বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জলবায়ু-বিপদটা আসলে কী

সেপ্টেম্বর ১৯৯০। খুলনার ডুমুরিয়া।

বিল ডাকাতিয়ার মানুষ কোদাল আর শাবল নিয়ে বেড়িবাঁধের চার জায়গা কেটে ফেললেন। সরকারি নথিতে ঘটনাটার নাম টিকে আছে একটা ইংরেজি শব্দে, ‘পাবলিক কাট’।

বাঁধটা দেওয়া হয়েছিলো ষাটের দশকে, জোয়ারের নোনা পানি ঠেকিয়ে চাষ বাড়াতে। তিরিশ বছর পর বাঁধের ভিতরের নয় হাজার হেক্টর জমি বছরের পর বছর পানির নিচে। ফসল নাই, ভিটায় পানি।

কারণ বাঁধের বাইরে নদীর তলায় পলি জমতে জমতে নদী উঁচু হয়ে গেছে। ভিতরের জমি এখন নদীর চেয়ে নিচু। পানি তো নিচ থেকে উপরে ওঠে না, তাই বৃষ্টির পানি জমিতেই থেকে যায়।

বাঁধ কেটে মানুষ তখন জোয়ার ঢুকতে দিলেন। ডুবে থাকা জমিতে দিনে আরও দুইবার যেন জোয়ারের পানি ঢোকে।

জোয়ার আসে, ভাটায় আবার ফিরে যায়। যাওয়ার সময় সঙ্গের কাদাটা রেখে যায়। এই কাদা রেখে দেওয়ার কাজটাই তারা করলেন। এই অঞ্চলে কাজটার পুরানা নামও আছে, জোয়ার-ভাটা খেলানো।

এই ঘটনার চার বছর পর সরকার আবার কাটা মুখগুলি জোর করে বন্ধ করে দেয়।

বন্ধ করার পর জরিপ হলো। জোয়ার যেখানে যেখানে পৌঁছেছিলো, সেখানকার জমি উঁচু হয়ে গেছে। যেখানে পৌঁছায় নাই, সেখানে হয় নাই।

➖

বন্যার পরের জমিতে ফলন ভালো হয়। বাংলাদেশের কৃষক এই কথাটা বই পড়ে শেখেন নাই। পানি নেমে গেলে জমির উপর নরম কাদার যেই পরত থেকে যায়, কারণটা সেখানে। পলি।

ব্যাপারটা অবশ্য এক মৌসুমের সারের চেয়ে অনেক বড়। এই দেশের মাটিটাই আসলে ওই কাদার জমানো রূপ।

হিমালয় পৃথিবীর সবচেয়ে কমবয়সী পর্বতগুলির একটা, সবচেয়ে দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া পর্বতগুলিরও।

প্রতি বর্ষায় গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্র সেই ক্ষয়ে আসা মাটি বয়ে আনে। সীমান্ত পার হয়ে নদী দুইটা চলে নতুন নামে, পদ্মা আর যমুনা। গোয়ালন্দে দুইটা মিলে যায়, আর সাগরে গিয়ে পড়ে মেঘনা নাম নিয়ে।

সেই ক্ষয়ে আসা মাটির পরিমাপ নিয়ে গবেষণায় তর্ক আছে, সবচেয়ে সাবধানী হিসাবে বছরে পঞ্চাশ কোটি টন। সহজ হিসাবে একশো কোটির উপরে।

সেই মাটি সাগরে পৌঁছানোর আগে যেখানে এসে জমেছে, স্তরের উপর স্তর হয়ে উঠেছে, সেই জায়গাটার নাম বাংলাদেশ।

জমতে থাকা আজও চলছে। বর্ষার পানি জমির উপর ছড়ায়, পলি রেখে নেমে যায়, জমি ওঠে বছরে এক থেকে দুই সেন্টিমিটার।

ওঠাটা জরুরি, কারণ একই সময়ে জমি নামছেও। নরম পলিমাটি নিজের ভারে চাপা খেয়ে দেবে যায়, এটা তার স্বভাব। ব-দ্বীপে জমির উচ্চতা তাই কোনো স্থির জিনিস না। দুইটা চলমান গতির যোগফল, নামার গতি আর ওঠার গতি।

