এসেছেন, এবার একটি মাধ্যম ব্যবহার করলেন যা তার মাথার ভেতরের ছবি দ্রুত ও স্পষ্টভাবে ক্রু-এর সামনে তুলে ধরতে পারে।

তিনি এটাকে বললেন ‘সৃজনশীলভাবে মুক্তিদায়ক’। আর্ট ডিরেক্টরস গিল্ড তার তীব্র সমালোচনা করলো, বললো এটা সিনেমার সহযোগিতামূলক প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।

কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করলেন প্রি-প্রোডাকশনে, স্টোরিবোর্ড আঁকার কাজে। সেই একই কাজ যা তিনি এগারো বছর বয়স থেকে করে আসছেন কাগজে-পেনসিলে।

চূড়ান্ত ছবিতে মানুষই থাকছেন। ক্যামেরার সামনে রক্তমাংসের অভিনেতা, তাদের শরীর, তাদের চোখ, তাদের অভিজ্ঞতা। হাইডেগারের ভাষায় বললে, স্করসেজি প্রযুক্তিকে এনফ্রেমিংয়ের ফাঁদে পড়তে দিচ্ছেন না, মানুষকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত হতে দিচ্ছেন না।

এখানে একটা সামঞ্জস্য দেখা যায়। ২০১৯-এ তিনি মার্ভেলকে বললেন, এটা মানুষের আবেগময় অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার সিনেমা না।

২০২৪-২৫-এ বললেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করেন কিন্তু হৃদয়টা থাকতে হবে। ২০২৬-এ নিজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতিয়ার ব্যবহার করলেন প্রিপ্রোডাকশনে। মূল কথাটা হলো, চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে মানবিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের একটি দৃশ্য ছিল মনে রাখার মতো। নির্মাতা জাফর পানাহি এসেছিলেন তার ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ নিয়ে।

কারাবাসের পর গোপনে বানানো ছবি, কানে ‘পাম দর’ জেতা ছবি। সেখানে স্করসেজির সঙ্গে তার একটি কথোপকথনের আয়োজন করা হয়েছিলো।

দুইজনে দীর্ঘ আলিঙ্গন করলেন। পানাহি স্করসেজিকে বললেন সিনেমার ঈশ্বর, মাথা নত করলেন।

পানাহি বলেছিলেন, তাকে যখন বলা হলো বিশ বছর ছবি বানানো যাবে না, লেখা যাবে না, সাক্ষাৎকার দেওয়া যাবে না, দেশ ছাড়া যাবে না, তিনি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু থামেন নাই।

স্করসেজি সেদিন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করলেন, ইরানি নির্মাতাদের ছবি দেখান, শুধু টাইলে রেখে দিয়েন না, কিউরেট করেন। মানুষকে পৌঁছে দিন এই ছবিগুলো।

এই দৃশ্যটার মধ্যে স্করসেজির পুরো জীবনের অবস্থান ফুটে আছে। তিনি হলিউডের ভেতর থেকে কাজ করেন, কিন্তু তার দৃষ্টি হলিউডের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর। কুরোসাওয়ার ছবি সংরক্ষণ করেন, কিয়ারোস্তামির ছবিতে বিশুদ্ধতা খোঁজেন, পানাহির পাশে দাঁড়ান।

কালচার ইন্ডাস্ট্রির যন্ত্র চলছে, চলবে। থিম পার্ক ছবি বানানো হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলচ্চিত্রের নানা স্তরে ঢুকে পড়বে, অ্যালগরিদম ঠিক করে দেবে দর্শক কী দেখবে।

কিন্তু ‘ইতালিয়ানআমেরিকান’-এর সেই রান্নাঘরের দৃশ্যটার কথা ভাবুন, ক্যাথরিন স্করসেজি সস রাঁধছেন, ছেলে ক্যামেরা ধরে আছে, বাবা পাশে বসে গল্প বলছেন।

কোনো বিশেষ প্রভাব নেই, কোনো ফর্মুলা নেই। শুধু কয়েকজন মানুষ, একটা ঘর, আর কিছু কথা যা হারিয়ে যেতো যদি কেউ ক্যামেরা না ধরতো।

যতোদিন মার্টিন চার্লস স্করসেজির মতো কেউ একজন সেই ক্যামেরাটা ধরে থাকবেন, ততোদিন সিনেমার ‘অরা’ টিকে থাকবে। ততোদিন মানুষের গল্প দেখবে মানুষ।

— আবদুল আহাদ তানভীর

0 FacebookTwitterEmail

মন্তব্য করুন