নাইরোবির এক অফিসে কিছু তরুণ-তরুণী প্রতিদিন বসতেন ইন্টারনেটের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসগুলির সামনে। সহিংসতা, নির্যাতন, এমন সব বর্ণনা যা একবার পড়লে ভোলা কঠিন।
তাদের কাজ ছিল চ্যাটজিপিটি-কে ভদ্র বানানো। মডেল যাতে এইসব শিখেও উগরে না দেয়, সেইজন্য মানুষকে আগে দেখে দেখে চিহ্নিত করে দিতে হয়। মজুরি ঘণ্টায় দুই ডলারের আশপাশে।
‘টাইম’ ম্যাগাজিন ২০২৩ সালে গল্পটা সামনে আনে। আর চলতি বছর মন্ট্রিলের এক গবেষণা-সম্মেলনে আফ্রিকার ডেটা-শ্রমের পুরো সাপ্লাই চেইন ম্যাপ করে দেখানো হয়, কেনিয়া থেকে ফিলিপাইন, একই চিত্র।
এই ঘন্টায় দুই ডলার এবং এর জন্য ইন্টারনেটের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়গুলোর মুখোমুখি হওয়া নিশ্চিতভাবেই শোষণ, সন্দেহ নাই। কিন্তু এই শোষিত শ্রমিকের একটা জিনিস আছে, সেটা চুক্তি।
সে জানে সে কাজ করছে, কার জন্য করছে, এবং কত পাবে।
এবং সাপ্লাই চেইনের ভিতরে আছে বলেই সে আজকে ইউনিয়ন করছে, মামলা করছে, দর কষার একটা অবস্থানে পৌঁছেছে।
এখন প্রশ্নটা হলো, এই শোষণের চেয়েও নিচে কোনো ধাপ আছে কি?
অদ্ভুত শোনালেও সত্য, আছে। সেটা শোষণেরও অযোগ্য বিবেচিত হওয়া। যে টেবিলে খারাপ চুক্তিটাও সই হয়, সেই টেবিলে আমন্ত্রণই না পাওয়া।
এআই-অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান মোটামুটি এই জায়গায়।
এআই মডেলগুলো তৈরির এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কোন কাজে বাংলাদেশিরা যুক্ত না। বাংলাদেশ কেবল ডেটা দিয়ে যায়। এই অর্থনীতিতে তার কোন ভাগ নাই।
এবং এই অবস্থান কোনো দুর্ঘটনা না, আমাদের নীতি বা পলিসির ফল।
সংখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন আট কোটির বেশি মানুষ। শুধু ফেসবুকেই সাত কোটির উপরে।
জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, যার বৃহত্তম অংশ আঠারো থেকে চব্বিশ বছরের তরুণ। বড় ফেসবুক-মার্কেটগুলির মধ্যে বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয়।
এই সাত কোটি মানুষের প্রতিমুহূর্তের লাইক, শেয়ার, বিরতিহীন স্ক্রল, সমস্ত আচরণগত তথ্য প্রক্রিয়াজাত হয় বিদেশের সার্ভারে।
বাংলাদেশে মেটা, গুগল বা অ্যামাজনের একটা ডেটা সেন্টারও নাই।
ডেটা যায় সিঙ্গাপুরে, আর রাজস্ব জমে ক্যালিফোর্নিয়ায়। এআই অর্থনীতিতে বাংলাদেশের মূলত এই ‘অবদান’।
স্বাভাবিক আপত্তি উঠবে, আমরা তো শ্রমও দিই। কথাটা অন্য বিচারে ঠিক। অনলাইন শ্রমে বাংলাদেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়, ভারতের পরেই।
হিসাবভেদে বৈশ্বিক অনলাইন লেবারের ষোল শতাংশ। দেশে ডেটা-অ্যানোটেশনের প্রতিষ্ঠানও আছে, যারা বিদেশি এআই কোম্পানির ট্রেনিং-ডেটা তৈরি করে।
কিন্তু এই স্তরটা পাতলা, এবং আরও পাতলা হচ্ছে।
২০২৫ সালের গবেষণা বলছে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের যে রুটিন কাজগুলি বাংলাদেশের শক্তি ছিল, যেমন লেখা, বেসিক কোডিং, ইমেজ, সেগুলির চাহিদা কমছে, দাম পড়ছে।
কারণটা পরিহাসের মতো, এআই নিজেই এখন সেই কাজ করে।
এখন তাহলে হিসাবটা দাঁড়ায়, একদিকে এআই-য়ের কারণে আমাদের শ্রমের বাজার সংকুচিত হচ্ছে, আর অন্যদিকে আমাদের সমস্ত ডেটা এআই কোম্পানিগুলোর কাছে যাচ্ছে বিনামূল্যে।
দুই দিক থেকেই আমরা টান খাচ্ছি।
এইখানে একটা প্রচলিত ধারণা ভাঙা জরুরি। সবাই বলে, ফেসবুক আমাদের ডেটা “বেচে।” কথাটা ভুল, এবং ভুলটা ধরলে দেখা যায়, প্রকৃত ব্যবস্থাটা আরও প্রতিকূল।
মেটা কারো ডেটা কারো কাছে বেচে না। ইউনিলিভার যদি ঢাকার তরুণীদের কাছে শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন পৌঁছাতে চায়, সে মেটাকে টাকা দেয়, মেটা বিজ্ঞাপনটা নির্ভুল মানুষের সামনে হাজির করে।
ইউনিলিভার কোনোদিন জানে না মানুষগুলি কারা। নাম না, তালিকা না, কিছুই না। ডেটা মেটার সিন্দুকেই থাকে। যা বিক্রি হয় তা ডেটা নয়, ডেটা দিয়ে নির্মিত নিশানার ক্ষমতা।
এই মডেলের যুক্তি সরল। বেচলে জিনিস হাতছাড়া হয়, দাম মেলে একবার। নিজের কাছে রেখে কেবল ব্যবহারের অনুমতি বেচলে টাকা আসে প্রতিবার, প্রতিটি ক্যাম্পেইনে, অনির্দিষ্টকাল।
মেটা ডেটার দোকানদার নয়, মেটা ডেটার জমিদার। জমি বেচে না, খাজনা তোলে।
২০২৪ সাল থেকে এই জমিতে দ্বিতীয় ফসলও উঠছে। মেটা নিজেই ঘোষণা করেছে, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের পাবলিক পোস্ট ও ছবি এখন তার নিজস্ব এআই মডেলের প্রশিক্ষণ-উপাদান।
অর্থাৎ আপনার দশ বছর আগের স্ট্যাটাস একইসঙ্গে বিজ্ঞাপনের খাজনা দিচ্ছে, আবার মেটার এআই মেশিনকে বাংলা শেখাচ্ছে।
একই জমি, দ্বৈত ফলন।
তাহলে যেসব এআই কোম্পানির নিজের কোনো প্ল্যাটফর্ম নাই, তারা বাংলা শিখলো কোথা থেকে? এবং তারা যখন আমাদের কোন ‘শ্রমিক’কে ‘ঘন্টাপ্রতি দুই ডলারে’ চাকরিও দিচ্ছে না?
এর উত্তর, খোলা মাঠ থেকে। পাবলিক ইন্টারনেটে যা আছে, ক্রলার তা অনুলিপি করে, বিশ বছরের ব্লগ, পত্রিকার আর্কাইভ, উইকিপিডিয়া, ফোরামের তর্ক।
জিপিটি বা সমজাতীয় মডেলগুলি বাংলা পারে, কারণ বাঙালি বিশ বছর ধরে ইন্টারনেটে বাংলা লিখেছে। অনুমতির প্রশ্ন ওঠে নাই, দামের প্রশ্ন তো দূরের কথা।
অথচ দামের প্রশ্ন তোলা যায়, যদি দলিল থাকে। ‘রেডিট’ তার ফোরামের ডেটা গুগলের কাছে লাইসেন্স দিয়েছে, বছরে ছয় কোটি ডলারে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস একদিকে মামলা লড়ছে, অন্যদিকে লাইসেন্সিং-চুক্তিও করছে। তবে আসলেই তারা পেরেছে, কারণ তাদের ডেটা এক জায়গায়, এক মালিকানায়, এক আইনি সত্তার নামে নিবন্ধিত।
এইদিকে বাংলা ভাষার বিশ বছরের ইন্টারনেট-কর্পাস? লাখো মানুষের উৎপাদন, কিন্তু মালিক-সত্তা শূন্য। যার দলিল নাই, তার সঙ্গে কেউ দর কষে না। তার জিনিস তোলে।
বাংলাদেশের এখানে মনোযোগ দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা আছে। পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র ইতিমধ্যে এই খেলায় নেমেছে, সচেতনভাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআই কোম্পানিকে বাধ্য করছে প্রশিক্ষণ-ডেটার হিসাব দিতে।
ভারত সরাসরি ডেটা বিক্রি করছে না, কিন্তু ডেটা দেশে রাখতে বাধ্য করছে। এইভাবে সেই ডেটাকে পরিণত করছে দর কষাকষির অস্ত্রে।
কেউ দেয়াল তুলছে, কেউ দাম হাঁকছে। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে একটা নিলাম চলছে।
বাংলাদেশ কি টেবিলে বসেছে? একবার বসার ভঙ্গি করেছিল। গত নভেম্বরে অধ্যাদেশ এলো, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ।
সেখানে দুটি সাহসী জিনিস ছিল।
এক, বিদেশি ক্লাউডে রাখা ডেটার একটি প্রতিলিপি দেশের মাটিতে রাখতে হবে। দুই, নাগরিকের ডেটা থেকে অর্জিত মুনাফার উপর রাষ্ট্র ফি বসাতে পারবে।
তারপরের গল্পটা তিন ধাপের।
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আসলো সংশোধনী, প্রতিলিপির শর্ত সংকুচিত হয়ে ঠেকলো কেবল ‘বিশেষ শ্রেণির ডেটা’য়।
এপ্রিলে পূর্ণাঙ্গ আইন, সেখানে দেখা গেলো প্রতিলিপি রাখার শর্তটাই আর নাই।
এখন জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, বিপুল পরিমাণে বিদেশে পাঠালেও লাগবে শুধু একটা নোটিশ। অনুমতি না, নোটিশ।
পাঁচ মাসে দেয়ালটা প্রথমে ছোট হলো, তারপর মিলিয়ে গেলো।
আর ফি? ক্ষমতাটা আইনে টিকে আছে। সরকার চাইলে গেজেট করে বসাতে পারে। কিন্তু সেই গেজেট আজও হয় নাই।
অস্ত্রটা আছে। খাপ থেকে বার করার কেউ নাই।
একটা পুরনো প্যাটার্ন এইখানে ফিরে আসে। আমাদের পাট যেতো কাঁচা, ফেরত আসতো চটের দামে। এখন ডেটা যাচ্ছে কাঁচা, ফেরত আসছে মাসিক সাবস্ক্রিপশনের বিলে।
কিন্তু নস্টালজিয়া দিয়ে এই বিশ্লেষণ শেষ করা যাবে না, কারণ তুলনাটার ভিতরেই একটা অসমতা লুকানো। পাটের অন্তত মালিক ছিল, চাষি, পাটকল, রাষ্ট্র।
ডেটার বেলায় মালিকানার কাঠামোটাই এখনো জন্ম নেয় নাই। আর মালিকহীন সম্পদের পরিণতি ইতিহাসে সবসময় একটাই হয়েছে।
শেষ প্রশ্নটা তাই রাষ্ট্রের কাছে। সাত কোটি মানুষের প্রতিদিনের উৎপাদন যে সম্পদ, তার অভিভাবক কে?
আইন একবার সেই অভিভাবকত্বের দিকে হাত বাড়ালো, পাঁচ মাসে গুটিয়ে নিলো।
এইটা সক্ষমতার ঘাটতি, নাকি ইনসেন্টিভের হিসাব? উত্তর যা-ই হোক, ফলাফল অভিন্ন। নিলামঘরে আমাদের চেয়ার নাই। আমরা বিক্রেতা না, ক্রেতাও না।
আমরা ‘লটের মাল’।