যোগফলটা এতদিন আমাদের পক্ষে ছিল। বরফযুগের শেষে, আজ থেকে হাজার দশেক বছর আগে, সাগর উঠছিল ইতিহাসের দ্রুততম গতিতে।

জিওলজি জার্নালে ছাপা হিসাব বলছে, তখন পলি নামত আজকের দ্বিগুণ, আর সেই জোরে এই ব-দ্বীপ ওই সময়টাতেও ডোবে নাই, বরং উঁচু হয়েছে।

পলি আসতে থাকলে এই জমি সাগরের সঙ্গে পেরে ওঠে। প্রমাণটা মাটির স্তরে স্তরে লেখা।

গত ষাট বছরে বদলেছে শুধু একটা জিনিস। পলির সঙ্গে আমাদের ব্যবহার।

➖

১৯৫৪ আর ১৯৫৫-র পরপর দুই মহাবন্যার পর জাতিসংঘের পাঠানো বিশেষজ্ঞ মিশন পরামর্শ দিলো, পূর্ব পাকিস্তানের পানি সামলাতে লাগবে বড় প্রকৌশল।

১৯৫৯-এ জন্ম নিলো ওয়াপদা। সান ফ্রান্সিসকোর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইইকো ১৯৬১ সালে মাস্টারপ্ল্যান জমা দিলো, টাকার জোগান মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডের।

পরিকল্পনা সোজাসাপ্টা। উপকূলের জোয়ারের জমি বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলা হবে, নোনা পানি ঢুকবে না, ধান বাড়বে। ডাচ কায়দার এই ঘেরের নাম ‘পোল্ডার’।

ষাট আর সত্তরের দশক জুড়ে তৈরি হলো একশো ঊনচল্লিশটা পোল্ডার। বাঁধ সব মিলিয়ে চার থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার। ঘেরের ভিতরে বারো লাখ হেক্টর জমি।

প্রথম বছরগুলিতে এই প্রকল্প কথা রেখেছিল। এক ফসলের জমিতে দুই ফসল হলো, বাঁধের উপর দিয়ে রাস্তা হলো, বসতি ঘন হলো।

প্রকল্পের পুরানা নথি ঘেঁটে ওয়াটার হিস্ট্রি জার্নালে ছাপা এক গবেষণা দুইটা জিনিস পরিষ্কার করেছে। বাঁধগুলি ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর জন্য বানানো হয় নাই, নকশার লক্ষ্য ছিল প্রতিদিনকার জোয়ার।

আর নথিপত্রে পলির প্রসঙ্গটা নকশাকাররা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নাই।

জোয়ার নোনা পানি আনত, পলিও আনত। দিনে দুইবার পানি জমির উপর উঠত, তারপর নামত, পলিটা রেখে যেত। উপকূলের জমি এতদিন উঁচু ছিল এই কারণেই।

বাঁধ ওঠার পর সেই পলির জমার জায়গা রইলো একটাই। নদীর তলা।

বাঁধের ভিতরে থাকা জমি নতুন পলি পায় না, অথচ ডেবে যাওয়া থামে না, তাই জমি নামতে থাকলো। বাইরে নদীর তলায় পলি জমতে থাকলো, ফলে নদী উঠতে থাকলো। পঞ্চাশ বছর ধরে দুইটা রেখা গেছে উল্টা দিকে।

শেষে নদী বইতে থাকলো জমির চেয়ে উঁচু দিয়ে। বৃষ্টির পানি আর নামার জায়গা পায় না, জমির উপরেই থেকে যায়, মাসের পর মাস, তারপর বছরের পর বছর।

কাগজে এর নাম ‘জলাবদ্ধতা’।

খুলনার বিল ডাকাতিয়ার নয় হাজার হেক্টর জমি ছিল এই আটকে পড়া পানির নিচে। ডুমুরিয়ার মানুষ ১৯৯০ সালে যেই বাঁধ কেটেছিলেন, সেটা এই বাঁধ।

