চাকরির শেষ দিনটা নিয়ে আমরা যখন ভাবি, ভাবি বিদায় সংবর্ধনার কথা, ফুলের তোড়ার কথা। কিন্তু সেই দিনটার আসল ঘটনা অন্য জায়গায়।
সেইদিন একজন মানুষের নিয়মিত আয় চিরতরে বন্ধ হয়, আর প্রায় একই সময়ে তার হাতে এসে পৌঁছায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্কের টাকা।
প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশনের এককালীন অংশ। ত্রিশ বছরের শ্রম জমা হয়ে একটা সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
এই দুইটা ঘটনা একসঙ্গে ঘটে বলেই মুহূর্তটা এত বিপজ্জনক। মানুষটার আর আয়ের পথ সচল নাই, অথচ হাতে বড় টাকা।
এই টাকা দিয়ে বাকি জীবন চালাতে হবে, অথচ কীভাবে চালাবে তা বলে দেওয়ার দায়িত্ব কারো নাই।
এই একা মানুষটার সামনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কী কী রেখেছে, সেই হিসাব নিয়েই এই লেখা।
➖
তবে শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। উপরের বর্ণনাটা আসলে সংখ্যালঘুর অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশে কর্মে নিয়োজিত মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। গ্রামে এই হার ৮৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, শহরে ৭৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কর্মরত নারীদের প্রায় ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে।
অনানুষ্ঠানিক মানে নিয়োগপত্র নাই, প্রভিডেন্ট ফান্ড নাই, গ্র্যাচুইটি নাই, অবসরের কোনো তারিখও নাই। রিকশাচালক, দোকানের কর্মচারী, গৃহকর্মী, ক্ষেতমজুর, রাজমিস্ত্রি, ছোট ব্যবসায়ী।
তাদের কেউ একদিন অবসরে যান না। তারা কাজ করতে করতে একদিন আর পারেন না।
সেদিন কী হবে, তার একটা উত্তর বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। সেটা হলো সন্তান।
➖
এই সন্তান-নির্ভর ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, তার প্রমাণ আছে রাষ্ট্রের নিজের আইনে।
২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন। প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে, স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখতে হবে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাসে পাঠানো যাবে না।
আইন না মানলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড।
যে কাজ আপনাআপনি হয়, তার জন্য আইন লাগে না। ভরণপোষণ আইন থাকার অর্থই হলো, রাষ্ট্র জানে সন্তান সবসময় দায়িত্ব নেয় না।
কিন্তু জেনে রাষ্ট্র কী করল? নিজে কিছু দিল না। সন্তানকে আইনত বাধ্য করল। অর্থাৎ নির্ভরশীলতাকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তাকে আইনি রূপ দিল।
আইনটা কাজেও লাগে না। প্রথম আলো লিখেছে, এই আইনের ব্যবহার দেশে এখনো খুবই কম।
কারণটাও স্পষ্ট। লোকলজ্জা ও স্নেহের কারণে কোনো পিতা-মাতা সাধারণত নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে যেতে চান না। যে মা অবহেলা সইতে সইতে মারা যান, তার মৃত্যুর পর এই আইনে আর কিছু করার থাকে না।
একজন বৃদ্ধ মানুষকে তার নিজের ছেলের নামে থানায় যেতে বলা, এটাই বাংলাদেশে বার্ধক্যের নিরাপত্তার আইনি রূপ।
তাই ব্যবস্থাটা যা, তা এক বাক্যে বলা যায়। প্রত্যাশার কোনো তহবিল নাই, নিবন্ধন নাই, কিস্তির তারিখ নাই, প্রাপ্যতার হিসাব নাই। কেউ দিলে আছে, না দিলে নাই।
এরপর আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন। যাদের সন্তান নাই, বা সন্তান দায়িত্ব নিলো না, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী রেখেছে?
