মালয়েশিয়ায় একজন মানুষ এগারো বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি আছেন।
তার নামে কোনো মামলা নাই, বিচার হয় নাই, রায় নাই, সাজার মেয়াদও কোথাও লেখা নাই।
খবরটা বের হয়েছে দেশটার সংসদেই। গত ২২ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল এক লিখিত জবাবে জানান, ৩০ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার অভিবাসন ডিপোগুলিতে বন্দি বাইশ হাজারের বেশি মানুষ।
তার মধ্যে বাংলাদেশি এগারোশো তেত্রিশ জন, সংখ্যায় চতুর্থ বৃহত্তম দল।
জবাবের সঙ্গে একটা তালিকাও ছিল, কে কতদিন ধরে আছেন। বেশিরভাগই তিন মাসের কম। পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এক থেকে পাঁচ বছর। আটজন ছয় থেকে দশ বছর।
আর একজন, এগারো বছরের বেশি। লোকটার নাম জবাবে নাই, জাতীয়তাও নাই। থাকলে তিনি কারাগারে থাকতেন।
তিনি আছেন ডিপোতে।
এখন এই ডিপো জিনিসটা কী, সেইটা বোঝার চেষ্টা করলে বাকি গল্পটা নিজে নিজেই খুলতে থাকে।
➖
কারাগার চালাতে আদালত লাগে। কিন্তু ডিপো চালাতে লাগে শুধু একটা সন্দেহ, লোকটার কাগজ ঠিক নাই।
আইনের ভাষায় এর নাম প্রশাসনিক আটক। বিচার হয় নাই, সাজা হয় নাই। মানুষটাকে রাখা হয়েছে ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায়।
অপেক্ষাটা কতদিনের? মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইনের ৩৪ ধারার উত্তর, ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে “যত সময় প্রয়োজন।” সর্বোচ্চ সীমা লেখা নাই।
কারাগারের সাজার একটা শেষ তারিখ থাকে। এই ডিপোর সেটা থাকে না।
আদালতে গিয়ে যে জিজ্ঞাসা করবেন কেন আটক, সেই দরজাও একই আইন বন্ধ রেখেছে। ৫৯-এ ধারা বলে, আটকের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কেবল কাগজপত্র নিয়মমতো হয়েছে কি না, সেটা তোলা যায়।
অবৈধভাবে ঢোকার শাস্তিটাও আইনে লেখা আছে। দশ হাজার রিঙ্গিত জরিমানা, পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল, আর সর্বোচ্চ ছয় ঘা বেত। বেত মানে সত্যিকারের বেত। আইনের বইয়ে ওই শব্দটাই লেখা।
এই হলো ডিপো ঘরের নকশা।
এমন ঘর এখন পৃথিবীজুড়ে। জেদ্দার কাছে শুমাইসি, গ্লোবাল ডিটেনশন প্রজেক্টের নথিতে যার ধারণক্ষমতা বত্রিশ হাজার, এক ছাদের নিচে একটা জেলা শহরের সমান মানুষ।
টেক্সাসের মরুভূমিতে তাঁবুর শিবির ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা, আমেরিকার সবচেয়ে বড়। আসামের গোয়ালপাড়ায় মাটিয়া, ভারতের সবচেয়ে বড়। ত্রিপোলির তাজুরা। আলবেনিয়ায় ইতালির ভাড়া করা গিয়াদের।
এই সবগুলো ঘরেই বাংলাদেশিরা আছেন।
➖
মানুষ সেখানে ঢোকে কীভাবে?
প্রথম উত্তরটা সবার জানা। সীমান্ত পার হয়ে, নৌকায় চড়ে, দালালের হাত ধরে। উত্তরটা সত্যি, কিন্তু খাতা মেলালে আরেকটা রাস্তাও বের হয়, এবং সেটা অনেক চওড়া।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড ও ব্র্যাকের হিসাব ধরে বণিক বার্তা লিখেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪, এই দশ বছরে প্রায় পৌনে সাত লাখ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন আউটপাসে। আউটপাস মানে দূতাবাসের দেওয়া একটা কাগজ, পাসপোর্ট নাই এমন মানুষকে যেটা দিয়ে শুধু দেশে ফেরানো যায়।
এই পৌনে সাত লাখ প্রায় সবাই গিয়েছিলেন বৈধ ভিসায়, সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে। ফিরেছেন কাগজহীন হয়ে।
মানে মাঝখানে কোথাও একটা কল চলছে, যেটা বৈধ মানুষ ঢুকিয়ে অবৈধ মানুষ বের করে।
২০২২-এর আগস্টে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার খোলে, যাওয়ার শেষ তারিখ ২০২৪-এর ৩১ মে। ওই তারিখের মধ্যে যেতে পারেন নাই সতেরো হাজার সাতশো সাতাত্তর জন কর্মী।
সংখ্যাটা বাংলাদেশ হাইকোর্টের কার্যক্রমে ব্যবহৃত, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে আছে।
খেয়াল করেন, এদের প্রত্যেকের হাতে মালয়েশিয়ার অনুমোদিত কলিং ভিসা ছিল, জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্রও ছিল। ছিল না শুধু রিক্রুটিং এজেন্সির দেওয়া উড়োজাহাজের টিকিট।
হাইকোর্ট ২৪ জুন জানতে চেয়েছে, এদের টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।
আর যারা তারিখের আগে পৌঁছালেন? তাদের একটা অংশ গিয়ে দেখেন, যে চাকরির কথা বলে আনা হয়েছে, সেই চাকরিটাই নাই।
আইএলও, আইওএম ও ইউএনওডিসি ২০২৪-এর মে মাসে যৌথ বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশি কর্মীদের জোরপূর্বক শ্রমের জন্য একটা পাচার-চক্র সক্রিয়, কাজ না পাওয়া কর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে রাখা হচ্ছে ঠাসাঠাসি হোস্টেল আর গুদামঘরে।
প্রক্রিয়াটা হল, কাজ নাই মানে ভিসার শর্ত ভাঙা। শর্ত ভাঙা মানে অবৈধ। আর অবৈধ মানে অভিযানের তালিকায়।
মালয়েশিয়াকিনি লিখেছে, ২০২৪-এর ২৩ মার্চ এমন একদল প্রতারিত কর্মী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার হন তারা নিজেরাই।
গত বছরের মে মাসে ব্লুমবার্গ জানায়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে, শ্রমিক-শোষণ চক্রের তদন্তগুলি যেন তুলে নেওয়া হয়।
ঢুকেছিলেন বৈধ কর্মী হিসেবে। বের হবেন “অবৈধ অভিবাসী” হিসেবে। মাঝখানের কাজটা করেছে এজেন্সি, নিয়োগকর্তা, আর দুই দেশের সরকারের নীরবতা।
তারপর নামে অভিযান। গত সেপ্টেম্বরে কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে এক রাতে আটক প্রায় আটশো, সেখানে বাংলাদেশি তিনশো সাতাত্তর জন, ডেইলি স্টারের খবর। গত এপ্রিলে ইপোর এক কারখানায় গ্রেপ্তার হন ঊনআশি জন বাংলাদেশি।
ফলাফল, এক বছরে ডিপোর বন্দি সতেরো হাজার থেকে বেড়ে বাইশ হাজার। অথচ ঘরগুলির ধারণক্ষমতা সাড়ে একুশ হাজার। ঘরে যা ধরে, মানুষ এখন তার চেয়ে বেশি।
➖
ভারতে ব্যাপারটা আরও এক ধাপ এগিয়ে। সেখানে বিদেশে যাওয়ারও দরকার নাই, রাষ্ট্র নিজেই ঠিক করে দেয় কে বিদেশি।
আসামে এই কাজ করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল নামের একশোটা বিশেষ আদালত। ২০২১-এর শেষ পর্যন্ত তারা এক লাখ তেতাল্লিশ হাজার মানুষকে বিদেশি ঘোষণা করেছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজের সংসদীয় জবাবে সংখ্যাটা আছে।
একই মন্ত্রণালয় আরেক জবাবে জানিয়েছে, ১৯৮৫ থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই চৌষট্টি হাজার মানুষকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছে একতরফা রায়ে, মানে অভিযুক্ত আদালতে হাজিরই হন নাই, অনেকে নোটিশও পান নাই।
নতুন আইন কার্যকর হয়েছে গত ১ সেপ্টেম্বর। সেখানে লেখা, কেউ বিদেশি নন, এই প্রমাণের দায় তার নিজের। মানে রাষ্ট্র ইচ্ছা হলে সন্দেহ করবে, আর কাগজ খুঁজবেন আপনি।
এই ঘোষিত বিদেশিদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ একটাই, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।
আর এই এক লাখ তেতাল্লিশ হাজারের মধ্যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আসলে বহিষ্কার করা গেছে তিনশো উনত্রিশ জনকে। সংখ্যাটাও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই।
ঘোষিত বিদেশিদের ফেরত পাঠানো কঠিন, কারণ বাংলাদেশ তাদের নিজের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। ফলে তালিকায় নাম উঠলেও বেশিরভাগ মানুষ ভারতেই থেকে যান।
কেউ থাকেন মাটিয়ার মতো ক্যাম্পে। আসামের আটককেন্দ্রগুলিতে ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মারা গেছেন একত্রিশ জন, হিসাবটা মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নিজের, বিধানসভায় দেওয়া।
বাকিদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, ত্রিশ হাজার ঘোষিত বিদেশি নিরুদ্দেশ, যেখানে পাওয়া যাবে সেখান থেকেই ফেরত পাঠানো হবে।
ফেরত পাঠানোর সেই পদ্ধতির নাম পুশ-ইন। শব্দটা এখন সবারই পরিচিত। রাতের অন্ধকারে সীমান্তে নিয়ে ঠেলে দেওয়া, কোনো কাগজ ছাড়া।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত বিজিবির হিসাবে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এভাবে ঠেলে দেওয়া হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে। তাদের একশো বিশজনকে বিজিবি নিজেই শনাক্ত করেছে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের সুনালি খাতুন একজন, পরিচয়পত্র দেখানোর পরেও দিল্লি পুলিশ তাকে ও তার পরিবারসহ ছয়জনকে বাংলাদেশি বলে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেয়, ২০২৫ সালের জুনে।
কলকাতা হাইকোর্ট এই বহিষ্কারকে বেআইনি বলে। বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ আদালত রায় দেয়, ছয়জনই ভারতীয়। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে অন্তঃসত্ত্বা সুনালি ফেরেন ডিসেম্বরে, বাকি চারজন গত ৮ জুলাই।
একটা রাষ্ট্র তাদের বিদেশি বলেছিল, দুই দেশের আদালত বলল তারা ওই রাষ্ট্রেরই নাগরিক। মাঝখানে গেল তেরো মাস, আর রামপুরহাটের হাসপাতালে জন্ম নিল সুনালির ছেলে।
ঢাকা প্রতিবাদ করেছে, গত জুনে দিল্লিতে বিজিবি পুশ-ইনকে বলেছে বেআইনি ও অমানবিক। ভারতের পাল্টা জবাব, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রায় তিন হাজার অনুরোধ ঢাকার কাছে ঝুলে আছে, কোনোটা পাঁচ বছরের বেশি।
বৈঠক শেষ হয়েছে। পুশ-ইন বন্ধের সমঝোতা হয় নাই।
➖
মালয়েশিয়ার নিজের মানবাধিকার কমিশন সুহাকাম গত ১ জুলাই চারটা সুপারিশ করেছে, ডিপোগুলিতে ডাক্তার বাড়ানো, রোগ ঠেকানো, প্রতিটা মৃত্যুর তদন্ত করে ফল জানানো, আর বাইরের লোককে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া।
পরদিন উপমন্ত্রী সংসদে জানান, সুহাকামকেই এখনো ডিপোতে ঢোকার সরাসরি অনুমতি দেওয়া হয় নাই। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও ঢুকতে পারে না, ২০১৯ থেকে।
তবু ডিপোর ভিতরের খবর বের হয়, ছাড়া পাওয়া মানুষের মুখে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৪-এ তেইশজন সাবেক বন্দির সাক্ষাৎকার নিয়ে যে প্রতিবেদন ছাপে, তার শিরোনামই এক বন্দির বাক্য, “আমরা সূর্য দেখতে পাই না।”
এক কক্ষে আশি জন পর্যন্ত মানুষ, কম্বল নাই, পানির টান, নারীরা মাসিকের সময় ছেঁড়া কাপড় ব্যবহার করছেন। তেইশজনের প্রত্যেকে মারধর দেখেছেন, পনেরোজন নিজে মার খেয়েছেন, রাবারের পাইপ আর লাঠিতে।
মৃত্যুর হিসাবটা সংসদই দিয়েছে, ২৯ জুনের আরেক লিখিত জবাবে। পাঁচ বছরে ডিপোগুলিতে মৃত চারশো পঁয়ষট্টি জন, যাদের মধ্যে বারোজন শিশু। কারণের ঘরে রক্তে বিষক্রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, আর সংক্রামক ব্যাধির তালিকায় এইচআইভি, মেনিনজাইটিস, লেপটোস্পাইরোসিস।
শেষেরটা ছড়ায় ইঁদুরের প্রস্রাব মেশা পানিতে।
মন্ত্রীর হিসাবে এই মৃত্যুহার শূন্য দশমিক তেরো শতাংশ মাত্র। ভাগটা অন্যভাবে করলে, প্রতি সাড়ে সাতশো বন্দিতে একজন। এমন হেফাজতে, যেখানে কারো সাজা হয় নাই।
আর ওইখানে ফিলিপাইনের মৃত দুইশো বাইশ, ইন্দোনেশিয়ার একশো নয়, মিয়ানমারের একষট্টি, এবং “অন্যান্য দেশ” তিয়াত্তর।
জীবিত বন্দির তালিকায় বাংলাদেশের নিজের ঘর আছে, এগারোশো তেত্রিশ। মৃতের তালিকায় বাংলাদেশ “অন্যান্য”-র ভিতরে।
কতজন, মালয়েশিয়া বলে নাই। বাংলাদেশ জিজ্ঞাসাও করে নাই।
ডিপোগুলির ভিতরের বর্ণনা আছে একটা গবেষণাপত্রে। গত অক্টোবরে ডিসকভার সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ সাময়িকীতে ছাপা গবেষণায় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে পঁচিশজন ফেরত আসা বাংলাদেশি বন্দির, যারা আটক ছিলেন সৌদি আরব, লিবিয়া, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটা দেশে।
পঁচিশজনের ষোলোজন মার খেয়েছেন। পানি বরাদ্দ দিনে দেড় লিটার, গোসল দুই-তিন দিনে একবার। আর চিকিৎসা পাওয়া যায়, এক বন্দির ভাষায়, কেবল যখন কেউ প্রায় মারা যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
এই ঘরে ঢুকলে মানুষ বাইরের দুনিয়া থেকে মুছে যায়, সেটারও নথি আছে। ২০২৪-এর ঈদুল ফিতরের রাতে রিয়াদে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই দলের পাল্টাপাল্টি মিছিলের একটা টিকটক ভিডিও পুলিশের চোখে পড়ে। গ্রেপ্তার অন্তত তিরানব্বই জন বাংলাদেশি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সাত মাস পরে তাদের পঞ্চাশজনের তালিকা জোগাড় করে পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলেছিল। এক মা বলেছিলেন, ছেলের অবস্থার কিছুই তারা জানেন না। এক বাবা বলেছিলেন, কে সাহায্য করতে পারে, কোথায় যেতে হবে, তিনি জানেন না।
২০২৪-এর নভেম্বরের পর এই তিরানব্বই জনের আর কোনো খবর কোনো কাগজে নাই। ছাড়া পেয়েছেন, নাকি এখনো ভিতরে, কেউ লেখে নাই।
আমেরিকার সবচেয়ে বড় ক্যাম্পের নথি আবার সবচেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ, কারণ সেখানে সরকারি নিরীক্ষা দপ্তর ঢুকতে পেরেছিল।
টেক্সাসের ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা, ফোর্ট ব্লিস সামরিক ঘাঁটির ভিতরে তাঁবুর সারি, প্রতি খোপে বাহাত্তর জন করে।
নিরীক্ষা দপ্তর জিএও-র প্রতিবেদনে আছে, একশো ত্রিশ কোটি ডলারের এই শিবিরের ঠিকাদারের আটক-ব্যবস্থাপনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, খোলার দিন আইনজীবী বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করার ঘরই ছিল না, আর যে দুই সপ্তাহ শিবিরে একজন বন্দিও ছিলেন না, সেনাবাহিনী খাবারের পুরো বিল মিটিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এসিএলইউ-র যৌথ প্রতিবেদনে ভিতরের হিসাব, বাহাত্তর জনের জন্য ছয়টা টয়লেট, পরিষ্কার দুই সপ্তাহে একবার, এক বন্দি ত্রিশ দিন সূর্য দেখেন নাই, এক ডায়াবেটিস রোগী পনেরো দিন ইনসুলিন পান নাই।
খাবারের মান নিয়ে অনশন করায় জবাব এসেছে বিশজন প্রহরীর লাঠি আর মরিচের স্প্রেতে। গত জানুয়ারিতে নির্জন কক্ষে মারা যান কিউবার নাগরিক জেরালদো লুনাস কাম্পোস, ময়নাতদন্তে মৃত্যুর ধরন লেখা হয়েছে হত্যা।
পুরা মার্কিন ব্যবস্থার ছবিটা আছে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্র্যাকের খাতায়। জুলাইয়ে আইসিই হেফাজতে পঁয়ষট্টি হাজার মানুষ, যাদের প্রতি দশজনের সাতজনের নামে কোনো ফৌজদারি দণ্ড নাই।
➖
এই পর্যন্ত এসে ভাবতে পারেন, এতগুলি দেশে এত অব্যবস্থা, নিশ্চয়ই সামর্থ্যের ঘাটতি।
আইসিই-র সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর সাংবাদিক জোনাথন ব্লিটজারের কাছে, গত জুলাইয়ে ছাপা অনুসন্ধানে। সরকারের লক্ষ্যই হলো আটক-অবস্থাকে এমন খারাপ দেখানো ও অনুভব করানো, যাতে মানুষ নিজে থেকে চলে যায়।
ব্যবস্থাটা ঠিক এই কাজটার জন্যই বানানো। এর একটা আনুষ্ঠানিক সরকারি নামও আছে, স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যাবাসন নির্দেশিকায় “স্বেচ্ছা প্রস্থান”-এর আইনি সংজ্ঞা লেখা আছে। ফেরার আদেশে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সেই আদেশ পালন করা।
স্বেচ্ছা মানে ইচ্ছা নয়। স্বেচ্ছা মানে সময়মতো আদেশ মানা। একই নির্দেশিকার আরেক অনুচ্ছেদে লেখা, আদেশ না মানলে আটক।
আমেরিকার আইনে “স্বেচ্ছা প্রস্থান” একটা দরকষাকষি। নিজের খরচে, সময়মতো চলে গেলে নামের পাশে আনুষ্ঠানিক বহিষ্কারের আদেশ বসবে না, আর ওই আদেশের শাস্তিগুলিও এড়ানো যাবে। না গেলে জরিমানা, আর দশ বছরের জন্য অন্য কোনো আইনি সুরাহা চাওয়ার পথ বন্ধ।
চুক্তির এক পক্ষ বসে আছেন তাঁবুতে।
ফোর্ট ব্লিসের বন্দিদের হয়ে গত মে মাসে টেক্সাসের ফেডারেল আদালতে করা মামলার আরজিতে একজনের জবানবন্দি আছে। এখানে থাকতে থাকতে তিনি আর লড়ার ইচ্ছা হারিয়েছেন, আর ভিতরের অবস্থা তাকে এমন কাগজে সই করতে বাধ্য করেছে, যেটাতে অন্য অবস্থায় তিনি সই করতেন না।
একই আরজিতে প্রহরীদের কথা, তোমরা তো যেকোনো সময় নিজে থেকে চলে যেতে পারো। আর নতুন বন্দিদের উদ্দেশে বলা যে বাক্যটা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনের শিরোনাম হয়েছে, “তোমরা এখান থেকে বের হবে দুইভাবে, বহিষ্কৃত হয়ে, অথবা মরে।”
ব্লিটজার এনপিআর-কে বলেছেন, একটা নারী-ইউনিটের প্রায় অর্ধেক বন্দি শুধু ভিতরের অবস্থার কারণে বহিষ্কারে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। আরজির হিসাবে, ১ মে পর্যন্ত স্বেচ্ছা প্রস্থানে সই করেছেন প্রায় নব্বই হাজার মানুষ, আগের প্রশাসনের শেষ ষোলো মাসের সাত গুণের বেশি।
কায়দাটা নতুন না। ২০১২ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলি ইশাই ইরিত্রীয় ও সুদানি আশ্রয়প্রার্থীদের প্রসঙ্গে সরাসরিই বলেছিলেন, তাদের বন্দি করো, জীবন দুর্বিষহ করে তোলো।
তারপর নেগেভ মরুভূমিতে চালু হয় হোলট নামের “খোলা” কেন্দ্র, দিনে তিনবার হাজিরা, রাতে ভিতরে থাকা বাধ্যতামূলক। দেড় বছরে ইসরায়েল ছাড়েন প্রায় আট হাজার মানুষ।
আদালত অবশ্য প্রশ্নটার নিষ্পত্তি করেছিল ১৯৯০ সালেই। ওরান্তেস-এরনান্দেস বনাম থর্নবার্গ মামলায় মার্কিন আপিল আদালতে প্রমাণ হয়, অভিবাসন কর্মকর্তারা সালভাদরের বন্দিদের ফরম ধরিয়ে দিতেন না পড়িয়ে, সইয়ের জায়গায় দেখিয়ে বলতেন এখানে সই করো, না করলে অনির্দিষ্টকাল জেল।
আদালতের অভিমত, হেফাজতে এইভাবে নেওয়া সম্মতি জ্ঞাত সম্মতিও নয়, স্বেচ্ছাপ্রণোদিতও নয়।
➖
উপসাগরে আরেকধরনের ব্যবহারও চোখে পড়ে। মুখ বন্ধ রাখার।
২০২৪-এর ১৯ জুলাই আমিরাতে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল করেছিলেন প্রবাসীরা। ২০ জুলাই তদন্ত ঘোষণা, ২১ জুলাই বিচার ও রায়।
আটচল্লিশ ঘণ্টার কম সময়ে সাতান্ন জনের দণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লিখেছে, সবার জন্য আইনজীবী ছিলেন একজন, আদালতের নিযুক্ত, আর যাচাই করা ভিডিওতে মিছিলগুলি শান্তিপূর্ণ।
সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট সবাইকে ক্ষমা করলেন। দশ দিনের মধ্যে সাতান্ন জনই ঢাকায়। ক্ষমা মানে মুক্তি না, ক্ষমা মানে দ্রুততর বহিষ্কার।
কুয়েতে ২০২৫-এর জুলাইয়ে পাঁচ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে থানার সামনে দাঁড়ানো একশো সাতাশ জন বাংলাদেশিকে সরাসরি বিমানবন্দরে তুলে দেওয়া হয়, আরব টাইমসের খবরে, নিজেদের জিনিসপত্র পর্যন্ত আনার সুযোগ না দিয়ে।
আর সৌদি আরবে এই প্রক্রিয়া চলে কারখানার গতিতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক বিবরণীতে, সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএ-র মাধ্যমে প্রকাশিত, সপ্তাহে দশ থেকে পনেরো হাজার মানুষ ফেরত পাঠানোই এখন স্বাভাবিক গতি।
যেকোনো এক সপ্তাহে ত্রিশ হাজার মানুষ থাকেন ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায়, প্রায় আঠারো হাজারের নাম যায় নিজ নিজ দূতাবাসে, ভ্রমণ-দলিলের জন্য।
ওই আঠারো হাজারে বাংলাদেশি কতজন, বিবরণীতে থাকে না। কোনো সপ্তাহেই থাকে না। বাংলাদেশ জানে শুধু ফলাফল, ২০২৪-এ শুধু সৌদি আরব থেকেই আউটপাসে ফিরেছেন পঞ্চাশ হাজার মানুষ।
➖
লিবিয়ায় এর একটা বেসরকারি সংস্করণ আছে।
সরকারি আটককেন্দ্রের পাশে সেখানে চলে পাচারকারীদের নিজস্ব ঘর, যাত্রীরা যেগুলিকে বলেন, গেম ঘর।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির শরিফুল হাসানের হিসাব, ডেইলি স্টারে প্রকাশিত, লিবিয়া হয়ে ইতালি যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ঘরগুলিতে আটকা পড়েন, মুক্তিপণ ওঠে ত্রিশ লাখ টাকা পর্যন্ত।
সরকারি ঘরে সই আদায় হয়, বেসরকারি ঘরে টাকা যায়।
এই ঘরগুলির চূড়ান্ত নজির ২০২০-এর ২৮ মের এক ঘটনা। মিজদাহ শহরে জিম্মি অভিবাসীদের গুলি করে মারা হয়, নিহত ত্রিশজনের ছাব্বিশজন বাংলাদেশি, এগারোজন মাদারীপুরের। মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল জনপ্রতি বারো হাজার ডলার।
যারা ফেরেন, তারা ফেরেন আইওএম-এর ভাড়া করা উড়োজাহাজে। গত নয় মাসে ছয়টা ফ্লাইটে লিবিয়ার আটককেন্দ্র থেকে দেশে এসেছেন প্রায় বারোশো বাংলাদেশি, বেশিরভাগ ত্রিপোলির তাজুরা আর বেনগাজির গানফুদা থেকে।
আর যারা ফেরেন না, তাদের হিসাব পাওয়া যায় লিবিয়ার সৈকতে। গত বছরের জানুয়ারির শেষ চার দিনে সেখানে ভেসে আসে তেইশটা লাশ, দাফন হয় আজদাবিয়ায়। ধারণা করা হয় তারা বাংলাদেশি, তবে ত্রিপোলির রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, লাশগুলির সঙ্গে কোনো কাগজ ছিল না, জাতীয়তা নিশ্চিত করার উপায়ও নাই।
কোন কবরে কোন দেশের মানুষ, সেই হিসাবটা পর্যন্ত কোনো খাতায় নাই।
➖
ইউরোপ এখন এই ব্যবস্থার সবচেয়ে নতুন সংস্করণটা বানাচ্ছে। আর সেটার পরীক্ষা চলছে বাংলাদেশিদের উপরেই।
কারণ সমুদ্র পার হয়ে ইতালিতে পৌঁছানো মানুষের সবচেয়ে বড় দলটা এখন বাংলাদেশি। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বছর নৌকায় পৌঁছানো প্রতি দশজনের তিনজন বাংলাদেশি, সংখ্যায় বিশ হাজারের বেশি।
পৌঁছানোর পর একজন মানুষ কী করেন? আশ্রয়ের আবেদন করেন। ইউরোপের হিসাব রাখার দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের খাতায়, বাংলাদেশিদের এই আবেদনে প্রতি দশটা সিদ্ধান্তের মধ্যে নয়টাতেই ‘না’ আসে।
না মানে দেশে ফেরার আদেশ। গত বছর এমন আদেশ পেয়েছেন তেরো হাজার বাংলাদেশি।
কিন্তু আদেশ দেওয়া আর সত্যিই পাঠিয়ে দেওয়া এক জিনিস না। ওই তেরো হাজারের মধ্যে ফেরত পাঠানো গেছে দুই হাজারকে। বাকি এগারো হাজার রয়ে গেছেন ইউরোপেই।
তারা কাজ করেন, ভাড়া দেন, বাজার করেন। অথচ কাগজে তাদের থাকার অধিকার নাই, ধরা পড়লেই আটককেন্দ্র। এই এগারো হাজারের ফাঁকটা বন্ধ করতেই ইউরোপ নতুন আইন করেছে।
গত ১৭ জুন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পাশ হওয়া আইনটায় বড় বদল দুইটা।
এক, আগে ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায় কাউকে সর্বোচ্চ আঠারো মাস আটকে রাখা যেত। ইউরোপের শরণার্থী সংগঠনগুলির জোট ইসিআরই-র পাঠে, নতুন আইনে সেটা ত্রিশ মাস পর্যন্ত যেতে পারে, মানে আড়াই বছর।
দুই, ইউরোপ এখন অন্য দেশে জায়গা ভাড়া করে সেখানে বন্দিদের রাখতে পারবে। ওই দেশের সঙ্গে বন্দির কোনো সম্পর্ক থাকারও দরকার নাই।
এমন একটা ভাড়া করা কেন্দ্র ইতিমধ্যেই চালু। ইতালি সেটা বানিয়েছে নিজের সীমানার বাইরে, আলবেনিয়ার গিয়াদের নামের জায়গায়।
ওই কেন্দ্রে বাংলাদেশিদের ঢোকানোর দরজা খুলে দিয়েছে একটা শব্দবন্ধ। ২০২৪ সালের মে মাসে ইতালি বাংলাদেশকে ঘোষণা করে “নিরাপদ উৎস-দেশ”।
তালিকায় নাম উঠলে সুবিধাটা হয় এই, ওই দেশের কারো আবেদন আর খুঁটিয়ে দেখার দরকার পড়ে না, দ্রুত খারিজ করে দেওয়া যায়। এবং খারিজের অপেক্ষায় মানুষটাকে আটকে রাখা যায়।
দুইজন বাংলাদেশি শ্রমিক এই ঘোষণাটাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেন। গিয়াদেরে আটক অবস্থায় করা তাদের মামলা রোমের আদালত ঘুরে পৌঁছায় ইউরোপের সর্বোচ্চ আদালতে।
গত বছরের ১ আগস্ট সেই আদালত রায় দেয়, কোনো দেশকে “নিরাপদ” বলতে হলে সেটা ওই দেশের সব মানুষের জন্যই নিরাপদ হতে হবে। আর সরকারের এই ঘোষণা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।
দুই বাংলাদেশি শ্রমিকের মামলায় সাতাশ দেশের আশ্রয়-আইনের একটা স্তম্ভ নড়ে গেল। বাংলাদেশের কাগজে খবরটা প্রায় ছাপাই হয় নাই।
কেন্দ্রটা কেমন চলছে? ইতালীয় সংস্থা অ্যাকশনএইডের হিসাবে, পাঁচ বছরের জন্য বরাদ্দ প্রায় আশি কোটি ইউরো, আর একজন বন্দির জায়গা বানাতে খরচ হয়েছে ইতালির নিজের কেন্দ্রের সাত গুণ।
এত টাকার বিনিময়ে জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানে পাঠানো গেছে একশো বত্রিশ জনকে, দেশে ফেরানো গেছে বত্রিশজনকে।
গত জুনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা নিজেরাই কেন্দ্রটা দেখতে যান। তাদের কক্ষের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয় নাই।
ইউরোপের সঙ্গে নাগরিক ফেরত নেওয়ার একটা সমঝোতা বাংলাদেশের আছে, ২০১৭ সাল থেকে। কিন্তু কোন শর্তে বাংলাদেশ নিজের নাগরিকদের ফেরত নেয়, সেটা কেউ জানে না।
ইউরোপের হিসাব-নিরীক্ষা দপ্তরের এক প্রতিবেদনে দলিলটার উল্লেখ আছে, কিন্তু দলিলটা কোথাও প্রকাশ করা হয় নাই।
➖
এবার ভুক্তভোগীর খাতাটা, টাকায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে, বিদেশে যেতে একজন বাংলাদেশির গড় খরচ চার লাখ টাকার বেশি, আর সেই টাকার আটাত্তর শতাংশই যায় দালাল-মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে, ঢাকা ট্রিবিউনের হিসাবে।
ব্র্যাকের শরিফুল হাসানের তুলনায়, একই বাজারে ঢুকতে বাংলাদেশি খরচ করেন নেপালির তিন-চার গুণ।
খরচটা তুলতে সময় লাগে গড়ে সাড়ে সতেরো মাস, অদক্ষ কর্মীর বিশ মাস।
এখন মালয়েশিয়ার তালিকাটা আবার দেখেন। ডিপোর বেশিরভাগ বন্দি ছিলেন তিন মাসের কম। মানে সদ্য যাওয়া কর্মীদের বড় অংশ ধরা পড়েছেন খরচ ওঠার অনেক আগে।
আমেরিকার রুটে অঙ্কটা আরও বড়। গত ৩০ জুলাই ফেরত পাঠানো তেইশজনের বিশজন গিয়েছিলেন ব্রাজিল হয়ে, তেরো থেকে পনেরোটা দেশ পার হয়ে, বাসে এবং হেঁটে, ডেইলি স্টারের খবরে জনপ্রতি খরচ পঞ্চাশ থেকে পঁয়ষট্টি লাখ টাকা।
ফিরেছেন হাতকড়া পরে, আগের এক দলের হিসাবে টানা ষাট ঘণ্টা বেড়ি পায়ে।
মুক্তিপণের প্রসঙ্গে, ভূমধ্যসাগর থেকে ফেরা এক শ্রমিক ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, তার পঁচিশ লাখ টাকা জোগাড় করতে পরিবার ঋণ নিয়েছে, জমি বন্ধক দিয়েছে, আত্মীয়ের কাছে হাত পেতেছে।
ফেরার পর রাষ্ট্রের ঘরে যেটা জমা আছে সেটা হল, যাওয়ার সময় প্রত্যেকে ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তহবিলে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে দিয়ে যান।
ফেরার পর প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের যে চার শতাংশ সুদের পুনর্বাসন ঋণ, চালুর পর প্রথম বছরে সেটা পেয়েছিলেন ফেরত আসা কর্মীদের দুই শতাংশ। গবেষণা বলছে সাঁইত্রিশ শতাংশ জানতেনই না ঋণটা আছে।
মন্ত্রণালয়ের বাজেট নেমেছে বারোশো কোটি থেকে সাড়ে আটশো কোটিতে, ডেইলি স্টারের হিসাবে জাতীয় ব্যয়ের শূন্য দশমিক শূন্য আট শতাংশ। অথচ এই মানুষগুলিই গত অর্থবছরে পাঠিয়েছেন সাড়ে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ ব্যাংকের খাতায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।
➖
তাহলে এই ব্যবস্থার সামনে একটা রাষ্ট্র কী করতে পারে? কয়েকটা দেশে তার উদাহরণ আছে।
মেক্সিকো প্রত্যেককে গোনে। গত মার্চে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চোদ্দ মাসে আমেরিকায় আটক হয়েছেন এক লাখ সাতাত্তর হাজার মেক্সিকান, ওই দিন পর্যন্ত ভিতরে আছেন তেরো হাজার সাতশো বাইশ জন।
একই সময়ে তাদের কনসাল কর্মকর্তারা আটককেন্দ্রে ঢুকেছেন দিনে গড়ে ত্রিশ বার।
ফিলিপাইন কাজটা ঢুকিয়েছে আইনের ভিতরে। বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের আইনি সহায়তা তহবিলের টাকা কখনো একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের নিচে নামতে পারবে না, এটা আইনের ধারা, আর ওই টাকায় চলে বিদেশি আইনজীবী আর জামিন।
ফল, গত ডিসেম্বরে দেশটির অভিবাসী শ্রমিক সচিব জানান, বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা ফিলিপিনো এক বছরে ঊনপঞ্চাশ থেকে নেমে চব্বিশে।
ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর হিসাব ছাপে, আর মালয়েশিয়ার ডিপো থেকে নিজের নাগরিক ফিরিয়ে আনে দল ধরে ধরে, এই বছরের জুলাই পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি।
ভারতের সংসদেও প্রশ্নটা ওঠে নিয়মিত, মন্ত্রণালয় জবাব দেয় দেশওয়ারি তালিকা ধরে, ছিয়াশি দেশের কারাগারে দশ হাজারের বেশি ভারতীয়।
বাংলাদেশের ঘরে সংখ্যা আছে দুইটা। ২০১৯ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, বিদেশের কারাগারে প্রায় নয় হাজার বাংলাদেশি। ২০২৪ সালে পরের মন্ত্রী বলেন, ছাব্বিশ দেশে নয় হাজার তিনশো সত্তর।
পাঁচ বছরে দুইটা সংখ্যা, দুইবারই কেউ প্রশ্ন করেছিল বলে। কতজন সাজাপ্রাপ্ত আর কতজন বিনা বিচারে, কতজনের আইনজীবী আছে, কিছুই লেখা নাই।
মালয়েশিয়ার হিসাবেই তা ধরা পড়ে। কুয়ালালামপুরের হাইকমিশন এপ্রিলে বলেছে ক্যাম্পে বাংলাদেশি প্রায় চারশো। মালয়েশিয়ার সংসদ জুনে বলছে, শুধু ডিপোতেই এগারোশো তেত্রিশ।
কেন এমন হয়, তার উত্তর মন্ত্রণালয়ের নিজের নথিতে। শ্রম কাউন্সেলরদের সম্মেলনের প্রতিবেদনে লেখা, চোদ্দ দেশে শ্রম উইং ষোলোটা, মূল সমস্যা জনবল আর টাকার অভাব।
ওই সম্মেলনেই কাতারের প্রতিনিধি হিসাব করে দেখান, একজন কর্মকর্তা দিনে দুইশো কর্মীর সঙ্গে দেখা করলেও বছরে দাঁড়ায় দশ হাজারের কম, অথচ কাতারেই কর্মী দুই লাখ।
প্রতিবেদনটা এক দশক পুরনো, এবং আজও এটাই মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বিস্তারিত প্রকাশিত হিসাব। এই দশকে বিদেশে যাওয়া বেড়েছে, গত বছরেই সাড়ে দশ লাখ।
কাগজের দিকটাও একইরকম। অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার নিয়ে জাতিসংঘের যে সনদে বাংলাদেশ ২০১১ সালে অনুসমর্থন দিয়েছে, তার ষাটটা সদস্যের তালিকায় মালয়েশিয়া নাই, সৌদি আরব নাই, উপসাগরের কেউ নাই, ভারত নাই, আমেরিকা নাই, পশ্চিম ইউরোপের একটা দেশও নাই।
সই করেছে শ্রমিক পাঠানো দেশগুলি, নেওয়া দেশগুলির একটাও না।
আইন যেখানে বাধ্য করে, বাংলাদেশ সেখানে পক্ষ না। বাংলাদেশ যেখানে পক্ষ, আইন সেখানে বাধ্য করে না।
➖
কয়েকটা সৎ কথা লেখা থাকুক।
এক, অনেকেই সত্যিই কাগজ ছাড়া গেছেন। পঞ্চাশ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে তেরো দেশ পেরিয়ে মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানো কোনো আইনে বৈধ নয়, এই লেখা সেটা অস্বীকার করছে না।
দুই, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিটা রাষ্ট্রের আছে। প্রশ্নটা ঢোকা-না-ঢোকার না। প্রশ্নটা আটক-ঘরের ভিতরের অবস্থার, এবং ঘরে ঢোকার পর মানুষটার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার।
তিন, মালয়েশিয়া বা সৌদি আরব সংখ্যা অন্তত প্রকাশ করে। এই লেখার প্রায় প্রতিটা তথ্য তাদেরই ছাপানো নথি থেকে নেওয়া, লেখাটা লেখা গেছে সেই কারণেই।
চার, বাংলাদেশের দূতাবাস নিষ্ক্রিয়, এটাও সত্য না।
মে মাসে কুয়ালালামপুরের কনস্যুলার দল দুই দিনে দুইটা ডিপো ঘুরে চুয়াল্লিশজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে, ভ্রমণ-অনুমতিপত্র দিয়েছে। ফলে প্রশ্নটা কিছুটা সদিচ্ছার, কিন্তু পুরাটাই অনুপাতের।
➖
মালয়েশিয়ার ওই জবাবটায় শেষবার ফেরা যাক।
মৃতের তালিকায় ফিলিপাইনের নাম আলাদা করে লেখা আছে, কারণ ম্যানিলা খোঁজ রাখে আর জানতে চায়। সেই চাওয়ার পিছনে আইনে বাঁধা টাকা রাখে। ইন্দোনেশিয়ার নামও আছে, কারণ জাকার্তা নিজের নাগরিকদের হিসাব রাখে আর ফিরিয়ে আনে।
বাংলাদেশের নাম নাই, কারণ বাংলাদেশ এই হিসাবটা রাখে না। কে কোথায় আটক আছেন, তার খোঁজ পড়ে কেবল তখনই, যখন পাঁচ বছর পরপর কেউ সংসদে প্রশ্নটা তোলে।
তালিকার ওই একজন রয়েই গেলেন। এগারো বছরের বেশি, নাম নাই, জাতীয়তা নাই।
তিনি বাংলাদেশি কি না, বাংলাদেশ জানে না। জিজ্ঞাসা করলেই জানা যেত, কেউ জিজ্ঞাসা করে নাই।