জোয়ার ঢোকানোর বুদ্ধিটা তাদের নতুন করে বের করতেও হয় নাই। পোল্ডারের আগের যুগে এই উপকূলে বাঁধ দেওয়াই হতো আট মাসের জন্য, নাম অষ্টমাসী বাঁধ। বাকি চার মাস নদী জমিতে ঢুকত, পলি দিয়ে যেত।

নতুন বাঁধে গেইট বসেছিল অনেক, শুরুর দফাতেই সাতশোর বেশি। সবগুলিই পানি বের করে দেওয়ার জন্য। জোয়ার ঢোকানোর একটাও না।

➖

খুলনার পোল্ডার বত্রিশ, আর তার গা-লাগানো সুন্দরবন। এই দুইটা জায়গা পাশাপাশি রেখে হিসাব করেছিলেন মার্কিন আর বাংলাদেশি গবেষকদের একটা দল। ফল ছাপা হয় ২০১৫ সালে, নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে।

বাঁধ দেওয়ার পর পঞ্চাশ বছরে পোল্ডারের জমি নেমে গেছে এক থেকে দেড় মিটার। মানুষের কোমর থেকে বুক সমান।

বাঁধহীন সুন্দরবন রয়ে গেছে প্রায় আগের উচ্চতাতেই। জোয়ার সেখানে আজও ঢোকে, পলি ফেলে, বন নিজের উচ্চতা নিজেই ধরে রাখে।

দুই জায়গার সাগর এক, নদী এক, পলিও এক। তফাত শুধু বাঁধটুকু।

সাগরের বৈশ্বিক গতিতে এই দূরত্ব তৈরি হতে লাগে তিন থেকে চারশো বছর। বাঁধের ভিতরের জমি সেখানে নেমেছে পঞ্চাশ বছরে।

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আয়লায় পোল্ডার বত্রিশের বাঁধ ভাঙলো। বাংলাদেশে মারা গেলেন প্রায় একশো নব্বই জন। ভাঙা বাঁধ দিয়ে জোয়ার ঢুকলো টানা দুই বছর, ঘরছাড়া মানুষের জন্য দুর্বিষহ দুই বছর।

সেই দুই বছরে জমির উপর যত পলি জমলো, গবেষকদের মাপে সেটা কয়েক দশকের স্বাভাবিক জমতে থাকার সমান।

মধ্য-উপকূলের খোলা জমিতে পলি-ফাঁদ বসিয়ে মেপেছে আরেক দল, ফল ছাপা হয়েছে এলিমেন্টা জার্নালে। নদীর সঙ্গে যোগ আছে যেই জমির, সেখানে আজও বছরে দুই সেন্টিমিটারের বেশি পলি জমে। স্থানীয় আপেক্ষিক সমুদ্র-ওঠার দ্বিগুণেরও বেশি।

শর্ত ওই একটাই। যোগটা থাকতে হবে।

➖

খুলনা-যশোরের জলাবদ্ধতা সারাতে নব্বইয়ের দশকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে বড় প্রকল্প নেওয়া হলো। নকশায় ছিল আরও নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী রেগুলেটর, পাম্প। স্থানীয় মানুষ শুরু থেকেই বলছিলেন, জোয়ার ঢুকতে দেন।

১৯৯৭-র অক্টোবরে যশোরের ভাইনা বিলের মানুষ প্রকল্পের নকশার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে বাঁধ কাটলেন।

ছয়শো হেক্টরের বিলে জোয়ার ঢুকলো চার বছর। জমি উঠলো গড়ে আশি সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার। কাটা মুখের কাছে দেড় থেকে দুই মিটার, দূরের প্রান্তে অনেক কম। জলাবদ্ধতা তবু মোটামুটি শেষ।

সাগরের গতিতে এক মিটার মানে দুইশো বছরের বেশি। এই বিল উঠেছে চার বছরে।

প্রকল্প শেষে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক নিজেরাই একটা মূল্যায়ন ছাপে। নিজেদের প্রকল্পের রেটিং লিখলো, অসফল। আর কৃষকদের পদ্ধতি সম্পর্কে লিখলো, কারিগরিভাবে সম্ভব, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।

পদ্ধতিটা ততদিনে সরকারি নামও পেয়ে গেছে। টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট, সংক্ষেপে টিআরএম। জাতীয় পরিকল্পনায় ঢুকলো, পরে শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যানেও জায়গা পেলো।