➖
সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত শান্তি নিবাস আছে ছয়টি। ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বাগেরহাট, বরিশাল ও সিলেটে। প্রতিটিতে পঞ্চাশটি করে আসন, সব মিলিয়ে তিনশো।
এর বাইরে ৮৫টি সরকারি শিশু পরিবারে প্রবীণদের জন্য দশটি করে আসন সংরক্ষিত। আরও সাড়ে আটশো।
শেষের ব্যবস্থাটা লক্ষ করার মতো। প্রবীণদের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান না বানিয়ে এতিমখানার ভেতরে কিছু আসন রেখে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশটির মতো।
আর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে ষাট বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ এক কোটি তিপ্পান্ন লাখের বেশি, জনসংখ্যার সোয়া নয় শতাংশ।
এই আশ্রমগুলিও বিনামূল্যের না। সরকারি প্রবীণ নিবাসেও থাকতে ও খেতে টাকা দিতে হয়। আর বেসরকারিগুলি কীভাবে চলবে, কারা ভর্তি হতে পারবে, কী মানে চলবে, তার কোনো রূপরেখাই নাই।
ফলে যে মানুষটার সন্তান দায়িত্ব নেয় নাই এবং হাতে টাকাও নাই, তার জন্য কিছুই থাকে না। বৃদ্ধাশ্রমও তার জন্য না।
এইখানেই মূল্যবোধের ব্যাখ্যাটা আটকে যায়। বাবা-মাকে দেখা বা না দেখা শুধু সন্তানের চরিত্রের প্রশ্ন হলে, ধনী-গরিব সবার ক্ষেত্রে ফলটা একরকম হতো। হয় না।
সামর্থ্য থাকলে দায়িত্ব পালন করা সহজ, না থাকলে কঠিন। আর সামর্থ্য না থাকলে বিকল্পও নাই।
➖
এইবার রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাগুলি।
সবচেয়ে পুরানোটির নাম বয়স্ক ভাতা, চালু ১৯৯৭-৯৮ সালে। এখন ভাতা পান একষট্টি লাখ মানুষ, জনপ্রতি মাসে সাড়ে ছয়শো টাকা।
দিনে বাইশ টাকারও কম। এই টাকায় বার্ধক্য চলে না, বড়জোর সংসারের ভেতরে বৃদ্ধ মানুষটার একটা সামান্য অবস্থান টিকে থাকে।
মধ্যবিত্তের জন্য মূল ব্যবস্থা সঞ্চয়পত্র। সব মিলিয়ে জমা তিন লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি।
কিন্তু ভাণ্ডারটা কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মানুষ যত টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছে, ভাঙিয়েছে তার চেয়ে বেশি।
ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি ছয় হাজার চারশো কোটি, উত্তোলন সাত হাজার পাঁচশো কোটির বেশি। মূল্যস্ফীতি ঘোরাফেরা করছে নয় শতাংশের আশপাশে।
সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফা সাড়ে এগারো শতাংশের কাছাকাছি, বড় বিনিয়োগে আরও কম। ফলে বহু বিনিয়োগকারীর প্রকৃত আয় প্রায় শূন্য।
তৃতীয় ব্যবস্থাটা নতুন। ২০২৩ সালে চালু সর্বজনীন পেনশন স্কিম, ঘোষিত লক্ষ্য প্রতিটি নাগরিকের বার্ধক্যের নিরাপত্তা।
বত্রিশ মাস পরের চিত্র হলো, নিবন্ধন তিন লাখ সাতাত্তর হাজার, তহবিলে জমা দুইশো পঞ্চান্ন কোটি টাকা।
প্রথম বছরে যুক্ত হয়েছিলেন পৌনে চার লাখ মানুষ। পরের বিশ মাসে যুক্ত হয়েছেন মাত্র পাঁচ হাজার। সরকারের লক্ষ্য অবশ্য বহাল, ২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি।
➖
এইবার দেখা যাক, মানুষের অবসরের টাকা আসলে কোথায় গেছে।
ডেসটিনির হিসাব এইখানে সবচেয়ে পরিষ্কার। এক যুগে তোলা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, নিজেদের হিসাবেই পঁয়তাল্লিশ লাখ মানুষ।
তাদের মধ্যে ছাত্র, গৃহিণী, স্কুলশিক্ষক আর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। ২০১২ সালে ধরা পড়ার পর আট বছরেও কেউ টাকা ফেরত পান নাই।
পিরোজপুরের এহসান গ্রুপে পণ্য ছিল ধর্ম। প্রতিষ্ঠাতা রাগীব আহসান একসময় মসজিদের ইমাম, পরে ঢাকার এক এমএলএম কোম্পানির কর্মী। তার প্রস্তাবটা সরল, ব্যাংকের সুদ হারাম, আমাদের এখানে সঞ্চয় রাখেন।
দশ হাজার গ্রাহকের একশো দশ কোটি টাকায় শুরু, শেষে অভিযোগ দাঁড়ায় সতেরো হাজার কোটিতে। এই অঙ্ক নিরীক্ষায় প্রমাণিত না, অভিযোগেরই অংশ।
২০২৩ সালে এমটিএফই। মাঠকর্মীও লাগে নাই, দালানও লাগে নাই। শুধু একটা অ্যাপ। ভুক্তভোগী এক থেকে পাঁচ লাখ, ক্ষতি প্রায় হাজার কোটি টাকা।
সিআইডি ফেরত আনতে পেরেছে চুয়াল্লিশ কোটি, আর সংস্থাটির কর্মকর্তাই বলেছেন সেই টাকা গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো কঠিন হবে।
সরকারি যোগফল হলো, এমএলএম ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে আটকে আছে প্রায় বাইশ হাজার কোটি টাকা, গ্রাহক প্রায় এক কোটি।
রাষ্ট্রের পেনশন তহবিল বত্রিশ মাসে জমিয়েছে দুইশো পঞ্চান্ন কোটি। প্রতারকের পাত্রে বাইশ হাজার কোটি। ব্যবধান প্রায় নব্বই গুণের।
➖
এই তালিকায় সবচেয়ে নতুন সংযোজনের নাম জুয়া।
সরকার গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ পাস করেছে। ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট রহিত করে অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং ও ডিজিটাল ওয়ালেটভিত্তিক সব জুয়াকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
আইন লাগার কারণটা সংখ্যায় দেখা যায়। বিএফআইইউর হিসাবে, গত চার বছরে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
একই সময়ে এমন সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় একুশ গুণ। নগদ, বিকাশ, রকেট, উপায়, এইসব মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমেই বেশিরভাগ লেনদেন।
এবং এই নেশায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ ও তরুণরা। টাকার জন্য পরিবারে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, সম্পর্কে ফাটল ধরছে।
এমএলএম, অনিবন্ধিত সমিতি, ক্রিপ্টো অ্যাপ, বেটিং সাইট। এইসবের বাইরের চেহারা আলাদা, ভেতরের প্রস্তাব এক। অল্প টাকা দিন, বেশি ফেরত পাবেন, এবং দ্রুত।
যার সামনে চল্লিশ বছরের নিশ্চিত সঞ্চয়ের কোনো পথ খোলা নাই, তার কাছে এই প্রস্তাব অযৌক্তিক শোনায় না।
কারণ সঞ্চয় জিনিসটা কাজ করে সময় আর নিশ্চয়তার ওপর ভর করে। প্রতি মাসে অল্প করে রাখলে ত্রিশ বছরে সেটা বড় হয়, এই কথাটা তখনই সত্য, যখন জমা রাখার একটা নিরাপদ জায়গা থাকে, আর জমানো টাকার মূল্য টিকে থাকে।
দুইটার একটাও এইখানে নাই। যিনি অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন তার জন্য কোনো পেনশন তহবিল নাই। ব্যাংকে রাখলে মূল্যস্ফীতি বছরে নয় শতাংশ খেয়ে ফেলে। সমিতিতে রাখলে সেটা থাকবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নাই।
ফলে ধৈর্যের প্রতিদানটাই বাতিল হয়ে যায়। তিরিশ বছর নিয়ম করে জমিয়ে যদি কার্যত কিছুই না বাড়ে, তবে ধীরে জমানোর যুক্তিটা আর টেকে না।
এই অবস্থায় দ্রুত-বড়-হওয়ার প্রস্তাব লোভের ব্যাপার থাকে না, হিসাবের ব্যাপার হয়ে যায়। কারণ ছোট বাজি বারবার ধরলে ছোট ক্ষতি হয়, কিন্তু একবার লাগলে সেই অঙ্কটা এত বড় যে অন্য কোনো পথে সারাজীবনেও পৌঁছানো যেত না।
মধ্যবয়সে এই হিসাবটা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে গিয়ে যখন কেউ বোঝেন যে হাতে কিছুই জমে নাই, তখন তার সামনে আর তিরিশ বছর অবশিষ্ট নাই। ধীরে জমানোর সময় পার হয়ে গেছে।
যা বাকি আছে তা হলো একটা লাফ দেওয়ার চেষ্টা।
এখানেই ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হয়। যিনি হারান, তিনি শুধু টাকাটা হারান না, ওই টাকাটা আবার গড়ার সময়ও হারান।
➖
শূন্যতাটা কেন এত বড়, সেটাও আইনের দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে।
২০২৬ সালে সংসদে আমানত সুরক্ষা আইন পাস হয়েছে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে প্রত্যেক আমানতকারী সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
এইটা প্রকৃত অগ্রগতি। কিন্তু আইনের সুরক্ষা কোনো ব্যক্তির জন্য না, প্রতিষ্ঠানের জন্য। টাকা কোথায় রাখা আছে, সেইটাই ঠিক করে দেয় ফেরত পাওয়ার অধিকার আছে কিনা।
সমবায় সমিতি এই তালিকায় নাই।
অথচ সমবায় সমিতি আইনত সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় আমানত নিতে পারে। নিবন্ধনের জন্য দরকার মাত্র বিশজন সদস্য। নিবন্ধন দেয় সমবায় অধিদপ্তর, যেটি একটি উন্নয়ন সংস্থা, আর্থিক তদারকির সংস্থা না।
এছাড়াও, শাস্তির মাত্রা দেখলে ফারাকটা বোঝা যায়। নিবন্ধন ছাড়া নামের সঙ্গে “সমবায়” শব্দ ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ হাজার টাকা।
কোটি টাকার ব্যবসায় পাঁচ হাজার টাকা কোনো বাধা না, খরচের একটা খাত।
একই মানুষ, একই টাকা। ব্যাংকে রাখলে সতেরো দিনে দুই লাখ ফেরত পাওয়ার আইনি অধিকার। পাড়ার সমিতিতে রাখলে কোনো তহবিল নাই, সময়সীমা নাই, কর্তৃপক্ষ নাই।
আর গ্রামের যেই ব্যক্তির কাছে ব্যাংকের চেয়ে সমিতি অনেক বেশি চেনা, সে সমিতির কাছেই যায়।
➖
সীমান্তের ওপারে একই ঘটনা ঘটেছে, এবং সেখান থেকে শেখার আছে।
পশ্চিমবঙ্গের সারদা গোষ্ঠী ভেঙে পড়ে ২০১৩ সালের এপ্রিলে, সতেরো লাখেরও বেশি আমানতকারীর টাকা নিয়ে। ধরনটা পরিচিত, গ্রামের ছোট সঞ্চয়কারী, বিধবা নারী, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, পাড়ার পরিচিত এজেন্ট।
রাজ্য সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শ্যামল সেনের নেতৃত্বে একটি কমিশন বসায় আর টাকা ফেরানোর জন্য পাঁচশো কোটি রুপির তহবিল দেয়। কমিশন সেখান থেকে প্রায় দুইশো পঁচিশ কোটি ফেরত দিতে পারে।
দেড় বছর পর সরকার কমিশন বন্ধ করে দেয়। অবশিষ্ট একশো আটত্রিশ কোটি রুপি ফেরত চলে যায় সরকারের কোষাগারে, আর দপ্তরে পড়ে থাকে কয়েকশো বস্তা আবেদন। যেগুলি খোলাই হয় নাই।
কমিশনের হিসাব প্রকাশ পেতে লেগেছে এক যুগ। ২০২৬ সালের মার্চে কলকাতা হাইকোর্ট সেই নির্দেশ দিয়েছে।
কাজটা অসম্পূর্ণ, রাজনৈতিক, এবং দেরিতে। তবু ব্যবস্থাটা ছিল, একটা কমিশন, একটা তহবিল, একটা আবেদনের ঠিকানা।
বাংলাদেশে ডেসটিনির চার হাজার কোটির বিপরীতে আজও কোনো তহবিল নাই, কমিশন নাই। আবেদন জমার বস্তাও নাই, কারণ আবেদন নেওয়ার জায়গা কখনো তৈরি হয় নাই।
➖
সঞ্চয় যে শুধু প্রতারণায় যায়, তা-ও না। বড় অংশ যায় আরও নিঃশব্দে। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৩ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ায় এর চেয়ে বেশি শুধু আফগানিস্তানে।
ভারতে ৪৯ দশমিক ৮০, শ্রীলঙ্কায় ৪৩ দশমিক ৬০, ভুটানে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। চলতি বছর সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন হারটা এখন প্রায় ৮০ শতাংশ, যেখানে থাইল্যান্ডে দশ শতাংশ।
২০২২ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে প্রায় একষট্টি লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হলে একটা পরিবারের গড় খরচ পঞ্চান্ন হাজার টাকার বেশি।
মানুষ এই খরচ মেটায় কীভাবে, সেই হিসাব বিশেষভাবে বলার মতো। ভর্তি হওয়া মানুষদের ছাব্বিশ শতাংশের বেশি ধার করেছেন, প্রায় উনিশ শতাংশ আত্মীয়-বন্ধুর কাছ থেকে নিয়েছেন, সাড়ে পনেরো শতাংশ সম্পদ বিক্রি করেছেন।
নিয়মিত আয় থেকে চালাতে পেরেছেন মাত্র ছয় দশমিক দুই নয় শতাংশ। বাকিদের বড় অংশ সঞ্চয় ভেঙেছেন।
আর ভবিষ্যতের চাপটা এই দিক থেকেই আসছে। দেশে এখন মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা।
এই রোগগুলির চরিত্রই আলাদা। এগুলি একবারে শেষ হওয়ার মত না, বছরের পর বছর টাকা নিতে থাকে।
যে দেশে প্রবীণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে আর চিকিৎসার আশি শতাংশ ব্যক্তির পকেট থেকে যায়, সেখানে অসংক্রামক রোগের উত্থান মানে পরিবারগুলির ওপর একটা স্থায়ী, বাড়তে থাকা কর।
প্রতারক না থাকলেও সঞ্চয় শেষ হয়, শুধু ধীরে।
➖
এইবার একটা যোগসূত্র, যেটা সাধারণত আলাদা করে আলোচনা হয়। যেখানে রাষ্ট্রীয় পেনশন নাই, সেখানে সন্তানই পেনশন।
একজন সন্তান বিদেশ যেতে পারে, একজন অসুস্থ হতে পারে, একজন বেকার হতে পারে। তাই তিনজন থাকা নিরাপদ।
জনসংখ্যা আলোচনায় আমরা সাধারণত শিক্ষা, সচেতনতা, জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রাপ্যতা নিয়ে কথা বলি।
কিন্তু হিসাবের এই দিকটা কম উচ্চারিত হয় যে, বার্ধক্যের নিরাপত্তা না থাকলে বেশি সন্তান নেওয়াটা কুসংস্কার না, একটা যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।
➖
দেশের প্রায় সাড়ে সতেরো কোটি মানুষের মধ্যে এখন প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স পনেরো থেকে চৌষট্টির মধ্যে। অর্থাৎ কাজের বয়সের মানুষ সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, আর তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষ তুলনায় কম।
অর্থনীতিতে একে বলা হয় জনমিতিক লভ্যাংশ।
এই অবস্থাটা স্থায়ী না। বিশ্লেষকদের হিসাবে সুযোগটা ২০৩৩ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
আর প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেছে। গত কয়েক দশকে জন্মহার কমেছে, আয়ু বেড়েছে। ফলে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত থিতিয়ে গিয়ে এখন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, আর প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চললে লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগানোর আগেই দেশ বার্ধক্যজনিত অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।
আর ২০৫০ সালে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন প্রবীণ।
কেন এটা নিয়ে এত উদ্বেগ, তা বোঝা কঠিন না। যারা কাজ করেন, তারাই উৎপাদন করেন, সঞ্চয় করেন, কর দেন। তাদের অনুপাত কমলে তিনটাই কমে। আর ঠিক সেই সময়েই বাড়ে চিকিৎসা ও ভরণপোষণের খরচ।
যেসব দেশে এই ধাক্কা আগে এসেছে, সেখানে ভার বহন করেছে পেনশন তহবিল। কর্মজীবনের চল্লিশ বছরে অল্প অল্প করে যা জমেছে, বার্ধক্যের বিশ বছরে তা মাসে মাসে বের হয়েছে।
টাকাটা আগে থেকেই জমানো ছিল, ফলে খরচের সময় নতুন করে কারও ঘাড়ে পড়েনি।
বাংলাদেশে সেই তহবিল নাই। সর্বজনীন পেনশনে বত্রিশ মাসে জমেছে দুইশো পঞ্চান্ন কোটি টাকা। তহবিল না থাকলে খরচটা মুছে যায় না, শুধু জায়গা বদলায়।
এখানে সেটা যাবে সরাসরি পরিবারের ওপর।
হিসাবটা এক লাইনে করা যায়। একটা কর্মজীবী দম্পতি, তাদের ওপর দুই সেট বৃদ্ধ বাবা-মা, সঙ্গে নিজেদের সন্তান। চিকিৎসার আশি শতাংশ খরচ নিজের পকেট থেকে।
এই ভার একটা পরিবারের ওপর টেকে না।
➖
ধাক্কাটার আরেকটা মুখও আছে, যেটা এখনো সামনে আসে নাই।
গত অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন সাড়ে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ইতিহাসের সর্বোচ্চ। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে বিদেশ গেছেন সোয়া এগারো লাখের বেশি কর্মী।
এই মানুষগুলি একদিন ফিরবেন।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিকের কোনো পেনশন নাই। বিশ-পঁচিশ বছর কাজ করার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা ফেরে তার সঙ্গেই, এক যাত্রায়, নগদে।
সেই টাকা কোথায় রাখবেন, এই প্রশ্নের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর আজকের বাংলাদেশে নাই।
উত্তরহীন এই জায়গাটাই আগামী পঁচিশ বছরের সবচেয়ে বড় বাজার। ডেসটিনি সেটা দেখেছে, এহসান দেখেছে, এমটিএফই দেখেছে। বেটিং অ্যাপগুলি এখন দেখছে।
রাষ্ট্র এখনো দেখে নাই। ফলে যে মানুষটা আজ চল্লিশে, তার বার্ধক্যের পরিকল্পনা বলতে এখনো একটাই, ছেলেমেয়ে ভালো হোক, আর শরীরটা টিকে যাক।