খালের লাশের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই শহর ঢাকা

আজ সোমবার সকালে ঢাকায় দুইটা পরীক্ষা হলো।

একটার নাম এইচএসসি। রুটিনে পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান আর যুক্তিবিদ্যার প্রথম পত্র। আরেকটার কোনো রুটিন নাই।

সেই পরীক্ষাটা হয় প্রতি বর্ষায়, প্রশ্ন প্রতিবার এক, আর ষাট বছর ধরে সেই পরীক্ষায় ফেল করছে রাষ্ট্র।

রোববার ভোরের ছয় ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ছিয়াত্তর মিলিমিটার, চব্বিশ ঘণ্টার হিসাবে সাতানব্বই। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, বংশাল, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, ধোলাইখাল, ডুবেছে সব। গুলশান-বনানীও বাদ যায় নাই।

পানির চোখে অভিজাত এলাকা বলে কিছু নাই, এইটুকু গণতন্ত্র ঢাকায় এখনো টিকে আছে।

দেশের অন্য প্রান্তে এই একই বৃষ্টি শুধু ভোগান্তি না, মৃত্যু। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বন্যা আর পাহাড়ধসে সাত জেলায় মারা গেছেন একান্ন জন। শুধু কক্সবাজারেই আটাশ। ক্ষতিগ্রস্ত দশ লাখের বেশি মানুষ, পানিবন্দি পৌনে তিন লাখ পরিবার।

চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা তাই ষোলো জুলাই পর্যন্ত স্থগিত।

কিন্তু ঢাকার ছেলেমেয়েরা? তাদের বোর্ডের পরীক্ষা চলছে সূচি অনুযায়ীই। তারা কোমরপানি ভেঙে হলে গেছে, প্রবেশপত্র পলিথিনে মুড়িয়ে।

শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর দাবি তুলেছিল। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, “আজকে আমরা গভীর পর্যবেক্ষণে আছি।”

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জরুরি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরীক্ষার্থীদের পরামর্শ দিলো, হাতে সময় নিয়ে আগেভাগে বাসা থেকে বের হও।

খেয়াল করেন সমাধানটা। রাষ্ট্র পানি সরাবে না। আপনি আগে বের হবেন।

ষাট বছরের নগর-ব্যর্থতার পুরা দায়টা গিয়ে পড়লো সতেরো বছরের একটা ছেলের ঘুম ভাঙার সময়ের উপর।

➖

এই শহরের ডোবার কথা ছিল না। কথাটা আবেগের না, মাপজোখের।

২০১২ সালে চারজন বাংলাদেশি গবেষক, শহিদুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন, মোস্তফা কামাল আর রাকিব আহমেদ, একটা নিরীহ চেহারার পরীক্ষা করেছিলেন।

তারা জোগাড় করলেন ১৯৬০ সালের সরকারি টপোগ্রাফিক ম্যাপ, যেই আমলে ঢাকার খালে তখনো নৌকা চলে। তার পাশে রাখলেন ২০০৮ সালে জাপানি স্যাটেলাইট ‘অ্যালোস’-এর তোলা ঢাকার ছবি।

তারপর কম্পিউটারে দুইটা স্তর একটার উপর আরেকটা বসিয়ে দেখলেন, আটচল্লিশ বছরে ম্যাপের কোন নীল দাগগুলি ছবিতে আর নাই।

উনিশশো ষাটে ঢাকায় নদী-খাল-জলাশয় ছিল প্রায় তিন হাজার হেক্টর, আর পানি ধরে রাখার নিচু জমি ছিল সাড়ে তেরো হাজার হেক্টর।

২০০৮-এর স্যাটেলাইট ছবিতে সেই নিচু জমি নেমে এসেছে ছয় হাজার চারশোতে। অর্ধেকের বেশি হাওয়া।

আরেকটা গবেষণা ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইটের তিরিশ বছরের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ১৯৭৮ থেকে ২০০৯-এর মধ্যেই ঢাকার জলাভূমি কমেছে প্রায় সাতাত্তর শতাংশ।

সাক্ষীটা খেয়াল করেন। এই সাক্ষী কোনো বিরোধী দল না, কোনো টকশো না। এই সাক্ষী মহাকাশ থেকে তোলা ছবি। স্যাটেলাইট মিছিল করে না, স্যাটেলাইট শুধু মনে রাখে।

মাটিতে নেমে হিসাবটা আরও করুণ। জরিপ বলছে, স্বাধীনতার সময়ও ঢাকা জেলায় নদী ছিল পনেরোটা। তার পাঁচটা, আঁটি, কনাই, দোলাই, পান্ডো আর নড়াই, এখন নিখোঁজ।

নামগুলি আরেকবার পড়েন। এগুলি গ্রামের নাম না। আস্ত পাঁচটা নদীর নাম, যেগুলি রাজধানীর ভিতর থেকে হারিয়ে গেলো, আর কেউ কোনোদিন জিডিও করলো না।

স্বাধীনতার পর খাল ছিল সাতান্নটা, টিকে আছে ছাব্বিশটা। ব্রিটিশ আমলের ছোট ঢাকায় পুকুর ছিল একশো বিশটা, এখন চব্বিশটা।

ধোলাই খাল দিয়ে নৌকা চলতো, খালটা গিয়ে মিশতো বুড়িগঙ্গায়। আজ ঢাকার মানুষকে ধোলাইখাল বললে সে বোঝে গাড়ির পুরানা যন্ত্রাংশের মার্কেট।

আস্ত একটা জলপথের নাম টিকে রইলো ভাঙারি পার্টসের ঠিকানা হয়ে।

এই খালগুলি বার্ধক্যে মরে নাই। এগুলিকে মারা হয়েছে। ভরাট করেছে হাউজিং, দখল করেছে প্রভাবশালী, আর সবচেয়ে বড় হাতটা ছিল রাষ্ট্রের নিজের।

খালের উপর কংক্রিটের ঢাকনা বসিয়ে রাস্তা বানানো হলো, নাম দেওয়া হলো বক্স কালভার্ট। পান্থপথ দিয়ে আজ যেই বাসটা যাচ্ছে, তার চাকার নিচে শুয়ে আছে একটা খালের লাশ।

তারপর প্রতি বর্ষায় আমরা অবাক হই, পানি কেন রাস্তায়?

পানি রাস্তায় না। পানি তার নিজের বাড়িতে ফিরেছে। দখলদার আমরা।

➖

এইবার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা। রাষ্ট্র কি জানতো না?
জানতো। দলিলসহ জানতো।

ঢাকার প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিল সেই ষাটের দশকে।

১৯৯১ সালে জাপানের জাইকার সহায়তায় সেটা নতুন করে করা হলো। জাপানি প্রকৌশলীরা পুরা শহরকে বারোটা ড্রেনেজ জোনে ভাগ করে হিসাব কষে দিয়ে গেলেন, কোন পানি কোন খাল দিয়ে কোন নদীতে যাবে।

২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের টাকায় আরেকটা স্টাডি হলো।

মানে ছয় দশক ধরে নকশা টেবিলে পড়ে আছে। ষাটের দশকে একটা, একানব্বইয়ে একটা, দুই হাজার এগারোতে একটা। প্রতি প্রজন্মে রাষ্ট্র একবার করে নকশা কেনে, তারপর নকশার খালগুলি বেচে দেয়।

ওই একানব্বইয়ের নকশার মূল যুক্তিটা আজ পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। জাপানি প্রকৌশলীদের পুরো হিসাবটা দাঁড়িয়ে ছিল একটা সরল সত্যের উপর। ভারী বৃষ্টিতে এই শহরকে বাঁচায় তার লেক আর নিচু জমি।

পানি আগে সেখানে গিয়ে জমে, দম নেয়, তারপর ধীরে ধীরে খাল বেয়ে নদীতে নামে। নকশার ভাষায় এগুলির নাম রিটেনশন, বাংলায় বললে শহরের ফুসফুস।

পরের তিন দশকের গবেষণাপত্রগুলিও একই কথা লিখে গেছে, প্রায় মুখস্থ বুলির মতো। ঢাকার নিচু জমিগুলিই তার আসল ড্রেনেজ, ওগুলি ভরাট হলেই জলাবদ্ধতা।

মানে যেই জমিগুলিকে বিজ্ঞান বলছে শহরের ফুসফুস, বাজার সেগুলিকেই চিনেছে প্লট হিসাবে। আজ সেখানে আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড।

টাকার খাতাটাও খুলি। শুধু গত চার বছরেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে খরচ করেছে অন্তত সাতশো তিরিশ কোটি টাকা। আর ওয়াসা-সিটি করপোরেশনের নিজেদের সূত্রই বলছে, এক যুগের খরচ কমপক্ষে তিন হাজার কোটি।

ফলাফল? দুই-তিন বছর আগেও ঘণ্টায় পঞ্চাশ মিলিমিটার বৃষ্টি এই শহর হজম করতো, এখন পঁয়ত্রিশেই ডুবে যায়।

পৃথিবীতে এমন বিনিয়োগ বিরল, যেখানে টাকা যত ঢালা হয়, সক্ষমতা তত কমে। তবু প্রকল্প থামে না। কারণ প্রকল্পের আসল ফসল তো পানি নিষ্কাশন না। প্রকল্পের আসল ফসল প্রকল্প নিজেই। তার টেন্ডার, তার বিল, তার ভাগ।

জলাবদ্ধতা এই শহরের সমস্যা না। জলাবদ্ধতা এই শহরের একটা চালু ব্যবসা। বৃষ্টি তার কাঁচামাল।

➖

তাহলে দায়টা কার?

আইনে লেখা ছিল, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ঢাকা ওয়াসার দায়িত্ব। ওয়াসা বলতো এটা সিটি করপোরেশনের কাজ, সিটি করপোরেশন বলতো ওয়াসার।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সরাসরি লিখেছে, আইনের মারপ্যাঁচে সংস্থাগুলি একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে সরে থাকে, আর মাশুল গোনে জনগণ।

ওয়াসা রিপোর্টে দাবি করলো তাদের ছাব্বিশ খালের বিশটাই সচল। গবেষকরা মাঠে গিয়ে দেখলেন, খালের মুখ বর্জ্যে বন্ধ।

তারপর দুই হাজার বিশ সালের একত্রিশে ডিসেম্বর মহাসমারোহে খালগুলি ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর হলো। ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে গেলো। পানি যেখানে ছিল, সেখানেই রইলো।

প্রতিশ্রুতিরও অভাব হয় নাই। দুই হাজার সতেরোয় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আশ্বাস দিলেন, জলাবদ্ধতা দ্রুত যাবে। মেয়র তাপস প্রথমে বললেন ওয়াসা ব্যর্থ, “আমাদের দায়িত্ব দিন”। দায়িত্ব পেলেন।

তারপর ঘোষণা দিলেন, অতিবৃষ্টি হলেও পানি নামবে পনেরো মিনিটে।

পনেরো মিনিট। আজ কাজীপাড়ার মানুষ পনেরো ঘণ্টাতেও পানি নামতে দেখে না।

তারপর মেয়র গেলো, প্রশাসক এলো, সরকারই বদলে গেলো। স্ক্রিপ্ট বদলালো না। এই রোববারও প্রশাসকের মুখে সেই চেনা বুলি, “সাময়িক জলাবদ্ধতা”, আর নগরবাসীর প্রতি ধৈর্য ধরার আহ্বান।

সাথে ফাউ, সরকারের নতুন “সমন্বিত মহাপরিকল্পনা”র ঘোষণা।

প্রতি বর্ষায় ঢাকায় একটা মহাপরিকল্পনার জন্ম হয়। শুকনা মৌসুমে সেটা মারা যায়। জানাজাও হয় না।

অথচ করণীয়টা কোনো রহস্য না। গবেষণা হিসাব কষে দেখিয়েছে, দখল হওয়া খালগুলির মাত্র পনেরোটা খুঁড়লেই শহরের জলাবদ্ধতার আশি শতাংশ সমাধান হয়।

মাত্র পনেরোটা খাল। ষাট বছরে তিনটা মাস্টারপ্ল্যান, ছয়টা জমানা, অগুনতি মেয়র-মন্ত্রী। কেউ পারলো না।

পারলো না, কারণ খাল খুঁড়তে গেলে আগে দখলদার সরাতে হয়। আর দখলদারের একটা নাম থাকে। নামের পিছনে দল থাকে, দলের হাতে ক্ষমতা থাকে। যেই আমলে যেই দল, সেই আমলে সেই দলের লোক খালের জমিতে।

তাই জলাবদ্ধতার আসল ঠিকানা রাস্তায় না। জলাবদ্ধতার আসল ঠিকানা জমির দলিলে। আর দলিলে হাত দেওয়ার সাহস বাংলাদেশের কোনো রাজনীতিকের কোনো আমলে হয় নাই।

➖

শেষ দৃশ্যে ওই পরীক্ষার্থীর কাছে ফিরি।

ভেজা জুতা হাতে, প্যান্ট গুটিয়ে ছেলেটা হলে ঢুকলো। প্রশ্নপত্রে পদার্থবিজ্ঞান। পানির চাপ, পানির প্রবাহ, পানি কীভাবে নিজের পথ খুঁজে নেয়।

উত্তরটা সে তিন ঘণ্টা ধরে লিখলো। যদিও তার চেয়ে ভালো উত্তর জানে হলের বাইরের রাস্তাটাই। পানি আসলেই নিজের পথ ভোলে না।

১৯৬০ সালের ম্যাপে যেই দাগগুলি নীল ছিল, প্রতি বর্ষায় পানি ঠিক সেই দাগ ধরেই ফিরে আসে। ম্যাপটা আমরা ভুলেছি, পানি ভোলে নাই।

দখলের দলিল মানুষের আদালতে চলে, পানির আদালতে চলে না।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

মন্তব্য করুন