তারপর রাষ্ট্র নিজে চালাতে গেলো। পরপর চারটা বিলে, এবং প্রতিবারই আটকালো একই জায়গায়। জায়গাটা ক্ষতিপূরণের।

যেই বিলে জোয়ার ঢোকানো হয়, সেই বিলের চাষির জমি কয়েক বছর পানির নিচে থাকে। ফসল নাই, আয় নাই, ভরসা বলতে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি।

কেদারিয়া বিলে প্রতিশ্রুতিটাই ছিল না। তার উপর জোয়ার ঢোকানো হয়েছিল গেট দিয়ে মেপে মেপে, পলি ঢুকলোই সামান্য, জমি উঠলো না বললেই চলে।

খুকশিয়া বিলে জমি উঠলো গড়ে এক মিটারের বেশি, কিন্তু ক্ষতিপূরণ পৌঁছালো ভাঙাচোরা ভাবে। কাগজ মেলে না, রেকর্ড পুরানা, বর্গাচাষি আর দিনমজুরের নাম তালিকাতেই নাই।

কাপালিয়া বিলে ক্ষতিপূরণের জন্য সাড়ে পনেরো কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। খুকশিয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি আর কেউ বিশ্বাস করলো না, কাজ শুরুই করা গেলো না।

শেষ চেষ্টা সাতক্ষীরার পাখিমারা, ২০১৫ থেকে ২০২১। জরিপ বলছে প্রান্তিক চাষিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষতিপূরণ পান নাই, অথচ ফসলের ক্ষতি হয়েছে পাঁচজনে চারজনের বেশির। গবেষণার হিসাবে প্রকল্পটা ব্যর্থ।

২০২১ সালের পর থেকে পুরা দেশে একটা টিআরএম বেসিনও আর চালু নাই।

অথচ হিসাব করা হয়েছে। হাইড্রোলজি অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্সেস জার্নালে ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দলের মডেল দক্ষিণ-পশ্চিমের দুইশো চৌত্রিশটা বিল ধরে ধরে দেখিয়েছে, শুধু বর্ষার মৌসুমে জোয়ার ঢোকালেও শতকরা ছিয়ানব্বইটা বিলের জমি উঠবে আপেক্ষিক সমুদ্র-ওঠার অন্তত তিন গুণ গতিতে।

পদ্ধতিটা প্রমাণিত, খরচও কম। আটকে আছে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাপনায়।

লুইজিয়ানা ১৯৩২ সালের পর নিজের উপকূলীয় জমির এক-চতুর্থাংশ হারিয়েছে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপের হিসাবে এখনো প্রতি একশো মিনিটে একটা ফুটবল মাঠের সমান। প্রতিকার হিসাবে মিসিসিপির পলি ব-দ্বীপে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা ডাইভার্শন প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, বরাদ্দ দুইশো কোটি ডলারের বেশি।

বাষট্টি কোটি ডলার খরচের পর গত বছর সেই প্রকল্প বাতিল। জেলেদের আপত্তি, ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মামলা, নতুন গভর্নরের রাজনীতি।

নদীকে তার পলি ফেরত দেওয়ার প্রকল্প পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশেও হেরে যায়।

➖

গত পঞ্চাশ বছরে পলির আসাটাও কমেছে।

পদ্মার পলি মাপা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজে, দেশে ঢোকার পরপরই। ষাটের দশকের শেষে সেখান দিয়ে বছরে নামত আনুমানিক পঞ্চান্ন কোটি টন। হালের মাপে সংখ্যাটা বাইশ কোটির ঘরে।

মাঝখানে ১৯৭৫ সাল। গঙ্গার উপর ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমের পানির বড় অংশ ঘুরে গেছে হুগলির দিকে। পানির সঙ্গে পলিও।

পানির ভাগ নিয়ে দুই দেশের দর-কষাকষি তারপর পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে।

দামটা সবচেয়ে বেশি পড়েছে গড়াইয়ের উপর। পদ্মা থেকে বেরিয়ে এই শাখা নদী খুলনার দিকে মিষ্টি পানি নিয়ে যায়, সুন্দরবন বাঁচে এই পানির উপর। ফারাক্কার আগে গড়াইয়ের গড় প্রবাহ ছিল সেকেন্ডে দুই হাজার ঘনমিটারের উপরে, পরে নেমে আসে নয়শোতে। ফ্রন্টিয়ার্স ইন ওয়াটার জার্নালের হিসাব।

সবচেয়ে খারাপ বছরগুলিতে, আটাশি থেকে বিরানব্বইয়ের শুষ্ক মৌসুমগুলিতে, গড়াইয়ের গড় প্রবাহ নেমেছিল সেকেন্ডে এক ঘনমিটারে।

সেকেন্ডে এক ঘনমিটার একটা সেচপাম্পের মাপ।

মিষ্টি পানি না নামলে নোনা পানি ওঠে। দক্ষিণ-পশ্চিমের ক্ষেতে, পুকুরে, নলকূপে লবণ যতদূর উঠে এসেছে, সেই ওঠায় সাগরের ভাগ আছে, মিষ্টি পানি সরে যাওয়ার ভাগ আছে, চিংড়ির ঘেরে ইচ্ছা করে নোনা পানি ঢোকানোর ভাগও আছে।

পলি সরাসরি তুলেও নেওয়া হচ্ছে।

এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স জার্নালে ছাপা স্যাটেলাইট-জরিপের হিসাবে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা জুড়ে বছরে প্রায় এগারো-বারো কোটি টন বালু তোলা হচ্ছে। নদী তলা দিয়ে যত মোটা দানার পলি টেনে আনে, তোলার মাপটা তার কাছাকাছি মাত্রার।

➖

জমির নামার গতিতেও মানুষের অবদান আছে। কাজটা হয় মাটির নিচে, ফলে চোখে পড়ে না।

সত্তরের দশক থেকে এই অঞ্চল সেচ আর খাওয়ার পানির জন্য ভূগর্ভের পানি তুলছে। লাখ লাখ নলকূপ। পানি বের হয়ে গেলে মাটির স্তর চাপা খেয়ে বসে যায়।

স্যাটেলাইট রাডারে মাপা গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরের কোথাও কোথাও মাটি নামছে বছরে এক সেন্টিমিটারের বেশি। সবচেয়ে দ্রুত নামছে সেই এলাকাগুলি, যেগুলি নরম জৈব কাদার উপর দাঁড়ানো।

মেকং ব-দ্বীপ ভিয়েতনামের দক্ষিণ মাথায়, নদীর পলিতে গড়া সমতল, আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমের মতোই। মানুষ থাকে এক কোটি সত্তর লাখের বেশি। ধান, চিংড়ি, ঘন বসতি, আর সেচের জন্য অসংখ্য নলকূপ।

ভিয়েতনাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারকদের একটা, আর দেশটার রপ্তানি হওয়া চালের নব্বই শতাংশই ফলে এই ব-দ্বীপে।

সেই ব-দ্বীপ পঁচিশ বছর ভূগর্ভের পানি তুলে গড়ে আঠারো সেন্টিমিটার দেবে গেছে। এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্সের হিসাবে সেখানে মাটির নামার গতি এখন গড়ে সাগরের ওঠার তিন গুণের বেশি, কোথাও কোথাও প্রায় দশ গুণ।

মেকং ডুবছে সত্যি, তবে ডোবাচ্ছে মূলত নলকূপ, সাগর না।

সাগর উঠছে বছরে চার মিলিমিটারের কাছাকাছি, বৈশ্বিক গড়। আর দক্ষিণ-পশ্চিমের মাটি নামছে বছরে এক থেকে দশ মিলিমিটার, জায়গা আর মাপার পদ্ধতিভেদে। আর্থ-সায়েন্স রিভিউজ জার্নালে ছাপা সমন্বয়-গবেষণার হিসাব।

অর্থাৎ উপকূলের পায়ের নিচে মাটির নামার ভাগ সাগরের ওঠার সমান, বহু জায়গায় তার চেয়েও বড়।

খুলনার গেজের যেই সংখ্যাটা মাঝে মাঝে খবরে আসে, পানি উঠছে বছরে সতেরো মিলিমিটার। গ্লোবাল অ্যান্ড প্ল্যানেটারি চেঞ্জ জার্নালের গবেষণা দেখিয়েছে, ওই সতেরোর অর্ধেকের বেশি আসছে জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া থেকে।

জোয়ার বেড়েছে, কারণ বাঁধে বাঁধে নদীগুলি সরু হয়ে গেছে, একই পানি কম জায়গায় ঢুকে বেশি উঁচুতে ওঠে।

ফলে মাপের চরমতম সংখ্যাটার ভিতরেও বড় দায় বাঁধের।

➖

“বাংলাদেশ ডুবে যাচ্ছে” পৃথিবীর সবচেয়ে সফল জলবায়ু-বাক্যগুলির একটা। এই বাক্যে সম্মেলন হয়, তথ্যচিত্র হয়, তহবিল আসে।

বাক্যটার সবচেয়ে প্রচারিত রূপ, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের সতেরো শতাংশ পানির নিচে, দুই কোটি জলবায়ু-শরণার্থী।

এই হিসাবের কোনো পিয়ার-রিভিউড উৎস নাই। কথা দুইটা ছড়িয়েছিল ২০০৮ সালের এক বার্তা সংস্থার রিপোর্ট থেকে, জাতিসংঘের জলবায়ু প্যানেলের নামে।

প্যানেলের নিজের রিপোর্টে সংখ্যাটা কোথাও নাই। আর এইধরনের শরণার্থী-হিসাব নিয়ে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ জার্নালে আস্ত একটা পর্যালোচনাই আছে, যার রায় সরল। সংখ্যাগুলি কেউ যাচাই করে পুনরুৎপাদন করতে পারে না।

ডুবতে থাকা অঞ্চলের ম্যাপগুলিরও একই দশা। বেশিরভাগ আঁকা হয় সরল নিয়মে, সাগর এক মিটার উঠলে এক মিটারের নিচের সব জমি নীল। এই নিয়মে পলি নাই, জমির ওঠা নাই, এমনকি কয়েক হাজার কিলোমিটার বাঁধও নাই। বাথটাবে পানি ঢালার হিসাব, জ্যান্ত ব-দ্বীপের হিসাব না।

গল্পটা তবু বেঁচে আছে, কারণ গল্পটা কারও না কারও কাজে লাগে।

নৃবিজ্ঞানী কামেলিয়া দেওয়ান বছরের পর বছর খুলনার পোল্ডার-অঞ্চলে মাঠ-গবেষণা করে বই লিখেছেন, মিসরিডিং দ্য বেঙ্গল ডেল্টা। সেই গবেষণায় এক উন্নয়ন-পরামর্শক তাকে খোলাখুলি বলেছেন, প্রকল্প-প্রস্তাবে জলবায়ু পরিবর্তন হলো মসলার মতো। ছিটিয়ে দিলে টাকা পাস হয়।

জলাবদ্ধতা দেশি প্রকৌশলের ফল, এই গল্পে দায় ওয়াপদার, সমাধান বাঁধ কেটে জোয়ার ঢোকানো। জলাবদ্ধতা জলবায়ুর ফল, এই গল্পে দায় বৈশ্বিক, সমাধান নতুন প্রকল্প, নতুন বাঁধ, নতুন ঠিকাদার।

➖

এই পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে, সাগর তাহলে বানানো জুজু। সেই উপসংহার এই লেখার না। উল্টা দিকের হিসাবগুলিও থাকুক।

ব-দ্বীপ মোটের উপর এখনো জমি বাড়াচ্ছে। স্যাটেলাইট ছবির হিসাবে মেঘনা মোহনায় বছরে প্রায় চৌদ্দ বর্গকিলোমিটার নতুন চর জাগে। কিন্তু বাড়ে মোহনায়, আর কমে দক্ষিণ-পশ্চিমে, বছরে পাঁচ বর্গকিলোমিটার করে।

পোল্ডারও নির্বোধ প্রকল্প ছিল না। আটানব্বইয়ের বন্যায় বাঁধ না থাকলে উপকূলের যতটা ডুবত, বাঁধ থাকায় ডুবেছে তার তিন ভাগের এক ভাগ। বাঁধ ভাত দিয়েছে, রাস্তা দিয়েছে, ঝড়ের রাতে মানুষ বাঁচিয়েছে। সমস্যাটা শুরু হয়েছে বাঁধটা চিরস্থায়ী করার পর।

টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট, সংক্ষেপে টিআরএমের দামও কম না। যার বিলে জোয়ার ঢোকে, তার জমি কয়েক বছর অনাবাদি। সেই কয় বছরের ভাতের ব্যবস্থা কাগজে আছে, বাস্তবে নাই। খুকশিয়া আর পাখিমারার পর মানুষের অবিশ্বাসটা অযৌক্তিক না।

আর শতাব্দীর শেষে সাগর সত্যিই বড় ঘটনা। পিএনএএস জার্নালে এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল একশো একটা গেজের প্রায় সাড়ে চার দশকের রেকর্ড মিলিয়ে দেখিয়েছে, মাটির নামা যোগ করলে ২১০০ সালে এই উপকূলে পানির কার্যকর ওঠা দাঁড়াতে পারে পঁচাশি থেকে একশো চল্লিশ সেন্টিমিটারে, মাঝারি নিঃসরণের দৃশ্যকল্পেও।

কোমর থেকে গলা সমান।

ফলে ভুয়া সংখ্যা বাদ দিলে ভয়টা বাদ হয়ে যায় না, সৎ হয়।

আজকের ডোবার বড় কারণ আমাদের নিজেদের, বাঁধ, নলকূপ, ফারাক্কা। শতাব্দীর শেষের ডোবায় সাগরও যোগ দিবে। সেই লড়াইয়ে আমাদের হাতে একটাই জিনিস থাকবে, পলি। রাস্তা বন্ধ থাকলে সেটাও থাকবে না।

➖

পলি কতটা আসবে, সেই সিদ্ধান্তটাও যে বাংলাদেশে হয় না, তাও বলা দরকার।

১৯ জুলাই, ২০২৫। তিব্বতের নিংচি।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ফলক উন্মোচন করলেন মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের। ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর পাঁচ ধাপের বাঁধ, ঘোষিত খরচ একশো সাতষট্টি বিলিয়ন ডলার, বিদ্যুতের লক্ষ্য থ্রি গর্জেস বাঁধের তিন গুণ।

ভাটিতে নেমে নদীটার নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। বাংলাদেশে ঢুকে যমুনা।

বাঁধ বসছে নামচে বারওয়া পর্বত ঘেঁষা গ্রেট বেন্ডে, অরুণাচল সীমান্তের তিরিশ কিলোমিটার উজানে। নদী সেখানে পঞ্চাশ কিলোমিটার পথে দুই কিলোমিটার নিচে নামে, পৃথিবীর তীব্রতম ক্ষয়ের জায়গাগুলির একটা।

জিওলজি জার্নালে ছাপা গবেষণার হিসাব, ব্রহ্মপুত্রের মোট পলির প্রায় অর্ধেক আসে অববাহিকার মাত্র দুই শতাংশ এলাকা থেকে। সেই দুই শতাংশই এই গ্রেট বেন্ড।

চীন বলছে প্রকল্পটা রান-অব-রিভার, পানি জমিয়ে রাখবে না। পানির বেলায় কথাটা হয়তো সত্য। পলির বেলায় না।

মেকংয়ের জায়াবুরি বাঁধও খাতায় রান-অব-রিভার, আর ওয়াটার রিসোর্সেস রিসার্চ জার্নালের হিসাবে ওই একটা বাঁধই নদীর অর্ধেক পলি আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। জলাধার যত বড়, পলি তত আটকা পড়ে। প্রকল্পের নামে কিছু আসে যায় না।

ঢাকা ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে বেইজিংয়ের কাছে প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। জবাব আসে নাই। প্রকাশ্যে বেইজিংয়ের ভাষ্য এক লাইনের, ভাটির দেশের ক্ষতি হবে না।

মেদোগ একা না। এই অববাহিকার উজানি দেশগুলির খাতায় এখন চারশোর উপরে বাঁধের পরিকল্পনা। সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট জার্নালের মডেল বলছে, সবগুলি হলে শতাব্দীর শেষে এই ব-দ্বীপে পলি নামবে বাঁধ-পূর্ব প্রবাহের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।

জলবায়ু একা এই ক্ষতি করত না। গরম বাড়লে বর্ষা জোরালো হয়, পাহাড়ের ক্ষয় বাড়ে, আরেক মডেলের হিসাবে শতাব্দীর শেষে হিমালয় বরং এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক বেশি পলি পাঠাত।

নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে ২০২৩ সালে ছাপা গবেষণা দুইটা ভবিষ্যৎ পাশাপাশি রেখেছে।

জলবায়ু একা বদলালে পলির ঘাটতি বড়জোর বিশ শতাংশ। পরিকল্পিত বাঁধগুলি যোগ হলে ঘাটতি একশো থেকে দুই হাজার শতাংশেরও বেশি। তাদের উপসংহার, জলবায়ু পরিবর্তন এই ব-দ্বীপ সইতে পারবে, যদি বাঁধ আর পানি-প্রত্যাহার না ঘটে।

মিশর পরীক্ষাটা আগেই করে ফেলেছে। আসোয়ান হাই ড্যাম নীল নদের পলির আটানব্বই শতাংশ আটকায়। নীল ব-দ্বীপে নতুন পলি জমা এখন কার্যত শূন্য, দামিয়েত্তার উপকূল পিছাচ্ছে বছরে বায়ান্ন মিটার পর্যন্ত।

নীল ব-দ্বীপ পাঁচ হাজার বছর ধরে মিশরকে খাইয়েছে। আসোয়ান বসার পর ষাট বছরও হয় নাই, ব-দ্বীপটা এখন গুটাচ্ছে।

➖

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে সই হয়েছিল গঙ্গার পানিচুক্তি। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সই, মেয়াদ ত্রিশ বছর।

মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই ডিসেম্বরে।

চুক্তির মূল দলিলে হিসাবের একক একটাই, কিউসেক, অর্থাৎ সেকেন্ডে কত ঘনফুট পানি। পলি শব্দটা গোটা দলিলে একবারও নাই।

ইকোলজি নাই, পরিবেশ নাই। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় কত কিউসেক কার ভাগে, দলিলটা এর বাইরে আর কোনো প্রশ্ন করে না।

সেই কিউসেকের হিসাবও সুবিধার না। ওয়াটার পলিসি জার্নালে ছাপা পর্যালোচনা বলছে, শুষ্ক মৌসুমের সবচেয়ে সংকটময় সময়গুলিতে বাংলাদেশ তার নিশ্চিত হিস্যা পায় নাই পঁয়ষট্টি শতাংশ ক্ষেত্রে।

আগের ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ন্যূনতম প্রবাহের একটা গ্যারান্টি ধারা ছিল, ছিয়ানব্বইয়ের চুক্তিতে সেই ধারাটা নাই।

ত্রিশ বছর ধরে আমরা কিউসেক মেপেছি, ভাগ চেয়েছি, প্রায়ই পাই নাই। পলি চাই নাই কোনোদিন।

এই বছর প্রথম শব্দটা আলোচনায় উঠেছে। ঢাকা ট্রিবিউনের খবর, নবায়ন-প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের ঘোষিত অবস্থানে এবার পানির সঙ্গে ঢুকেছে পলি ব্যবস্থাপনা আর পরিবেশগত প্রবাহ, সঙ্গে গ্যারান্টি ধারা ফেরানোর চাওয়া।

ঢাকা জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা চেয়েছে। দিল্লি আগস্ট পর্যন্ত তারিখ দেয় নাই।

শব্দটার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে লাগলো ত্রিশ বছর। দলিল পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না, তা ডিসেম্বরে জানা যাবে।

গ্রেট বেন্ডে কংক্রিট ঢালা এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আর যেই পদ্ধতিতে ডুমুরিয়ার জমি আবার উপরে উঠেছিল, ২০২১ সালের পর সেটা দেশে আর কোথাও চালু নাই।

গ্রেট বেন্ডের বাঁধ আমাদের হাতে নাই। বিলের চাষির ক্ষতিপূরণটা আজও আমাদের হাতে আছে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন