একটা চিঠি দিয়ে শুরু করি, যেটা ব্রডশিটের ইনবক্সে এসেছে গত সপ্তাহে।
লিখেছেন একজন নারী। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা, এখন একটা নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নাম গোপন রেখেছেন, তার ভাষায়, “সংগত কারণে।”
এই “সংগত কারণে” শব্দ দুইটাই আসলে পুরো লেখাটার বিষয়।
তার দাবিগুলো শুনলে অবাক হবেন, কারণ এত সামান্য জিনিসকে “দাবি” বলতেও অস্বস্তি হয়। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি, দরকারে রোস্টার করে হলেও। নির্ধারিত অফিস-টাইম। একটা বেতন-কাঠামো, যেটা কারও ব্যক্তিগত খেয়ালে বদলায় না। এইটুকুই।
আর এইটুকু বলতেই তাকে নাম লুকাতে হচ্ছে। ক্যারিয়ারকে তিনি তুলনা করেছেন “দূরারোগ্য ব্যাধি বয়ে বেড়ানোর” সঙ্গে। যেটা ছাড়াও যায় না, বওয়াও যায় না।
প্রশ্নটা হলো, এই ভয় কি তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা? নাকি সম্পূর্ণ যৌক্তিক হিসাব?
সেই হিসাবটাই করবো এই লেখায়। এবং হিসাবের শেষে দেখবেন, ভয়টা শুধু যৌক্তিক না, ভয়টাই এই দেশের বেসরকারি চাকরির অলিখিত প্রথম শর্ত।
➖
প্রথমে মেপে নেওয়া দরকার, বাংলাদেশের কর্মজীবী মানুষ পৃথিবীর ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও-র মতে সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার বেশি কাজ স্বাস্থ্যের জন্য “অতিরিক্ত।” সেই আইএলও-রই তথ্যে, পৃথিবীর দীর্ঘতম কর্মসপ্তাহের দেশগুলোর প্রথম পাঁচে বাংলাদেশ। সঙ্গী ভারত, ভুটান, কম্বোডিয়া।
বছরের হিসাবে একজন বাংলাদেশি কর্মজীবী খাটেন গড়ে প্রায় দুই হাজার চারশো ঘণ্টা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় কর্মসপ্তাহ ছত্রিশ ঘণ্টা, নেদারল্যান্ডসে বত্রিশ।
ভাগ করলে দাঁড়ায়, একজন ডাচ কর্মীর তুলনায় একজন বাংলাদেশি বছরে প্রায় ছয়শো ঘণ্টা বেশি খাটেন। ছয়শো ঘণ্টা মানে, আট ঘণ্টার হিসাবে, বাড়তি আড়াই মাসের ফুল-টাইম চাকরি। প্রতি বছর। বিনা স্বীকৃতিতে।
এবার সবচেয়ে তাজ্জব তুলনাটা শোনেন।
পর্তুগালে অফিস-সময়ের পরে বস যদি আপনাকে ফোন বা মেসেজ করেন, সেটা আইনত অপরাধ। কোম্পানির জরিমানা হয়। আইনটার নামই “বিশ্রামের অধিকার।”
ফ্রান্সে ২০১৭ সাল থেকে কর্মীর আইনি অধিকার আছে অফিস-সময়ের বাইরের ইমেইল উপেক্ষা করার, জবাব না দেওয়ার জন্য তাকে দায়ী করা যায় না। বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি, গ্রিস, আর্জেন্টিনা, একই পথে।
অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৪ থেকে আইন, বসের আফটার-আওয়ার কল না ধরার শাস্তি দেওয়া নিষেধ। এমনকি কেনিয়াও এই আইন বিবেচনা করছে।
অর্থাৎ পৃথিবীর একটা বড় অংশে এখন তর্ক চলছে, রাত আটটার পরে বসের মেসেজটাই বৈধ কি না।
আর ঢাকায়? রাত এগারোটার হোয়াটসঅ্যাপের জবাব না দিলে সকালে জবাবদিহি। শুক্রবারের মিটিং “টিম-স্পিরিট।” ছুটির দিনের কল ধরাটা “ডেডিকেশন।” যে জিনিস লিসবনে জরিমানাযোগ্য অপরাধ, ঢাকায় সেটা প্রমোশনের যোগ্যতা।
আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিজের হিসাব, দেশের প্রায় পঁচাশি শতাংশ কর্মজীবী কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। নিয়োগপত্র নাই, নির্ধারিত মজুরি নাই, ছুটির নিয়ম নাই।
প্রতি সাতজনে ছয়জন এমন ব্যবস্থায় কাজ করছেন, যেখানে “অধিকার” শব্দটাই প্রযোজ্য না।
➖
কেউ বলবেন, বাংলাদেশে তো শ্রম আইন আছে।
আছে, এবং এটাই এই গল্পের সবচেয়ে তিক্ত অংশ। শ্রম আইন ২০০৬-এ প্রায় সবই লেখা, আটচল্লিশ ঘণ্টার সীমা, সাপ্তাহিক ছুটি, ছুটির দিনে কাজ করালে তিন দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি, বছরে দশ দিন নৈমিত্তিক আর চোদ্দ দিন পীড়া-ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা।
বকেয়া বেতন আটকানো দণ্ডনীয় অপরাধ।
তাহলে কাগজের অধিকার হাতে পৌঁছায় না কেন? সেটাও পরীক্ষা করে নেওয়ার মতো।
ধরুন, আগামীকাল সকালে আপনি ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে, এবার আইনি প্রতিকার চাইবেন। আপনার সামনে রাস্তা দুইটা।
প্রথম রাস্তা, রাষ্ট্রের পরিদর্শক আপনার অফিসে আসবেন, নিয়ম ভাঙা দেখবেন, ব্যবস্থা নেবেন। বাস্তবে সেই পরিদর্শকের সংখ্যা প্রয়োজনের ভগ্নাংশ।
খোদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, তিনিও নাম গোপন রেখে সংবাদমাধ্যমে স্বীকার করেছেন, “অজ্ঞাত চাপে” পরিদর্শন আর মামলা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে চোখের পাহারা দেওয়ার কথা আপনার পক্ষে, সেই চোখ কারও ইশারায় বন্ধ।
দ্বিতীয় রাস্তা আদালত। এই রাস্তার চেহারা বোঝার জন্য একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
মিলনা, তিনি পোশাককর্মী। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর নিজের পাওনা টাকা চেয়ে মালিকের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিলেন। তারপর সাত বছর পার। মামলার নিষ্পত্তি হয় নাই।
মাঝখানে ঘটেছে আরেকটা জিনিস, মালিকপক্ষই তার বিরুদ্ধেই মামলা দিয়েছে, সেই মামলায় তাকে জামিন নিতে হয়েছে। নিজের বেতন চাইতে গিয়ে তিনি এখন দুই মামলার ঘানি টানছেন, একটায় বাদী, আরেকটায় আসামি।
মিলনা ব্যতিক্রম না, মিলনা লাইনের একজন। সেই লাইনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আটাশ হাজার মামলা। শুধু ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতেই সাত হাজারের বেশি। আইনজীবীরা বলছেন, শ্রমিকের পক্ষে লড়ার মতো আইনি শাখাই অধিদপ্তরের নাই, পরিদর্শকরা কখনো আদালতে হাজিরাই দেন না।
তাহলে আপনার পরীক্ষার ফলাফলটা লেখি।
অভিযোগ করলে প্রথমে চাকরি যাবে, প্রায় নিশ্চিত। তারপর আটাশ হাজারের লাইনে আপনি সর্বশেষ সংযোজন, গন্তব্য বছর পাঁচ-সাত দূরে। মাঝপথে পাল্টা মামলায় আপনি নিজে আসামি হতে পারেন। আর এই পুরো সময় সংসার চলবে কীসে, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো আইনের কোনো ধারায় নাই।
এই অঙ্কটা প্রতিটা বেসরকারি কর্মী মনে মনে জানেন। কেউ তাকে শেখায় নাই, হিসাবটা বাতাসে ভাসে। আর সেজন্যই কেউ মামলা করে না, কেউ প্রতিবাদ করে না, সবাই সয়ে যায়।
চাইলে এর একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণও আছে, এবং এটা শুনলে থমকে যাবেন। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে কর্মীদের “টার্গেট পূরণ না হওয়ার” অজুহাতে পদত্যাগে বাধ্য করার চর্চা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্কুলার জারি করে লিখতে হয়েছে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণিত অভিযোগ ছাড়া কাউকে চাকরিচ্যুত করা বা পদত্যাগে বাধ্য করা যাবে না।
বাক্যটা আরেকবার পড়ুন, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে লিখিতভাবে বলতে হচ্ছে, জোর করে পদত্যাগ করানো যাবে না। কোনো চর্চা কতটা মহামারি হলে তার বিরুদ্ধে সার্কুলার লাগে?
এখন বলুন, আমাদের চিঠির লেখক যে নাম লুকিয়েছেন, সেটা দুর্বলতা? নাকি এই ব্যবস্থায় টিকে থাকার একমাত্র বুদ্ধিমান কৌশল? কর্মী নাম লুকায়, রাষ্ট্রের কর্মকর্তা নাম লুকায়, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার লেখে।
একটা দেশের শ্রমবাজারের এক্স-রে রিপোর্ট এই তিন লাইনেই সম্পূর্ণ।
➖
তবে ব্রডশিটের ইনবক্সে পাঠানো চিঠির লেখকের অবস্থান আরেক স্তর জটিল, আর সেই স্তরে তার সঙ্গী দেশের কয়েক লাখ শিক্ষিত কর্মজীবী।
শ্রম আইনের সুরক্ষা মূলত তাদের, যারা আইনের চোখে “শ্রমিক।” কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এনজিও-কর্মকর্তা, নানা প্রতিষ্ঠানের সাদা-কলার পেশাজীবী, এরা সেই সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে পড়েন কি না, তা নিয়েই ধোঁয়াশা।
ফলে উল্টো এক সমীকরণ দাঁড়িয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকের জন্য কাগজে অন্তত একটা কাঠামো আছে, সেটা যত ভাঙাই হোক। আর শিক্ষিত অফিস-কর্মী, যিনি নিজেকে “চাকরিজীবী” ভাবেন, “শ্রমিক” না, তিনি আবিষ্কার করেন, তার জন্য স্পষ্ট কোনো নিয়মই নাই। অফিস-টাইম, ছুটি, ইনক্রিমেন্ট, সব ঝুলছে প্রতিষ্ঠানের “নীতি”র উপর। আর নীতি যারা লেখেন, তারাই ভাঙেন।
চিঠির লেখক এই শূন্যতার বাসিন্দা, আর সেখান থেকে তিনি যে দৃশ্যগুলো পাঠিয়েছেন, সেগুলো শোনার মতো।
দৃশ্য এক, জাতীয় বিদ্যুৎ-সংকটের সময় তার প্রতিষ্ঠান সরকারি নিয়ম মেনে অফিস-টাইম আর বিদ্যুৎ-ব্যবহারের অফিস-অর্ডার জারি করেছিল। অর্ডারটা ফাইলে আছে। মানা হয়নি একদিনও। নিয়মটা ছিল দেখানোর, মানার না।
দৃশ্য দুই, প্রতিষ্ঠানের গোড়ার লোকেরা, বিশেষত যারা অনুদান আনার কারিগর, নিজেদের বেতন নিজেরাই ঠিক করেন। কাঠামো ছাড়া বাড়ে, সাধারণ কর্মকর্তার সঙ্গে ফারাক লাখ টাকার।
দৃশ্য তিন, বছরের পর বছর অ্যাডমিন আর অ্যাকাউন্টসের প্রধান একই ব্যক্তি। যিনি নিজের বেতন নিজে বাড়ান, হিসাবও নিজে রাখেন। ক্যাশবাক্সের চাবি আর ক্যাশবাক্স পাহারার ডিউটি, দুটোই একজনের পকেটে।
তার সবচেয়ে ধারালো যুক্তিটা জনস্বার্থের। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে চলে সরকারি অনুদানে। অনুদান মানে জনগণের করের টাকা। তার ভাষায়, সেই টাকা যার হাতে যায়, সে সেটাকে নিজের সম্পত্তি গণ্য করে।
জনগণের টাকায় চলা প্রতিষ্ঠান যখন জনগণের বেঁধে দেওয়া নিয়মই মানে না, প্রশ্নটা তখন শুধু শ্রম-অধিকারের থাকে না, জবাবদিহির হয়ে যায়।
সততার খাতিরে লেখা থাকুক, এগুলো একজন কর্মীর ভাষ্য, ব্রডশিট এগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ হিসেবে প্রকাশ করছে না।
কিন্তু লোক-দেখানো নিয়ম, কাঠামোহীন বেতন, চিরস্থায়ী হিসাবরক্ষক, এই প্যাটার্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন সংস্থা পর্যন্ত এতবার ফিরে আসে যে এটা আর এক প্রতিষ্ঠানের গল্প না। বাইরে আলোকিত সমাজের সাইনবোর্ড, ভেতরে ব্যক্তিগত জমিদারি, এই স্থাপত্য একটা খাতের ছাঁচ।
➖
এই পুরো ভারের সবচেয়ে অসম বণ্টনটা পড়ে ঠিক আমাদের চিঠির লেখকের মতো মানুষের কাঁধে। তিনি নারী, সংসার-সন্তান সামলে চাকরি করেন, আর এই দ্বৈত জীবনকে বলেছেন “নিদারুণ যন্ত্রণা।”
কারণটা সরল। অফিস-টাইম অনির্ধারিত আর ছুটি অনিশ্চিত হলে সেই নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় দাম দেন তিনি, যার জন্য বাড়িতে দ্বিতীয় একটা কর্মক্ষেত্র অপেক্ষা করে।
পুরুষ কর্মী রাত করে ফিরলে সেটা “পরিশ্রম”, নারী ফিরলে পারিবারিক সংকট। কর্মঘণ্টার নৈরাজ্য তাই পুরুষের জন্য ক্লান্তি, নারীর জন্য দুই ফ্রন্টের প্রতিদিনের যুদ্ধ, যে যুদ্ধে হেরে অসংখ্য নারী নিঃশব্দে কর্মবাজার থেকেই ঝরে যান। কর্মঘণ্টার শৃঙ্খলা আর মাতৃত্ব-সুরক্ষা নারীর জন্য “সুবিধা” না, টিকে থাকার পূর্বশর্ত।
➖
শেষ হিসাবটা মিলাই।
যে দেশের কর্মসপ্তাহ পৃথিবীর দীর্ঘতমদের প্রথম পাঁচে। যেখানে পঁচাশি শতাংশ কর্মী কোনো আনুষ্ঠানিক সুরক্ষার ভেতরেই নাই। যেখানে আইনে অধিকার লেখা আছে, কিন্তু দাবি করার মূল্য চাকরি, আর প্রতিকারের ঠিকানা আটাশ হাজার মামলার লাইনের শেষ মাথা।
যেখানে জোরপূর্বক-পদত্যাগ ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সার্কুলার লিখতে হয়। আর যেখানে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বসের রাতের ফোনটাই জরিমানাযোগ্য অপরাধ।
এই সত্যগুলো একসঙ্গে রাখলে যা দাঁড়ায়, তাকে নিরাপত্তাহীনতা বলা যায় না। বলতে হয়, নকশা। কর্মী দুর্বল থাকবে, ভীত থাকবে, দর কষার টেবিলে পৌঁছাতেই পারবে না।
চিঠির লেখক শেষে একটা আশা লিখেছেন। কথাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কারও চোখে পড়লে উনারা যেন “সদয় হন।”
শব্দটা আরেকবার পড়ুন। সদয়।
একশো বছর আগে পৃথিবী যেটাকে অধিকার বলে মীমাংসা করেছে, বাংলাদেশের একজন শিক্ষিত কর্মজীবী নারী সেটা চাইছেন দয়া হিসেবে। নাম লুকিয়ে। কারণ এই দেশে প্রাপ্য চাওয়ার নিরাপদ পদ্ধতি ওই একটাই।
অধিকার যখন দয়ায় নেমে আসে, তখন আর বোঝার কিছু বাকি থাকে না। ব্যবস্থাটা আমরা কখনো ভাঙার চেষ্টা করিনি। ব্যবস্থাটা এভাবেই বানানো।