পৃথিবীর সবচেয়ে ধীর শহরটাকে বাঁচাবে কে?

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেই খোঁড়াখুঁড়ির ভিতর দিয়ে আপনি তেরো বছর ধরে যাতায়াত করছেন, সেই রাস্তাটা বানানো শুরু হয়েছিল বাসের জন্য, এখন তা শেষ হচ্ছে গাড়ির জন্য।

কাগজের নাম ‘বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট’। সংক্ষেপে বিআরটি।

বুদ্ধিটা সরল, রাস্তার মাঝখানে দুইটা লেন শুধু বাসের। কোনো গাড়ি ঢুকবে না, কোনো জটে আটকাবে না। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পঁয়ত্রিশ মিনিটে, এই ছিল ওয়াদা।

প্রকল্প পাশ হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। শেষ হওয়ার কথা ২০১৬-তে। হয় নাই। ২০২০-এও না, ২০২৪-এও না।

তেরো বছরে বিশ কিলোমিটার। ভাগ করলে দাঁড়ায়, বছরে দেড় কিলোমিটার। দেড় কিলোমিটার একজন মানুষ হেঁটে পার হয় আঠারো মিনিটে।

২০২৪-এর ডিসেম্বরে অবশেষে ‘সেবা’ চালু হলো। কী দিয়ে? পাঁচ বছরের পুরানো দশটা বিআরটিসি বাস। ভাড়া একশো চল্লিশ টাকা। আর পঁয়ত্রিশ মিনিটের জায়গায় সময় লাগলো দুই ঘণ্টা।

দুই ঘণ্টায় বিশ কিলোমিটার মানে ঘণ্টায় দশ, মোটামুটি রিকশার গতি।

দশ মাস পরে, গত অক্টোবরে, প্রকল্পটাই স্থগিত হয়ে গেলো। খরচ ততদিনে প্রায় দুই হাজার আটশো কোটি টাকা।

এই বছরের ১৮ মে বুয়েটের এক কমিটি সরকারকে শেষ পরামর্শ লিখে দিয়েছে, বিআরটি বাদ দেন। বাসের ওই লেনে টোল বসিয়ে গাড়ি ওঠান।

বাসের জন্য বানানো রাস্তা, খুলবে গাড়ির রাস্তা হয়ে।

একটা শহর এই জায়গায় পৌঁছায় কীভাবে, এই লেখা সেই হিসাবই মেলাবে।

আগেই বলে রাখি, ঝগড়াটা বাস বনাম মেট্রো না। ঝগড়াটা ক্রম নিয়ে, কোনটা আগে, কার টাকায়, কার জন্য। আর দোষটা শেষমেশ কার ঘাড়ে গিয়ে থামে।

এই পুরা হিসাবের শুরুতে একটা দলিল আছে, বয়স একুশ বছর, তার পাতায় পুরা গল্পটা আগেই লেখা ছিল, কেবল উল্টা করে।

➖

২০০৪ সালের মার্চে ঢাকার পরিবহন নিয়ে একটা বড় সমীক্ষার কাজ শুরু হয়।

কাজটা করে দুইটা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, মার্কিন কোম্পানি লুই বার্জার আর দেশি বাংলাদেশ কনসালট্যান্টস। খরচ দেয় বিশ্বব্যাংক। কাজটা করানো হচ্ছিল সরকারের নিজের সংস্থার জন্য, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের জন্য।

কাজে নজর রাখতে ছিল বত্রিশ সদস্যের একটা উপদেষ্টা কমিটি। সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী।

কাজ শেষ হয় ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। ফলাফলটার নাম স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান, সংক্ষেপে এসটিপি। বিশ বছরের নকশা, ২০০৪ থেকে ২০২৪।

প্রশ্ন ছিল একটাই। এই শহর চলবে কীসে?

উত্তর বের করার পদ্ধতিটা ছিল পরীক্ষার মতো। পরামর্শকরা দশটা সম্ভাব্য প্যাকেজ বানালেন।

প্রত্যেক প্যাকেজে তিনটা জিনিসের আলাদা আলাদা মিশেল। কত নতুন রাস্তা বানানো হবে, বাসের জন্য আলাদা লেন থাকবে কি না, আর মেট্রোরেল থাকবে কি না।

তারপর দশটা প্যাকেজকেই নম্বর দেওয়া হলো।

ফলাফল যা দাঁড়ালো, সবচেয়ে বেশি নম্বর পেলো যেই প্যাকেজ, তাতে বাসের লেন আছে, মেট্রো নাই। নম্বর ৩১৯। দুই নম্বরে যেটা, নম্বর ৩১৭, সেখানেও বাসের লেন আছে, মেট্রো নাই। তিন নম্বরে ২৮৩, একই কথা।

সেরা তিনটার একটাতেও মেট্রোরেল নাই।

বাছাই হলো চার নম্বরে থাকা প্যাকেজটা। নম্বর ২৭৪। তাতে বাসের লেনও আছে, মেট্রোও আছে।

দামের ফারাকটাও ছোট না। এক নম্বরে থাকা প্যাকেজের দাম ছিল তিনশো কোটি ডলার। বাছাই হওয়া প্যাকেজের দাম পাঁচশো আশি কোটি। প্রায় দ্বিগুণ।

কেন কম নম্বর পাওয়া প্যাকেজটা বাছা হলো, সেটা লুকানো নাই, নথিতেই লেখা আছে।

উপদেষ্টা কমিটির হিসাব ছিল, একটা বিআরটি লাইন ঘণ্টায় বড়জোর বিশ হাজার যাত্রী টানতে পারে, ঢাকার ভিড়ের জন্য এই ক্ষমতা যথেষ্ট না। কমিটি চেয়েছিল মেট্রো।

আর পরামর্শকরা নিজেদের সুপারিশে লিখলেন, এই প্যাকেজটাই নাকি গণপরিবহন আর ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ভালো ভারসাম্য।

ওই বিশ হাজারের হিসাবটা আসলে ঠিক ছিল কি না, সেই প্রশ্নে পরে আসছি।

মেট্রো ঢুকলো। কিন্তু কোনটা আগে হবে, সেই প্রশ্নে দলিলটার কোনো দ্বিধা ছিল না।

প্রথম ধাপ ধরা হলো ২০০৫ থেকে ২০১০। এই পাঁচ বছরের কাজ, বিআরটি লাইন ১ আর ২ চালু করা।

তিন লাইনের বিআরটি হবে, দলিলের ভাষায়, প্রথম দশ বছরের মেরুদণ্ড। তিনটার নির্মাণ শেষ হবে ২০১৫ সালের মধ্যে।

মেট্রো আসবে তারপর, দ্বিতীয় দশকে, ওই বাসের নেটওয়ার্কের কাঁধে চড়ে।

দামও আলাদা আলাদা লেখা ছিল। তিনটা বিআরটি করিডোর, মোট দুইশো কিলোমিটার, একশো কোটি ডলার। তিনটা মেট্রো লাইন, দুইশো দশ কোটি। আর উনত্রিশ কিলোমিটার উড়ালসড়ক, নব্বই কোটি।

তুলনাটা এইখানেই সেরে ফেলি, কারণ এইটাই পুরা গল্পের সবচেয়ে জরুরি সংখ্যা।

পুরা শহরের জন্য দুইশো কিলোমিটারের বাস-নেটওয়ার্ক, দাম একশো কোটি ডলার। আর বাস্তবে বানানো হয়েছে মেট্রোরেল-৬, দৈর্ঘ্য একুশ কিলোমিটার, দাম প্রায় তিনশো কোটি ডলার।

একুশ কিলোমিটার। দুইশো কিলোমিটারের তিন গুণ দামে।

উড়ালসড়কও দলিলে ছিল, সেটা অস্বীকার করার কিছু নাই। কিন্তু ছিল তালিকার একেবারে শেষে, সবচেয়ে কম টাকা নিয়ে। রাষ্ট্রের নিজের পরিবহন সমন্বয় সংস্থার একজন পরিকল্পনাবিদের ভাষায়, এসটিপিতে উড়ালসড়ক ছিল পরিপূরক জিনিস। মূল নকশা না।

তাহলে দলিলটা শেষ পর্যন্ত কী বলেছিল, এক লাইনে দাঁড় করানো যায়।

একটা ক্রম। আগে বাস। তারপর রেল। গাড়ির পথ সবার শেষে।

সরকার দলিলটা অনুমোদনও করেছিল। কবে করেছিল, আজ আর নিশ্চিত করে বলা যায় না। জাইকার নথিতে লেখা ২০০৮। উপদেষ্টা কমিটির এক সদস্যের লেখায় ২০০৯।

কোন সভায় পাশ হলো, কার সইয়ে হলো, কোনো সূত্রেই পাওয়া যায় না।

বিশ বছরের মহাপরিকল্পনা। জন্মতারিখটাই কেউ লিখে রাখে নাই।

➖

তারপর যা হলো, তারিখ ধরে লিখলেই চলে। মন্তব্যের দরকার পড়ে না।

২০১১, জানুয়ারি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চুক্তি সই হলো। দলিলে যেই প্রকল্প ছিল সবার শেষে, বাস্তবে সেইটাই লাইনের সবার আগে চলে আসলো।

তখনো কোনো বিআরটির এক কোদাল মাটিও কাটা হয় নাই।

২০১২, ডিসেম্বর। এই এক মাসেই একনেকে পাশ হলো দুইটা প্রকল্প। গাজীপুরের বিআরটি, দুই হাজার চল্লিশ কোটি টাকা। আর মেট্রোরেল-৬, প্রায় বাইশ হাজার কোটি টাকা।

দুইটার দৈর্ঘ্য প্রায় সমান, বিশ কিলোমিটারের আশেপাশে। টাকার ফারাক এগারো গুণ।

২০১৫। যেই বছরের মধ্যে তিনটা বিআরটি চালু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বছর একটারও নির্মাণকাজ শুরু হয় নাই।

২০১৬, আগস্ট। ব্যর্থতার কারণ খোঁজার বদলে দলিলটাই কেটে নতুন করা হলো। বিআরটি তিনটা থেকে কমে দুইটা, মেট্রো তিনটা থেকে বেড়ে পাঁচটা।

২০২৩, সেপ্টেম্বর। এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশ চালু হলো। বিশ বছরের পরিকল্পনার সবচেয়ে শেষের প্রকল্পটা বাস্তবে খুললো সবার আগে।

উপরে টোল দিয়ে ছুটছে গাড়ি। চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ পর্যন্ত পরিচালন তথ্য বলছে, ব্যবহারকারীর আটানব্বই দশমিক তিন শতাংশই প্রাইভেট কার।

সংখ্যাটা কোনো এক দিনের ঝোঁক না। দুই বছরের গড়।

বাস নাই, কারণ জিনিসটার আকৃতিই বাসের বিরুদ্ধে। এক মুখ দিয়ে উঠে, না থেমে, আরেক মুখ দিয়ে নামা, গাড়ির যাত্রা এইরকমই হয়।

বাস উল্টা, বাস টাকা তোলে মাঝপথ থেকে, স্টপে স্টপে যাত্রী নিয়ে। যেই পথে খিলক্ষেত নাই, বনানী নাই, মহাখালী নাই, সেই পথে বাস তুললে বাসটা খালি চলবে।

এক বাস মালিকের ভাষ্য আরও সরল, তিন-চার কিলোমিটারের জন্য একশো ষাট টাকা টোল দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না।

কাজেই অভিযোগটা এই না যে নকশায় বাসের কথা কেউ ভাবতে ভুলে গেছে। অভিযোগটা হলো, এমন আকৃতির জিনিস বানানো হয়েছে যেটা গঠনগতভাবেই গণপরিবহন বইতে অক্ষম।

আর সেটাকেই ঢাকার পরিবহন সংকটের সমাধান বলে চালানো হয়েছে।

কারা উঠতেই পারবে না, সেই তালিকাটাও নকশার অংশ। মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ, সিএনজি অটোরিকশা নিষিদ্ধ, সাইকেল নিষিদ্ধ। মানে শহরের সাশ্রয়ী বাহনগুলির কোনোটারই ওঠার অধিকার নাই।

কারণ হিসাবে বলা হয় নিরাপত্তা।

যুক্তিটা আদতে কেমন ছিল, তা একবার দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ৬ মে সকাল সাতটা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত মোটরসাইকেল আর সিএনজি চলেছে ওই পথে, বিশ টাকা টোলে।

সেদিন খালেদা জিয়া দেশে ফিরছিলেন, বিমানবন্দর সড়কে ভিড়, পুলিশের অনুরোধ ছিল। ছয় ঘণ্টার জন্য নিরাপত্তার সমস্যাটা মিটে গিয়েছিল। তারপর আবার নিষেধ।

তবে সবচেয়ে বড় গোলমালটা রাস্তার শেষ মাথায় না, তার শরীর বেয়ে নামা মুখগুলিতে।

সাড়ে এগারো কিলোমিটারে ওঠানামার মুখ ষোলোটা। গাড়ি নামে বনানীতে, মহাখালী বাস টার্মিনালে, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে, কারওয়ান বাজারে। তালিকাটা আরেকবার পড়েন, এইগুলি ঢাকার ফাঁকা জায়গা না, এইগুলি ঢাকার সবচেয়ে ঠাসা জায়গা।

উপরে জমা হওয়া গাড়ি নিচে নামে একসাথে, বেগে, আর গিয়ে পড়ে এমন মোড়ে যেখানে আগে থেকেই তিল ধারণের জায়গা নাই।

রাষ্ট্রের নিজের পরিবহন সংস্থার একজন পরিকল্পনাবিদের ভাষায়, এতে ওই মোড়গুলিতে জ্যামের “শকওয়েভ” তৈরি হয়।

জিনিসটা তাই যানজট মুছে দেয় না। যানজটের জায়গা বদলায়, আর জমাট বাঁধায়।

এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটা। এই রাস্তার টাকা কে দিলো?

খাতায় প্রকল্পটা “বেসরকারি”। বিদেশি কোম্পানি বানাবে, তারপর টোল তুলে খরচ উঠাবে।

বাস্তবের হিসাব, মোট খরচ তেরো হাজার আটশো সাতান্ন কোটি টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ আর পুনর্বাসনের চার হাজার নয়শো সতেরো কোটি পুরোটাই দিয়েছে রাষ্ট্র। তার উপর নির্মাণে ভর্তুকি আরও দুই হাজার চারশো তেরো কোটি।

যোগ করলে দাঁড়ায়, “বেসরকারি” প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি টাকা এসেছে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে। মানে আপনার কাছ থেকে।

আর মালিকানা এখন, ২০২৪ সালের এক সালিসি রায়ের পর, কার্যত পুরোটাই দুই চীনা কোম্পানির হাতে।

সেবা পাচ্ছে কারা? রাষ্ট্রের নিজের পরিকল্পনাবিদের হিসাবে, শহরের প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ। ব্যবস্থাটার নামও তিনি দিয়েছেন, পরিবহন বর্ণবৈষম্য। উঁচু ডেকের উপর দিয়ে যায় ধনীরা, বাকি সবাই নিচে জ্যাম ঠেলে।

প্রক্ষেপণ ছিল দিনে আশি হাজারের বেশি গাড়ি উঠবে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উঠছিল বিয়াল্লিশ হাজার।

রাস্তাটা দাঁড়িয়ে আছে রেলের জমির উপর। ওই জমি দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর কমিউটার রেললাইনের, লাখো মানুষের সবচেয়ে সস্তা বাহন।

কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। এখন ঠেকেছে ২০২৭ সালের পরে।

গাড়ির আকাশ-রাস্তাটা বানানো হয়েছে রেলের জমি আর রেলের সময়, দুইটাই খেয়ে। নিচে, বিমানবন্দর সড়কে, বাস দাঁড়িয়ে থাকে।

➖

বিআরটির নির্মাণ ততদিনে চলছিল, নিজের গতিতে।

এইখানে এসে জিনিসটা আসলে কী, একবার বলে নেওয়া দরকার।

বিআরটি মানে শুধু “বাসের জন্য একটা লেন” না। পুরা ব্যবস্থাটা চারটা জিনিস নিয়ে। রাস্তার মাঝখানে বেড়া দিয়ে আলাদা করা লেন, যেখানে গাড়ি ঢুকতেই পারে না।

রাস্তার মাঝখানে স্টেশন, যেখানে টিকিট কাটা হয় বাসে ওঠার আগে। স্টেশনের মেঝে আর বাসের মেঝে সমান উচ্চতায়, যাতে ওঠানামায় সময় নষ্ট না হয়। আর মোড়ে বাসের জন্য সিগন্যালের অগ্রাধিকার।

দুনিয়াজুড়ে বিআরটি সস্তা আর দ্রুত, কারণ এইগুলির কোনোটাই আকাশে বানাতে হয় না। যেই রাস্তা আগে থেকেই আছে, তার উপর রঙ, কার্ব, স্টেশন আর সিগন্যাল বসালেই কাজ চলে।

জাকার্তা প্রথম করিডোরটা এইভাবেই নয় মাসে খুলে ফেলেছিল।

ঢাকা এই পথে যায় নাই। গাজীপুরের করিডোরে ঢুকলো উড়ালসেতু, ঢুকলো পিলার, ঢুকলো ভারী কাঠামো। মাটির উপর রঙ টানার প্রকল্পটা হয়ে গেলো আকাশে কংক্রিট তোলার প্রকল্প।

আর যেই প্রকল্পে আকাশে কংক্রিট তুলতে হয়, সেই প্রকল্পে ক্রেন লাগে। চলন্ত রাস্তার উপর দিয়ে বক্স গার্ডার ঝোলাতে হয়।

২০২২ সালের ১৫ আগস্ট, উত্তরায়, তেমন একটা গার্ডার ক্রেন থেকে পিছলে নিচের প্রাইভেট কারের উপর পড়ে। গাড়িতে ছিল একটা পরিবার। পাঁচজন মারা যান। দুইজন শিশু।

এক মাস আগে একই প্রকল্পে ক্রেন ছিঁড়ে মারা গিয়েছিলেন এক শ্রমিক। সংবাদপত্রে নথিভুক্ত মৃত্যু অন্তত ছয়টা। পুরা প্রকল্পে মোট কতজন গেছেন, সেই সংখ্যাটা কোনো সরকারি কাগজে নাই।

দামটাও ওই একই কারণে বেড়েছে। গাজীপুরের বিশ কিলোমিটারে খরচ হয়েছে প্রায় দুই হাজার আটশো কোটি টাকা, মানে কিলোমিটারপ্রতি এক কোটি ডলারের বেশি।

জাকার্তার বিআরটি বানাতে কিলোমিটারপ্রতি লেগেছিল দশ লাখ ডলার। আহমেদাবাদে আঠারো লাখ।

মানে যেই জিনিসটা পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা গণপরিবহন হিসাবে পরিচিত, ঢাকা সেটাই বানিয়েছে অন্যদের চেয়ে সাত গুণেরও বেশি দামে। এবং শেষ পর্যন্ত চালাতেই পারে নাই।

যেই লেনের জন্য গার্ডারটা তোলা হচ্ছিল, সেই লেনে শেষ পর্যন্ত বাস নেমেছিল দশটা। পুরানা। দশ মাসের জন্য।

➖

এইবার বিলটা দেখাই। ক্রম উল্টানোর দাম শহর কীভাবে দিচ্ছে।

২০২৩ সালে আমেরিকার অর্থনীতি গবেষণা সংস্থা এনবিইআর গুগল ম্যাপসের তথ্য ঘেঁটে একশো বায়ান্নটা দেশের বারোশোর বেশি শহরের গতি মাপে।

তালিকার একেবারে শেষ নাম ঢাকা। পৃথিবীর সবচেয়ে ধীর শহর। কাবুলের নিচে, কিনশাসার নিচে, সবার নিচে।

গতিটা কীভাবে পড়লো, সেটাও মাপা আছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকার গাড়ির গড় গতি দশ বছরে একুশ কিলোমিটার থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে সাত-এ। বুয়েট ২০২২ সালে মেপে পেয়েছে চার দশমিক আট।

একজন সুস্থ মানুষ হেঁটে যায় ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার।

মানে ভবিষ্যতে কোনো একদিন না, এই শহরে গাড়ি এখনই হাঁটার চেয়ে ধীরে চলে। আর বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, কিছু না বদলালে ২০৩৫ সালে গতি নামবে চারে।

এর দাম দুইভাবে দেওয়া হয়।

প্রথমটা সময়ে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাবে, ঢাকায় যানজটে দিনে নষ্ট হয় বত্রিশ লাখ কর্মঘণ্টা। বুয়েটের হিসাবে আরও বেশি।

দ্বিতীয়টা টাকায়। বুয়েটের হিসাবে বছরে ক্ষতি সাঁইত্রিশ হাজার কোটি টাকা।

সংখ্যাটা ধরার সহজ উপায় আছে। মেট্রোরেল-৬ বানাতে লেগেছে বত্রিশ হাজার সাতশো কোটি টাকা আর এগারো বছর। যানজট পোড়ায় তার চেয়ে বেশি, প্রতি বছর।

অর্থাৎ এই শহর প্রতি বছর একটা করে আস্ত মেট্রোরেল পুড়িয়ে ফেলে।

কেন এই দশা, তার পাটিগণিতটাও জটিল না।

ঢাকার নির্মিত এলাকার মাত্র সাত শতাংশ জুড়ে রাস্তা। একটা কাজ-চলা শহরের জন্য মান ধরা হয় বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ।

ওই সাত শতাংশের উপর প্রাইভেট কারের সংখ্যা ২০১০ সালের এক লাখ ষাট হাজার থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ছত্রিশ হাজারে। তেরো বছরে দ্বিগুণের বেশি।

আর ওই সরু রাস্তার ভাগ-বাটোয়ারাটা এইরকম।

প্রাইভেট কার শহরের একশোটা যাতায়াতের পাঁচটা বহন করে। রাস্তার আশি ভাগ জায়গা দখল করে।

বাস বহন করে আটাশটা। জায়গা পায় পাঁচ ভাগ।

লাইন দুইটা আরেকবার পড়েন। যে পাঁচকে টানে, সে আশি নেয়। যে আটাশকে টানে, সে পায় পাঁচ।

➖

তাহলে ওই আটাশ শতাংশের জন্য বিশ বছরে কী করা হয়েছে? খতিয়ানটা ছোট, পুরাটাই দেওয়া যায়।

স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের আরেকটা বড় সুপারিশ ছিল ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং’। কথাটা কঠিন শোনায়, জিনিসটা সহজ।

ঢাকায় এখন একই রুটে বাস চালায় বহু কোম্পানি, বহু মালিক। প্রত্যেকের আয় নির্ভর করে সে কয়জন যাত্রী তুলতে পারলো তার উপর। ফলে একই রুটের দুইটা বাস আসলে প্রতিদ্বন্দ্বী।

সামনের যাত্রীটা কে আগে তুলবে, তার উপরেই দিনের রোজগার।

এই একটা কারণ থেকেই ঢাকার বাসের চেনা চেহারাটা তৈরি, যেখানে-সেখানে থামা, দরজা খোলা রেখে চলা, গায়ের সাথে গা লাগিয়ে রেষারেষি।

ফ্র্যাঞ্চাইজিং মানে এই প্রতিযোগিতাটা তুলে দেওয়া। এক রুট, এক কোম্পানি। চালক বেতনে চলবে, যাত্রীপ্রতি কমিশনে না। যাত্রী ধরার তাড়া থাকবে না, কারণ যাত্রী কোথাও যাচ্ছে না।

জামিলুর রেজা চৌধুরী নিজে একে দলিলের অন্যতম প্রধান সুপারিশ বলেছিলেন।

বাস্তবায়ন, শূন্য।

২০১৯ সালে হাইকোর্ট বিয়াল্লিশটা রুটে এটা চালু করার নির্দেশ পর্যন্ত দিয়েছেন। নির্দেশটা ঝুলে আছে, সাত বছর হলো।

মাঝখানে একবার মনে হয়েছিল কিছু একটা হবে।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে রেষারেষি করতে থাকা বাসের চাপায় ঢাকায় দুইজন কলেজশিক্ষার্থী মারা যান। শহর অচল করে নেমে এসেছিল স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা।

সরকার তখন বাস রুট গোছানোর জন্য কমিটি গঠন করে। আড়াই বছর, এগারোটা বৈঠক।

রাস্তায় নামা নতুন বাস, শূন্য।

খেয়াল করেন, যেই রেষারেষি ওই দুইজনকে মেরেছিল, সেটা বন্ধ করার দাওয়াইটাই দলিলে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে লেখা ছিল।

২০২১ সালে অবশেষে একটা পরীক্ষা চালু হয়, “ঢাকা নগর পরিবহন”, এক রুট, এক কোম্পানি, পঞ্চাশটা বাস।

চার বছরে সেটা নেমে এসেছে সাত-আটটা বাসে। অপারেটরের মাসে লোকসান বিশ লাখ টাকা। কোম্পানির নিজের অভিযোগ, কাউন্টার বসাতে গেলে চাঁদা চাওয়া হয়।

তাহলে হিসাবটা দাঁড়ালো এইরকম।

দিনে সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ লাখ মানুষ বহন করে যেই বাহন, বিশ বছরে তার জন্য রাষ্ট্রের মোট অর্জন, একটা না-হওয়া সংস্কার, একটা না-মানা আদালতের নির্দেশ, এগারোটা বৈঠক, আর চাঁদাবাজের হাতে ছেড়ে দেওয়া আটটা বাস।

➖

এই জায়গায় এসে জানতে ইচ্ছা করে, একই সময়ে অন্য শহরগুলি কী করছিল।

তুলনার জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার দরকার নাই। নিচের শহরগুলি আমাদেরই মতো। ভিড়, কম টাকা, দুর্বল প্রশাসন, রাজনৈতিক ঝামেলা।

জাকার্তা দেখায়, কাজটা কত দ্রুত হতে পারে।

এসটিপির কাজ ঢাকায় শুরু হয় ২০০৪ সালের মার্চে। তার দুই মাস আগে, ১৫ জানুয়ারি, জাকার্তায় ট্রান্সজাকার্তার প্রথম করিডোরে বাস নেমে গেছে। পরিকল্পনা থেকে উদ্বোধন, মোট নয় মাস।

আজ সেই নেটওয়ার্ক আড়াইশো কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম বিআরটি।

এবং ভাড়াটা ২০০৪ সাল থেকে বাড়ে নাই, এখনো টাকার হিসাবে ত্রিশের কম। গাজীপুরের বিশ কিলোমিটারের ভাড়া ধরা হয়েছিল একশো চল্লিশ।

সিউল দেখায়, এই কাজে রাজনীতিবিদের লাভ আছে।

২০০৪ সালের ১ জুলাই সিউল পুরা শহরের বাসব্যবস্থা বদলে ফেলে, এক দিনে। নতুন রুট, নতুন ভাড়া, নতুন কার্ড। আট হাজার বাসে কার্ড-রিডার বসানো হয় এক রাতে।

কার্ড-রিডার মানে বাসের দরজায় বসানো একটা ছোট যন্ত্র, যেখানে যাতায়াত কার্ড টাচ করলে ভাড়া নিজে থেকে কেটে যায়, যত দূর গেছেন, ততটুকু।

আসল কথাটা অবশ্য ভাড়া কাটা না। আসল কথা হলো, ওই একই কার্ডে বাস থেকে নেমে পাতালরেলে উঠলে, কিংবা এক বাস থেকে আরেক বাসে গেলে, দ্বিতীয়বার ভাড়া দিতে হয় না।

এই একটা নিয়মে সমস্ত শহরের সব বাস আর সব ট্রেন মিলে একটাই যানবাহন হয়ে যায়।

যাত্রীর আর দরকার পড়ে না এমন একটা বাস খুঁজে বের করার, যেটা তাকে বাড়ি থেকে অফিস পর্যন্ত পুরাটা পৌঁছে দেবে।

সিউলে প্রথম মাসটা গেছে বিশ্রী। ভাড়ার হিসাবে ভুল, যাত্রীদের অর্ধেকের বেশি ক্ষুব্ধ।

কিন্তু তিন মাসের মাথায় ক্ষোভ নেমে আসে তেরো শতাংশে, বাসের গতি ঘণ্টায় এগারো-সতেরো থেকে ওঠে বিশ-বাইশে। আর পরের কয়েক বছরে দুর্ঘটনা কমে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

পাশাপাশি সিউল আরেকটা কাজ করছিল, শহরের মাঝখানের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ভেঙে ফেলছিল। ওই পথে চলতো দিনে এক লাখ উনসত্তর হাজার গাড়ি। ঢাকার এক্সপ্রেসওয়েতে চলে বিয়াল্লিশ হাজার।

মানে আমাদেরটার চার গুণ ব্যস্ত একটা আকাশ-রাস্তা একটা শহর ইচ্ছা করে ভেঙে খাল বানিয়ে ফেললো।

যানজট আর ফিরলো না। কারণ আগের বছরে সাজিয়ে রাখা বাসব্যবস্থা গাড়ির যাত্রীদের শুষে নিয়েছিল। দুইটা প্রকল্প ইচ্ছা করেই জোড়া লাগানো ছিল।

যেই মেয়র এই দুইটা কাজ করেছিলেন, তিন বছর পর ভোটাররা তাকে দেশের প্রেসিডেন্ট বানায়।

কলোম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা দেখায়, বাসের সীমাটা আসলে কোথায়।

ঢাকার উপদেষ্টা কমিটি মেট্রো ঢুকিয়েছিল এই যুক্তিতে যে একটা বিআরটি লাইন ঘণ্টায় বিশ হাজারের বেশি যাত্রী টানতে পারে না।

বোগোতার বিআরটি তখনই টানছিল ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ হাজার।

সংস্থা গঠনের চোদ্দ মাসের মাথায় বাস রাস্তায়। সড়ক-দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমেছিল বিরানব্বই শতাংশ।

সৎ কথাটাও বলি, বিআরটিরও সীমা আছে। ভিড়ের চাপে বোগোতা শেষ পর্যন্ত মেট্রোতেই গেছে, ২০১৮ সালে। কিন্তু ততদিনে বিআরটি তাকে পঁচিশটা বছর কিনে দিয়েছে, দশ ভাগের এক দামে।

দিল্লি দেখায়, ভুলটা আসলে কেমন হয় দেখতে।

দিল্লি মেট্রো বানিয়েছে কিলোমিটারপ্রতি সাত কোটি ডলারের বেশি খরচে। একই দেশে, একই সময়ে, আহমেদাবাদ বিআরটি বানিয়েছে কিলোমিটারপ্রতি আঠারো লাখ ডলারে, চার বছরে। ফারাক প্রায় চল্লিশ গুণ।

আর এত টাকা ঢালার পরও, জাতিসংঘের হ্যাবিট্যাটের হিসাবে, দিল্লির মাত্র দুই দশমিক দুই শতাংশ মানুষ মেট্রো-নেটওয়ার্কের আধা কিলোমিটারের মধ্যে থাকে।

সেই দিল্লি নিজের বিআরটিটা ভেঙে ফেলেছে ২০১৬ সালে।

অথচ ওই অর্ধেক বানানো করিডোরেও বাসযাত্রীর সময় কমেছিল চল্লিশ শতাংশ। ভাঙার মামলা যখন আদালতে ওঠে, রায়ে লেখা হয়েছিল, উন্নত দেশ সেইটা না, যেখানে গরিবের গাড়ি আছে, উন্নত দেশ সেইটা, যেখানে ধনী চড়ে গণপরিবহনে।

তবু ভাঙা হলো।

কারণ দিল্লি যেটা বানিয়েছিল, সেটা পুরা বিআরটি ছিল না। চারটা উপাদানের মধ্যে ছিল একটা, মাঝখানের আলাদা লেন। টিকিট কাটা হতো বাসে উঠে, স্টেশন আর বাসের মেঝে সমান ছিল না, মোড়ে বাসের কোনো অগ্রাধিকার ছিল না।

করিডোরটাও ছিল একলা। পাড়া থেকে যাত্রী তুলে করিডোরে পৌঁছে দেওয়ার ছোট বাসগুলিও কখনো নামে নাই।

বিআরটি আসলে একটা নেটওয়ার্কের নাম, একটা লাইনের নাম না। লাইনটা কাজ করে তখনই, যখন চারপাশের বাসগুলি তাকে যাত্রী এনে দেয়।

গাজীপুরে লাইনটা বানানো হয়েছে। চারপাশটা বানানো হয় নাই।

➖

মেট্রো নিয়ে শেষ সাক্ষীটা ঢাকার নিজের লোক।

ঢাকার মেট্রো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০২৫ সালে প্রকাশ্যে বলেছেন, ঢাকায় মেট্রো বানাতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ বাইশ থেকে পঁচিশ কোটি ডলার। ভারতের পাটনায় চার কোটি।

ঢাকার এক কিলোমিটারের টাকায় পাটনা বানায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার।

কথাটা কোনো সমালোচকের না। যেই কোম্পানি মেট্রো বানায়, তার প্রধানের। কারণও তিনিই বলেছেন, ঋণদাতার শর্তে দরপত্র আটকে থাকে গুটিকয় বিদেশি ঠিকাদারে, নকশায় বাড়াবাড়ি, তদারকিতে ঢিলা।

লাইনটা কাজের, সেটাও সত্য। দিনে চার লাখ পর্যন্ত মানুষ ব্যবহার করছে। কিন্তু শহরের দৈনিক দুই কোটির বেশি যাতায়াতে মেট্রোর ভাগ এক শতাংশের কাছাকাছি।

বাকি সবাই নিচে, রাস্তায়। যেই রাস্তার জন্য বিশ বছরের বরাদ্দ ছিল এগারোটা বৈঠক।

➖

এতটা পথ ঘুরে এসে প্রশ্নটা আর এড়ানো যায় না। এই বিশ বছরের দায় কার?

পরামর্শকদের দিকে না, তাদের নম্বরের খাতাই তো বাসের পক্ষের সাক্ষী। মেট্রোর দিকেও না, জিনিসটা দরকারি।

আঙুলটা সিদ্ধান্তের চেয়ারগুলির দিকে।

২০১১ সালে যেই হাত কোনো বিআরটির মাটি কাটার আগে গাড়ির এক্সপ্রেসওয়ের চুক্তিতে সই করেছিল, সেই হাতগুলির দিকে।

এর মধ্যে গেছে তিন রকমের আমল, নির্বাচিত, ‘স্বনির্বাচিত’, অন্তর্বর্তী। সই বদলেছে, দল বদলেছে। ক্রমটা একবারও বদলায় নাই।

গাড়ির প্রকল্প আগে চলে। বাসের প্রকল্প ঝুলে থাকে।

কেন বদলায় না, তার দুইটা ব্যাখ্যা আছে।

প্রথম ব্যাখ্যাটা আন্তর্জাতিক।

মেগাপ্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে নামকরা গবেষক অক্সফোর্ডের বেন্ট ফ্লিভবিয়ার্গ শত শত প্রকল্প ঘেঁটে দেখিয়েছেন, বড় প্রকল্প অনুমোদন পায় এমন সব সংখ্যার উপর ভর দিয়ে, যেগুলি পরে টেকে না।

খরচ ধরা হয় কম, যাত্রী ধরা হয় বেশি। আসল হিসাবটা বেরোয় তখন, যখন টাকা ঢালা শুরু হয়ে গেছে আর পিছানোর পথ নাই।

ঢাকার খাতা এই কথার সাক্ষী।

মেট্রোরেল-৬ পাশ হয়েছিল প্রায় বাইশ হাজার কোটি টাকায়, শেষ হয়েছে বত্রিশ হাজার সাতশো কোটিতে। মেট্রোরেল-১ অনুমোদন পেয়েছিল বাহান্ন হাজার কোটিতে, দরপত্রে দাম উঠেছে প্রায় ছিয়ানব্বই হাজার কোটি।

আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দিনে আশি হাজার গাড়ি ওঠার কথা ছিল, ওঠে বিয়াল্লিশ হাজার।

অর্থাৎ মেট্রো যখন বিআরটিকে হারিয়ে দিলো, তখন যেই দামে সে জিতেছিল, সেটা আসল দাম ছিল না।

দ্বিতীয়টা দেশি, আর অঙ্কের মতো সরল। যেই টেবিলগুলি ঘুরে ফাইল পাশ হয়, সচিব, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, মন্ত্রী, তাদের কতজন অফিসে যান বাসে চড়ে?

যেই বাহনে সিদ্ধান্তদাতারা নিজেরা চড়েন না, সেই বাহন বিশ বছর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। থেকেছেও।

➖

২০২৪ সালে এসটিপির মেয়াদ ফুরিয়েছে। তার তিনটা বিআরটির একটাও চলে নাই।

গত ৪ আগস্ট এসেছে নতুন মহাপরিকল্পনা। মেয়াদ আবারও বিশ বছর। ভিতরে আটটা মেট্রো, ছয়টা এক্সপ্রেসওয়ে, পাঁচটা মনোরেল, তিনটা রিং রোড। আর বিআরটি দুইটা।

চাওয়া হয়েছে ছয় হাজার চারশো কোটি ডলার, পুরানা দলিল বিশ বছরের জন্য যা চেয়েছিল তার প্রায় বারো গুণ।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটাও চেনা, ২০১৫ সালের সংশোধিত পরিকল্পনার সহ-লেখক তারাই।

দলিল বদলায়। লেখক থাকে। ক্রমও থাকে।

তবে এইটার অনুমোদন এখনো হয় নাই। দরজাটা খোলা।

পুরানা দলিল ভুল ছিল বলে ব্যর্থ হয় নাই। ব্যর্থ হয়েছে কারণ সেটা মানতে কেউ বাধ্য ছিল না। দলিল বলেছিল আগে বাস, রাষ্ট্র সই করলো আগে এক্সপ্রেসওয়ে।

তাতে কোনো নিয়ম ভাঙা হয় নাই, কারণ নিয়মটাই ছিল না।

কথাটা নতুন পরিকল্পনার শর্তেও লেখা আছে। যেই ব্যাংকের টাকায় এই পরিকল্পনাটা বানানো হয়েছে, তারা বলে দিয়েছে, এই পরিকল্পনাকে হতে হবে ছাঁকনি, যাতে পরিকল্পনার বাইরের প্রকল্প ঢুকতেই না পারে।

কাজেই আসল প্রশ্ন কয়টা মেট্রো বা কয়টা এক্সপ্রেসওয়ে, তা না। প্রশ্নটা একটাই।

এইবার কি এমন কিছু থাকবে, যেটা এক নম্বর প্রকল্পকে লাইন ভেঙে সামনে চলে আসতে দেবে না?

না থাকলে নতুন দলিলটাও আগেরটার মতোই একটা ইচ্ছাপত্র।

গাজীপুরের বিশ কিলোমিটার এখনো অপেক্ষায়। বুয়েট কমিটির যুক্তি ফেলনা না। বুয়েট কমিটির হিসাবে প্রকল্পে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে চার হাজার আড়াইশো কোটি টাকায়। ফেলে রাখলে পুরাটাই লোকসান।

এখন টোল বসুক, রাস্তা খুলুক।

হিসাব হিসাবে অকাট্য। শুধু একটা ঘর ফাঁকা, তেরো বছরে দুই হাজার আটশো কোটি টাকা কার সিদ্ধান্তে গেলো, তার তদন্ত আজও হয় নাই।

ততদিনে বাসের লেনে উঠে যাবে গাড়ি। টোল প্লাজাটা বসবে টঙ্গীর উড়ালসেতুর কাছে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন